শ্রীমৎ-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শঙ্করভগবৎ- কৃত-পদভাষ্যসমেতা
[ তৃতীয় সংস্করণ]
১৩৪১ সাল।
All rights reserved.]
মূল্য ২৫০ দুই টাকা বার আনা মাত্র
স্বামী বিবেকানন্দের সংগ্রহ
উপনিষৎপর্যায়ে দ্বিতীয় সংখ্যায় কেনোপনিষৎ প্রকাশিত হইল। উপনিষৎ- মাত্রই ব্রহ্ম-বিদ্যা-প্রকাশক; সুতরাং কেনোপনিষদের প্রতিপাদ্য বিষয়ও তাহা হইতে পৃথক্ নহে। মোহান্ধ জীবগণ স্বভাবতঃই বিনশ্বর দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি অনাত্ম-পদার্থে আত্ম-বুদ্ধি স্থাপন করিয়া, ধ্রুবসত্য পরমাত্মাকে দেখিতে পায় না; তাহার ফলে জন্মের পর জন্ম, মৃত্যুর পর মৃত্যু, এইরূপে অনবরত অনর্থময় দুঃখধারা ভোগ করিতে থাকে, এবং দিন দিন পরিবর্দ্ধমান, আসক্তি-সুরার উন্মাদময়ী বাসনায় অধীর হইয়া, সুদীর্ঘ সংসার-পথে অগ্রসর হইতে থাকে; কিছুতেই পরম শান্তিময় বিবেক-দৃষ্টি লাভ করিতে পারে না। তাহাদের সেই প্রগাঢ় মোহান্ধকার বিধ্বস্ত করিয়া বিবেক-সূর্য্য সমুম্মেষিত করণ, সংসারাক্ত জীবগণের জন্ম-জন্মান্তরসঞ্চিত ‘আমি, আমার’ বুদ্ধি নিরসনপূর্ব্বক পরমাত্মার দিকে উন্মুখী- করণ এবং জীব, জগৎ ও ব্রহ্মের পরস্পর বিশ্লেষণ দ্বারা প্রকৃত স্বরূপ নিরূপণ প্রভৃতি বিষয়সমূহও উপনিষৎ শাস্ত্রের অপরিহার্য্য প্রতিপাদ্য মধ্যে পরিগণিত।
‘এই কেনোপনিষদে চারিটি মাত্র খণ্ড বা অংশ সন্নিবিষ্ট আছে। তন্মধ্যে প্রথম খণ্ডে বর্ণিত হইয়াছে,—সব্বজ্ঞ, সর্ব্বশক্তি পরমেশ্বরই সর্ব্বজগতের একমাত্র পরিচালক ও প্রবর্ত্তক; তাঁহার প্রেরণায় প্রেরিত হইয়াই মন, প্রাণ, চক্ষুঃ, শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয়নিচয় নিজ নিজ কার্য্যে যানিয়মে প্রবৃত্ত হয়; কিন্তু কোন ইন্দ্রিয়ই পরমেশ্বরকে গ্রহণ করিতে পারে না; চক্ষু তাহাকে দেখিতে পায় না, বাক্য তাঁহাকে ব্যক্ত করিতে পারে না, এবং মনও চিন্তা দ্বারা তাঁহাকে ধারণা করিতে সমর্থ হয় না,—তিনি অবাঙ্মনসগোচর ইত্যাদি।
দ্বিতীয় খণ্ডে কথিত হইয়াছে,—যাহারা মনে করে, ব্রহ্মকে জানিয়াছি, বস্তুতঃ তাহারা তাঁহাকে জানে নাই; আর যাহারা ব্রহ্মতত্ত্ব কিঞ্চিৎ অবগত হইয়াছেন, তাঁহারা মনে করেন,—নির্গুণ, নিরুপাধি ও অনন্ত ব্রহ্মকে আমার অল্পশক্তি বুদ্ধি কখনই সম্পূর্ণরূপে জানিতে পারে না, সুতরাং তিনি আমাদের পক্ষে এখনও অবিদিত বা অপরিজ্ঞাতই বটে।
পরিচ্ছিন্ন যে-কোন মূর্ত্ত বস্তুকে আরাধনা করা যায়, তাহা ব্রহ্মের বিভূতি বটে, কিন্তু উহাই অনন্ত ব্রহ্মের পূর্ণ রূপ নহে; সুতরাং তদারাধনে সাক্ষাৎসম্বন্ধে
श्री
মুক্তিলাভ হয় না। আর যাঁহারা প্রতিনিয়ত প্রত্যেক বুদ্ধিবৃত্তিতেই ব্রহ্মস্ফূর্ত্তি দেখিতে পান, প্রকৃতপক্ষে তাঁহারাই ব্রহ্মকে কথঞ্চিৎরূপে জানিতে পারেন, এবং সেই বিজ্ঞানের ফলেই তাঁহারা দেহত্যাগের পর পরম মুক্তিলাভে অধিকারী হন। ইত্যাদি।
তৃতীয় খণ্ডে বর্ণিত হইয়াছে,—একদা ইন্দ্রাদি দেবগণ দেবাসুর-সংগ্রামে পর- মেশ্বর-কৃপায় অসুরগণকে পরাজিত করিয়াছিলেন; কিন্তু উহা যে ঈশ্বর-কৃপারই একমাত্র ফল, তাহা না বুঝিয়া সকলে একত্র সমাসীন হইলেন, এবং বিজয়-লব্ধ অভিমানে আপনাদিগকে গৌরবান্বিত মনে করিয়া নিরতিশয় গর্ব্ব অনুভব করিতে লাগিলেন। এমন সময়, পরমেশ্বর দেবগণের অজ্ঞান-কৃত মিথ্যাভিমানের অপনয়নার্থ অদূরে একটি রমণীয় জ্যোতিঃরূপে আবির্ভূত হইলেন। বায়ু প্রভৃতি সকলেই চমকিত হইয়া একে একে তাঁহার সমীপে সমাগত হইলেন; কিন্তু কেহই আত্ম-শক্তির পরিচয় দিতে সমর্থ হইলেন না। অবশেষে দেবরাজ ইন্দ্র নিকটে গমন করিবামাত্র, সেই জ্যোতিঃ অন্তর্হিত হইল, এবং সঙ্গে সঙ্গে অপর একটি রমণীয় রমণীরূপ আবির্ভূত হইল। ঐ রমণীই হৈমবতী ‘উমা’ নামে প্রসিদ্ধ। ইত্যাদি। চতুর্থ খণ্ডে উক্ত হইয়াছে,—সেই হৈমবতী উমা দেবরাজ ইন্দ্রকে প্রশ্নোত্তর ছলে বলিতে লাগিলেন,—এই যে, তোমরা অসুরগণকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়াছ, ইহা তোমাদের নিজ শক্তির কার্য্য নহে, সর্ব্বনিয়ন্তা, সর্ব্বশক্তি পরমেশ্বরেরই কৃপার ফল। তোমরা নি‘র জানিও, তিনিই স্বীয় শক্তি-সংযোগে তোমাদের দ্বারা এই অসুরবিজয় কার্য্য সম্পাদন করিয়াছেন। তাঁহার প্রেরণায়ই তোমরা যন্ত্রের মত কার্য্য করিয়াছ ও করিতেছ। অতএব, তোমরা মিথ্যা-মোহকৃত বিজয়-লব্ধ অভিমান বা গর্ব্ব পরিত্যাগ কর।
এইরূপে ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারের ফলেই বায়ু অগ্নি প্রভৃতি দেবগণ স্বসমাজে উৎকর্ষ লাভ করিয়াছেন, এবং দেবরাজ সর্ব্বোৎকর্ষ প্রাপ্ত হইয়াছেন। অতঃপর অধ্যাত্ম ও অধিদৈবত ভেদে দ্বিবিধ ব্রহ্মচিন্তা, এবং ব্রহ্মবিদ্যালাভের সহায় বা সাধনীভূত তপস্যা ও সত্যনিষ্ঠা প্রভৃতি বিষয়ের নির্দেশ ও সে সকলের ফলকথন দ্বারা উপনিষৎ সমাপ্ত, ইত্যাদি।
সম্পাদক—
কেনেষিতমিত্যাদ্যোপনিষৎ পরব্রহ্মবিষয়া বক্তব্যেতি নবমস্যাধ্যায়স্যারম্ভঃ প্রাগেতস্মাৎ কর্মাণ্যশেষতঃ পরিসমাপিতানি, সমস্তকর্মাশ্রয়ভূতস্য চ প্রাণস্য উপাসনানি উক্তানি কৰ্ম্মাঙ্গ-সামবিষয়াণি চ। অনন্তরঞ্চ গায়ত্রসামবিষয়ং দর্শনং বংশান্তমুক্তং কার্য্যম্। সর্ব্বমেতদ্যথোক্তং কৰ্ম্ম চ জ্ঞানঞ্চ সম্যগনুষ্ঠিতং নিষ্কামস্য মুমুক্ষোঃ সত্ত্বশুদ্ধ্যর্থং ভবতি; সকামস্য তু জ্ঞানরহিতস্য কেবলানি শ্রৌতানি স্মার্তানি চ কর্মাণি দক্ষিণমার্গপ্রতিপত্তয়ে পুনরাবৃত্তয়ে চ ভবন্তি। স্বাভাবিক্যা ত্বশাস্ত্রীয়য়া প্রবৃত্ত্যা পশ্বাদিস্থাবরান্তাধোগতিঃ স্যাৎ। “অথৈতয়োঃ পথোর্ন কতরেণ- চন তানীমানি ক্ষুদ্রাণি অসকৃদাবর্তীনি ভূতানি ভবন্তি। জায়স্ব-ম্রিয়স্ব ইত্যেতৎ তৃতীয়ং স্থানম্।” ইতি শ্রুতেঃ। “প্রজা হ তিস্রো অত্যায়মীষ্” ইতি মন্ত্র- বর্ণাদ্বিশুদ্ধসত্ত্বস্য তু নিষ্কামস্যৈব বাহ্যাদনিত্যাং সাধ্যসাধনসম্বন্ধাৎ ইহকৃতাৎ পূর্ব্ব- কৃতাদ্বা সংস্কারবিশেষোদ্ভবাদ বিবক্তস্থ্য প্রত্যগাত্মবিষয়া জিজ্ঞাসা প্রবর্ততে।’ তদেতদ্ বস্তু প্রশ্নপ্রতিবচনলক্ষণযা শত্যা প্রদশ্যতে - কেনেষিতমিত্যাদ্যয়া।
কাঠকে চোক্তম—“পবাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বযস্তস্মাৎ পরাঙ পশ্যতি নান্তরাত্মন্। কশ্চিদ্ ধীবঃ প্রত্যগাত্মানমৈক্ষদাবত্তচক্ষবমৃতত্বমিচ্ছন্” ইত্যাদি। “পরীক্ষা লোকান্ কৰ্ম্মচিতান্ বাহ্মণো নিবেদমাযান্নাস্ত্যকৃতঃ কৃতেন।” “তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ সমিৎপাণিঃ শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্’ ইত্যাদ্যাথর্ব্বণে চ। এবং হি বিরক্তস্য প্রত্যগাত্মবিষয়ং বিজ্ঞানং শ্রোতুং মন্ত্রং বিজ্ঞাঞ্চ সামর্থ্যমুপপদ্যতে; নান্যথা। এতস্মাচ্চ প্রত্যগাত্ম-ব্রহ্মবিজ্ঞানাৎ সংসাববাজমজ্ঞানং কামকর্মপ্রবৃত্তি- কারণমশেষতো নিবর্ত্ততে; “তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ, “তরতি’শোকমাত্মবিৎ” ইতি, “ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্চিদ্যন্তে সর্ব্বসংশয়াঃ। ক্ষীয়ন্তে চাস্য কর্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যশ্চ।
কৰ্ম্মসহিতাদপি জ্ঞানাদেতৎ সিধ্যতীতি চেৎ, ন, বাজসনেয়কে তস্য অন্যকারণত্ব- বচনাৎ। “জায়া মে স্যাৎ” ইতি প্রস্তুত্য “পুত্রেণায়ং লোকো জয্যো, নান্যেন কর্মণা। কৰ্ম্মণা পিতৃলোকো বিদ্যয়া দেবলোকঃ” ইত্যাত্মনোহন্যস্য লোকত্রয়স্য কারণত্বমুক্তং বাজসনেয়কে। তত্রৈব চ পাবিরাজ্যবিধানে হেতুরুক্তঃ—“কিং প্রজয়া করিষ্যামো যেষাং নোহয়মাত্মাহয়ং লোকঃ।” ইতি। তত্রায়ং হেত্বর্থঃ—
প্রজা-কৰ্ম্ম-তৎসংযুক্তবিদ্যাভির্মনুষ্য-পিতৃ-দেব-লোকত্রয়সাধনৈঃ অনাত্মলোকপ্রতি- পত্তি-কারণৈঃ কিং করিষ্যামঃ। ন চাম্মাকং লোকত্রয়মনিত্যং সাধনসাধ্যমিষ্টং যেষামম্মাকং স্বাভাবিকোহজোহজরোহমৃতোহভয়ো ন বদ্ধতে কৰ্ম্মণা নো কনীয়া- ন্নিত্যশ্চ লোক ইষ্টঃ। স চ নিত্যত্বান্নাবিদ্যানিবৃত্তিব্যতিরেকেণ অন্যসাধননিষ্পাদ্যঃ। তস্মাৎ প্রত্যগাত্ম-ব্রহ্মবিজ্ঞানপূর্ব্বকঃ সর্ব্বৈষণাসন্ন্য।স এব কর্তব্য ইতি।
কর্মসহভাবিত্ববিরোধাচ্চ প্রত্যগাত্মব্রহ্মবিজ্ঞানস্য। নহ্যপাত্তকারকফলভেদ- বিজ্ঞানেন কৰ্ম্মণা প্রত্যস্তমিতসর্ব্বভেদদর্শনস্য প্রত্যগাত্মব্রহ্মবিষয়স্য সহভাবিত্ব- মুপপদ্যতে। বস্তুপ্রাধান্যে সতি অপুরুষতত্ত্বদ্ব্রহ্মবিজ্ঞানস্য। তস্মাৎ দৃষ্টাদৃষ্টেভ্যো বাহ্যসাধনসাধ্যেভ্যো বিবক্তস্য প্রত্যগাত্মবিষয়া ব্রহ্মজিজ্ঞাসেয়ং কেনেষিতমিত্যাদি- শ্রুত্যা প্রদর্শ্যতে। শিষ্যাচার্য্য প্রশ্নপ্রতিবচনরূপেণ কথনন্ত সুক্ষবস্তুবিষয়ত্বাৎ সুখপ্রতিপত্তিকারণং ভবতি, কেবলতর্কাগম্যত্বঞ্চ দর্শিতং ভবতি; “নৈষা তর্কেণ মতিরপনেয়া” ইতি শ্রুতেচ্চ, “আচার্য্যবান্ পুরুষো বেদ” “আচার্য্যাদ্ধ্যের বিদ্যা বিদিতা সাধিষ্ঠং প্রাপৎ” ইতি, “তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন” ইত্যাদিশ্রুতিস্মৃতিনিয়- মাচ্চ। কাশ্চিদ গুরুং ব্রহ্মনিষ্ঠং বিধিবদুগেত্য প্রত্যগাত্মবিষয়াদন্যত্র শরণমপশ্যন্ন- ভয়ং নিত্যং শিবমুচলমিচ্ছন্ পপ্রচ্ছেতি কল্প্যতে,-কেনেসিতমিত্যাদি।
অতঃপর, পরব্রহ্ম-প্রতিপাদক কেনোপনিষৎ বলিতে হইবে বলিয়া নবম অধ্যায়(১) আরব্ধ হইয়াছে। ইতঃপূর্বের সমস্ত কৰ্ম্ম- বিধি সম্পূর্ণরূপে কথিত হইয়াছে, কর্মসংশ্লিষ্ট প্রাণোপাসনা এবং কৰ্ম্মাঙ্গ সামোপান্নোও ‘উক্ত, হইয়াছে। তাহার পর ‘গায়ত্র’ সাম- সম্বন্ধে যেরূপ চিন্তা করিতে হইবে, তাহা এবং শিষ্য-পরম্পরাগত ঋষিবংশ পয্যন্ত যাহা যাহা বলা আবশ্যক, তৎসমস্তই কথিত হইয়াছে। বুঝিতে হইবে, পূর্বোক্ত জ্ঞান, কম্ম সমস্তই যথাযথ- রূপে অনুষ্ঠিত হইলে নিষ্কাম মুমুক্ষু ব্যক্তির চিত্তশুদ্ধি উৎপাদন করে; কিন্তু, আত্মজ্ঞান-বিমুখ সকাম ব্যক্তিগণের পক্ষে শ্রুতি ও স্মৃতি- শাস্ত্রোক্ত কৰ্ম্মসমূহ দক্ষিণ পথে(ধূমাদি মার্গে) গতি ও পুনরাবৃত্তি
অর্থাৎ বারংবার জন্ম-মরণপ্রবাহ সম্পাদন করে। আর যে সকল কৰ্ম্ম শাস্ত্রবিহিত নহে—কেবল স্বাভাবিক প্রবৃত্তির প্রেরণায় অনুষ্ঠিত হয়, সেই সকল কর্ম্মের ফলে পশু প্রভৃতি হইতে আরম্ভ করিয়া স্থাবর জন্ম পর্য্যন্ত অধোগতি লাভ হয়। নিম্নলিখিত শ্রুতিসমূহ এবিষয়ে প্রমাণ,—[ যাহারা স্বাভাবিক অনুরাগের বশে কৰ্ম্ম করে] “তাহারা দক্ষিণায়ন বা উত্তরায়ণ, এই দুই পথের এক পথেও গমন করে না; তাহারা অসকৃদাবর্ত্তী অর্থাৎ পুনঃ পুনঃ জন্ম-মরণশীল এই সকল ক্ষুদ্র প্রাণিরূপ(কৃমি-কীট প্রভৃতি) জন্ম ধারণ করিয়া থাকে। ইহাই ‘জায়স্ব-ম্রিয়স্ব’ নামক তৃতীয় স্থান।” আর “জরায়ুজ, অণ্ডজ ও উদ্ভিদ এই ত্রিবিধ প্রাণীই পিতৃযান ও দেবযান অতিক্রম করিয়া অতি কষ্টকর গতি প্রাপ্ত হইয়াছে” এই মন্ত্র হইতে জানা যায় যে, যাহারা বিশুদ্ধচিত্ত ও নিষ্কাম, এবং ঐহিক বা পারলৌকিক শুভ সংস্কার প্রবুদ্ধ হওয়ায় সাধ্যসাধনময় অনিত্য বাহ্য ভোগ-সাধনে বিরক্ত, হইয়াছেন, কেবল তাহাদের পক্ষেই আত্মবিষয়ক জিজ্ঞাসা উপস্থিত হইয়া থাকে। এই বিষয়ই “কেনেষিতম্” ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা প্রশ্ন-প্রতিবচনচ্ছলে উপন্যস্ত হইতেছে। কঠোপনিষদেও উক্ত আছে—‘যেহেতু পরমেশ্বর ইন্দ্রিয়গণকে বহির্মুখ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন(অথবা হিংসা করিয়াছেন), সেই হেতু ইন্দ্রিয়গণ কেবল বাহ্য বস্তুই দর্শন করে,—অন্তরাত্মাকে দর্শন করে না। অতি অল্পসংখ্যক ধীর ব্যক্তিই মুক্তির ইচ্ছায় চক্ষু পরাবৃত্ত করিয়া, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণকে অন্তর্মুখ করিয়া পরমাত্মার দর্শন লাভ করিয়াছেন’ ইত্যাদি। অথর্ববেদীয় উপনিষদেও আছে— ‘কর্ম্মলব্ধ স্বর্গাদি লোকসকল পরীক্ষা করিয়া, অর্থাৎ যুক্তি দ্বারা কর্ম্ম- ফলের অনিত্যতা অবগত হইয়া ব্রহ্মনিষ্ঠ হইবে, এবং ক্রিয়া দ্বারা অকৃত—নিত্যস্বরূপ মোক্ষ লাভ করা যায় না; বুঝিয়া বৈরাগ্য অবলম্বন করিবে।’ ‘সেই শিষ্য সমিৎপাণি হইয়া ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য বেদজ্ঞ
ও’ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর সমীপে উপস্থিত হইবে’ ইত্যাদি। উক্ত প্রকারে বৈরাগ্যসম্পন্ন হইলেই আত্মজ্ঞান বিষয়ে শ্রবণ, মনন ও উপলব্ধি করিবার ক্ষমতা উৎপন্ন হয়, নচেৎ হয় না এবং এই আত্মতত্ত্ব- বিজ্ঞানের ফলেই কামনা ও কামনা-প্রণোদিত কৰ্ম্ম-প্রবৃত্তির হেতু এবং সংসার-বীজ অজ্ঞান বিনিবৃত্ত হইয়া যায়। ‘যে লোক(সর্বত্র) একত্ব দর্শন করে, তাহার সেই অবস্থায় শোকই বা কি, আর মোহই বা কি?(কিছুই থাকে না)। এই মন্ত্র এবং ‘আত্মজ্ঞান-সম্পন্ন ব্যক্তি শোক অতিক্রম করে’, ‘সেই পরাবর(পর-ব্রহ্মাদিও যাহা অপেক্ষা অবর বা নিকৃষ্ট) ‘ব্রহ্ম সাক্ষাৎকৃত হইলে হৃদয়ের গ্রন্থি(অহঙ্কার) ছিঁড়িয়া যায়, সমস্ত সংশয় বিধ্বস্ত হইয়া যায়, এবং কর্মসমূহও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতেও ঐ কথা প্রমাণিত হয়।
যদি বল, কৰ্ম্মসহকৃত জ্ঞান হইতেও ত এই বিষয়(মুক্তি) সিদ্ধ হইতে পারে? না—হইতে পারে না; কারণ, যজুর্বেদীয় বাজ- সনেয় উপনিষদে কৰ্ম্ম-সহিত জ্ঞানের অন্য প্রকার ফল উক্ত হইয়াছে, —প্রথমে ‘আমার পত্নী হউক’ এই কথা আরম্ভ করিয়া ‘পুত্র দ্বারাই এই বর্তমান লোক জয় করা যাইতে পারে, অপর কর্ম্মদ্বারা নহে; আবার কর্ম্মদ্বারাই পিতৃলোক জয় করা যাইতে পারে, এবং বিদ্যা- দ্বারা দেবলোক লাভ করা যাইতে পারে’, এইরূপে সেই স্থলে কর্ম্মসহকৃত জ্ঞানকে লোকত্রয়-লাভেরই কারণ বলা হইয়াছে, কিন্তু আত্মলাভের কারণ বলা হয় নাই। সেই ধাজসনেয় ব্রাহ্মণেই পুনশ্চ সন্ন্যাস-বিধানের এই হেতু ‘বলা হইয়াছে—‘আমরা সেই প্রজা (সন্তানের) দ্বারা কি করিব, যাহা দ্বারা আমাদের অভীষ্ট আত্ম-লোক লব্ধ হইবে না?’ ইহার অভিপ্রায় এই যে, প্রজা, কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্ম- সংযুক্ত বিদ্যা এই তিনটি যথাক্রমে মনুষ্যলোক, পিতৃলোক ও দেব- লোক প্রাপ্তির সাধন বা উপায়, কিন্তু সাধ্য-সাধনবিশিষ্ট অনিত্য এই লোকত্রয় আমাদের অভীষ্ট নহে। আমাদের আত্মা, জরা-মরণ-
বর্জিত, অমৃত ও সর্বভয়-রহিত, নিত্যস্বভাব; সেই আত্মা কোন কর্মদ্বারা বৃদ্ধি-হ্রাস প্রাপ্ত হয় না। অতএব, পূর্বোক্ত লোকত্রয়- সাধনীভূত কর্ম দ্বারা আমাদের কোন প্রয়োজন নাই। আমাদের অভীষ্ট সেই আত্মলোক অবিদ্যানিরত্তি ‘ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে সম্পন্ন হইবার যোগ্য নহে; অতএব, জীব-ব্রহ্মের অভেদ-জ্ঞানপূর্ব্বক সর্ববাসনা পরিত্যাগরূপ সন্ন্যাস গ্রহণ করাই অবশ্য কর্তব্য।
জীব ও ব্রহ্মের একত্ব রোধ কর্মানুষ্ঠানের সম্পূর্ণ বিরোধীও বটে। এই কারণেই আত্মজ্ঞানের সহিত কর্মবিধির সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠান হইতে পারে না। কেননা, কর্মানুষ্ঠানে কর্তৃ-কর্মাদি কারক-ভেদ এবং স্বর্গ-লোকাদি, ফলভেদ জ্ঞাত থাকা আবশ্যক হয়; আর আত্মবিষয়ক জ্ঞানে সেই সমস্ত ভেদবুদ্ধি বিলুপ্ত করিয়া দেয়; সুতরাং তদুভয়ের একত্র(একই পুরুষে) অবস্থিতি সম্ভবপর হয় না। বিশেষতঃ ব্রহ্মাত্ম-বিজ্ঞানটি বস্তুপ্রধান, অর্থাৎ বস্তুর সত্যতার উপরেই প্রতিষ্ঠিত; উহাতে কত্তার কিছুমাত্র স্বাতন্ত্র্য বা প্রাধান্য নাই *। অতএব, বুঝিতে হইবে যে, সর্বপ্রকার বাহ্য সাধন ও বাহ্য ফল- ভোগে যাহার বৈরাগ্য উপস্থিত হইয়াছে, তাহার জন্যই ‘কেনেষিতম্’ ইত্যাদি শ্রুতিদ্বারা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসা প্রদর্শিত হইতেছে। শাস্ত্রপ্রতি- পাদ্য এই বিষয়টি অতি সূক্ষ্ম—সহজে বুদ্ধিগম্য হয় না; এই দুরূহ বিষয়টিকে অনায়াসে বুদ্ধিগম্য করিবার জন্য শিষ্য ও আচার্য্যের প্রশ্ন-প্রত্যুত্তরচ্ছলে নিরূপিত করা হইয়াছে। আর এই বিষয়টি যে, কেবল শুষ্ক তর্কের অগম্য, তাহাও এই আখ্যায়িকাদ্বারা বিজ্ঞাপিত
করা হইয়াছে। শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘এই আত্মবিষয়া বুদ্ধি (আত্মজ্ঞান) তর্কদ্বারা লাভ করা যায় না; ‘অথবা শাস্ত্রবিরুদ্ধ তর্ক- দ্বারা এই আত্মজ্ঞান অপনীত করিবে না, ‘পুরুষ, উপযুক্ত আচায্য লাভ করিলেই(ব্রহ্মকে) জানিতে পারে’, ‘বিদ্যা আচার্য্য হইতে লব্ধ হইলেই উৎকৃষ্ট ফল প্রাপ্ত করায়’ ইত্যাদি। ভগবানও বলিয়া- ছেন—[হে অর্জুন!] ‘অতএব, তুমি গুরুর সমীপে প্রণিপাত দ্বারা সেই তত্ত্ব অবগত হও’ ইত্যাদি শ্রুতি-স্মৃতি হইতেও পূর্ব্বোক্ত নিয়ম সমর্থিত হইতেছে। অতএব, মুমুক্ষু ব্যক্তি পরমাত্ম- জ্ঞান ভিন্ন আর কুত্রাপি আশ্রয় না পাইয়া যথাবিধি ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর সমীপে উপস্থিত হইয়া সর্বভয়-হর, নিত্যকল্যাণময়, অচল আশ্রয় লাভের আশায়ই যে তদ্বিষয়ে প্রশ্ন করিয়াছিলেন, এইরূপ অভিপ্রায় উক্ত বাক্য হইতে কল্পনা কর। যাইতে পারে।
সামবেদীয়া তলবকারোপনিষৎ
ওঁ আপ্যায়ন্ত মমাঙ্গানি বাক্ প্রাণশ্চক্ষুঃ শ্রোত্রমথো বল ন্দ্রিয়াণি চ সর্ব্বাণি। সর্ব্বং ব্রহ্মৌপনিষদং মাহং ব্রহ্ম নিরাকুর্য্য মা মা ব্রহ্ম নিরাকরোদনিরাকরণমত্ত্বনিরাকরণং মেহস্ত তদাত্মনি নিরতে য উপনিষৎসু ধর্মাস্তে ময়ি সন্তু, তে ময়ি সন্ত ওঁ.শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ হরিঃ ওঁ। শান্তিপাট।
আমার সমস্ত অঙ্গ এবং বাক্, প্রাণ, চক্ষুঃ, শ্রোত্র, বল ও ইন্দ্রি সমূহ বৃদ্ধি বা পুষ্টি লাভ করুক। উপনিষৎ-প্রতিপাদিত ব্রহ্ম আম নিকট প্রতিভাত হউক; আমি যেন ব্রহ্মকে নিরাস বা ‘অস্বীকার করি এবং ব্রহ্মও যেন আমাকে প্রত্যাখ্যান বা পরিত্যাগ না করে তাঁহার নিকট আমার এবং আমার নিকট তাঁহার সর্বদা অপ্রত্যাখ্য (নিয়ত সম্বন্ধ) বিদ্যমান থাকুক। আর আত্মনিষ্ঠ আমাতে উপনিষ প্রোক্ত ধর্মসমূহ প্রকাশিত হউক ॥
কেনেষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ। কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি ॥১॥
প্রণম্য গুরুপাদাজং স্মৃতা শঙ্করভাষিতম্। কেনোপনিষদাং ব্যাখ্যা সরলাখ্যা প্রতন্যতে॥
মনঃ কেন ইষিতম্(ইড়াগমশ্ছান্দসঃ, ইষ্টম্ অভিপ্রেতম্) প্রেষিতং(প্রেরিতং চ সৎ) পততি(স্ববিষয়ং প্রতি গচ্ছতি)।[শরীরাভ্যন্তরস্থঃ] প্রথম:(শ্রেষ্ঠঃ) প্রাণঃ কেন যুক্তঃ(নিযুক্তঃ প্রেরিতঃ সন্) প্রৈতি(স্বব্যাপারং প্রতি গচ্ছতি)। কেন ইষিতাং ইমাং(শব্দলক্ষণাং) বাচম্ বদন্তি,[‘লোকাঃ ইতি শেষঃ]। তথা কঃ উ (বিতর্কে) দেবঃ(দ্যোতনবান্) চক্ষুঃ শ্রোত্রং চ যুনক্তি(যুক্তে, প্রেরয়তি) ॥১৷৷ অনুবাদ।
মন কাহার ইচ্ছায় প্রেরিত হইয়া(স্ববিষয়ে) গমন করে? শ্রেষ্ঠ প্রাণই বা কাহার নিয়োগে গমনাগমন করে? লোকসকল কাহার ইচ্ছায় প্রণোদিত শব্দ উচ্চারণ করে এবং কোন্ দেবতা এই চক্ষুঃ ও কর্ণকে স্ব স্ব কার্য্যে নিযুক্ত করিয়া থাকেন? ১৷৷
কেনেষিতমিতি। কেন কর্ত্তা ইষিতম্ ইষ্টম্ অভিপ্রেতং সৎ মনঃ পততি গচ্ছতি স্ববিষয়ং প্রতীতি সম্বধ্যতে। ইয়েরাভীক্ষ্যার্থস্য গত্যর্থস্য চ ইহাসম্ভবাৎ ইচ্ছার্থস্যেব এতদ্রূপমিতি গম্যতে। ইষিতমিতি ইট্প্রয়োগস্ত ছান্দসঃ, তস্যৈব প্রপূর্ব্বস্থ্য নিয়োগার্থে প্রেষিতমিদ্যেতং। তত্র প্রেষিতমিত্যেবোক্তে প্রেষয়িত্ব- প্রেষণবিশেষবিষয়াকাঙ্ক্ষা স্যাৎ কেন প্রেষয়িত্ববিশেষেণ, কীদৃশং বা প্রেষণমিতি। ইষিতমিতি তু বিশেষণে সতি তদুভয়ং নিবর্ত্ততে, কস্য ইচ্ছামাত্রেণ প্রেষিতমিত্যর্থ- বিশেষনিদ্ধারণাৎ।
যদ্যেযোহর্থোহভিপ্রেতঃ স্যাৎ, কেনেষিতমিত্যেতাবতৈব সিদ্ধত্বাৎ প্রেষিত- মিতি ন বক্তব্যম্। অপি চ শব্দাধিক্যাদর্থাধিক্যং যুক্তমিতীচ্ছয়া কৰ্ম্মণা বাচা বা কেন প্রেষিতমিত্যর্থবিশেষোহবগন্তুং যুক্তঃ। -ন, প্রশ্নসামর্থ্যাৎ; দেহাদি-সঙ্ঘাতাৎ অনিত্যাৎ কর্মকাৰ্য্যাৎ বিরক্তঃ অতোহন্যৎ কূটস্থং নিত্যং বস্তু বুভুৎসমান: পৃচ্ছ- তীতি সামর্থ্যাদুপপদ্যতে। ইতরথা ইচ্ছাবাক্কৰ্ম্মভিঃ দেহাদিসঙ্ঘাতস্য প্রেরয়িতৃত্বং প্রসিদ্ধমিতি প্রশ্নোহনর্থক এব স্যাৎ। এবমপি প্রেষিতশব্দস্যার্থো ন প্রদর্শিত’এব? ন, সংশয়বতোহয়ং প্রশ্ন ইতি প্রেষিতশব্দস্যার্থবিশেষ উপপদ্যতে,-কিং যথা- প্রসিদ্ধমেব কার্যকারণসঙ্ঘাতস্য প্রেষয়িতৃত্বং, কিংবা সঙ্ঘাতব্যতিরিক্তস্থ্য
স্বতন্ত্রস্য ইচ্ছামাত্রেণৈব মন-আদিপ্রেষয়িতৃত্বম্, ইত্যস্য অর্থস্য প্রদর্শনার্থম্ “কেনে- ষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ” ইতি বিশেষণদ্বয়মুপপদ্যতে।
ননু স্বতন্ত্রং মনঃ স্ববিষয়ে স্বয়ং পততীতি প্রসিদ্ধম্; তত্র কথং প্রশ্ন উপপদ্যত ইতি? উচ্যতে।—যদি স্বতন্ত্রং মনঃ প্রবৃত্তিনিবৃত্তিবিষয়ে স্যাৎ, তর্হি সর্ব্বস্য অনিষ্ট- চিন্তনং ন স্যাৎ, অনর্থং চ জানন্ সঙ্কল্পয়তি, অত্যুগ্রদুঃখে চ কার্য্যে বাৰ্য্যমাণমপি প্রবর্ত্তত এব মনঃ। তস্মাদযুক্ত এব কেনেষিতমিত্যাদিপ্রশ্নঃ। কেন প্রাণো যুক্তো নিযুক্তঃ প্রেরিতঃ সন্ প্রৈতি গচ্ছন্তি স্বব্যাপারং প্রতি। প্রথম ইতি প্রাণ- বিশেষণং স্যাৎ, তৎপূর্ব্বকত্বাৎ সর্ব্বেন্দ্রিয়প্রবৃত্তীনাম্। ‘কেন ‘ইষিতাং বাচমিমাং শব্দলক্ষণাং বদন্তি লৌকিকাঃ। তথা চক্ষুঃ শ্রোত্রং চ যে যে বিষয়ে কউ দেবো দ্যোতনবান্ যুনক্তি নিযুক্তে প্রেরয়তি ॥ ১ ॥
মন কাহার অভিলষিত ও কাহাদ্বারা প্রেষিত হইয়া অর্থাৎ কাহার ইচ্ছায় নিয়োজিত হইয়া স্বকার্য্যাভিমুখে যাইতেছে? ‘ইষ’ ধাতুর অর্থ আভীক্ষ্য(পৌনঃপুন্য), গতি ও ইচ্ছা। তন্মধ্যে আভীক্ষ্য ও গত্যর্থের এখানে সম্ভব নাই; কাজেই এখানে ইচ্ছার্থক ‘ইষ’ ধাতুর প্রয়োগ বুঝিতে হইবে। ‘প্রেন্বিতম্’ পদটিও ইচ্ছার্থক ‘ইষ’ ধাতু হইতে ‘প্র’ উপসর্গ-যোগে নিষ্পন্ন হইয়াছে। এখানে উহার অর্থ—নিয়োগ করা। শ্রুতিতে ‘ইষিতম্’, না বলিয়া যদি কেবল ‘প্রেষিতম্’ই বলা হইত, তাহা হইলে প্রেষয়িতা ও প্রেষণ সম্বন্ধে বিশেষ সংবাদ জানিবার জন্য পুনশ্চ আকাঙ্ক্ষা হইত, অর্থাৎ মন যাহার প্রেষণে থাকিত হয়, সেই প্রেষয়িতা কে, এবং তাহার প্রেষণই বা কি প্রকার?—ইহা জানিবার জন্যও ঔৎসুক্য থাকিয়া যাইত; কিন্তু ‘ইষিতং’ বিশেষণেই সেই বিশেষার্থ নির্দ্ধারিত হওয়ায় তদ্বিষয়ক বিশেষাকাঙ্ক্ষা আপনা হইতেই নিবৃত্ত হইয়াছে।
এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, যদি ঐরূপ অর্থবিশেষ নিরূপণ করাই শ্রুতির অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে ‘ইষিতম্’ পদেই যখন সেই অভিপ্রায় অবধারিত হইল, তখন আর ‘প্রেষিতম্’ বিশেষণ প্রয়োগ
২
করা উচিত হয় না; বিশেষতঃ, শব্দের আধিক্য থাকিলে যখন অর্থেরও আধিক্য থাকা যুক্তিসিদ্ধ, তখন এরূপ অর্থও প্রতীত হইতে পারে যে, যিনি[আমাদেরই মত] স্বীয় ইচ্ছা, চেষ্টা বা বাক্যদ্বারা মনকে প্রেষিত করেন, তিনি কে? না; প্রশ্ন-সামর্থ্যেই ওরূপ প্রতীতি হইতে পারে না; কারণ, উক্ত প্রশ্ন দৃষ্টে মনে হয় যে, কোন লোক যেন ইন্দ্রিয়াদির সমষ্টিভূত, অনিত্য দেহাদিতে বিরক্ত(বৈরাগ্য- প্রাপ্ত) হইয়া দেহাদির, অতিরিক্ত একটি কূটস্থ নিত্য বস্তুর অন্বেষণে ঐরূপ প্রশ্নের অবতারণা করিয়াছেন; সুতরাং তাঁহার পক্ষে উক্ত- প্রকার প্রতীতিমূলক প্রশ্ন কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। পক্ষান্তরে, ইন্দ্রিয়াদি-সঙ্ঘাতময় এই দেহ যে, ইচ্ছা, চেষ্টা ও বাক্য দ্বারা মনকে প্রেরণ করে, ইহা সর্বজন-বিদিত এবং প্রশ্ন-কর্তাও নিশ্চয়ই, ইহা অবগত আছেন; সুতরাং তাঁহার পক্ষে ঐরূপ প্রশ্নের উত্থাপন একেবারেই অর্থহীন-নিষ্প্রয়োজন হইয়া পড়ে। ভাল, এরূপ বলিলেও ‘প্রেষিত’ শব্দের ত কোনই অর্থ-বিশেষ প্রদর্শিত হইল না? না,-এ প্রশ্নও যুক্তিযুক্ত হইল না; কারণ, যে লোকের মনে মনের প্রেষণ ও’প্রেষয়িতা সম্বন্ধে সংশয় বিদ্যমান আছে, তাহার পক্ষে সংশয়-ভঞ্জনার্থ ‘প্রেয়য়িতা’ পদের সার্থকতা প্রদর্শন করা যাইতে পারে। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদির সমষ্টিময় এই দেহই ‘প্রেষয়িতা’ বলিয়া লোকপ্রসিদ্ধ; বস্তুতঃ সেই দেহই কি মনেরও প্রেরক? না; তদতি- রিক্ত, এমন স্বতন্ত্র(স্বাধীন) কেহ আছেন, যাঁহার ইচ্ছামাত্রে মন প্রভৃতির প্রেষণকার্য্য অনায়াসে সম্পাদিত হয়; এইরূপ বিশেষাভি- প্রায়-বিজ্ঞাপনার্থই ‘ইষিত’ ও ‘প্রেষিত’ বিশেষণ দুইটি প্রযুক্ত হইয়াছে।
জিজ্ঞাসা করি,—মনই স্বয়ং স্বাধীনভাবে স্ববিষয়ে গমন করে, ইহাই ত লোকপ্রসিদ্ধ; তবে আর ঐরূপ প্রশ্ন সঙ্গত হয় কিরূপে? হাঁ, এ প্রশ্নের উত্তর বলা যাইতেছে,—মন যদি নিজের প্রবৃত্তি ও
নিবৃত্তিতে স্বাধীন হইত, “তাহা হইলে কাহারও কখন অনিষ্ট-চিন্তা আসিতে পারিত না; অথচ মন জানিয়া শুনিয়াও অনর্থ(অনিষ্ট) চিন্তা করিয়া থাকে; বাধা সত্ত্বেও মন অতি প্রচণ্ড দুঃখকর কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে;[মন স্বাধীন হইলে’ এরূপ হইত না]। অতএব, ‘কেন ইষিতম্’ ইত্যাদি প্রশ্ন যুক্তি-যুক্তই বটে।
প্রাণ কাহার দ্বারা নিযুক্ত(প্রেরিত) হইয়া গমন করে, অর্থাৎ স্বীয় কার্য্য সম্পাদন করে?[পঞ্চবৃত্তি] ‘প্রাণই, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রথমোৎপন্ন; এই কারণ প্রাণকে ‘প্রথম’ বিশেষণে বিশেষিত করা হইয়াছে। সাধারণ লোক সকল কাঁহার প্রেরিত শব্দ উচ্চারণ করে? এবং কোন্ দেবতা’(দ্যুতিমান্) চক্ষুঃ ও শ্রবণেন্দ্রিয়কে স্ব স্ব কার্য্যে প্রেরণ করেন? ॥১॥
শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসো মনো যদ্ বাচো হ বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ। চক্ষুষশ্চক্ষুরতিমুচ্য ধীরাঃ প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি ॥২॥ ব্যাখ্যা।
যৎ(যঃ) শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্,(কার্য্য-প্রবৃত্তি-হেতু), মনসঃ মনঃ(মনন-প্রয়োজকম্) বাচঃ ই বাচম্(বাকু), সঃ দেবঃ উ(অপি) প্রাণস্থ্য প্রাণঃ, চক্ষুষঃ চক্ষুঃ, [শ্রোত্রাদেঃ শ্রোত্রাদিলক্ষণং ব্রহ্ম বিদিত্বা] অতিমুচ্য(শ্রোত্রাদিষু আত্মবুদ্ধিং পরিত্যজ্য) ধীরাঃ(ধীমন্তঃ) অস্মাৎ লোকাৎ প্রেত্য(মৃত্যু) অমৃতাঃ(অমরণ- ধর্মাণঃ) ভবন্তি ॥২॥
যিনি শ্রোত্রের শ্রোত্র(কার্য্য-প্রবর্ত্তক), মনের মন, বাক্যেরও বাক্য; তিনিই প্রাণের প্রাণ, চক্ষুর চক্ষুঃস্বরূপ; এই হেতু পণ্ডিতগণ ইন্দ্রিয়সমুহে আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করিয়া মৃত্যুর পর অমৃতত্ব লাভ করেন অর্থাৎ অমর হন ॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্। এবং পৃষ্ঠবতে যোগ্যায় আহ গুরুঃ, শৃণু ত্বং যৎ পৃচ্ছসি,—মনআদিকরণ-
জাতস্য কো দেবঃ স্ববিষয়ং প্রতি প্রেরয়িতা, কথং বা প্রেরয়তীতি। শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্, শূণোত্যনেনেতি শ্রোত্রম্-শব্দস্য শ্রবণং প্রতি করণং শব্দাভিব্যঞ্জকং শ্রোত্রমিন্দ্রিয়ম্, তস্য শ্রোত্রং সঃ, যস্তুয়া পৃষ্টঃ-চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যনক্তীতি। অসাবেবংবিশিষ্টঃ শ্রোত্রাদীনি নিযুক্ত ইতি বক্তব্যে-নন্বেতদনুরূপং প্রতিবচনং -শ্রোত্রস্য শ্রোত্রমিতি। নৈষ দোষঃ; তস্য অন্যথাবিশেষানবগমাৎ। যদি হি শ্রোত্রাদিব্যাপারব্যতিবিক্তেন স্বব্যাপাবেণ বিশিষ্টঃ শ্রোত্রাদিনিযোক্তা অবগম্যেত দাত্রাদি-প্রয়োক্তবৎ, তদিদমননুরূপং প্রতিবচনং স্যাৎ। ন ত্বিহ শ্রোত্রাদীনাং প্রয়োক্তা স্বব্যাপাববিশিষ্টে। লবিত্রাদিবৎ অধিগম্যতে। শ্রোত্রাদীনামের তু সংহতানাং ব্যাপাবেণ আলোচন-সংকল্পাধ্যবসাযলক্ষণেন ফলাবসানলিঙ্গেন অবগম্যতে। অস্তি ‘হি শ্রোত্রাদিভিরসংহতঃ, যৎপ্রযোজন-প্রযুক্তঃ শ্রোত্রাদি- কলাপো গৃহাদিবৎ ইতি, সংহতানাং পবার্থত্বাৎ অবগম্যতে শ্রোত্রাদীনাং প্রয়োক্তান তস্মাৎ অনুরূপমেবেদং প্রতিবচনং শ্রোত্রস্য শ্রোত্রমিত্যাদি।
কঃ পুনরত্র, পদার্থ: ‘শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্’ ইত্যাদেঃ‘। ন হ্যত্র শ্রোত্রস্য শ্রোত্রান্তবে- ণার্থঃ—যথা প্রকাশস্য প্রকাশান্তবেণ। নৈষণ দোষঃ। অয়মত্র পদার্থঃ,—শ্রোত্র তাবৎ স্ববিষয়ব্যঞ্জনসমর্থং দৃষ্টম্, তচ্চ স্ববিষয়ব্যঞ্জনসামর্থ্যং শ্রোত্রস্য চৈতন্যে হ্যাত্ম জ্যোতিষি নিত্যেহসংহতে সর্ব্বান্তবে সতি ভবতি, নাসতি, ইত্যতঃ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রমিত্যাদ্যপপদ্যতে। তথা চ ক্রত্যন্তবাণি,—‘আত্মনৈবাযং জ্যোতিষাস্তে’, ‘তস্য ভাসা সর্ব্বমিদং বিভাতি,’ ‘যেন সূর্য্যস্তপতি তেজসেদ্ধঃ’ ইত্যাদিনি। ‘যদাদিত্য- গতং তেজো জগদ্ভাসয়তে খিলম্॥” “ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত,” ইত্যাদি গীতাসু। কাঠকে চ,—“নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্” ইতি। শ্রোত্রাদ্যের সর্ব্বস্যাত্মভূতং চেতনমিতি প্রসিদ্ধম্’, তদিহ নিবর্ত্ততে। অস্তি কিমপি বিদ্ববুদ্ধিগম্যং সর্ব্বান্তবতমং কূটস্থমজবমমৃতমভয়মজং শ্রোত্রাদেরপি শ্রোত্রাদি, তৎসামর্থ্য-নিমিত্তমিতি প্রতিবচনম্, শব্দার্থশ্চোপপদ্যত এব।
তথা মনসোহন্তঃকরণস্য মনঃ। ন হ্যন্তঃকরণমন্তবেণ চৈতন্যজ্যোতিষা দীপিতং স্ববিষয়সংঙ্কল্পাধ্যবসায়াদিসমর্থং স্যাৎ। তস্মান্মনসোহপি মন ইতি। ইহ বুদ্ধিমনসী একীকৃত্য নির্দেশঃ ‘মনসঃ’ ইতি।
যদ্বাচো হ বাচম্;—যচ্ছব্দো যস্মাদর্থে শ্রোত্রাদিভিঃ সর্ব্বৈঃ সম্বধ্যতে। যস্মাৎ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্, যস্মান্মনসো মন ইত্যেবম্। বাচো হ বাচমিতি দ্বিতীয়া প্রথমাত্বেন
‘বিপরিণম্যতে; প্রাণস্য প্রাণ ইতিদর্শনাৎ। বাচো হ বাচমিত্যেতদনুরোধেন প্রাণস্য প্রাণমিতি কস্মাদ্বিতীয়ৈব ন ক্রিয়তে? ন; বহুনামনুরোধস্য যুক্তত্বাৎ বাচমিত্যস্য বাগিত্যেতাবদ্ বক্তব্যম্, ‘স উ প্রাণস্য প্রাণঃ’ ইতি শব্দদ্বয়ানুরোধেন; এবং হি বহুনামনুরোধো যুক্তঃ কৃতঃ স্যাৎ। পৃষ্টং চ বস্তু প্রথময়ৈব নির্দেষ্টুং যুক্তম্। স যত্ত্বয়া পৃষ্টঃ প্রাণস্য প্রাণাখ্যবৃত্তিবিশেষস্য প্রাণঃ, তৎকৃতং হি প্রাণস্য প্রাণনসামর্থ্যম্। ন হ্যাত্মনা অনধিষ্ঠিতস্য প্রাণনমুপপদ্যতে। ‘কো হোবান্যাৎ, কঃ প্রাণ্যাৎ, যদেষ আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ’ ‘ঊর্দ্ধং প্রাণমুন্নয়ত্যপানং প্রত্যগস্যতি,’ ইত্যাদি- শ্রুতিত্যঃ। ইহাপি চ বক্ষ্যতে-‘যেন. প্রাণঃ প্রণীয়তে; তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি,’ ইতি। শ্রোত্রাদীন্দ্রিয়প্রস্তাবে ঘ্রাণপ্রাণস্য ননু যুক্তং গ্রহণম্? সত্যমেবম্; প্রাণগ্রহণেনৈব তু ঘ্রাণপ্রাণস্য গ্রহণং কৃতম্,-এবং মন্যতে শ্রুতিঃ। সর্ব্বস্যৈব করণকলাপস্য যদর্থপ্রযুক্তা প্রবৃত্তিস্তদ্ব্রহ্মেতি প্রকরণার্থো বিবক্ষিতঃ।
তথা চক্ষুষশ্চক্ষুঃ, রূপপ্রকাশকস্য চক্ষুষো যদ্রূপগ্রহণসামর্থ্যম্, তৎ আত্মচৈতন্যা- ধিষ্ঠিতস্যৈব, অতশ্চক্ষুষশ্চক্ষুঃ। প্রষ্টুঃ পৃষ্টস্যার্থস্য জ্ঞাতুমিষ্টত্বাৎ শ্রোত্রাদেঃ শ্রোত্রাদি- লক্ষণং যথোক্তং ব্রহ্ম জ্ঞাত্বেতি অধ্যাহিয়তে। ‘অমৃতা ভবন্তি’ ইতি ফলশ্রুতেশ্চ; জ্ঞানাদ্যমৃতত্বং প্রাপ্যতে; ‘জ্ঞাত্বা বিমুচ্যতে’ ইতি সামর্থ্যাৎ শ্রোত্রাদিকরণকলাপ- মুজ ঝিত্বা-শ্রোত্রাদৌ হ্যাত্মভাবং কৃত্বা তদপাধিঃ সন্ তদাত্মনা জায়তে ম্রিয়তে সংসরতি চ। অতঃ শ্রোত্রাদেঃ শ্রোত্রাদিলক্ষণং ব্রহ্ম আত্মেতি বিদিত্বা অতিমুচ্য শ্রোত্রাদ্যাত্মভাবং পরিত্যজ্য যে শ্রোত্রাদ্যাত্মভাবং পরিত্যজন্তি, তে ধীরা ধীমন্তঃ। নহি বিশিষ্টধীমত্বমন্তয়েণ শ্রোত্রাদ্যাত্মভাবঃ শক্যঃ, পরিত্যক্তুম্। প্রেত্য-ব্যাবৃত্ত অস্মাল্লোকাৎ পুত্রমিত্রকলত্রবন্ধুযু মমাহংভাবসংব্যবহারলক্ষণাৎ ত্যক্তসর্ব্বেষণা ভূত্বেত্যর্থঃ। অমৃতা অমরণধর্ম্মাণো ভবন্তি। ‘ন কৰ্ম্মণা ন প্রজয়া ধনেন ত্যাগেনৈকে অমৃতত্বমানগুঃ’, ‘পরাঞ্চি খানি ব্যভৃণৎ,’ ‘আবৃত্তচক্ষুরমৃতত্ব- মিচ্ছন্,’ ‘যদা সর্ব্বে প্রমুচ্যন্তে’, ‘অত্র ‘ব্রহ্ম সমশ্নুতে’-ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। অথবা অতিমুচ্য ইত্যনেমৈব এষণাত্যাগস্য সিদ্ধত্বাৎ অস্মাল্লোকাৎ প্রেত্য অস্মাচ্ছরীরাৎ প্রেত্য মৃত্বেত্যর্থঃ ॥ ২॥
এইরূপে প্রশ্নকারী উপযুক্ত শিষ্যকে গুরু বলিলেন,—তুমি যে মনপ্রভৃতি করণ বা ইন্দ্রিয়গণের নিজ নিজ বিষয়ে প্রেরয়িতা ও
প্রেরণ সম্বন্ধে প্রশ্ন করিতেছ,[তাহার উত্তর বলিতেছি] শ্রবণ কর। যাহা দ্বারা শব্দ শ্রবণ করা যায়, অর্থাৎ যাহা শব্দ শ্রবণের করণ বা উপায়, শব্দাভিব্যঞ্জক সেই ইন্দ্রিয়ের নাম শ্রোত্র। কোন্ দেবতা চক্ষুঃ ও শ্রোত্রকে স্ববিষয়ে নিযুক্ত করে?—এই বলিয়া তুমি যাঁহার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছ, তিনি সেই শ্রোত্রেরও শ্রোত্র।
ভাল, প্রশ্ন ছিল, কোন্ দেবতা চক্ষুঃ, শ্রোত্র প্রভৃতির প্রেরণ করে? তদুত্তরে বলা উচিত, ‘ছিল-’এবংবিধ অমুক পুরুষ শ্রোত্রাদিকে স্ব স্ব বিষয়ে প্রেরণ করে।’ কিন্তু তাহা না বলিয়া, শ্রোত্রের শ্রোত্র বলায় ত প্রশ্নের অনুরূপ উত্তর হইল না? না,-এ দোষ হয় না; কারণ, ‘সেই প্রেরয়িতার অন্য প্রকার এমন কোনও বিশেষ ধৰ্ম্মই জানিতে’ পারা যায় না, যাহাদ্বারা দাত্রাদি-প্রযোক্তার(দা প্রভৃতি অস্ত্র দ্বারা যিনি ছেদনাদি কার্য্য করেন, তাঁহার) ন্যায়(১) তাঁহারও স্বরূপ নির্দেশ করা যাইতে পারে। শ্রোত্রাদির প্রেরয়িতাকে যদি শ্রোত্রাদির ব্যাপার(কার্য্য) ব্যতিরেকে তাঁহার নিজের কোনও ব্যাপার দ্বারা পরিচিত করান’ যাইতে পারিত, তাহা হইলে অবশ্যই ঐরূপ অননুরূপ বা বিসদৃশ’ উত্তর প্রদান দোষাবহ হইত; কিন্তু শ্রোত্রাদির প্রেরয়িতা কাষ্ঠাদির ছেদনকর্তার মত কখনও স্বকৃত কোনও ব্যাপার সহযোগে অনুভূত হন না; পরন্তু সংহভ(অবয়ব- সহযোগে উৎপন্ন) ‘শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয়-সমূহ আলোচনা, সঙ্কল্প ও অধ্যবসায়রূপ(নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিবৃত্তিরূপ) যে সকল কার্য্য সম্পাদন
‘করে, সেই সকল ব্যাপারের দ্বারাই তৎপ্রয়োক্তা পুরুষের অস্তিত্ব অনুমিত হয়(২)। অতএব ‘শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্’ ইত্যাদি প্রত্যুত্তর বচন অনুরূপই হইয়াছে।
জিজ্ঞাসা করি, তাহা হইলে ‘শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্’ ইত্যাদি পদগুলির অর্থ হইবে কিরূপ?—প্রকাশময় একটি প্রদীপের দ্বারা যেরূপ প্রকাশময় অপর প্রদীপের কিছুমাত্র প্রয়োজন সিদ্ধ হয় না, সেইরূপ একটি শ্রোত্রেরও অপর শ্রোত্রের দ্বারা কিছুই উপকার হইতে পারে না? না,—এরূপ দোষও এখানে সম্ভাবিত হয় না। ‘শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্’ ইত্যাদি পদগুলির অর্থ এইরূপ,—শ্রবণেন্দ্রিয়কে সাধারণতঃ স্ববিষয়(শব্দ) গ্রহণ করিতে সমর্থ দেখা যায়; কিন্তু নিত্য-অসংহত (নিরবয়ব) সর্বান্তরস্থ আত্ম-জ্যোতিঃ বিদ্যমান থাকিলেই শ্রবণেন্দ্রিয়ের সেই বিষয়াভিব্যঞ্জন-সামর্থ্য থাকে, নচেৎ থাকে না। অতএব, শ্রবণেন্দ্রিয়ের শক্তিপ্রকাশক বলিয়াই তাঁহাকে ‘শ্রোত্রেরও শ্রোত্র’ বলা সঙ্গত হইতে পারে। ‘এই পুরুষ(মনুষ্যাদি) আত্ম- জ্যোতিঃ দ্বারাই প্রকাশানুরূপ কার্য্য করিয়া থাকে’, ‘এই সমস্ত জগৎ তাঁহার দীপ্তিতে প্রকাশিত হয়’, ‘সূর্য্য যাঁহার তেজে প্রদীপ্ত
হইয়া তাপ দিতেছে’, ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য এবং ‘আদিত্যগত যে তেজ এই সমস্ত জগৎকে উদ্ভাসিত করে[তাহা আমার তেজঃ], হে ভারত, ক্ষেত্রী(শরীরাধিষ্ঠাতা—আত্মাও) সেইরূপ সমস্ত জগৎকে প্রকাশিত করে’ “ইত্যাদি গীতা-বাক্যও উক্তবিধ অর্থের প্রমাণ। ‘তিনি(পরমেশ্বর) নিত্যেরও নিত্য এবং চেতনেরও চেতন’, ইত্যাদি কঠোপনিষদীয় বাক্যও পূর্ব্বোক্ত অর্থেরই দৃঢ়তা সম্পাদন করিতেছে। অভিপ্রায় এই যে, শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ই আত্ম- স্বরূপ চেতন, বলিয়া ‘সাধারণে প্রসিদ্ধ; ‘শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্’ বাক্যে লোকসিদ্ধ সেই ভ্রান্ত ধারণাই দূরীকৃত করা হইয়াছে;—অর্থাৎ কেবল, জ্ঞানিগণের বুদ্ধিগম্য, সকলের অন্তরস্থ, কূটস্থ, সর্বভয়- নিবারক’ ও জরামরণবর্জিত এমন কোন একটি বস্তু আছে, যাহার সাহায্যে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়নিচয় নিজ নিজ কার্য্য সম্পাদনে সমর্থ হয়। এইরূপে শ্রুতি-প্রদত্ত প্রতিধ্বন ও[আমাদের ব্যাখ্যাত উক্তপ্রকার] শব্দার্থ উভয়ই সঙ্গত হয়।
তিনি[যেমন শ্রোত্রের(শ্রাত্র, তেমনি] মনেরও—অন্তঃকরণেরও মন, কেন না, সেই’ আত্ম-চৈতন্য-জ্যোতিতে দীপ্তিযুক্ত না হইলে অন্তঃকরণরূপী মন স্ববিষয়ে সঙ্কল্প বা অধ্যবসায়াদি কার্য্য করিতে সমর্থ হয় না; এই কারণে তিনি(পরমেশ্বর) মনেরও মন। ‘বুদ্ধি ও মন উভয়কে এক করিয়া ‘মনসঃ’ বলা হইয়াছে।
‘যদ্বাচো হ বাচম্’ এই স্থলে ‘যৎ’ শব্দটি ‘যস্মাৎ’ অর্থে (হেত্বর্থে) প্রযুক্ত হইয়াছে, এবং শ্রোত্রাদির সহিত সম্বদ্ধ হইয়াছে। অর্থ এইরূপ,—যেহেতু শ্রোত্রের শ্রোত্র এবং যেহেতু মনেরও মন। আর ‘প্রাণস্য প্রাণঃ’ এই স্থলে ‘প্রাণ’ শব্দটি প্রথমান্ত থাকায় ‘বাচো হ বাচম্’ এই ‘বাচম্’ শব্দের দ্বিতীয়া বিভক্তিটিকে প্রথমা বিভক্তিতে পরিণত করিতে হইবে। অবশ্য আপত্তি হইতে পারে যে, ‘বাচো হ বাচম্’ এই দ্বিতীয়ার অনুরোধে ‘প্রাণস্য প্রাণম্’ স্থলেই প্রথমাটিকে
‘দ্বিতীয়াতে পরিণত করা হয় না কেন? না-এ আপত্তি সঙ্গত হয় না; কারণ, বহুর অনুরোধে একটির পরিবর্তন করাই যুক্তি-সিদ্ধ; বিশেষতঃ অত্রত্য ‘প্রাণ’ শব্দ এবং ‘স উ প্রাণস্য প্রাণঃ’, এই দুইটি প্রথমান্ত ‘প্রাণ’ শব্দের অনুরোধে একমাত্র ‘বাচম্’ শব্দেরই দ্বিতীয়ার পরিবর্তন দ্বারা ‘বাক্যের বাক্য’(বাচো হ বাক) এইরূপ অর্থ করা সঙ্গত হয়। বিশেষতঃ জিজ্ঞাসিত বিষয়ের উত্তর দিতে হইলে, প্রথমা দ্বারা উত্তর দেওয়াই সমীচীন। অভিপ্রায় এই যে,-‘তুমি যে প্রাণের প্রাণ সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছ, তাঁহার সাহায্যেই এই প্রাণ- বৃত্তির কর্মশক্তি সম্পন্ন হইয়া থাকে। কেননা, আত্মার অধিষ্ঠান বা প্রেরণা ব্যতীত কখনও প্রাণব্যাপার হইতে পারে না‘। ‘অন্যত্র শ্রুতি বলিয়াছেন,-‘যদি আনন্দস্বরূপ এই আকাশ(ব্রহ্ম) ‘না থাকিতেন, তাহা হইলে কেই বা বাঁচিত, আর কেই বা প্রাণধারণ করিত’, ‘তিনিই প্রাণকে উদ্ধগামী করান, এবং অপান বায়ুকে অধোগামী করান’ ইত্যাদি। আর এখানেও কথিত হইবে যে,- ‘যাঁহার দ্বারা প্রাণ প্রেরিত হয়, তুমি তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিও’। অতএব, ‘প্রাণ’ শব্দের বিভক্তির পরিবর্তন না করিয়া ‘বাচম্’ শব্দেরই বিভক্তির পরিবর্তন করা যুক্তিসঙ্গত। ভাল কথা, শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ের প্রস্তাবে ‘প্রাণ’ শব্দে, ঘ্রাণেন্দ্রিয়েরই গ্রহণ করা সঙ্গত [প্রাণবায়ুর গ্রহণ অপ্রাসঙ্গিক]? হাঁ, সত্য কথা; কিন্তু শ্রুতি মনে করেন যে, সমস্ত ইন্দ্রিয়বর্গ(করণসমূহ) যাহার জন্য স্ব স্ব কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়, তিনিই সেই ব্রহ্ম; ইহাই এই প্রকরণের অভিপ্রেত অর্থ; অতএব, প্রাণ গ্রহণেই ঘ্রাণেন্দ্রিয়েরও গ্রহণ সাধিত হইয়াছে। তিনি চক্ষুরও চক্ষুঃ, অর্থাৎ চক্ষুর যে রূপপ্রকাশন সামর্থ্য, তাহাও আত্মচৈতন্যের অধিষ্ঠানেই সম্পাদিত হইয়া থাকে; অতএব, তিনি চক্ষুরও চক্ষুঃস্বরূপ। যিনি যে বিষয়ে প্রশ্ন করেন, নিশ্চয়ই সেই বিষয়টি জানিবার
৩
জন্য তাঁহার ইচ্ছা থাকে। অতএব, একটি ‘জ্ঞাহ্বা’ ক্রিয়া উহ্য করিয়া এইরূপ অর্থ করিতে হয়- শ্রোত্রাদিরও শ্রোত্রাদি স্বরূপ পূর্ব্বোক্ত ব্রহ্মকে জানিয়া’; বিশেষতঃ জ্ঞান ব্যতীত যখন অমৃতত্ব(মোক্ষ) লাভ হয় না, অথচ ফলোল্লেখের সময় অমৃতত্ব লাভের কথা আছে, তখন ঐরূপ অর্থ করাই সঙ্গত। ইহার অভিপ্রায় এই যে, সাধারণতঃ অজ্ঞ লোকেরা শ্রোনাদি ইন্দ্রিয়ে আত্মভাব স্থাপন করিয়া, সেই সমস্ত উপাধি-সহযোগে জন্ম-মরণাত্মক সংসার লাভ করে। অতএব, যে সকল পুরুষ শ্রোত্রাদিরও শ্রোত্রাদি ‘স্বরূপ ব্রহ্মকে আত্মস্বরূপ জানিয়া শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয়বগে আত্ম-বুদ্ধি পরিত্যাগ করে, তাহারাই যথার্থ ধীমান্-সদ্বুদ্ধিসম্পন্ন; বস্তুতঃ বিশেষ বিজ্ঞান ব্যতিরেকে কখনই শ্রোত্রাদিতে ‘আত্মবুদ্ধি পরিত্যাগ করিতে পারা যায় না। সেই সকল ধীমান্ পুরুষেরা ইহলোক হইতে প্রয়াণ করিয়া-পুত্র, মিত্র, কলত্র ও বন্ধুজনে ‘আমি’, ‘আমার’ প্রভৃতি ব্যবহার ত্যাগ করিয় - অর্থাৎ সবপ্রকার বাসনা বিসজ্জন করিয়া, অমৃতত্ব লাভ করেন (অমূরত্ব প্রাপ্ত হন)। ‘কোন ঋষি ধন, সন্তান ও কৰ্ম্ম দ্বারা মোক্ষ লাভ করিতে পারেন নাই-কেবল সন্ন্যাস দ্বারাই অমৃতত্ব লাভ করিয়াছেন’, ‘পরমেশ্বর ইন্দ্রিয়সমূহকে বহির্মুখ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন’, ‘অমৃতত্ব(মোক্ষ) লাভের ইচ্ছায় বাহ্য দৃষ্টিকে অন্তর্মুখী করিয়াছিলেন’, ‘যখন[সমস্ত বাসনা] পরিত্যক্ত হয়’, ‘এই অবস্থায়ই ব্রহ্ম লাভ করেন’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতেও উক্ত অভিপ্রায় প্রমাণিত হয়। অথবা ‘অতিমুচ্য’ কথায়ই বাসনা-পরি- ত্যাগ অর্থ লব্ধ হওয়ায় ‘প্রেত্য’ শব্দে এই দেহ হইতে প্রয়াণ করিয়া -মরিয়া, এইরূপ অর্থ করিতে হয় ॥ ২॥
ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগ্ গচ্ছতি নো মনঃ। ন বিদ্মো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাৎ ॥ ৩ ॥
তত্র(তস্মিন্ ব্রহ্মণি) চক্ষুঃ ন গচ্ছতি, বাক্ ন গচ্ছতি, মনঃ নো(ন গচ্ছতি)। [বয়ং][তৎ] ন বিমঃ(জানীমঃ), যথা এতৎ(ব্রহ্ম) অনুশিষ্যাৎ(শিষ্যায় উপদিশেৎ),[তৎ অপি] ন বিজানীমঃ। তৎ(ব্রহ্ম) বিদিতাৎ(বিদিক্রিয়াকৰ্ম্মভূতাৎ স্থূলাৎ বস্তুনঃ) অন্যৎ(পৃথক্) এব। অবিদিতাৎ(সূক্ষ্মাং অজ্ঞাতাৎ বস্তুনঃ) অথো(অপি) অধি(উপরি—অন্যৎ, পৃথক্ এব)। যে নঃ(অস্মভ্যম্) তৎ (ব্রহ্মতত্ত্বম্) ব্যাচচক্ষিরে(ব্যাখ্যাতবস্তুঃ),[তেষাং] পূর্ব্বেষাম্[আচার্য্যাণাম্] ইতি (এবং বচনম্)[বয়ং] শুশ্রুম(শ্রুতবন্তঃ) ॥ ৩:৪ ॥
সেখানে(ব্রহ্মে) চক্ষু যায় না, বাক্য গমন করে না, মনও স্ফূর্ত্তি পায় না; আমরা তাঁহাকে জানি না, এবং আচার্য্যগণ এই ব্রহ্মতত্ত্ব শিষ্যগণকে যেরূপে উপদেশ দেন, তাহাও বুঝি না। তিনি বিদিত(অথাৎ স্থূল বস্তু) হইতে পৃথক্ এবং সূক্ষ্ম বস্তু হইতেও পৃথক্। যাঁহারা আমাদের নিকট এই তত্ত্বের ব্যাখ্যা করিয়াছেন সেই পূর্ব্বাচার্য্যগণের নিকট এই কথা শুনিয়াছি ॥ ৩৪ ॥
যস্মাৎ শ্রোত্রাদেরপি শ্রোত্রাদ্যাত্মভূতং ব্রহ্ম, অতো ন তত্র তস্মিন্ ব্রহ্মণি চক্ষু- র্গচ্ছতি, স্বাত্মনি গমনাসম্ভবাৎ। তথা ন’বাগ্ গচ্ছতি। ৰাচা হি শব্দ উচ্চাৰ্য্য- মাণোহভিধেয়ং প্রকাশয়তি যদা, তদাহভিধেয়ং প্রতি বাগ্ গচ্ছতীত্যুচ্যতে। তস্য চ শব্দস্য তন্নির্ব্বর্তকস্য চ করণস্য আত্মা ব্রহ্ম, অতো ন বাগু গচ্ছতি। যথাহগ্নিদাহকঃ প্রকাশকশ্চাপি সন্ নহি আত্মানং প্রকাশয়তি দহতি চ, তদ্বৎ। নো মনঃ, মনশ্চা- ন্যস্য সঙ্কল্পয়িতৃ অধ্যবসায়িত্ব চ সৎ আত্মানং সঙ্কল্পয়তি অধ্যবস্থ্যতি চ। তস্যাপি ব্রহ্ম আত্মেতি। ইন্দ্রিয়মনোভ্যাং হি বস্তুনো বিজ্ঞানম্; তদগোচরত্বাৎ ন বিদ্মস্তদ্ ব্রহ্ম—ঈদৃশমিতি; অতো ন বিজানীমঃ—যথা যেন প্রকারেণ এতদ্ব্রহ্ম অনুশিষ্যাৎ উপদিশেৎ—শিষ্যায় ইত্যভিপ্রায়ঃ। যদ্ধি করণগোচরং তদন্যস্মৈ উপদেষ্টুং শক্যং জাতিগুণক্রিয়াবিশেষণৈঃ। ন তজ্জাত্যাদিবিশেষণবদ্ ব্রহ্ম। তস্মাৎ বিষমং শিষ্যানুপদেশেন প্রত্যায়য়িতুমিতি।
উপদেশে তদর্থগ্রহণে চ যত্নাতিশয়কর্তব্যতাং দর্শয়তি,-“ন বিদ্মঃ” ইত্যাদি। অত্যন্তমেবোপদেশপ্রকারপ্রত্যাখ্যানে প্রাপ্তে তদপবাদোহয়মুচ্যতে, -সত্যমেবং প্রত্যক্ষাদিভিঃ প্রমাণৈর্ন পরঃ প্রত্যায়য়িতুং শক্যঃ; আগমেন তু শক্যত এব প্রত্যায়য়িতুম্। তদুপদেশার্থমাগমমাহ-অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতা- দধীতি। অন্যদেব পৃথগেব তৎ, যৎ প্রকৃতং শ্রোত্রাদীনাং শ্রোত্রাদীত্যুক্তমবিষয়শ্চ তেষাম্। -তৎ বিদিতাৎ অন্যদেব হি,-বিদিতং নাম যদ্বিদিক্রিয়য়া অতি- শয়েনাপ্তং, তদ্বিদিক্রিযাকৰ্ম্মভূতং ক্বচিং কিঞ্চিৎ, কস্যচিদ্ বিদিতং স্যাদিতি সর্ব্বমেব ব্যাকৃতং তদ্ বিদিভমেব, তস্মাদন্যদেবেত্যর্থঃ। অবিদিতমজ্ঞাতং তহীতি প্রাপ্তে আহ, অথো অপি অবিদিতাৎ বিদিতবিপবীতাৎ অব্যাকৃতাৎ অবিদ্যালক্ষণাৎ ব্যাকৃতবীজাৎ-অধীতি উপর্যর্থে; লক্ষণযা অন্যদিত্যর্থঃ।
যদ্ধি ধম্মাদধি উপবি ভবতি, তস্মাদন্যদিতি প্রসিদ্ধম্; যবিদিতম্, তল্প মর্ত্যং দুঃখাত্মকং চেতি হেষম। তস্মাবিদিতাদন্যদ্ ব্রহ্মেত্যুক্তে তু অহেযত্বমুক্ত, স্যাৎ। তথা অবিদিতাদধীত্যুক্তেহনুপাদেয়ত্বমুক্তং স্যাৎ। কার্য্যার্থং হি কারণমন্যৎ অন্যেন উপাদীয়তে; অতশ্চ ন বেদিতুরন্যস্মৈ প্রয়োজনায় অন্যদুপাদেয়ং ভবতীতোন বিদিতাবিদিতাভ্যামন্যদিতি হেযোপাদেয়প্রতিষেধেন স্বাত্মনঃ * অন্যব্রহ্মবিষযা জিজ্ঞাসা শিষ্যস্য নিবর্ত্তিতা স্যাৎ। ন হন্যস্য স্বাত্মনো বিদিতাভ্যামন্যত্ব, বস্তুন’ সম্ভবতীত্যাত্মা ব্রহ্মেত্যেষ, বাক্যাঃ। ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ ‘য আত্মা অপহতপাপ্ন।’ ‘যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ ব্রহ্ম।’ ‘য আত্মা সর্ব্বান্তবঃ’ ইত্যাদিশ্রুত্যন্তবেভ্যশ ইত্যে- সর্ব্বাত্মনঃ সর্ব্ববিশেষরহিতস্য চিন্মাত্রজ্যোতিষো ব্রহ্মত্বপ্রতিপাদকস্য বাক্যার্থস্য আচার্য্যোপদেশপরম্পবয়া প্রাপ্তত্বমাহ—ইতি শুশ্রুমেত্যাদি। ব্রহ্ম চৈবমাচার্য্যোপ- দেশপরস্পরয়া এব অধিগন্তব্যম্—ন তর্কতঃ, প্রবচন-মেধা-বহুশ্রুততপোযজ্ঞাদিভ্যশ্চ। ইত্যেবং শুশ্রুম শ্রুতবস্তো বয়ং পূর্ব্বেষামাচাৰ্য্যাণাং বচনম্। যে আচার্য্যা নোহস্মভ্যং তদ্ ব্রহ্ম ব্যাচচক্ষিবে ব্যাখ্যাতবন্তো বিস্পষ্টং কথিতবন্তঃ, তেষামিত্যর্থঃ ॥ ৩।৪ ॥
যেহেতু ব্রহ্ম শ্রোত্রাদিরও শ্রোত্রাদি-স্বরূপ, অতএব, তদ্বিষয়ে চক্ষুর গতি নাই; কেননা, নিজের উপর নিজের ক্রিয়া হয় না ও হইতে পারে না। সেইরূপ বাক্যও তদ্বিষয়ে যায় না; কারণ,
উচ্চারিত শব্দে যখন কোন বস্তু প্রকাশ করে, তখনই বাগিন্দ্রিয় অভিধেয়ের(যাহা শব্দের মুখ্য অর্থ, তাহার) প্রতি গমন করে বলিয়া ব্যবহার করা হয়। ব্রহ্ম যখন সেই শব্দের ও শব্দ-সম্পাদক ইন্দ্রিয়ের আত্মভূত, তখন তদ্বিষয়ে ‘তাহার গমন অসম্ভব। অগ্নি যেরূপ স্বয়ং দাহক এবং প্রকাশক হইয়াও আপনাকে দগ্ধ ও প্রকা- শিত করিতে পারে না, সেইরূপ শব্দও আত্মস্বরূপ ব্রহ্মকে প্রকাশিত করিতে পারে না। ব্রহ্ম মনেরও আত্মস্বরূপ; অতএব মন অন্য বিষয়ে সংকল্প ও অধ্যবসায় করিতে পারিলেও ব্রহ্মবিষয়ে তাহা করিতে সমর্থ হয় না। কোন বিষয় জানিতে হইলে চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয় ও মনের সাহায্যেই জানিতে হয়; ব্রহ্ম যখন সেই ইন্দ্রিয় ও মনের অগোচর, তখন তাঁহাকে ‘ঈদৃশ’(এই প্রকার) বলিয়া জানিতে পারি না। অভিপ্রায় এই যে, ব্রহ্ম যখন ইন্দ্রিয় ও মনের অগোচর, তখন তাঁহাকে ‘ঈদৃশ’ বলিয়া শিষ্যের নিকট বিশেষাকারে নির্দেশ করিতে পারা যায় না; কেননা, যাহা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, তাহাকেই তদীয় জাতি(মনুষ্যত্বাদি) গুণ(শুক্রাদি) ও ক্রিয়া(গমনাদি) দ্বারা বিশেষিত করিয়া নির্দেশ করিতে পারা যায়; ব্রহ্মে যখন সেই জাত্যাদি বিশেষ ধর্ম্মের অত্যন্ত অভাব, তখন তাঁহাকে শিষ্যগণের নিকট বিশেষ করিয়া প্রতীতি-গম্য করান, অসম্ভব।
ব্রহ্ম-তত্ত্ব উপদেশ করিতে এবং উপদিষ্টার্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে যে, নিরতিশয় যত্নের আবশ্যকতা, তাহাই ‘ন বিদ্ধঃ’ ইত্যাদি বাক্যে প্রদর্শিত হইতেছে। পূর্ব্বোক্ত বাক্যে বুঝা গিয়াছে যে, ব্রহ্মতত্ত্ব একেবারেই উপদেশের অযোগ্য; এখন আবার তাহারই অপবাদ বা বিশেষ বিধান কথিত হইতেছে,—সত্য বটে, পরব্রহ্মকে প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ দ্বারা প্রতীতিগম্য করান যায় না; কিন্তু আগম বা শাস্ত্র-প্রমাণ দ্বারা তাঁহার প্রতীতি করান যাইতে পারে। এতদর্থে ‘অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি’ ইত্যাদি আগম-প্রমাণ
নির্দেশ করিতেছেন,-শ্রোত্রাদির শ্রোত্রাদিস্বরূপ যে ব্রহ্ম শ্রোত্রাদির অবিষয়ীভূত বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন, তিনি নিশ্চয়ই বিদিত হইতে পৃথক্ বা অন্য। বিদিত অর্থ ‘যাহা বিদি-ক্রিয়া-বেদন বা জ্ঞান দ্বারা সম্যরূপে প্রাপ্ত হওয়া যায়’ অর্থাৎ বিদি ক্রিয়ার কৰ্ম্ম- ভূত বস্তুই কোন সময়ে কোন লোকের বিদিত হইয়া থাকে; অতএব বুঝিতে হইবে, নাম-রূপ-সম্পন্ন স্থূল বস্তুই ‘বিদিত’ পদে অভিহিত হয়, তিনি সেই বিদিত হইতে ভিন্ন। তাহা হইলে তিনি অবিদিত অর্থাৎ জ্ঞানের, অতীত-এইরূপ সিদ্ধান্ত হইতে পারে; তাহাতে বলিতেছেন যে, তিনি অবিদিত, অর্থাৎ বিদিতের বিপরীত এবং ব্যাকৃত-স্থূল জগতের বীজস্বরূপ অব্যাকৃত অবিদ্যা ‘হইতেও অধি- উপরে অর্থাৎ ‘পৃথক্। ‘অধি’ অর্থ-উপরে, তাহার আবার লক্ষণা- লব্ধ অর্থ-অন্য বা পৃথক্। কেননা, যে বস্তু যাঁহার উপরিস্থিত, সেই বস্তু নিশ্চয়ই তাহা হইতে ভিন্ন হইয়া থাকে।
যে বস্তু বিদিত বা বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত হয়, তাহাই অল্প (পরিচ্ছিন্ন) মর্ত্য(বিনাশশীল) ও দুঃখাত্মক; অতএব তৎসমস্তই হেয়(পরিত্যাজ্য); ব্রহ্মকে, তদ্বিপরীত(বিদিত হইতে ভিন্ন) বলায় তাঁহার অহেয়ত্ব উক্ত হইল এবং অবিদিত হইতে ভিন্ন বলায় তাঁহার অনুপাদেয়ত্বও(অপ্রাপ্যত্বও) কথিত হইল। সাধারণতঃ দেখা যায়, কোন কার্য্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে একে অপর কারণ বা সাধনের গ্রহণ করিয়া থাকে; কিন্তু স্বতঃসিদ্ধ বেদিতা(জ্ঞাতা) কখনই অন্য প্রয়োজনে অন্য বস্তু গ্রহণ করিতে পারে না; অর্থাৎ তিনি পরপ্রয়োজনের অধীন নহেন। অতএব, আত্মাকে বিদিত ও অবিদিত হইতে পৃথক্ বলিয়া নির্দেশ করায়, তাঁহার হেয়োপাদেয়ত্বও প্রতিষিদ্ধ হইল; ইহার ফলে আত্মাতিরিক্ত ব্রহ্ম বিষয়ে যে শিষ্যের জিজ্ঞাসা সম্ভাবিত ছিল, তাহাও প্রত্যাখ্যাত হইল। আত্মা ভিন্ন কোন পদার্থই বিদিত ও অবিদিত হইতে অন্য হইতে পারে না।
অতএব বিদিতাবিদিত ভিন্ন আত্মার ব্রহ্মভাব প্রতিপাদনই উক্ত বাক্যের অভিপ্রেত; অর্থাৎ এই আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ। ‘যিনি নিষ্পাপ আত্মস্বরূপ’, ‘যিনি(আত্মা) সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ’, ‘যে আত্মা সকলের অন্তরস্থিত’, ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য এ বিষয়ে প্রমাণ।
এবংবিধ সর্বাত্মক ও সর্বপ্রকার বিশেষ-ধর্মরহিত শুদ্ধ চৈতন্যের ব্রহ্মত্ব-প্রতিপাদক উক্তরূপ বাক্যার্থ যে গুরুপরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত, তাহা জ্ঞাপনের উদ্দেশে ‘ইতি শুশ্রুম’ কথার নির্দেশ করিয়াছেন। ইহার অভিপ্রায় এই যে; আচার্য্যগণের উপদেশপরম্পরা, হইতেই উক্ত- প্রকার ব্রহ্মতত্ত্ব, পরিজ্ঞাত হওয়া যায়; কিন্তু কেবল তর্ক(শাস্ত্র- নিরপেক্ষ বিচার) দ্বারা তাঁহাকে জানা যায় না এবং কেবল প্রবচন (শাস্ত্রব্যাখ্যা), মেধা(স্বীয় প্রতিভা), বহুতর শাস্ত্রপাঠ, তপস্যা ও যজ্ঞাদি দ্বারাও তাঁহাকে অবগত হওয়া যায় না। যে সকল পূর্ববা- চায্য আমাদের সমীপে এই ব্রহ্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা করিয়াছেন, সেই সকল পূর্ববাচায্যগণের নিকট আমরা উক্ত উপদেশ শ্রবণ করিয়াছি ॥৩।৪৷৷
যদ্বাচানভ্যুদিতং যেন বাগভ্যুদতে।
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং পদিদমুপাসতে ॥ ৫ ॥
যৎ(ব্রহ্ম) বাচা অনভ্যুদিতং(অপ্রকাশিতং) যেন(ব্রহ্মণা) বাঁক্ অভ্যুদ্যতে (প্রকাশ্যতে প্রযজ্যতে) তৎ এব ব্রহ্ম ত্ব, বিদ্ধি(বিজানীহি)। যৎ ইদং(উপাধি- ভেদসম্বদ্ধং শরীরশবীৰ্য্যাদিরূপঃ বস্তু)[লোকাঃ] উপাসতে; ইদং[ব্রহ্ম] ন ॥ ৫ ॥
যিনি বাক্য দ্বারা প্রকাশিত হন না, পরন্তু যাহার সাহায্যে বাক্য উচ্চারিত হয়, তুমি তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে, কিন্তু লোকে যাঁহাকে ‘ইদম্’(বিভিন্নরূপ- বিশিষ্ট) বলিয়া উপাসনা করে, তাহা(জড়বস্তু) প্রকৃত ব্রহ্ম নহে ॥ ৫ ॥
‘অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি’ ইত্যনেন বাক্যেন আত্মা ব্রহ্মেতি প্রতিপাদিতে শ্রোতুরাশঙ্কা জাতা—তৎ কথং নু আত্মা ব্রহ্ম? আত্মা হি নামাধি-
কৃতঃ কৰ্ম্মণুপাসনে চ সংসারী কর্মোপাসনং বা সাধনমনুষ্ঠায় ব্রহ্মাদিদেবান্ স্বর্গং বা প্রাপ্ত মিচ্ছতি; তৎ তস্মাদন্য উপাস্যো বিষ্ণুরীশ্বর ইন্দ্রশ্চ প্রাণো বা ব্রহ্ম ভবিতু- মর্হতি, ন ত্বাত্মা; লোকপ্রত্যয়বিরোধাৎ। যথা অন্যে তার্কিকা ঈশ্বরাদন্য আত্মা ইত্যাচক্ষতে; তথা কর্মিণঃ “অমুং যজামুং যজ” ইতি অন্যা এব দেবতা উপাসতে। তস্মাদযুক্তং যবিদিতমুপাস্যম্, তদ্ ব্রহ্ম ভবেৎ, ততোহন্য উপাসক ইতি। তামেতা- মাশঙ্কাং শিষ্যলিঙ্গেন উপলক্ষ্য তদ্বাক্যাদ্বা আহ-মৈবং শঙ্কিষ্ঠাঃ যচ্চৈতন্যমাত্র- সত্তাকং বাচা-বাগিতি জিহ্বামূলাদিষু অষ্টসু স্থানেষু, বিষক্তম্ আগ্নেয়ং বর্ণানাম্ অভিব্যঞ্জকং করণং বর্ণাশ অর্থসঙ্কেতপরিচ্ছিন্না এতাবন্ত এবংক্রমপ্রযুক্তা ইতি, এবং তদভিব্যঙ্গ্যঃ শব্দঃ পদং বাগিত্যুচ্যতে। “অকারো বৈ সর্ব্বা বাক্, সৈষা স্পশা- ন্তঃস্থোম্ভিৰ্ব্ব্যজ্যমানা ‘বহ্বী নানারূপা ভবতি” ইতি শ্রুতেঃ। মিতমমিতং স্বরঃ সত্যানৃতে‘এব বিকারো যস্যাঃ, তয়া বাচা পদত্বেন পরিচ্ছিন্নয়া করণগুণবত্যা অনভ্যুদিতম্ অপ্রকাশিতম্ অনভ্যুক্তম্; যেন ব্রহণা বিবক্ষিতেহর্থে সকরণা বাক্ অভ্যদ্যতে-চৈতন্যজ্যোতিষা প্রকাশ্যতে প্রযুজ্যত ইত্যেতৎ। “যদ্বাচো হ বাক্” ইত্যুক্তম্; “বদন্ বাক্”,-“যো বাচমন্তরো যমস্তুতি” ইত্যাদি চ বাজসনেয়কে। “যা বাক্ পুরুষেষু, সা ঘোষেষু প্রতিষ্ঠিতা, কশ্চিৎ তাং বেদ ব্রাহ্মণঃ” ইতি প্রশ্নমুৎপাদ্য প্রতিবচনমুক্তম্,-“সা বাক্, যয়া স্বপ্নে ভাষতে” ইতি। সাহি বক্তু বক্তির্নিত্যা বাক্ চৈতন্যজ্যোতিঃস্বরূপা। “ন হি বক্তুর্ব্বক্তেব্বিপরিলোপো বিদ্যতে” ইতি শ্রুতেঃ। তদেব আত্মস্বরূপং ব্রহ্ম নিরতিশয়ং ভূমাখ্যং বৃহত্ত্বাদ ব্রহ্মেতি বিদ্ধি বিজানীহি ত্বম্। যৈব্বাগাদ্যপাধিভিঃ ‘বাচো হ বাক্’, ‘চক্ষুষচক্ষুঃ’, ‘শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্,’ ‘মনসো মনঃ’, ‘কর্তা, ভোক্তা, বিজ্ঞাতা, নিয়ন্তা, প্রণাসিতা’, ‘বিজ্ঞান- মানন্দং ব্রহ্ম’ ইত্যেবমাদয়ঃ সংব্যবহারা অসংব্যবহার্যে নির্বিশেষে পরে সাম্যে ব্রহ্মণি প্রবর্তন্তে, তান্ ব্যুদন্য আত্মানমেব নির্বিশেষং ব্রহ্ম বিদ্ধীতি, এব-শব্দার্থঃ। নেদং ব্রহ্ম, যদিদম্ ইত্যুপাধিভেদবিশিষ্টম্ অনাত্মেশ্বরাদি উপাসতে ধ্যায়ন্তি। তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধীত্যুক্তেহপি নেদং ব্রহ্ম ইতি অনাত্মনোহব্রহ্মত্বং পুনরুচ্যতে নিয়মার্থমন্যব্রহ্মবুদ্ধিপিসংখ্যানার্থং বা ॥ ৫ ॥
‘অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো’ ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, আত্মা ও ব্রহ্ম একই বস্তু; এই উপদেশ শ্রবণে শ্রোতার
হৃদয়ে আশঙ্কা উপস্থিত হয় যে, আত্মা ও ব্রহ্ম এক হইবে কিরূপে: কেননা, কৰ্ম্ম ও উপাসনায়’ অধিকারী সংসারী পুরুষই আত্ম-শব্দ- বাচ্য; সেই সংসারী আত্মা বিহিত কৰ্ম্ম বা উপাসনারূপ সাধনের অনুষ্ঠান করিয়া ব্রহ্মাদিদেবত্ব, কিংবা স্বর্গাদিভোগস্থান পাইতে ইচ্ছুক হয়,(কিন্তু স্ব-স্বরূপ পাইতে ইচ্ছা করে না)। উক্তপ্রকার লোক-ব্যবহার অনুসারে বুঝা যায় যে, উপাসক হইতে সম্পূর্ণ পৃথক বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র বা প্রাণ ইঁহারাই উপাস্য ব্রহ্ম হইতে পারেন, কিন্তু আত্মা কখনই উপাস্য হইতে পারেন না; তাহা হইলে, উহা লোক- ব্যবহারের বিরুদ্ধ হয়। অপর তার্কিকগণও বলিয়া থাকেন যে, ‘আত্মা ঈশ্বর হইতে অন্য এবং কর্মমীমাংসকগণও ‘অমুক দেবতার আরাধনা কর’, ‘অমুক দেবতার আরাধনা কর’, এইরূপ উপদেশ দ্বারা পৃথক বা আত্মাতিরিক্ত দেবতারই আরাধনা করিতে বলিয়া থাকেন। অতএব যাহা বিদিত(অর্থাৎ জ্ঞানের বিষয়ীভূত), তাহাই উপাস্য, এবং সেই উপাস্যই ব্রহ্ম। অবিদিত পদার্থ উপাস্যও হয় না, ‘এবং তাহার ব্রহ্মত্বও নাই; সুতরাং উপাস্য ও উপাসক পরস্পর ভিন্ন। শিষ্যের ইঙ্গিতেই হউক, কিংবা বাকাপ্রয়োগেই হউক, এইরূপ আশঙ্কা বুঝিতে পারিয়া, গুরুস্থানীয় শ্রুতি নিজেই বলিতেছেন যে, না,-তুমি এরূপ আশঙ্কা করিও না।
যিনি নিত্যঃচৈতন্যস্বরূপ, তিনি বাগিন্দ্রিয় ও তদভিব্যঙ্গ্য শব্দ দ্বারা অভিব্যক্ত বা প্রকাশিত হন না। এখানে ‘বাক্’, অর্থে জিহ্বামুলাদি আটটী স্থানে সংসক্ত বর্ণাভিব্যঞ্জক আগ্নেয়(অগ্নিদৈবতক) ইন্দ্রিয় এবং তদভিব্যক্ত বর্ণসমূহ, এই উভয়ই বুঝিতে হইবে। এই ‘বর্ণ’ অর্থেও অর্থ-বোধনে সঙ্কেতিত এবং বিশেষ বিশেষ ক্রম ও সংখ্যাযুক্ত শব্দময় পদ বুঝিতে হইবে। শ্রুতি বলিয়াছেন,—অ-কারই সমস্ত বাক্যের মূল; সেই অ-কাররূপা বাক্ স্পর্শ, অন্তঃস্থ ও উষ্ম বর্ণরূপে বিভিন্নপ্রকার বহু রূপ ধারণ করে। মিত(নিয়ত-পাদ ঋক্
8
২৬) কেনোপনিষৎ।
প্রভৃতি), অমিত(অনিয়ত-পাদ যজুঃপ্রভৃতি), স্বর(গেয়—সাম), দৃষ্ট(প্রত্যক্ষানুসারে বিষয়নির্দেশ করা), অনৃত(অসত্য বচন), এই সকল যাহার বিকার, এবং বাগিন্দ্রিয় যাহার করণ বা কার্য্যসাধন, পুরুষনিষ্ঠ সেই বাকশক্তিই এখানে ‘বাক্’ শব্দে অভিহিত হইয়াছে (৩)। উক্তপ্রকার বাক্ যাঁহাকে প্রকাশ করিতে পারে না, পরন্তু সেই নিত্যচৈতন্য জ্যোতিঃস্বরূপ ‘ব্রহ্মের প্রেরণায় ঐ বাক্(বাগি- ন্দ্রিয় ও শব্দ) উচ্চারিত হয়, অর্থাৎ প্রকাশ’ পায়। পূর্ব্বেই ঈশো- পনিষদে কথিত হইয়াছে যে, ‘যিনি বাক্যেরও বাক্যস্বরূপ, এবং শব্দ সম্পাদন করেন বলিয়া ‘বাক্’ শব্দে কথিত হন’, ‘যিনি অভ্যন্তরে
থাকিয়া বাক্যের সংযমন বা পরিচালন করেন’ ইত্যাদি। ‘পুরুষ- গত যে বাকশক্তি তাহা ঘোষেও(বর্ণেও) অবস্থিত আছে; কোন্ ব্রাহ্মণ(ব্রহ্ম-নিষ্ঠ) তাহা জানিতে পারেন? এইরূপে প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া তাহার প্রত্যুত্তরে বলিয়াছেন যে; ‘যাহার প্রভাবে স্বপ্নাবস্থায়ও কথা হয়, তাহাই প্রকৃত বাক্। বক্তার সেই উক্তিই(বচন) নিত্য- চৈতন্যরূপা বাক্। বক্তার বক্তি(বাক্) কখনও বিলুপ্ত হয় না’ এই শ্রুতিই উক্ত বিষয়ে প্রমাণ। তুমি জানিও, তিনিই আত্মস্বরূপ, এবং নিরতিশয়(সর্বাধিক), ‘বৃহত্ত্ব-নিবন্ধন ব্রহ্ম। অভিপ্রায় এই যে, সর্বপ্রকার লৌকিক ব্যবহারের অবিষয়, নির্বিশেষ, পরব্রহ্মেও যে সকল উপাধি দ্বারা বাক্যের বাক্য, চক্ষুর চক্ষুঃ, শ্রোত্রের শ্রোত্র, মনের মন, এবং কর্তা, ভোক্তা, বিজ্ঞাতা, নিয়ন্তা, প্রশাসিতা, বিজ্ঞান ও আনন্দ প্রভৃতি ব্যবহার আরোপিত হইয়া থাকে, সেই সকল উপাধি অপনীত করিয়া প্রকৃত আত্মাকেই নির্বিশেষ ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে। ইহাই ‘তৎ এব’ এই ‘এব’ শব্দের দ্বারা জ্ঞাপিত হইয়াছে। ‘ইদম্’, রূপে অর্থাৎ বিশেষ বিশেষ উপাধিবিশিষ্টরূপে যে অনাত্ম ঈশ্বরের উপাসনা বা ধ্যান করা হয়, ইহা প্রকৃত ব্রহ্ম নহে(৪)।
তুমি তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে, এই কথা বলার পরও উক্তার্থের দৃঢ়ীকরণার্থ ‘নেদং ব্রহ্ম’(ইহা, ব্রহ্ম নহে) বলিয়া অনাত্ম রস্তুর অব্রহ্মত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে। অথবা আত্মাতেই ব্রহ্মবুদ্ধি করণার্থ, কিংবা আত্মভিন্ন পদার্থে ব্রহ্মবুদ্ধি-নিবৃত্ত্যর্থ, ঐরূপ পুনরুক্তি করা হইয়াছে ॥ ৪ ॥
[জনঃ] মনসা যৎ ন মনুতে(সঙ্কল্পয়তি, সম্যক্, নিশ্চিনোতি), যেন মনঃ মতম্ (বিষয়ীকৃতম্)[ইতি ব্রহ্মবিদঃ] আহুঃ(কথয়ন্তি), তৎ এব ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৫ ॥ অনুবাদ।
যাহাকে মনের দ্বারা চিন্তা করা যায় না, এবং ব্রহ্মবিদ্গণ মনকেও যাহার মত অর্থাৎ বিষয়ীকৃত(উদ্ভাসিত) বলেন, তুমি তাঁহাকেই’ ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে; কিন্তু যাহাকে “ইদম্” বলিয়া উপাসনা করা হয়, তাহা ব্রহ্ম নহে ॥ ৫ ॥
যন্মনসা ন মনুতে। মন ইত্যন্তঃকরণং বুদ্ধিমনসোরেকত্বেন গৃহ্যতে। মনুতে অনেনেতি মনঃ সর্ব্বকরণসাধারণম্, সর্ব্ববিষয়ব্যাপকত্বাৎ “কামঃ সঙ্কল্পো বিচিকিৎসা শ্রদ্ধাহশ্রদ্ধা ধৃতিরধৃতিহ্রীর্ধীভীরিত্যেতৎ সর্ব্বং মন এব” ইতি শ্রুতেঃ। কামাদিবৃত্তিমৎ মনঃ, তেন মনসা যচ্চৈতনজ্যোতিৰ্ম্মনসোহবভাসকং ন মনুতে-ন সঙ্কল্পয়তি, নাপি নিশ্চিনোতি লোকঃ, মনসোহবভাসকত্বেন নিয়ন্ত ত্বাৎ। সর্ব্ববিষয়ং প্রতি প্রত্যগেবেতি স্বাত্মনি ন প্রবর্ত্ততেহন্তঃকরণম্। অন্তঃস্থেন হি ‘চৈতন্য- জ্যোতিষা অবভাসিতস্য মনসো মননসামর্থ্যম্; তেন সবৃত্তিকং মনো যেন ব্রহ্মণা মতং বিষয়ীকৃতং ব্যাপ্তমাহুঃ কথয়ন্তি ব্রহ্মবিদঃ। তস্মাৎ তদেব মনস আত্মানং প্রত্যচেতয়িতারং ব্রহ্ম বিদ্ধি। নেদমিত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৫ ॥
লোকে কামাদি বৃত্তিবিশিষ্ট মনের দ্বারা মনঃপ্রকাশক চৈতন্য- জ্যোতিকে মনন—সংকল্প করিতে পারে না, এবং নিশ্চিতরূপে ধারণাও করিতে পারে না; কারণ, সেই ব্রহ্মজ্যোতিই মনের উদ্ভাসক ও পরিচালক, সুতরাং সর্ববিষয়ে আত্ম-রূপে পরিব্যাপ্ত আছেন, এই কারণে মনও স্বস্বরূপ আত্মাতে প্রবৃত্ত হয় না, অর্থাৎ তাহাকে প্রকাশ করিতে পারে না। বিশেষতঃ অভ্যন্তরস্থ চৈতন্য- জ্যোতিতে সমুদ্ভাসিত হইলেই মনের মনন-সামর্থ্য(চিন্তাশক্তি)
সমুৎপন্ন হয়; এই কারণে ব্রহ্মবিদ্গণ বৃত্তিসম্পন্ন মনকে যাঁহার দ্বারা মত—বিষয়ীকৃত, অর্থাৎ ব্যাপ্ত(আয়ত্ত) বলিয়া নির্দেশ করেন, মনেরও চৈতন্য-সম্পাদক সেই আত্মাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানিও। ‘নেদম্’ ইত্যাদির অর্থ পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে।
এখানে বুদ্ধি ও মনকে এক করিয়া নির্দেশ করায় ‘মনঃ’ শব্দে অন্তঃকরণ অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে। যাহার দ্বারা মনন বা চিন্তা করা হয়, তাহার নাম মনঃ; সুতরাং ঐ শব্দটি সমস্ত করণবাচক (ইন্দ্রিয় প্রভৃতিরও বোধক)। ‘কামনা, সংকল্প(মানস চিন্তা), বিচিকিৎসা(সংশয়), শ্রদ্ধা, অশ্রদ্ধা, ধৃতি, অধৃতি(অসহিষ্ণুতা), হ্রী(লজ্জা), ধী(বুদ্ধিবৃত্তি), ভী(ভয়), এ সমস্তই মন অর্থাৎ মনের বৃত্তি—এই শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, কামনাদি বৃত্তিবিশিষ্ট অন্তঃকরণকেই ‘মনঃ’ বলা হয়; সুতরাং এখানে ‘মনঃ’ শব্দের বিশেষার্থ পরিত্যাগ করিয়া সাধারণ অর্থ অন্তঃকরণই বুঝিতে হইবে ॥ ৫ ॥
• যচ্চক্ষুষা ন পশ্যতি যেন চক্ষুংঘ্রি পশ্যতি। তদের ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ॥ ৬ ॥
[ লোকঃ] চক্ষুষা যৎ ন পশ্যতি(বিয়য়ী করোতি); যেন(চৈতন্যাত্মজ্যোতিষা) চক্ষুংষি পশ্যতি, তৎ এব ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৬ ॥
লোকে যাঁহাকে চক্ষুর দ্বারা দেখিতে পায় না; যাঁহার দ্বারা চক্ষুকে দর্শন করে। তুমি তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে, ইত্যাদি পূর্ব্বের ন্যায় ॥ ৬ ॥
যচ্চক্ষুষা ন পশ্যতি ন বিষয়ীকরোতি অন্তঃকরণবৃত্তিসংযুক্তেন লোকঃ, যেন চক্ষুংষি অন্তঃকরণবৃত্তিভেদভিন্নাঃ চক্ষুবৃত্তীঃ পশ্যতি—চৈতন্যাত্মজ্যোতিষা বিষয়ী- করোতি ব্যাপ্নোতি। তদেবেত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৬॥
লোকে অন্তঃকরণসংযুক্ত চক্ষুর দ্বারা যাঁহাকে দর্শন করিতে পারে না, অর্থাৎ যিনি চক্ষুর বিষয় হন না; বিভিন্নপ্রকার অন্তঃকরণবৃত্তি অনুসারে পৃথক্ পৃথক্ চক্ষুর বৃত্তিসকল যাহার দ্বারা দর্শন করে, অর্থাৎ লোকে যে আত্মচৈতন্যজ্যোতির সাহায্যে চাক্ষুষ বৃত্তি সকলও অনুভব করিতে পারে, অপরাংশ পূর্ব্বের মত। ৬॥
যচ্ছ্রোত্রেণ ন, শূণোতি, যেন শ্রোত্রমিদং শ্রুতম্। তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ॥ ৭ ॥
[ লোকঃ] শ্রোত্রেণ(কর্ণেন) যৎ নৃ শূণোতি, যেন চ ইদং শ্রোত্রং শ্রুতং (বিষয়ীকৃতম্ ভবতি), তৎ এব ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৭ ॥
লোকে যাঁহাকে শ্রবণেন্দ্রিয় দ্বারা শ্রবণ করিতে পারে না; এই শ্রোত্র যাঁহার দ্বারা শ্রুত হয়, অর্থাৎ বিষয়ীকৃত হয়; অপরাংশ পূর্ব্বের মত ॥ ৭ ॥
যৎ শ্রোত্রেণ ন শূণোতি দিগদেবতাধিষ্ঠিতেন আকাশকার্য্যেণ মনোবৃত্তি- সংযুক্তেন ন বিষয়ীকরোতি লোকঃ, যেন শ্রোত্রমিদং শ্রুতম্; যৎ প্রসিদ্ধং, চৈতন্যাত্মজ্যোতিষা বিষয়ীকৃতম্; তদেবেত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৭ ॥
লোকসকল দিগ্-দেবতা-পরিচালিত, আকাশ-সমুৎপন্ন ও মনো- বৃত্তিবিশিষ্ট শ্রবণেন্দ্রিয়দ্বারা যাঁহাকে বিষয়ীভূত করিতে পারে না, অর্থাৎ যিনি শ্রবণের অবিষয়(‘৫) পরন্তু এই প্রসিদ্ধ শ্রবণেন্দ্রিয় যে
আত্মচৈতন্য-জ্যোতিতে শ্রুত অর্থাৎ বিষয়ীকৃত হয়, তাঁহাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে, অপরাংশ পূর্ব্বের মত ॥ ৭ ॥
যৎ প্রাণেন ন প্রাণিতি যেন প্রাণঃ প্রণীয়তে। তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ॥ ৮॥
ইতি প্রথমঃ খণ্ডঃ।
[লোকঃ] প্রাণেন(ঘ্রাণেন) যৎ ন প্রাণিতি(ন বিষয়ীকরোতি), যেন প্রাণঃ প্রণীয়তে(প্রের্য্যতে), তৎ এব ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥৮॥
লোকে প্রাণ দ্বারা(ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা) যাঁহাকে গ্রহণ করিতে পারে না, পরন্তু যাঁহার দ্বারা প্রাণও(ঘ্রাণও)[স্ববিষয়ে] প্রেরিত হয়। তাঁহাকেই—ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৮ ॥
যৎ প্রাণেন ঘ্রাণেন পার্থিবেন নাসিকাপুটান্তরবস্থিতেন অন্তঃকরণপ্রাণবৃত্তিভ্যাং সহিতেন যং ন প্রাণিতি গন্ধবৎ ন বিষয়ীকরোতি; যেন চৈতন্যাত্মজ্যোতিষা অবভাস্যত্বেন স্ববিষয়ং প্রতি প্রাণঃ প্রণীরতে। ‘তদেবেত্যাদি সর্ব্বং সমানম্ ॥ ৮ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবৎপাদকৃতৌ কেনোপনিষৎপদভাষ্যে প্রথমঃ খণ্ডঃ ॥ ১ ॥ ভাষ্যানুবাদ।
নাসারন্ধ্রে অবস্থিত ও’ পার্থিব(পৃথিবী হইতে সমুৎপন্ন) প্রাণ অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয় অন্তঃকরণবৃত্তি ও পরিস্পন্দাত্মক প্রাণবৃত্তিসংযুক্ত হইয়াও যাঁহাকে গন্ধের মত অনুভব করিতে পারে না; পরন্তু প্রাণ যে আত্মচৈতন্যজ্যোতির দ্বারা উদ্ভাসিত হইয়া স্ববিষয়ে প্রেরিত হয়; তাঁহাকেই—ইত্যাদি পূর্ব্বের মত ॥৮॥
ইতি কেনোপনিষদ্-ভাষ্যানুবাদের প্রথম খণ্ড।
যদি মন্যসে সুবেদেতি দভ্রমেবাপি(১) নূনং ত্বং বেথ ব্রহ্মণো রূপম্। যদস্য ত্বং যদস্য দেবেষথ নু মীমাংস্যমেব তে মন্যে বিদিতম্ ॥৯। ১॥
যদি মন্যসে সুবেদ ইতি,[তর্হি] নূনং ত্বং ব্রহ্মণঃ রূপম্(স্বরূপম্) দভ্রম্(অল্পম) এব অপি বেথ(জানীষে)। ত্বম্[ভূতেষু] অস্য(ব্রহ্মণঃ) যৎ(রূপম্)[বেথ],[তৎ অল্পং বেথ]। নৃ’(অথবা)[ত্বং] দেবেষু অস্য(ব্রহ্মণঃ) যৎ(রূপম্)[বেথ],[তৎ অপি অল্পম্ এব বেথ]।[যত এবম্; তস্মাৎ] তে(তব) বিদিতম্[ব্রহ্ম]; অথ (অদ্যাপি) মীমাংস্যম্(বিচার্য্যম্) এব[মন্যে অহমিতি শেষঃ] ॥
তুমি যদি মনে কর—আমি ব্রহ্মের স্বরূপ উত্তমরূপে জানিয়াছি, তাহা হইলে জানিও যে, সেই রূপটি নিশ্চিতই দভ্র(অল্প)।[কেননা] ব্রহ্মের যে(ভূত-ভৌতিক), রূপ অথবা দেবতারূপ, সেই উভয়ই(অল্প); অতএব, আমি(আচার্য্য) মনে করি, তোমার(শিষ্যের) পরিজ্ঞাত ব্রহ্ম-স্বরূপটি এখনও মীমাংস্য, অর্থাৎ বিচার ও তর্ক দ্বারা এখনও বুঝিতে বাকি আছে॥ ৯।১॥
এবং হেয়োপাদেয়-বিপরীতঃ ত্বম্ আত্মা ব্রহ্মেতি প্রত্যায়িতঃ শিষ্যঃ ‘অহমেব ব্রহ্ম’ ইতি সুষ্ঠু বেদ ‘অহম্’ ইতি মা গৃহ্নীয়াদিত্যাশঙ্ক্য আচার্য্যঃ শিষ্যবুদ্ধিবিচালনার্থং যদীত্যাহ। ননু ইষ্টৈব সুবেদাহমিতি নিশ্চিতা প্রতিপত্তিঃ। সত্যম্, ইষ্টা নিশ্চিতা প্রতিপত্তিঃ ন হি সুবেদাহমিতি। যদ্ধি বেদ্যং বস্তু বিষয়ীভবতি, তৎ সুষ্ঠু বেদিতুং শক্যম্, দাহমিব দগ্ধুম্ অগ্নেদগ্ধঃ, ন তু অগ্নেঃ স্বরূপমেব। সর্ব্বস্য হি বেদিতুঃ
স্বাত্মা ব্রহ্মেতি সর্ববেদান্তানাং সুনিশ্চিতোহর্থঃ। ইহ চ তদেব প্রতিপাদিতং প্রশ্ন- প্রতিবচনোক্ত্যা “শ্রোত্রস্য শ্রোত্রম্” ইত্যাদ্যয়া। “যদ্বাচানভ্যুদিতম্” ইতি চ বিশেষতোহবধারিতম্। ব্রহ্মবিৎসম্প্রদায়নিশ্চয়শ্চোক্তঃ-“অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো, অবিদিতাদধি” ইতি; উপন্যস্তম্ উপসংহরিষ্যতি চ “অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাত- মবিজানতাম্” ইতি। তস্মাদযুক্তমেব শিষ্যস্য সুবেদেতি বুদ্ধিং নিরাকর্তুম্। ন হি বেদিতা বেদিতুর্বেদিতুং শক্যঃ অগ্নিদগ্ধ রিব দগ্ধ মগ্নেঃ। ন চান্যো বেদিতা ব্রহ্মণোহস্তি, যস্য বেদ্যমন্যৎ স্যাদ্ ব্রহ্ম। “নান্যদতোহস্তি বিজ্ঞাতৃ” ইত্যন্যো বিজ্ঞাতা প্রতিষিধ্যতে। তস্মাৎ সুষ্ঠু বেদাহং ব্রহ্মেতি প্রতিপত্তিমিথ্যৈব। তস্মাদযুক্তমেবাহ আচার্য্যো যদীত্যাদি। যদি কদাচিৎ অন্যসে-সু বেদেতি-সুষ্ঠু বেদাহং ব্রহ্মেতি। কদাচিদ্ যথাশ্রুতং দুর্বিজ্ঞেয়মপি ক্ষীণদোষঃ সুমেধাঃ কশ্চিৎ প্রতিপদ্যতে, কশ্চি- ন্নেতি সাশঙ্কমাহ যদীত্যাদি। দৃষ্টং চ “যু এযোহক্ষিণি পুরুষো দৃশ্যতে, এষ আত্মেতি হোবাচ, এতদমৃতমভয়মেতদ্ ব্রহ্ম” ইত্যুক্তে প্রাজাপত্যঃ পণ্ডিতোহপি অসুররাড বিবোচনঃ স্বভাবদোষবশাৎ অনুপপদ্যমানমপি বিপরীতমর্থং শরীরমাত্রেতি প্রতি- পন্নঃ। তথেন্দ্রো দেবরাট্ সরুদ্ধিস্ত্রিরুক্তং চাপ্ৰতিপদ্যমানঃ স্বভাবদোষক্ষয়মপেক্ষা চতুর্থে পর্যায়ে প্রথমোক্তমেব ব্রহ্ম প্রতিপন্নবান্। লোকেহপি একম্মাদগুরোঃ শৃণ্বতাং কশ্চিদবথারবৎ প্রতিপদ্যতে, কশ্চিদযথাবৎ, কশ্চিদ বিপরীতং, কশ্চিৎ ন পতিপদ্যতে, কিমু বক্তব্যমতীন্দ্রিয়মাত্মতত্ত্বম্। ক ॥
অত্র হি বিপ্রতিপন্নাঃ সদসদ্বাদিনস্তাকিকাঃ সর্ব্বে। তস্মাদবিদিতং ব্রহ্মেতি সুনিশ্চিতোক্তমপি বিষমপ্রতিপত্তিত্বাদ্ যদি মন্যস ইত্যাদি ‘সাশঙ্কং বচনং যুক্ত- মেবাহ আচার্য্যস্য। খ ॥
দভ্রম্ অল্পমেবাপি নূনং ত্বং বেথ জানীষে ব্রহ্মণো রূপম্। কিমনেকানি ব্রহ্মণো রূপাণি মহান্ত্যর্ভকাণি চ?—যেনাহ দভ্রমেবেত্যাদি? বাঁঢ়ম্। অনেকানি হি নাম- রূপোপাধিকৃতানি ব্রহ্মণো রূপাণি, ন স্বতঃ। স্বতন্ত্র “অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ং তথারসং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ” ইতি শব্দাদিভিঃ সহ রূপাণি প্রতিবিধ্যন্তে। ননু যেনৈব ধর্ম্মেণ যৎ রূপ্যতে, তদেব তস্য স্বরূপম্, ইতি ব্রহ্মণোহপি যেন বিশেষেণ নিরূপণম্, তদেব তস্য স্বরূপং স্যাৎ, অত উচ্যতে,—চৈতন্যম্, পৃথিব্যাদীনামন্য- তমস্য সর্ব্বেযাং বিপরিণতানাং বা ধর্ম্মো ন ভবতি। তথা শ্রোত্রাদীনামন্তঃকরণস্য চ ধর্ম্মো ন ভবতীতি। ব্রহ্মণো রূপমিতি, ব্রহ্ম রূপ্যতে চৈতন্যেন। তথা চোক্তম্—
t
“বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম,” “বিজ্ঞানঘনমেব,” “সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম,” “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম,” ইতি চ ব্রহ্মণো রূপং নির্দিষ্টং শ্রুতিষু। সত্যমেবম্, তথাপি তদন্তঃকরণ-দেহে- ন্দ্রিয়োপাধিদ্বারেণৈব বিজ্ঞানাদিশব্দৈর্নিদ্দিশ্যতে তদনুকারিত্বাদ্দেহাদি-বৃদ্ধি-সঙ্কোচ- চ্ছেদাদিযু নাশেষু চ, ন স্বতঃ। স্বতন্ত্র—“অবিজ্ঞাতং বিজানতাং, বিজ্ঞাতমবিজান- তাম্” ইতি স্থিতং ভবিষ্যতি। যদস্য ব্রহ্মণো ‘রূপমিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ন কেবলমধ্যাত্মোপাধি-পরিচ্ছিন্নস্য অন্য ব্রহ্মণো রূপং ত্বম্ অল্পং বেথ; যদপ্যধিদৈবতো- পাধিপরিচ্ছিন্নস্য অন্য ব্রহ্মণো রূপং দেবেষু বেথ ত্বম্, তদপি নূনং দভ্রমেব বেথ ইতি মন্যেহহম্। যদধ্যাত্মম্, যদধিদৈবম্, তদপি চ দেবেষুপাধিপরিচ্ছিন্নত্বাদ দভ্রত্বাৎ ন নিবর্ত্ততে। যদু‘বিধ্বস্তসর্ব্বোপাধিবিশেষং শান্তমনন্তমেকমদ্বৈতং ভূমাখ্যং নিত্যং ব্রহ্ম, ন তৎ সুবেদ্যমিত্যভিপ্রায়ঃ। যত এবম্, অথ নু—তস্মাৎ মন্যে অদ্যাপি মীমাংস্যং বিচার্য্যমের তে তব ব্রহ্ম। এরমাচার্য্যোক্তঃ শিষ্য একান্তে উপবিষ্টঃ সমাহিতঃ সন্ যথোক্তমাচার্য্যেণ আগমমর্থতো বিচার্য্য, তর্কতশ্চ নির্দ্ধার্য্য, স্বানুভবং কৃত্বা, আচার্য্যসকাশমুপগম্যোবাচ—মন্যেহহমপেদানীং বিদিতং ব্রহ্মেতি ॥৯৷১॥
আচার্য্য পূর্ব্বোক্তপ্রকারে উপদেশ দিলেন যে, ‘হেয়(যাহা পরি- ত্যাগের যোগ্য) ও উপাদেয়(যাহা গ্রহণের যোগ্য), এই উভয়বিধ ভাবরহিত তুমি অর্থাৎ’ তোমার আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ।’ শিষ্য উক্ত উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করিয়া বলিলেন,-আমিই, যে ব্রহ্ম, ইহা উত্তমরূপে বুঝিয়াছি। পাছে ‘অহং’পদে আমাকেই বুঝিয়া থাকে, আচার্য্য এই আশঙ্কায় শিষ্যের বুদ্ধি সৎপথে পরিচালিত করিবার উদ্দেশ্যে ‘যদি মনে কর’ ইত্যাদি কথা বলিয়াছেন। ভাল, “অহংসুবেদ” (আমি উত্তমরূপে বুঝিয়াছি) এইরূপ নিশ্চিত বা নিঃসন্দিগ্ধ জ্ঞান ত অভিমত বা প্রার্থনীয়ই বটে, তবে আশঙ্কা‘কেন? হ্যাঁ, ঐরূপ জ্ঞান অভিমতই সত্য; কিন্তু “অহং সুবেদ” এই বুদ্ধি ত আর সেইরূপ নিশ্চিত বুদ্ধি(অনুভব) নহে। কেননা, অগ্নি যেরূপ স্বীয় দাহযোগ্য বস্তুকেই দগ্ধ করিতে সমর্থ হয়, কিন্তু আপনাকে দগ্ধ করিতে সমর্থ হয় না, সেইরূপ যে বস্তু জ্ঞান-যোগ্য, জ্ঞানের বিষয়ীভূত হয়, জ্ঞাতা ব্যক্তি
সেই বস্তুকেই উত্তমরূপে জানিতে পারে; কিন্তু নিজের স্বরূপকে কখনই জানিতে পারে না। সমস্ত বেদিতার(জ্ঞাতৃমাত্রের) আত্মাই যে ব্রহ্মস্বরূপ, ইহা সমস্ত বেদান্তশাস্ত্রের নিশ্চিত বা অবিসংবাদিত সিদ্ধান্ত। এই কেনোপনিষদেও ‘শ্রোত্রের শ্রোত্র’ ইত্যাদি প্রশ্ন- প্রত্যুত্তরচ্ছলে তাহাই প্রতিপাদিত হইয়াছে; এবং ‘যিনি বাক্যের বিষয় হন না’ ইত্যাদি বাক্যে তাহাই আবার বিশেষভাবে অবধারিত হইয়াছে। এ বিষয়ে ব্রহ্মবিৎ-সম্প্রদায়ের যাহা নিশ্চয়(স্থির বিশ্বাস), তাহাও ‘যিনি বিদিত. ও অবিদিত হইতে. পৃথক’ ইত্যাদি বাক্যে উল্লিখিত হইয়াছে। ইতঃপর, ‘বিশেষজ্ঞদিগের নিকট তিনি অবিজ্ঞাত, আর অজ্ঞদিগের নিকট তিনি বিশেষরূপে জ্ঞাত’ ইত্যাদি বাক্যেও ঐ কথারই উপসংহার করা হইয়াছে। অতএব, শিষ্যের তাদৃশ সুবেদন-বুদ্ধি অপনোদন করা যুক্তিসঙ্গতই হইয়াছে। কারণ, অগ্নি যেমন অগ্নিকে দগ্ধ করিতে পারে না, তেমনি বেদিতার বেদিতাও জ্ঞানগ্রাহ্য হইতে পারে না। ব্রহ্মাতিরিক্ত এমন কোনও বেদিতা নাই, ব্রহ্ম যাহার বেদ্য হইতে পারেন। ‘ব্রহ্ম হইতে পৃথক্ কোন বিজ্ঞাতা নাই,’ এই শ্রুতিও ব্রহ্মাতিরিক্ত বেদিতার প্রত্যাখ্যান করিতেছেন। অতএব, ‘আমি ব্রহ্মকে উত্তমরূপে বুঝিয়াছি’ এইরূপ বুদ্ধি নিশ্চয়ই মিথ্যা। অতএব, ‘কখনও যদি তুমি মনে কর যে, আমি ব্রহ্মকে সুষ্ঠুরূপে বুঝিয়াছি,-‘আচার্য্যের এই ‘যদি’ শব্দোত্থ আশঙ্কা যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। নির্দোষ ও সুমেধা(ধারণা-শক্তি-সম্পন্ন) কোনও ব্যক্তি দুর্বিবজ্ঞেয় বিষয়ও শ্রবণ করিয়া কখন কখন বুঝিতে পারে, কখনও বা বুঝিতে পারে না; এই কারণেই ‘যদি’ ইত্যাদি বাক্যে আশঙ্কা সূচিত হইয়াছে। দেখাও গিয়াছে, প্রজাপতি বলিয়াছিলেন,-‘এই যে অক্ষিমধ্যে পুরুষ দৃষ্ট হইতেছে, ইহাই অমৃত, অভয়(সর্বভয়-নিবারক) এবং ইহাই ব্রহ্ম।’
অসুররাজ বিরোচন পণ্ডিত হইয়াও স্বীয় স্বভাব-দোষে
(রাজস-প্রকৃতি বশতঃ) প্রজাপতি-প্রদত্ত উক্ত উপদেশের প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারিয়া বিপরীতার্থ গ্রহণ করিয়াছিলেন— শরীরকে আত্মা বলিয়া বুঝিয়াছিলেন। অথচ দেবরাজ ইন্দ্র একবার, দুইবার, তিনবার পর্য্যন্ত প্রজাপতির উপদেশের রহস্য বুঝিতে পারি- লেন না; কিন্তু স্বাভাবিক দোষরাশি বিদূরিত হইলে পর প্রজাপতির প্রথমকথিত ব্রহ্মতত্ত্বই চতুর্থবারের উপদেশে বুঝিতে সমর্থ হইয়া- ছিলেন। ব্যবহার-ক্ষেত্রেও দেখা যায়, একই গুরুর নিকট বহু শিষ্য যুগপৎ একরূপ উপদেশ গ্রহণ করিলেও ‘তন্মধ্যে কেহ বিকৃতভাবে উপদিষ্টার্থ গ্রহণ করে, কেহ যথাযথভাবে গ্রহণ করে, কেহ বা বিপরীতভাবে গ্রহণ করে, আবার কেহ বা একেবারেই গ্রহণ করিতে পারে না। সাধারণ লোক-ব্যবহারেই যখন এইরূপ পার্থক্য ঘটে, তখন অলৌকিক আত্মতত্ত্ব-সম্বন্ধে আর কথা কি? ক ॥ সদসদ্বাদী তার্কিকগণ এ বিষয়ে ‘বিপ্রতিপন্ন বা বিরুদ্ধ-মতা- বলম্বী হইয়া থাকেন, অর্থাৎ কোন কোন তার্কিক বলিয়া থাকেন যে, আত্মা সৎ—নিত্য ও পরলোকভাগী। আবার কোন কোন তার্কিক বলিয়া থাকেন যে, না--আত্মা অসৎ—অনিত্য ও দেহপাতেই বিনষ্ট হয়। এইরূপে তার্কিক পণ্ডিতগণের মধ্যে পরস্পর বিরুদ্ধ মতবাদ প্রচলিত রহিয়াছে। ‘অতএব, ‘ব্রহ্ম বিদিত নহেন’, ইহা সুনিশ্চিত হইলেও প্রকৃতার্থ-গ্রহণে বাধা থাকায়, আচার্য্যের পক্ষে আশঙ্কা- সহকারে ‘যদি মনে কর’ বলা সঙ্গত হইয়াছে। খ॥
তুমি ব্রহ্মের যে রূপটি জানিয়াছ, তাহা নিশ্চয়ই দভ্র। দভ্র অর্থ ‘অল্প বা ক্ষুদ্র’। ভাল, তাহা হইলে ব্রহ্মের কি ছোট-বড় বহুতর রূপ আছে, যাহাতে তুমি ‘দভ্র’(অল্প) রূপের কথা বলিতেছ? হ্যাঁ— অনেক রূপই আছে; ব্রহ্মের নাম-রূপময় উপাধিকৃত রূপ বহুতর, কিন্তু তাঁহার সেই সকল রূপ স্বাভাবিক নহে। বাস্তবিক পক্ষে ‘তিনি শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ-বর্জিত, এবং অব্যয়(নির্বিকার) ও
নিত্য’ এই শ্রুতিদ্বারা তাঁহার স্বরূপতঃ রূপ(আকৃতি) ও রূপ- রসাদি ধৰ্ম্ম প্রতিষিদ্ধ হইয়াছে। গ ॥
প্রশ্ন হইতে পারে যে, যে ধর্ম্মের দ্বারা যাহাকে নিরূপিত বা পরি- চিত করা হয়, তাহাই তাহার রূপ বা স্বরূপ বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে; সুতরাং যে বিশেষ ধর্ম্মের দ্বারা ব্রহ্ম নিরূপিত হন, তাহাই তাঁহার স্বরূপ বলিয়া গৃহীত হইতে পারে? চৈতন্য পদার্থটি পৃথিব্যাদি পঞ্চভূতের বা পঞ্চভূত-বিকারের, অথবা তন্মধ্যে যে কোন একটিরও ধৰ্ম্ম নহে, এবং শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ের’ কিংবা অন্তঃকরণেরও, ধৰ্ম্ম নহে; অথচ চৈতন্য একমাত্র ব্রহ্মেরই ধৰ্ম্ম,-ব্রহ্ম ঐ চৈতন্য দ্বারাই নিরূপিত বা পরিচিত হন; অতএব, চৈতন্যই ব্রহ্মের স্বরূপ বলিয়া গৃহীত হয় নাই কেন? বক্ষ্যমাণ শ্রুতি-সমূহেও ঐরূপই ব্রহ্মস্বরূপ উক্ত হইয়াছে, -‘ব্রহ্ম বিজ্ঞান(চৈতন্য) ও আনন্দস্বরূপ’, ‘(ব্রহ্ম) কেবলই, বিজ্ঞানময়’, ‘ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান ও অনন্তস্বরূপ’, ‘ব্রহ্ম প্রজ্ঞানস্বরূপ’ ইত্যাদি। হ্যাঁ, যদিও এ কথা সত্য বটে, তথাপি বুঝিতে হইবে যে, দেহেন্দ্রিয়াদির ছেদ, ভেদ, বৃদ্ধি, হাস ও বিনাশ প্রভৃতি অবস্থায় আত্মা আপনাকেও যেন তদবস্থাপন্নই মনে করে; এই কারণে দেহেন্দ্রিয়াদি উপাধি সহযোগে বিজ্ঞানাদি-শব্দে তাঁহার নির্দেশ করা হয় মাত্র; বস্তুতঃ উহা তাঁহার স্বরূপ নহে। বাস্তবিক পক্ষে ‘বিজ্ঞদিগের নিকট তিনি অবিজ্ঞাত, আর অজ্ঞদিগের নিকট বিজ্ঞাত’ এই বাক্যেই তাঁহার প্রকৃত স্বরূপ, নিরূপিত হইবে। পূর্বকথিত ‘রূপ’ শব্দের সহিত “যৎ যস্য” কথার সম্বন্ধ আছে;- অর্থাৎ এই ব্রহ্মের যাহা‘রূপ; তুমি দেহেন্দ্রিয়াদি অধ্যাত্ম উপাধি পরিচ্ছিন্নরূপে যে ব্রহ্মরূপ জানিয়াছ, কেবল যে তাহাই অল্প, এরূপ নহে; পরন্তু দেবতামধ্যেও যে অধিদৈবত-রূপে ব্রহ্মরূপ অবগত হইয়াছ, আমি মনে করি, তাহাও তুমি অল্পই জানিয়াছ, অর্থাৎ ব্রহ্মের যে অধ্যাত্ম ও অধিদৈবত রূপ, তদুভয়ই উপাধি-পরিচ্ছিন্ন;
সুতরাং দভ্রত্ব বা অল্পত্ব দোষ-নিৰ্ম্মুক্ত, নহে। অভিপ্রায় এই যে, ব্রহ্ম সর্ববিধ উপাধি-বজ্জিত, শান্ত, অনন্ত, এক, অদ্বিতীয় ভূমা(পরম মহৎ) ও নিত্য; তাঁহাকে সহজে অবগত হওয়া যায় না; যেহেতু তাদৃশ ব্রহ্মস্বরূপ এমনই দুজ্ঞেয়। অতএব আমি মনে করি, উক্ত ব্রহ্মস্বরূপ তোমার পক্ষে এখনও মীমাংস্য—বিচার-যোগ্যই রহিয়াছে, [ অতএব বিচার দ্বারা বুঝিতে সচেষ্ট হও]। শিষ্য পূর্ব্বোক্ত প্রকারে আচার্য্যোপদেশ প্রাপ্ত হইয়া, সমাহিতচিত্তে নির্জ্জনে উপবিষ্ট হইয়া, আচার্য্যের উপদিষ্ট, কথার অর্থ বিচার করিয়া এবং তর্কের দ্বারা তাহার তাৎপর্য্য, নির্দ্ধারণ করিয়া—অধিকন্তু, ঐ কথার অভিপ্রায় হৃদয়ঙ্গম করিয়া আচার্য্য-সমীপে গমনপূর্ব্বক বলিলেন,—‘আমি মনে করি, এখন ব্রহ্মতত্ত্ব বুঝিতে পারিয়াছি’। ৯॥ ১॥
নাহং মন্যে সুবেদেতি নো ন বেদেতি বেদ চ। যো নস্তদ্বেদ তদ্বেদ নো ন বেদেতি বেদ চ ॥১০॥২৷৷
অহং[ব্রহ্ম] সুবেদ(সুষ্ঠু বেদ্মি) ইতি ন মন্যে। ন বেদ, ইতি চ নো (ন) বেদ। নঃ(অস্মাকং মধ্যে) যঃ(জনঃ) তৎ—‘নো ন বেদ, বেদ চ ইতি’[বচনম্] বেদ(বেত্তি),[সঃ] তৎ(ব্রহ্ম) বেদ ॥ অনুবাদ।
আমি ব্রহ্মকে উত্তমরূপে জানি এরূপ মনে করি না, এবং[একেবারেই] জানি না, এরূপও মনে করি না। আমাদের মধ্যে যে জন এই ‘জানি ও জানি না’ কথার ভাব বুঝিতে পারে, সেই জনই ব্রহ্মকেও জানিতে পারে ॥ ১০ ॥২॥
কথমিতি? শৃণুত;—নাহং মন্যে সুবেদেতি, নৈবাহং মন্যে সুবেদ ব্রহ্মেতি। নৈব তর্হি বিদিতং ত্বয়া ব্রহ্ম? ইত্যুক্তে আহ—নো ন বেদেতি বেদ চ। বেদ চেতি চশব্দাৎ ন বেদ চ।
ননু বিপ্রতিষিদ্ধম্,—নাহং মন্যে সুবেদেতি, নো ন বেদেতি বেদ চেতি। যদি ন মন্যসে—সুবেদেতি, কথং মন্যসে বেদ চেতি? অথ মন্যসে—বেদৈবেতি,
কথং ন মন্যসে—সুবেদেতি? একং বস্তু যেন জ্ঞায়তে, তেনৈব তদেব বস্তু ন সু- বিজ্ঞায়ত ইতি বিপ্রতিষিদ্ধং সংশয়-বিপর্য্যয়ৌ বর্জ্জয়িত্বা। ন চ ব্রহ্ম সংশয়িতত্বেন জ্ঞেয়ম্, বিপরীতত্বেন বেতি নিয়ন্তং শক্যম্। সংশয়-বিপর্য্যয়ৌ হি সর্ব্বত্রানর্থকরত্বে- নৈব প্রসিদ্ধৌ।
এবমাচার্য্যেণ বিচাল্যমানোইপি শিষ্যো ন বিচচাল। “অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি” ইত্যাচার্য্যোক্রাগম-সম্প্রদায়বলাৎ উপপত্ত্যনুভববলাচ্চ, জগর্জ চ— ব্রহ্মবিদ্যায়াং দৃঢ়নিশ্চয়তাং দশয়ন্নাত্মনঃ। কথমিতি? উচ্যতে,—যো যঃ কশ্চিৎ নোহম্মাকং সব্রহ্মচারিণাং মধ্যে তৎ—মদুক্তং বচনং তত্ত্বতো বেদ, সঃ তদ্ ব্রহ্ম বেদ। কিং পুনস্তদ্বচনমিত্যত আহ,—নো ন’বেদেতি বেদ চেতি। যদেব “অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি” ইত্যুক্তম্, তদেব বস্তু অনুমানানুভবাভ্যাং সংযোজ্য নিশ্চিতং বাক্যান্তরেণ ‘নো ন বেদেতি বেদ চ’ ইত্যবোচদাচার্য্যবুদ্ধিসংবাদার্থম্, মন্দবুদ্ধিগ্রহণব্যপোহার্থঞ্চ। তথা চ গর্জিতমুপপন্নং ভবতি,—‘যো নস্তদ্বেদ’ ইতি ॥ ১০ ॥ ২ ॥
যদি বল, কি প্রকার? তাহা বলিতেছি, শ্রবণ কর,—আমি ব্রহ্মকে উত্তমরূপে বুঝিয়াছি, ইহা কখনই মনে করি না। তবে কি তুমি ব্রহ্মকে বুঝিতে পার নাই? গুরুর এই প্রশ্নোত্তরে শিষ্য বলিলেন, আমি যে একেবারেই বুঝি না, তাহাও নহে। মূলের “বেদ চ” এই ‘চ’ শব্দে “ন বেদ চ” অর্থাৎ জানি-না, এইরূপ অর্থও ‘বুঝিতে হইবে। ভাল, আমি মনে করি,—‘ব্রহ্মকে জানি না, অথচ জানি’, এরূপ কথা ত পরস্পর-বিরুদ্ধ? কেননা, যদি মনে কর, ব্রহ্মকে জানি না, তবে আবার জানি, বলিয়া মনে কর ‘কিরূপে? পক্ষান্তরে, ব্রহ্মকে যদি জানিয়াই থাক, তবে ‘জানি’ বলিয়াই মনে কর না কেন? যে ব্যক্তি যে বস্তু জানে, সেই ব্যক্তিরই যে, আবার সেই বস্তু অবিজ্ঞাত থাকা, ইহা সংশয় ও বিপর্যয়(ভ্রম) ভিন্ন উপপন্ন হইতে পারে না, প্রত্যুত সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ হয়। আর ব্রহ্মকে যে, সংশয়িত বা বিপরীত- ভাবেই জানিতে হইবে, এরূপও কোন নিয়ম করা যাইতে পারে
না; বিশেষতঃ, সংশয় ও বিপর্যয়-জ্ঞান সর্ব্বত্রই অনর্থকর বলিয়া প্রসিদ্ধ।[অতএব, উক্ত জ্ঞানকে সংশয় বা বিপর্যয়(ভ্রম) বলা যাইতে পারে না](৬).
শিষ্য আচার্য্যকর্তৃক উক্তরূপে বিক্ষোভিত হইয়াও নিজের দৃঢ়- নিশ্চয় হইতে বিচলিত হইল না; পরন্তু, আচার্য্যোক্ত ‘তিনি বিদিত হইতে পৃথক্ এবং অবিদিত হইতে পৃথক্’ এই সাম্প্রদায়িক বাক্যানুসারে এবং যুক্তিযুক্ত অনুভবানুসারেও ব্রহ্মবিদ্যায় নিজের স্থিরতর ধারণা জ্ঞাপনার্থ উচ্চৈঃস্বরে, বলিতেলাগিলেন। কি প্রকার? বলা যাইতেছে,—আমরা যে সকলে একত্র বেদাধ্যয়ন করি, সেই আমাদের মধ্যে যে কেহ ঐ কথার অর্থ বুঝিতে পারে, প্রকৃতপক্ষে সেই লোকই ব্রহ্মকে জানিতে পারে। ঐ কথাটি যে কি, তাহাই “নো, ন’বেদেতি বেদ চ” বাক্যে বিবৃত করা হইয়াছে। অভিপ্রায় এই যে, ইতঃপূর্ব্বে আচার্য্যকর্তৃক “অন্যদেব তৎ বিদিতাৎ অথো, অবিদিতাৎ অধি”, এই বাক্যে যে তত্ত্ব অভিহিত হইয়াছে এবং শিষ্য নিজেও যে সেই তত্ত্ব সম্যক্ উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন, তাহাই “নো ন বেদ” ইত্যাদি বাক্যে অনুমান ও অনুভূতি-সহযোগে প্রকাশ করিলেন; আর মন্দমতি লোকেরা যে, ঐ তত্ত্ব-গ্রহণে, অসমর্থ, তাহাও জ্ঞাপন করিলেন। অতএব, ‘আমাদের মধ্যে যে জানে’ ইত্যাদি বাঁক্যে যে অভিমান ব্যক্ত করা হইয়াছে, তাহা অসঙ্গত হয় নাই ॥ ১০ ॥ ২ ॥
যস্যামতঃ তস্য মতং মতং যস্য ন’বেদ সঃ। অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাম্॥১১॥৩॥
[ব্রহ্ম] যস্য অমতম্(অবিজ্ঞাতম্), তস্য মতম্(সম্যক্ জ্ঞাতম্)।[ব্রহ্ম] যস্য মতম্(বিদিতম্ ইতি নিশ্চয়ঃ), সঃ[ব্রহ্ম] ন বেদ(ন জানাতি)।[যস্মাৎ] বিজানতাম্(সম্যক্ বিদিতবতাং সমীপে) | ব্রহ্ম। অবিজ্ঞাতম্, অবিজানতাম্ (অসম্যগ্দর্শিনাম্ এব) বিজ্ঞাতম্[ভবতি]॥
যে মনে করে, ব্রহ্মকে জানি না, বস্তুতঃ সে-ই তাঁহাকে জানে; আর যে মনে করে, ব্রহ্মকে জানি, বস্তুতঃ সে তাঁহাকে জানে না।[কারণ], বিজ্ঞ জনেরা তাঁহাকে অবিজ্ঞাত বলিয়া জানেন, আর অজ্ঞ জনেরাই তাঁহাকে বিজ্ঞাত বলিয়া মনে করে ॥ ১১ ॥ ৩ ॥
শিষ্যাচার্য্যসংবাদাৎ প্রতিনিবৃত্য স্বেন রূপেণ শ্রুতিঃ সমস্তসংবাদনিবৃত্তমর্থমেব বোধয়তি-যস্যামতমিত্যাদিনা। যস্য ব্রহ্মবিদঃ অমতম্ অবিজ্ঞাতম্ অবিদিতং ব্রহ্মেতি মতম্-অভিপ্রায়ঃ নিশ্চয়ঃ, তস্য মতং জ্ঞাতং সম্যগ্ব্রহ্মেত্যভিপ্রায়ঃ। যস্য পুনঃ মতং জ্ঞাতম্-বিদিতং ময়া ব্রহ্মেতি নিশ্চয়ঃ, ন বেদৈব সঃন ব্রহ্ম বিজানাতি সঃ। বিদ্বদবিদুযোঃ যথোক্তৌ পক্ষৌ অবধারয়তি,-অবিজ্ঞাতং বিজানতামিতি, অবিজ্ঞাতম্ অমতম্ অবিদিতমেব ব্রহ্ম বিজানতাং সম্যগ্বিদিতবতামিত্যেতৎ। বিজ্ঞাতং বিদিতং ব্রহ্ম অবিজানতাম্ অসম্যগ্দর্শিনাম্ ইন্দ্রিয়মনোবুদ্ধিঘেব আত্ম- দর্শিনামিত্যর্থঃ; নতু অত্যন্তমেব অব্যুৎপন্নবুদ্ধীনাম্। ন হি তেষাং ‘বিজ্ঞাত- মস্মাভিব্রহ্মেতি’ মতির্ভবতি। ইন্দ্রিয়-মনোবুদ্ধ্যুপাধিষু আত্মদর্শিনাং তু ব্রহ্মোপাধি- রিবেকানুপলম্ভাৎ, বুদ্ধ্যাদ্যপাধেশ্চ বিজ্ঞাতত্বাৎ বিদিতং ব্রহ্মেত্যুপপদ্যতে ভ্রান্তিরিতি, অতোহসম্যগ্দর্শনং পূর্ব্বপক্ষত্বেন উপন্যস্যতে-বিজ্ঞাতমবিজানতামিতি। অথবা হেত্বর্থ উত্তরাদ্ধোহবিজ্ঞাতমিত্যাদিঃ ॥ ১১॥ ৩॥
শ্রুতি এখন গুরু-শিষ্যভাবে উপদেশ পরিত্যাগ করিয়া নিজ রূপেই(শ্রুতিরূপেই) পূর্ব্বোক্ত তত্ত্ব জ্ঞাপন করিতেছেন,—ব্রহ্ম অমত—বিদিত বা বিজ্ঞাত নহে, ইহা যে ব্রহ্মবিদের মত—অভিপ্রায় বা নিশ্চয়, বস্তুতঃ ব্রহ্ম তাঁহারই মত অর্থাৎ সম্যক্ পরিজ্ঞাত।
৬
‘পরন্তু, ব্রহ্ম যাহার মত, অর্থাৎ ‘আমি ব্রহ্মকে জানিয়াছি,’ এইরূপ যাহার মনে নিশ্চয় হয়, সে লোক নিশ্চয়ই জানে না; অর্থাৎ সে লোক নিশ্চয়ই ব্রহ্মতত্ত্ব বুঝিতে পারে নাই। বিজ্ঞ ও অজ্ঞ সম্বন্ধে যে দুইটি পক্ষ কথিত হইল, এখন তাহাই অবধারণ করিয়া বলিতেছেন যে, যাঁহারা ব্রহ্মকে সম্যরূপে বুঝিতে পারিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট ব্রহ্ম নিশ্চয়ই অবিদিত(বলিয়া মনে হয়); আর যাহারা অবিজানৎ অর্থাৎ সম্যগজ্ঞান-রহিত, তাহাদের নিকটই ব্রহ্ম বিজ্ঞাত(বলিয়া প্রতিভাত হন)। যাঁহারা ইন্দ্রিয়, মন, ও বুদ্ধি প্রভৃতিকেই আত্মা বলিয়া মনে করে(তদতিরিক্ত আত্মা জানে না), তাহারাই এখানে ‘অবিজানৎ’(অজ্ঞ) শব্দে অভিহিত হইয়াছে, কিন্তু একেবারে অব্যুৎপন্নবুদ্ধি লোকগণ নহে। কেননা, তাহাদের মনে ‘আমরা ব্রহ্ম জানিয়াছি,’ এরূপ বুদ্ধি কখনও উৎপন্ন হয় না। আত্মার উপাধি—ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি প্রভৃতিতে যাহারা আত্মত্ব দর্শন করে, তাহারা কখনই ব্রহ্মকে উপাধি-বিযুক্তভাবে উপলব্ধি করিতে সমর্থ হয় না, পক্ষান্তরে ব্রহ্মোপাধিভূত বুদ্ধি প্রভৃতিকেই বুঝিতে পারে, এবং সেই বুদ্ধি-বিজ্ঞানেই ব্রহ্মকে বিজ্ঞাত বা বিদিত বলিয়া মনে করে; সুতরাং তাহাদের পক্ষে ঐরূপ বিদিতভ্রান্তি নিতান্তই সম্ভবপর(‘৩)। সেই কারণে, অসম্যগদর্শনোল্লেখের পূর্ব্বে
“বিজ্ঞাতম্ অবিজানতাম্” বাক্যে সম্যগদর্শনের উল্লেখ করা সঙ্গত হইয়াছে। অথবা, উক্ত শ্লোকের পূর্ব্বার্দ্ধে যে “যস্যামতম্” প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ হইয়াছে, তাহারই সমর্থনের জন্য “অবিজ্ঞাতম্”- ইত্যাদি উত্তরার্দ্ধ হেতুরূপে উপন্যস্ত হইয়াছে, বুঝিতে হইবে ॥১১৷৷৩৷৷
প্রতিবোধবিদিতং মতমমৃতত্বং হি বিন্দতে। আত্মনা বিন্দতে বীর্য্যং বিদ্যয়া বিন্দতেইমৃতম্ ॥১২॥৪॥
[ব্রহ্ম যদা] প্রতিবোধবিদিতম্(প্রত্যেক-বোধে জ্ঞাতম্)[ভরতি; তদা][তৎ] মতম্(সম্যগদর্শনম্)[ভবতীতি শেষঃ]।[তস্মাৎ] অমৃতত্বম্(মোক্ষম্) হি বিন্দতে (লভতে)।[তদেব বিভজ্য দর্শয়তি],—আত্মনা(জীবাত্মস্বরূপজ্ঞানেন) বীর্য্যম্ (অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যম্) বিন্দতে, বিদ্যয়া(ব্রহ্মবিদ্যয়া) অমৃতম্(মোক্ষম্) বিন্দতে ॥
যিনি প্রত্যেক জ্ঞানে ব্রহ্মস্বরূপ অনুভব করিতে পারেন, তিনিহ অমৃতত্ব (মুক্তি) লাভ করেন। বিশেষ এই যে, কেবল জীবাত্মার জ্ঞানে বীর্য্য, অর্থাৎ অণিমাদি ঐশ্বর্য্য লাভ করেন, আর বিদ্যা বা পরমাত্ম-জ্ঞানে মুক্তি লাভ করেন ॥১২॥ ৪ ॥
‘অবিজ্ঞাতং বিজ্ঞানতাম্’ ইত্যবধৃতম্। যদি ব্রহ্ম অত্যন্তমেব অবিজ্ঞাতম্, লৌকিকানাং ব্রহ্মবিদ্বাৎ চাবিশেষঃ প্রাপ্তঃ। ‘অবিজ্ঞাতং বিজ্ঞানতাম্’ ইতি চ পর- স্পুরবিরুদ্ধম্। কল্পং তু তৎ ব্রহ্ম সম্যগ্বিদিত ভবতীত্যেবমর্থমাহ—প্রতিবোধ- বিদিতম্,—বোধং বোধং প্রতি ‘বিদিতম্। বোধশব্দেন বৌদ্ধাঃ প্রত্যয়া উচ্যন্তে। সর্ব্বে প্রত্যয়া বিষয়ীভবন্তি যস্য, স আত্মা সব্ববোধান্ প্রতিবুধ্যতে,--সব্বপ্রত্যয়দর্শী চিচ্ছক্তিস্বরূপমাত্রঃ প্রত্যয়ৈবেব প্রত্যয়েষু অবিশিষ্টতয়া লক্ষ্যতে, নান্যৎ দ্বারমন্তরা- ত্মনো বিজ্ঞানায়। অতঃ প্রত্যয়-প্রত্যগাত্মতয়া বিদিতং ব্রহ্ম যদা, তদা তৎ মতম্,
তৎ সম্যগ্দর্শনমিত্যর্থঃ। সর্ব্বপ্রত্যয়-দর্শিত্বে চোপজননাপায়বর্জিত-দৃক্স্বরূপতা- নিত্যত্বং বিশুদ্ধস্বরূপত্বমাত্মত্বং নিব্বিশেষতৈকত্বং চ সর্ব্বভূতেষু সিদ্ধং ভবেৎ; লক্ষণভেদাভাবাৎ ব্যোম্ন ইব ঘট-গিরিগুহাদিষু। বিদিতাবিদিতাভ্যামন্যদ্ ব্রহ্মেতি আগমবাক্যার্থ এবং পরিশুদ্ধ এরোপসংহৃতো ভবতি। “দৃষ্টের্দ্রষ্টা, শ্রুতেঃ শ্রোতা, মতেমন্তা, বিজ্ঞাতেব্বিজ্ঞাতা” ইতি হি শ্রুত্যন্তরম্;
যদা পুনর্ব্বোধ-ক্রিয়াকর্তেতি বোধক্রিয়া-লক্ষণেন। তৎকর্তারং বিজানাতীতি বোধলক্ষণেন বিদিতম্—প্রতিবোধ-বিদিতমিতি ব্যাখ্যায়তে। যথা যো বৃক্ষশাখা- শ্চালয়তি, স বায়ুরিতি, তদ্বৎ। তদা বোধ-ক্রিয়াশক্তিমান্ আত্মা দ্রষ্টব্যম্, ন বোধ- স্বরূপ এব। বোধস্তু জায়তে বিনশ্যতি চ। যদা বোধো জায়তে, তদা বোধক্রিয়য়া সবিশেষঃ। যদা বোধো নশ্যতি, তদা নষ্টবোধো দ্রব্যমাত্রং নির্বিশেষঃ। তত্রৈবং সতি, বিক্রিয়াত্মকঃ সাবয়বোহনিত্যোহশুদ্ধ ইত্যাদয়ো দোষা ন পরিহর্ত্তুং শক্যন্তে।
যদপি কাণাদানাম্ আত্ম-মনঃসংযোগজো বোধ আত্মনি সমবৈতি, অত আত্মনি রোদ্ধত্বম্, নতু বিক্রিয়াত্মক আত্মা; দ্রব্যমাত্রস্ত ভবতি, ঘট ইব রাগসমবায়ী। অস্মিন্ পক্ষেহপি, অচেতনং দ্রব্যমাত্রং ব্রহ্মেতি “বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম”, “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম” ইত্যাদ্যাঃ শ্রুতয়ো বাধিতাঃ স্যুঃ। আত্মনো নিরবয়বত্বেন প্রদেশাভাবাৎ নিত্যসংযুক্তত্বাচ্চ মনসঃ মৃত্যুৎপত্তি-নিয়মানুপপত্তিঃ অপরিহার্য্যা স্যাৎ। সংসর্গ- ধর্মিত্বং চাত্মনঃ শ্রুতি-স্মৃতি-ন্যায়বিরুদ্ধং কল্পিতং স্যাৎ। “অসঙ্গো ন হি সজ্জতে”, “অসক্তং সর্ব্বভূৎ” ইতি হি শ্রুতি-স্মৃতী দ্বে; ন্যায়শ্চ,-গুণবদ্ গুণবতা সংসৃজ্যতে, নাতুল্যজাতীয়ম্। অতো নির্গুণং নির্বিশেষং সর্ব্ববিলক্ষণং কৈনচিদপি অতুল্য- জাতীয়েন সংসৃজ্যত ইত্যেতৎ ন্যায়বিরুদ্ধং ভবেৎ। তস্মাৎ নিত্যালুপ্তবিজ্ঞানস্বরূপ- জ্যোতিরাত্মা ব্রহ্ম, ইত্যসমর্থঃ সর্ব্ববোধ-বোদ্ধম্বে আত্মনঃ সিধ্যতি, নান্যথা। তস্মাৎ “প্রতিবোধ-বিদিতং মতম্” ইতি যথাব্যাখ্যাতএবার্থোহস্মাভিঃ।
যৎ পুনঃ স্বসংবেদ্যতা প্রতিবোধ-বিদিতমিত্যস্য বাক্যস্য অর্থো বর্ণ্যতে। তত্র ভবতি—সোপাধিকত্বে আত্মনো বুদ্ধ্যুপাধিস্বরূপত্বেন ভেদং পরিকল্প্য আত্মনা আত্মানং বেত্তীতি সংব্যবহারঃ। “আত্মন্যেবাত্মানং পশ্যতি,” “স্বয়মেবাত্মনাত্মানং বেথ ত্বং পুরুষোত্তম” ইতি। ন তু নিরুপাধিকস্যাত্মন একত্বে স্বসংবেদ্যতা পর- সংবেদ্যতা বা সম্ভবতি। সংবেদনস্বরূপত্বাৎ সংবেদনান্তরাপেক্ষা চ ন সম্ভবতি, যথা প্রকাশস্য প্রকাশান্তরাপেক্ষায়া ন সম্ভবঃ, তদ্বৎ। বৌদ্ধপক্ষে,—স্বসংবেদ্যতায়ান্তু
ক্ষণভঙ্গুরত্বং নিরাত্মকত্বঞ্চ বিজ্ঞানস্য স্যাৎ। “ন হি বিজ্ঞাতুব্বিজ্ঞাতেব্বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ”, “নিত্যং বিভুং সর্ব্বগতম্”, “স বা এষ মহানজ আত্মা অজরোহমরোহমৃতোহভয়ঃ” ইত্যাদ্যাঃ শ্রুতয়ো বাধ্যেরন্। যৎ পুনঃ ‘প্রতিবোধ’ শব্দেন—নিনিমিত্তো বোধঃ প্রতিবোধো যথা সুপ্তস্থেত্যর্থং পরিকল্পয়ন্তি। সকৃদ্- বিজ্ঞানং প্রতিবোধইত্যপরে। নির্নিমিত্তঃ সনিমিত্তঃ সকৃদ্বা অসকৃদ্বা প্রতিবোধ এব হি সঃ।
অমৃতত্বমমরণভাবং স্বাত্মন্যবস্থানং মোক্ষং হি যস্মাদ্বিন্দতে লভতে যথোক্তাৎ প্রতিবোধাৎ প্রতিবোধ-বিদিতাত্মকাৎ, তস্মাৎ প্রতিবোধ-বিদিতমেব মতমিত্যভি- প্রায়ঃ। বোধস্য হি প্রত্যগাত্মবিষয়ত্বঞ্চ মতমমৃতত্বে’ হেতুঃ। ন হ্যাত্মনোহনাত্ম- ত্বমমৃতত্বং ভবতি। আত্মত্বাদাত্মনোহমৃতত্বং নির্নিমিত্তমেব। এবং মর্ত্যত্বমাত্মনো যদবিদ্যয়া অনাত্মত্ব-প্রতিপত্তিঃ।
কথং পুনর্যথোক্তয়া আত্মবিদ্যয়া অমৃতত্বং বিন্দতে? ইত্যত আহ;—আত্মনা স্বেন স্বরূপেণ বিন্দতে লভতে বীর্য্যং বলং সামর্থ্যম্। ধনসহায়মন্ত্রৌষধিতপোযোগ- কৃতং বীর্য্যং মৃত্যুং ন শক্লোত্যভিভবিতুম্ অনিত্যবস্তুকৃতত্বাৎ; ‘আত্মবিদ্যাকৃতং তু বীর্য্যমাত্মনৈব বিন্দতে, নাদ্যেনেতি, অতোহনন্যসাধনত্বাৎ আত্ম-বিদ্যাবীর্য্যস্য, তদেব বীর্য্যং মৃত্যুং শক্লোত্যভিভবিতুম্। যত এবমাত্ম-বিদ্যাকৃতং বীর্য্যমাত্মনৈব বিন্দতে, অতো বিদ্যয়া আত্মবিষয়য়া বিন্দতেহমৃতম্ অমৃতত্বম্। “নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ” ইত্যাথর্ব্বণে। অতঃ সমর্থো হেতুঃ,—“অমৃতত্বং হি বিন্দতে” ইতি ॥ ১২ ॥ ৪ ॥
বিশেষজ্ঞদিগের নিকট ব্রহ্ম যে বিজ্ঞাত নহে, ইহা পূর্ব্বেই নির্ণীত হইয়াছে। এখন বক্তব্য এই যে, ব্রহ্ম যদি একান্তই অবিজ্ঞাত হন, অর্থাৎ কাহারও নিকটই পরিজ্ঞাত না হন, তাহা হইলে ত সাধারণ লোকে ও ব্রহ্মজ্ঞে কিছুমাত্র বিশেষ বা পার্থক্য থাকে না? আর ‘বিশেষজ্ঞ দিগের তিনি অবিজ্ঞাত,’ এই কথাগুলিও পরস্পর-বিরুদ্ধ; অর্থাৎ, যিনি বিশেষজ্ঞ, তিনি যদি ব্রহ্মকেই না জানেন, তবে আর তাঁহার বিশেষজ্ঞতা কি রহিল? ভাল, সেই ব্রহ্মকে কি উপায়ে সম্যরূপে জানা যাইতে পারে? ইহার উত্তরে বলিতেছেন,—
তিনি প্রতিবোধে বিদিত হন। ‘বোধ’, শব্দে বৌদ্ধ প্রত্যয়, অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিকে বুঝায়; অর্থাৎ সমস্ত বুদ্ধিকৃত্তিই আত্মার বিষয়ীভূত বা আত্ম-প্রকাশ্য হয়; সুতরাং ঘট-পটাদি-বিষয়ক প্রত্যেক বুদ্ধিবৃত্তিতেই সেই আত্মা প্রকাশকরূপে বিদ্যমান আছেন; অতএব, সমস্ত বুদ্ধি- বৃত্তির সাক্ষী ও একমাত্র চৈতন্যরূপী আত্মা বুদ্ধি-বৃত্তির সহিত একীভাবে পরিজ্ঞাত হন, এবং উক্তপ্রকার বোধই সেই পরিজ্ঞানের একমাত্র দ্বার বা উপায়। অতএব বুঝিতে হইবে, যে সময় সর্ববোধের সাক্ষিরূপে আত্মাকে’ জানিতে পারা ‘যায়, সেই সময়ই তদ্বিষয়ে সম্যক্ ‘জ্ঞান উপস্থিত হয়। আত্মার সর্ববোধ-দশিত্ব জানিলেই তাঁহার যে উৎপত্তি ও ধ্বংসরাহিত্য, নিত্য জ্ঞানস্বরূপতা, বিশুদ্ধতা এবং সববভূতে নিবিশেষ ও একরূপে অবস্থিতি, তাহাও প্রমাণিত ( পরিজ্ঞাত) হয়। কারণ, ঘট ও গিরিগুহাদি উপাধিগত আকাশ যেমন আপাততঃ বিভিন্ন বলিয়া প্রতীত্ব হইলেও বিভিন্ন চিহ্ন(লক্ষণ) না থাকায় স্বরূপতঃ একরূপ, তেমনি বিভিন্ন উপাধিগত আত্মাও স্বরূপতঃ একরূপ। শৃতির তাৎপয্য এইরূপ যে, তিনি বিদিতও নহেন, অবিদিতও নহেন—তিনি তদুভয় স্বরূপ হইতে সম্পূণ পৃথক। ফলতঃ এই শ্রুতির এইরূপ অর্থ হইলেই বিশুদ্ধ আত্ম তত্ত্বনিরূপণের উপসংহার সিদ্ধ হইতে পারে। অন্য শক্তিও তাহাকে ‘দৃষ্টির দ্রটা, শ্রবণের শ্রোতা, মননের মননকত্তা এবং বিজ্ঞানের বিজ্ঞাতা’ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন।”
কেহ কেহ ‘প্রতিবোধ বিদিতম্’ কথার এইরূপ অর্থ করেন যে, লোক-ব্যবহারে দৃষ্ট হয়,—‘যাহা দ্বারা বৃক্ষের শাখা স্পন্দিত বা কম্পিত হইতেছে, তাহার নাম বায়ু’; এইরূপে স্পন্দন-ক্রিয়া ‘দ্বারা বায়ুর পরিচয় প্রদান করা হয় বলিয়া, যেমন স্পন্দন-ক্রিয়াই, বায়ুর লক্ষণ হইয়া থাকে, তেমনি আত্মাই বোধ-ক্রিয়ার কর্তা, সুতরাং এই বোধ-ক্রিয়ারূপ লক্ষণ দ্বারা তৎকর্তা আত্মাকেও জানা যাইতে পারে।
অতএব, ‘প্রতিবোধ-বিদিতত্ব’ কথার অর্থ—বোধ বা জ্ঞান-ক্রিয়ারূপ লক্ষণ দ্বারা(ব্রহ্ম) বিদিত হন। এ পক্ষে বুঝা যায় যে, আত্মা কিন্তু বোধ-ক্রিয়া সমুৎপাদনে শক্তিমান্ বা সমর্থ বটে; কিন্তু স্বয়ং বোধস্বরূপ নহে,—জড় পদার্থ। উক্ত ‘বোধ-ক্রিয়া যখন উৎপত্তি- বিনাশশীল, তখন বুঝিতে হইবে, যে সময় ঐ বোধ-ক্রিয়া সমুৎপন্ন হয়, আত্মা তখনই সেই’বোধ-ক্রিয়াবিশিষ্ট হইয়া সবিশেষভাব প্রাপ্ত হন, আর যখন সেই বোধ বিনষ্ট হইয়া যায়, তখন ‘বোধহীন আত্মা একটি জড় দ্রব্যরূপে পর্য্যধসিত হন, এবং পূর্ব্বোক্ত বোধরূপ বিশেষ ধর্মটি না থাকায় নির্বিশেষভাব লাভ করেন। অতএব, এই মতে, আত্মার সবিকারত্ব, সাবয়বত্ব, অনিত্যত্ব ও অবিশুদ্ধি প্রভৃতি যে সকল দোষ উপস্থিত হয়, সে সকলের আর পরিহার করিবার কিছুমাত্র উপায় নাই।
আর যে, কণাদমতাবলম্বীরা বলিয়া থাকেন,-আত্মার সহিত মনের সংযোগ হইবার পর আত্মাতে যে বোধ-শক্তি সমুৎপন্ন হয়, তাহাতেই আত্মার বোদ্ধত্ব ঘটে; কিন্তু আত্মা স্বয়ং বিকারী নহেন। ঘট-দ্রব্যে যেরূপ লৌহিত্য গুণ সমবেত বা সম্বদ্ধ হইয়া থাকে, সেইরূপ আত্মাতেও বোধগুণ সমবেত হয় মাত্র; কিন্তু তাহা দ্বারা আত্মার বিকার ঘটে না ইত্যাদি। এই পক্ষেও ব্রহ্মের অচেতন দ্রব্যরূপতাই প্রমাণিত হয়,-‘চেতনত্ব প্রমাণিত হয় না। তাহার ফলে ব্রহ্ম-স্বরূপ- বোধক ‘ব্রহ্ম বিজ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য বাধিত বা বিরুদ্ধার্থ হইয়া পড়ে। অধিকন্তু আত্মা যখন নিরবয়ব, তখন তাহার আর প্রদেশ বা অংশ থাকা সম্ভব হয় না(সুতরাং মনের সহিত তাহার একদেশের সম্বন্ধও ঘটিতে পারে না)। বিশেষতঃ মনের সহিত তাহার সর্বদাই সম্বন্ধ থাকায় স্মৃতি বা স্মরণ-জ্ঞানের যে পারম্পর্য্য বা পর পর হইবার নিয়ম আছে, সেই নিয়মও কিছুতেই রক্ষা পায় না। শ্রুতি, স্মৃতি ও ন্যায় বা যুক্তি দ্বারা আত্মার যে সংসর্গ-
ধর্ম্মিত্ব বা সঙ্গিত্ব প্রতিষিদ্ধ হইয়াছে, এই পক্ষে আত্মাকে বোধ-বিশিষ্ট বলায় সেই সংসর্গ-ধৰ্ম্মই কল্পিত হইয়া পড়ে। ‘আত্মা অসঙ্গ, অতএব কুত্রাপি সংসক্ত হন না’ এই শ্রুতি, ‘তিনি সর্ব জগৎ ধারণ করিয়া আছেন, কিন্তু জগতে আসক্ত নহেন’ এই স্মৃতি এবং ‘গুণযুক্ত বস্তুই গুণযুক্ত অপর বস্তুর সহিত সম্মিলিত হয়, বিজাতীয় বস্তুদ্বয় পরস্পর মিলিত হয় না ও হইতে পারে না’, এই প্রকার যুক্তি দ্বারাও সবি- শেষ মনের সহিত নির্বিশেষ আত্মার সংসর্গ বা সম্বন্ধ-কল্পনা বিরুদ্ধ হইয়া থাকে।, অতএব, আত্মাকে, সর্ব্ববোধ-সাক্ষী বলিয়া স্বীকার করিলেই তাঁহার নিত্য নির্বিকার, জ্যোতির্ময় জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মভাব সিদ্ধ বা প্রমাণিত হইতে পারে, প্রকারান্তরে ‘হইতে পারে না। অতএব, “প্রতিবোধ-বিদিতং মতম্” কথার আমরা যেরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছি, তাহাই শ্রুতির প্রকৃত অভিপ্রেত অর্থ।
আবার কেহ কেহ যে, ‘প্রতিবোধ’ শব্দে স্বসংবেদ্যতা অর্থ করিয়া থাকেন, সেই পক্ষেও আত্মার সোপাধিকভাব গ্রহণপূর্ব্বক আত্মার সহিত তদুপাধি বুদ্ধ্যাদির প্রভেদ কল্পনা করিয়া ‘আত্মা আত্মাকে জানে’, এইরূপ ভেদ ব্যবহার করা হইয়া থাকে;[ঔপাধিক ভেদ স্বীকার না করিলে, বেদ্য-বেদিতৃভাবই হইতে পারে না] এই ঔপাধিক ভাবেই ‘আত্মা দ্বারা আত্মাকে দর্শন’ করে’ ‘হে পুরুষোত্তম(কৃষ্ণ)! তুমি নিজেই নিজকে জান’ ইত্যাদি ভেদ- ব্যবহার সঙ্গত হইতে পারে; কিন্তু আত্মা যদি ‘উপাধিরহিত এক হয়, তাহা হইলে কখনই তাহার স্বসংবেদ্যতা বা পরসরেদ্যতা, কিছুই সম্ভবপর হয় না; এবং সংবেদনস্বরূপ আত্মার অপর সংবেদন বা জ্ঞানেরও অপেক্ষা বা আবশ্যক হইতে পারে না। দেখা যায়, প্রকাশ- ময় দীপাদি বস্তুগুলি কখনই অপর প্রকাশের অপেক্ষা করে না। আর বৌদ্ধমতানুসারে স্বসংবেদ্যতা স্বীকার করিলেও বিজ্ঞানের ক্ষণভঙ্গুরত্ব(ক্ষণিকত্ব) ও অসত্যতা স্বীকার করিতে হয়। বস্তুতঃ
‘বিজ্ঞাতার বিজ্ঞান কখনই বিলুপ্ত হয় না; কারণ বিজ্ঞান পদার্থটি অবিনাশী’, ‘নিত্য, বিভু ও সর্ব্বগত’, ‘সেই আত্মা মহান, জরা, জন্ম, মরণ ও ভয় রহিত’ ইত্যাদি শ্রুতিসমূহের অর্থও বাধিত বা বিরুদ্ধ হইয়া পড়ে। আর কেহ কেহ সুযুপ্ত ব্যক্তির বোধের ন্যায় নির্নিমিত্ত(অহৈতুক) বোধকে ‘প্রতিবোধ’ শব্দের অর্থ বলিয়া কল্পনা করিয়াছেন। আবার অপরাপরে বলিয়াছেন যে, ‘প্রতিবোধ’ শব্দের অর্থ—সকৃৎ বিজ্ঞান, অর্থাৎ মোক্ষলাভের কারণীভূত জ্ঞান। সে যাহা হউক; বিজ্ঞান’সনিমিত্তই হউক আর নির্নিমিত্তই হউক, এবং একবারই হউক, বা অনেকবারই হউক, ফলতঃ উহা ‘প্রতিবোধ’ ভিন্ন আর কিছুই নহে। *[সুতরাং ঐ কথা লইয়া আর আলোচনা করা অনাবশ্যক]। যেহেতু মুমুক্ষুগণ প্রতিবোধে জায়মান আত্মানুভূতি হইতে অমৃতত্ব, অমরত্ব অর্থাৎ আত্মস্বরূপে অবস্থিতিরূপ মোক্ষ লাভ করেন, অতএব প্রতিবোধে আত্মানুভূতি করাই প্রকৃত মত, অর্থাৎ যথার্থ বিজ্ঞান। অভিপ্রায় এই যে, আত্মা প্রত্যেক বোধেই ব্যাপ্ত রহিয়াছেন, এবং তদ্বিষয়ক জ্ঞানই উক্ত অমৃতত্ব লাভে হেতু; কেননা, আত্মার যে অমৃতত্ব, তাহা আত্মারই স্বরূপ,—আত্মা হইতে পৃথক্ নহে,
৭
সুতরাং আত্মার অমৃতত্ব লাভ ফলতঃ নির্নিমিত্তই হইতেছে। এইরূপ আত্মার মর্ত্যত্বও(মরণশীলত্বও) অবিদ্যা দ্বারা অনাত্মত্ব-লাভ ভিন্ন আর কিছুই নহে।
জিজ্ঞাসা করি, আত্ম-বিষয়ক বিদ্যা দ্বারা যে অমৃতত্ব-লাভ হয়, তাহার প্রণালী কিরূপ? তদুত্তরে বলিতেছেন,, মুমুক্ষুব্যক্তি আত্মার স্বরূপপরিজ্ঞানে বল অর্থাৎ অমৃতত্ব-লাভের অনুকূল সামর্থ্য লাভ করেন; কিন্তু ধনসম্পৎ, মন্ত্র, ওষধি, তপস্যা ও যোগ দ্বারা যে, বীর্য্য(সামর্থ্য) লব্ধ হয়, তাহা কখনই মৃত্যু-ভয় নিবারণ করিতে সমর্থ হয় না; কারণ, ঐরূপ সামর্থ্য অনিত্য বস্তু হইতেই লব্ধ। অভিপ্রায় এই যে, অনিত্য বস্তুসমূহ স্বয়ং মৃত্যুভয়ে কাতর—বিনাশশীল; সুতরাং তৎকৃত সামর্থ্য আর মৃত্যু-ভয় নিবারণ করিবে কিরূপে? পরন্তু, আত্ম-জ্ঞান- লব্ধ সামর্থ্যটি‘সাক্ষাৎ আত্ম-প্রসূত অপর কোনও বাহ্য বস্তুর সাহায্য অপেক্ষা করে না; এই কারণে সেই’ আত্ম-বিদ্যা-সমুৎপাদিত বীর্য্যই মৃত্যুভয়-নিবারণে‘সমর্থ হয়। যেহেতু আত্ম-বিদ্যালব্ধ বীর্য্যই অমৃতত্ব সমুৎপাদনে সমর্থ; অতএব এই আত্ম-বিষয়ক বিদ্যা দ্বারাই প্রকৃত অমৃতত্ব(মোক্ষ) লাভ করা যায়। অথর্ববেদীয়, উপনিষদেও কথিত আছে যে; ‘বলহীন,(আত্ম-বিদ্যালব্ধশক্তিরহিত) পুরুষ এই আত্মাকে লাভ করিতে পারে না।’ অতএব, শ্রুতি-কথিত “অমৃতত্বং হি বিন্দতে” এই হেতুটি উপযুক্তই হইয়াছে ॥১২।৪॥ “
ইহ চেদবেদীদথ সত্যমস্তি ন চেদিহাবেদীন্মহতী বিনষ্টিং।* ভূতেষু ভূতেষু বিচিত্য ধীরাঃ প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি ॥ ১৩ ॥ ৫ ॥
[মনুষ্যঃ] ইহ(অস্মিন্ লোকে) চেৎ(যদি) অবেদীৎ(যথোক্তম্ আত্মানং বিদিতবান্), অথ(তদা তস্য), সত্যম্(সদ্ভাবঃ-পরমার্থতা) অস্তি(ভবতি)। ইহ চেৎ[তৎ ব্রহ্ম] ন অবেদীৎ,[তদা] মহতী বিনষ্টিঃ(বিনাশঃ-জন্ম-মরণাদিপ্রবাহঃ) [ভবতি]।[তস্মাৎ] ধীরাঃ(ধীমন্তঃ) ভূতেষু ভূতেষু(সর্ব্বভূতেষু)[একম্ আত্মতত্ত্বম্] বিচিত্য(বিজ্ঞায় সাক্ষাৎকৃত্য), অস্মাৎ লোকাৎ প্রেত্য(ব্যাবৃত্য) অমৃতাঃ ভবন্তি (ব্রহ্মৈব ভবন্তীতি ভাবঃ) ॥
মনুষ্য যদি ইহ লোকে ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধি করিতে পারে, তাঁহ হইলে তাহার ‘সত্য’ লাভ হইতে পারে; আর যদি ব্রহ্মকে জানিতে না পারে, তবে মহৎ অনিষ্ট হয়। জ্ঞানিগণ প্রত্যেক ভূতে’ এক ব্রহ্মভাব অবগত হইয়া ইহলোক হইতে প্রয়াণের পর অমৃত অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপ প্রাপ্ত হন ॥ ১৩ ॥ ৫ ॥
কষ্টা খলু সুর-নর-তির্য্যক্-প্রেতাদিষু সংসার-দুঃখবহুলেষু প্রাণিনিকায়েষু জন্ম- জরা-মরণ-রোগাদিসংপ্রাপ্তিরজ্ঞানাৎ; অত ইহৈব চেৎ মনুষ্যোহধিকৃতঃ সমর্থ: সন্ যদি অবেদীৎ আত্মানং যথোক্তলক্ষণং বিদিতবান্ যথোক্তেন প্রকারেণ। অথ তদন্তি সত্যম্—মনুষ্যজন্মন্যস্মিন্ অবিনাশোহর্থবত্তা’ বা সদ্ভাবো বা পরমার্থতা বা সত্যং বিদ্যতে। ন চেদিহাবেদীদিতি। ন চেদিহ জীবংশ্চেৎ অধিকৃতঃ অবেদীৎ—ন বিদিতবান, তদা মহতী দীর্ঘা অনন্তা বিনষ্টিবিনাশনং জন্মজরামরণাদি-প্রবন্ধা- বিচ্ছেদ লক্ষণা সংসারগতিঃ। তস্মাদেবং গুণ-দোষৌ বিজানন্তো ব্রাহ্মণাঃ ভূতেষু ভূতেষু সর্ব্বভূতেষু স্থাবরেষু চরেষু চ একমাত্মতত্ত্বং ব্রহ্ম বিচিত্য বিজ্ঞায় সাক্ষাৎ কৃত্য ধীরাঃ ধীমন্তঃ প্রেত্য ব্যাবৃত্য মমাহংভাবলক্ষণাৎ অবিদ্যারূপাৎ অস্মাৎ লোকাৎ উপরম্য সর্ব্বাত্মৈকত্বভাবম্ অদ্বৈতম্ আপন্নাঃ সন্তঃ অমৃতা ভবন্তি ব্রহ্মৈব, ভবন্তীত্যর্থঃ। “স যো হ বৈ তৎ পরং ব্রহ্ম বেদ, ব্রহ্মৈব ভবতি” ইতি শ্রুতেঃ ॥ ১৩ ॥ ৫ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শ্রীমচ্ছঙ্করভগবপাদকৃতৌ।
কেনোপনিষৎপদভাষ্যে দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ ॥ ২ ॥
এই সংসারে জীবগণ অজ্ঞানবশতঃ সুর, নর, পশু, পক্ষী ও প্রেত- প্রভৃতি দুঃখ-প্রচুর প্রাণিদেহ ধারণপূর্ব্বক কষ্টকর জন্ম, জরা, মরণ ও রোগাদি অবস্থা প্রাপ্ত হয়। অতএব, অধিকারী মনুষ্য যদি শক্তিমান্ হইয়া পূর্ব্বোক্ত আত্মাকে উক্ত প্রকারে যথাযথভাবে জানিতে পারে, তাহা হইলে এই মনুষ্যজন্মেই তাহার সত্য লাভ হয়। এখানে ‘সত্য’ অর্থে—অবিনাশ(মৃত্যু-অতিক্রম), অথবা অর্থবত্তা(জীবনের সফলতা), কিংবা সম্ভাব(যথার্থ সত্যতা), অথবা পরমার্থতা বুঝিতে হইবে। আর মনুষ্য অধিকারী হইয়াও’যদি জীবদবস্থায় আত্মাকে জানিতে না পারে, তাহা হইলে তাহার অত্যন্ত দীর্ঘকালব্যাপী বিনাশ, অর্থাৎ জন্ম-জরা-মরণার্দি-প্রবাহময় সংসার-প্রাপ্তি হইয়া থাকে। এই কারণেই উক্ত প্রকার গুণ ও দোষে অভিজ্ঞ, ব্রহ্মনিষ্ঠ সুধীগণ সর্ব্বভূতে একমাত্র ব্রহ্মসত্তা; সাক্ষাৎকার করিয়া ‘আমি আমার’ ভাবপূর্ণ অবিদ্যাময় ইহলোক হইতে প্রয়াণ করেন। অনন্তর সেই আত্মৈকত্ব-দর্শনের ফলে অদ্বৈত ও আত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া অমৃত হন, অর্থাৎ ব্রহ্মই হন। সেই যে ব্যক্তি পরব্রহ্মকে জানে, সে নিজেও ব্রহ্মই হইয়া পড়ে’ এই শ্রুতিই কথিত বিষয়ে প্রমাণ ॥ ১৩॥৫॥
ইতি কেনোপনিষদ্-ভাষ্যানুবাদে দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত।
য়ঃ খণ্ডঃ।
ব্রহ্ম হ দেবেভ্যো বিজিগ্যে, তস্য হ ব্রহ্মণো বিজয়ে দেবা অমহীয়ন্ত। ত ঐক্ষন্তাস্মাকমেবায়ং বিজয়োহস্মাকমেবায়ং মহিমেতি ॥ ১৪ ॥০১॥
ব্রহ্ম হ(কিল) দেবেভ্যঃ(দেবহিতার্থম্) বিজিগ্যে(জয়ং লব্ধবৎ অর্থাৎ দেবানাম্ অনুরাণাং চ সংগ্রামে জগদরাতীন্ ঈশ্বরসেতুভেত্তুন্ অসুরান্ জিত্বা দেবেভ্যো জয়ং তৎফলং চ প্রায়চ্ছৎ)। তস্য ব্রহ্মণঃ হ বিজয়ে দেবাঃ অমুহীয়স্তু (মহিমানং প্রাপ্তবন্তঃ)। তে(দেবাঃ)[তৎ অজানন্তঃ] ঐক্ষন্ত(ঈক্ষিতবন্তঃ—) অস্মাকম্ এব অয়ং বিজয়ঃ, অস্মাকম্ এব অয়ং মহিমা চ ইতি॥
ব্রহ্ম একদা ঐশ্বরিক-নিয়ম-লঙ্ঘনকারী অসুরগণকে দেবহিতার্থে পরাজিত করেন; সেই ব্রহ্মকৃত জয়কেই দেবগণ(নিজেদের জয় মনে করিয়া) গৌরব বোধ করিয়াছিলেন, ‘তাঁহারা মনে করিয়াছিলেন, এই বিজয় এবং মহিমা আমাদেরই,—অন্যের নহে ॥ ১৪ ॥ ১ ॥]
ব্রহ্ম হ দেবেভ্যো বিজিগ্যে। “অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাম্” ইত্যাদিশ্রবণাৎ স্বদস্তি, তদ্বিজ্ঞাতং, প্রমাণৈঃ, যন্নাস্তি, তদবিজ্ঞাতং শশবিষাণকল্প- মত্যন্তমেবাসৎ দৃষ্টম্। তথেদং ব্রহ্ম অবিজ্ঞাতত্বাৎ অসদেবেতি মন্দবুদ্ধীনাং ব্যামোহে। মাভূদিতি, তদর্থেয়মাখ্যায়িকা আরভ্যতে। তদেব হি ব্রহ্ম সর্ব্বপ্রকারেণ প্রশান্ত, দেবানামপি পরোদেবঃ; ঈশ্বরাণামপি ঈশ্বরো দুর্বিজ্ঞেয়ঃ, দেবানাৎ জয়হেতুঃ অসুরাণাং পরাজয়হেতুঃ; তৎ কথং নাস্তীতি, এতস্য অর্থস্য অনুকূলানি হ্যত্তরাণি বচাংসি দৃশ্যন্তে। অথবা ব্রহ্ম-বিদ্যায়াঃ স্তুতয়ে। কথম্? ব্রহ্ম-বিজ্ঞানাৎ হি অগ্ন্যা-
দয়ো দেবানাং শ্রেষ্ঠত্বং জন্মুঃ, ততোহপি অতিতরামিন্দ্র ইতি। অথবা দুর্বিজ্ঞেয়ং’ ব্রহ্ম, ইত্যেতৎ প্রদর্শ্যতে;—যেন অগ্ন্যাদয়োহতিতেজসোহপি ক্লেশেনৈব ব্রহ্ম বিদিতবন্তঃ, তথেন্দ্রো দেবানামীশ্বরোহপি সন্ ইতি বক্ষ্যমাণোপনিষদ্বিধিপরং বা সর্ব্বং ব্রহ্মবিদ্যাব্যতিরেকেণ, প্রাণিনাং কর্তৃত্বভোক্তৃত্বাদ্যভিমানো মিথ্যা, ইত্যেতদ্দর্শনার্থং বা আখ্যায়িকা। যথা দেবানাং জয়াদ্যভিমানস্তদ্বদিতি।
ব্রহ্ম যথোক্তলক্ষণং পরং হ কিল দেবেভ্যোহর্থায়, বিজিগ্যে জয়ং লব্ধবৎ, দেবানামসুরাণাঞ্চ সংগ্রামেহসুরান্ জিত্বা জগদরাতীন ঈশ্বরসেতুভেত্তুন্ দেবেভ্যো জয়ং তৎফলং চ প্রাযচ্ছৎ জগতঃ স্থেন্নে। তস্য হ কিল ব্রহ্মণো বিজয়ে দেবাঃ অগ্ন্যা- দয়ঃ অমহীয়ন্ত-মহিমানং প্রাপ্তবন্তঃ, তদা আত্ম-সংস্থস্য প্রত্যগাত্মন ঈশ্বরস্য সর্বজ্ঞস্য সর্ব্বক্রিয়াফল সংযোজয়িতুঃ প্রাণিনাং সর্বশক্তেঃ জগতঃ স্থিতিং চিকীর্ষোঃ অয়ং জয়ো মহিমা চ, ইত্যজানন্তস্তে দেবা ঐক্ষন্ত-ঈক্ষিতবন্তঃ অগ্ন্যাদিস্বরূপ- পরিচ্ছিন্নাত্মকৃতঃ অস্মাকমেবায়ং বিজয়ঃ অস্মাকমেবায়ং মহিমা অগ্নিবাযিন্দ্রত্বাদি- লক্ষণো জয়ফলভূতোহস্মাভিরনুভূয়তে, নাস্মৎপ্রত্যগাত্মভূতেশ্বরকৃতঃ, ইত্যেবং মিথ্যাভিমানলক্ষণবতাম্ ॥১৪॥১৷৷
পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে, ব্রহ্ম বস্তু বিজ্ঞদিগের অবিজ্ঞাত, আর অজ্ঞদিগের নিকট ‘বিজ্ঞাত বলিয়া প্রতিভাত হয়।[এখন কথা হইতেছে এই যে,] সাধারণতঃ দেখা যায়, যে বস্তু’ আছে, অর্থাৎ’ সত্তাবান্, তাহাই প্রমাণের দ্বারা বিজ্ঞাত হয়; আর যাহা নাই— শশ-বিষাণের ন্যায় একেবারেই অসৎ, তাহাই অবিজ্ঞাত থাকে। এতদনুসারে মন্দমতি লোকের মনে শঙ্কা হইতে পারে যে, ব্রহ্মও যখন অবিজ্ঞাত, তখন নিশ্চয়ই তিনিও শশ-বিষাণেরই মত অসৎ— অবস্তু। মন্দমতিগণের উক্ত আশঙ্কা(ভ্রম) অপনয়নার্থ বক্ষ্যমাণ আখ্যায়িকা আরব্ধ হইতেছে,—
দুজ্ঞেয় সেই ব্রহ্মই যখন সর্ব্ব জগতের সর্ব্বতোভাবে শাসনকর্ত্তা, দেবগণেরও পরদেবতা, অপরাপর ঈশ্বরদিগেরও(শক্তিশালিগণেরও) ঈশ্বর(প্রভু), দেবগণের বিজয়প্রদ এবং অসুরগণের পরাজয়-
কারী, তখন তিনি নাই কি প্রকারে?—অবশ্যই আছেন। এই খণ্ডের পরবর্তী বাক্যসমূহেও এই তত্ত্বেরই বর্ণনা পরিদৃষ্ট হইতেছে।
অথবা ব্রহ্মবিদ্যারই স্তুতির জন্য ‘এই আখ্যায়িকা আরব্ধ হইতেছে; কেননা, ব্রহ্ম-জ্ঞানের বলেই ইন্দ্রাদি দেবগণ অপরাপর দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছিলেন, এবং ঐ ব্রহ্মবিদ্যার ফলেই দেবরাজ ইন্দ্র অগ্নি প্রভৃতি দেবতা অপেক্ষাও সমধিক শ্রেষ্ঠতা লাভ করিয়াছিলেন।
অথবা এই আখ্যায়িকায় ব্রহ্মের দুর্বিবজ্ঞেয়তা প্রদর্শিত হইতেছে। কারণ, অতিতেজা অগ্নিপ্রভৃতি দেবতারাও অতি ক্লেশেই ব্রহ্মকে জানিয়াছিলেন! অধিক কি, ইন্দ্র দেবপতি হইয়াও ক্লেশেই ব্রহ্ম-তত্ত্ব বুঝিয়াছিলেন। অতএব, উপনিষৎ-পদবাচ্য-ব্রহ্মবিদ্যা-বিধানার্থ, কিংবা ব্রহ্মবিদ্যাই একমাত্র সত্য, তদ্ভিন্ন প্রাণিগণের যে, কর্তৃত্বাদি অভিমান আছে, তৎসমস্তই মিথ্যা, এই অভিপ্রায় জ্ঞাপনার্থ এই আখ্যায়িকা আরব্ধ হইতেছে।
পূর্ব্বোক্ত-লক্ষণান্বিত পরব্রহ্ম একসময় দেবগণের নিমিত্ত বিজয় লাভ করিয়াছিলেন, অর্থাৎ দেবাসুর-সংগ্রামে জগতের পরম শত্রু এবং ঐশ্বরিক নিয়মের উল্লঙ্ঘনকারী অসুরগণকে জগতের রক্ষার জন্য পরাজিত করিয়া, দেবগণকে, জয় ও জয়ফল প্রদান করিয়াছিলেন। প্রকৃত পক্ষে এই বিজয় যে আত্ম-গত(অন্তর্যামী), সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তি, প্রাণিগণের সর্বক্রিয়ার ফলপ্রদ, এবং জগতের স্থিতি-চিকীর্ষু পরমেশ্বরেরই বিজয়, তাহা না জানিয়া অগ্নি প্রভৃতি দেবগণ মহিমা(গর্ব) অনুভব করিতেছিলেন। অগ্নি প্রভৃতি পরিচ্ছিন্নরূপধারী সেই দেবগণ বুঝিয়াছিলেন,-আমাদেরই এই মহিমা অর্থাৎ বিজয়-গৌরব; এই কারণেই আমরা অগ্নিত্ব, বায়ুত্ব ও ইন্দ্রত্বাদি রূপ বিজয়-ফল অনুভব করিতেছি; কিন্তু আমাদের অন্তরস্থ
পরমেশ্বরকৃত এই বিজয় নহে। তাঁহারা এইরূপ মিথ্যা অভিমান বোধ করিতেছিলেন ॥ ১৪ ॥ ১ ॥
তটৈষাং বিজজ্ঞে তেভ্যো হ প্রাদুর্বভূব। তন্ন ব্যজানত কিমিদং যক্ষমিতি ॥ ১৫ ॥ ২ ॥
[ব্রহ্ম] হ এষাম্(দেবানাম্) তৎ(জয়-মহিম-বিষয়ে মিথ্যেক্ষণম্) বিজজ্ঞৌ (বিজ্ঞাতবৎ)। তেভ্যঃ(দেবেভ্যঃ) হ[ব্রহ্ম। প্রাদুর্বভূব। তৎ(প্রাদুর্ভূতং ব্রহ্ম দৃষ্টা অপি) ইদং যক্ষম্(পূজ্যং মহদ্ভূতম্) কিম্ ইতি[তে] ন ব্যজানত(ন বিজ্ঞাতবন্তঃ) ॥ অনুবাদ।
ব্রহ্ম দেবগণের সেই মিথ্যাজ্ঞান বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তিনি দেবগণের নিকট আবির্ভূত হইলেন, কিন্তু দেবগণ ঐ আবির্ভূত রূপ দর্শন করিয়াও এই মহৎ পুজনীয় মূর্ত্তিটি যে কি, তাহা বুঝিতে পারিলেন না ॥ ১৫ ॥ ২ ॥
এবং মিথ্যাভিমানেক্ষণবতাং তৎ হ কিলৈষাং মিথ্যেক্ষণং বিজজ্ঞৌ বিজ্ঞাতবদ ব্রহ্ম; সর্ব্বেক্ষিতৃ হি তৎ সর্ব্বভূত-করণপ্রয়োক্তৃত্বাৎ দেবানাঞ্চ মিথ্যাজ্ঞানমুপলভ্য মৈবাসুরবদ্দেবা মিথ্যাভিমানাৎ পরাভবেয়ুরিতি তদনুকম্পয়া দেবান্ মিথ্যাভিমানা- পনোদনেন অনুগৃহ্লীয়াম্, ইতি তেভ্যো দেবেভ্যো হ কিল অর্থায় প্রাদুর্বভূব— স্বযোগমাহাত্ম্যনিৰ্ম্মিতেন মত্যদ্ভুতেন’ বিস্মাপনীয়েন রূপেণ দেবানামিন্দ্রিয়গোচরে প্রাদুর্বভূব। তৎ প্রাদুর্ভূতং ব্রহ্ম ন ব্যজানত—নৈব বিজ্ঞাতবস্তো দেবাঃ,— কিমিদং যক্ষং মহদ্ভূতমিতি ॥ ১৫ ॥ ২ ॥
ব্রহ্ম দেবগণের সেই ভ্রান্ত-চিন্তা জানিতে পারিয়াছিলেন; কারণ, তিনি সর্বভূতের ইন্দ্রিয়-বর্গের পরিচালন করেন বলিয়া সর্বদর্শী। তিনি দেবগণের পূর্ব্বোক্তপ্রকার মিথ্যাজ্ঞান(ভ্রান্তি) বুঝিতে পারিয়া চিন্তা করিলেন যে, দেবগণও অসুরগণেরই মত মিথ্যাভিমানে বিমুগ্ধ না হউক, দেবগণের মিথ্যাভিমান অপনোদন করিয়া তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিব; এইরূপ স্থির করিয়া সেই দেবগণের
হিতার্থ তিনি সেখানে আবির্ভূত হইলেন, অর্থাৎ স্বীয় অদ্ভুত যোগ- প্রভাবে বিরচিত বিস্ময়কর-রূপে দেবগণের দৃষ্টি-গোচরে আবির্ভূত হইলেন। কিন্তু দেবগণ সেই প্রাদুর্ভূত ব্রহ্মরূপটি দেখিয়াও বুঝিতে পারিলেন না, এই মহৎ বিস্ময়কর পূজনীয় রূপটি কি? ১৫ ॥ ২॥
তে(দেবাঃ) অগ্নিম্ অক্রবন্(উক্তবন্তঃ)—হে জাতবেদঃ(সর্ব্বজ্ঞকল্প, ত্বম্) এতৎ(অস্মদগোচরস্থম্) বিজ্ঞানীহি(বিশেষতঃ বুধাস্য) কিম এতৎ যক্ষম্ ইতি।[অগ্নিঃ] তথা(এবম্ অস্ব) ইতি। কৃত্বা তৎ অভ্যদ্রবং, ইত্যুত্তরেণ সম্বন্ধঃ।] ॥
সেই দেবগণ অগ্নিকে বলিয়াছিলেন, হে জাতবেদঃ—অগ্নে! সমীপস্থ এই যক্ষাট কি পদার্থ, তুমি[যাইয়া] তাহা অবগত হও। অগ্নিও তথাস্তু বলিয়া , তাহার দিকে ধাবিত হইলেন] ॥ ১৬ ॥ ৩ ॥
তদভ্যদ্রবৎ, তমভ্যবদৎ কোহসীতি। অগ্নির্ব্বা অহমস্মীত্যব্রবীজ্জাতবেদা বা অহমস্মীতি ॥১৭॥ ৪ ॥
[অগ্নিঃ] তৎ(যক্ষম্) অভ্যদ্রবৎ(প্রতিগতবান্)।[যক্ষম্] তম্(অগ্নিম্) অভ্যবদৎ(প্রত্যভাষত)[ত্বম্] কঃ অসি ইতি? অহম্ অগ্নিঃ(অগ্রং নয়তীতি) বৈ(প্রসিদ্ধঃ) অস্মি ইতি, জাতবেদাঃ(জাতান্ উৎপন্নান্ বেত্তীতি) বৈ(অপি) অহম্ অস্মি ইতি[অগ্নিঃ] অব্রবীৎ ॥
অগ্নিদেব সেই যক্ষসমীপে উপস্থিত হইলেন; যক্ষ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—তুমি কে? অগ্নি বলিলেন—আমি অগ্নি ও জাতবেদা নামে প্রসিদ্ধ ॥ ১৭ ॥ ৪ ॥]
৮
তস্মিংস্তুয়ি কিং বীর্য্যমিতি। অপীদং সর্ব্বং দহেয়ম্, যদিদং পৃথিব্যামিতি ॥ ১৮॥৫ ॥
[ যক্ষম্ অবোচং] তস্মিন্(এবং প্রসিদ্ধগুণ-নামবতি) ত্বয়ি কিং বীর্য্যম্ (শক্তিঃ) অস্তি ইতি?[অগ্নিঃ অব্রবীৎ] পৃথিব্যাম্ ইদম্(স্থাবরাদি) যৎ[অস্তি], ইদং সর্ব্বম্ অপি দহেয়ম্ ইতি ॥
[ যক্ষ অগ্নিকে জিজ্ঞাসা করিলেন] তোমার সামর্থ্য কি প্রকার?[ অগ্নি বলি- লেন] এই পৃথিবীতে যে কিছু পদার্থ আছে, আমি তৎসমস্তই দগ্ধ করিতে পারি ॥ ১৮ ॥ ৫ ॥
তস্মৈ তৃণং নিদধাবেতদ্দহেতি। তদুপপ্রেয়ায়। সর্ব্বজবেন তন্ন শশাক দগ্ধুম্। স তত এব নিববৃতে; নৈতদশকং বিজ্ঞাতুম্, যদেতদ্যক্ষমিতি ॥ ১৯ ॥ ৬ ॥
এতৎ দহ হাত[উক্তা][যক্ষম্] তস্মৈ(তস্য অভিমানবতঃ অগ্নেঃ পুরতঃ) [একম্] তৃণং নিদধৌ(স্থাপিতবৎ)। অগ্নিশ্চ সর্ব্বজবেন(সর্ব্বোৎসাহকৃতেন বেগেন) তৎ(তৃণম্) উপপ্রেয়ায়(তৎসমীপং গতবান্)। তৎ[তু] দগ্ধধ ন শশাক (সমর্থো নাভূৎ)। সঃ(মগ্নিঃ) ততঃ(যক্ষাৎ) এব নিবকৃতে(নিবৃত্তঃ বভূব) [প্রত্যাগতশ্চ দেবান্ অব্রবীৎ—] যৎ এতৎ যক্ষম্, এতৎ বিজ্ঞাতুম্ অহং ন অশকম্(শক্তঃ নাভবম্)॥
“এইটি দগ্ধ কর” বলিয়া ব্রহ্ম সেই অভিমানী অগ্নির সম্মুখে একটি তৃণ স্থাপন করিলেন। অগ্নিও উৎসাহ সহকারে সত্বর তৎসমীপে উপস্থিত হইলেন; কিন্তু তৃণটি দগ্ধ করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন সেখান হইতে ফিরিয়া আসিলেন, এবং দেবগণকে বলিলেন, এই যক্ষ যে কি, তাহা বুঝিতে পারিলাম না ॥১৯৷৬৷৷
তে তদজানন্তো দেবাঃ সান্তর্ভয়াঃ তদ্বিজিজ্ঞাসবঃ অগ্নিম্ অগ্রগামিনং জাতবেদসং সর্ব্বজ্ঞকল্পম্ অব্রুবন্ উক্তবন্তঃ-হে জাতবেদঃ এতৎ অস্মদগোচরস্থং
বক্ষং বিজানীহি বিশেষতো বুধ্যস্ব, ত্বং নস্তেজস্বী, কিমেতৎ যক্ষমিতি। তথাস্তু ইতি তদ্ যক্ষম্ অভি অদ্রবৎ, তৎ প্রতি গতবান্ অগ্নিঃ। তং চ গতবন্তং পিপৃচ্ছিষুং তৎসমীপে অপ্রগল্ভত্বাৎ তৃষ্ণীভূতং তৎ যক্ষম্ অভ্যবদৎ অগ্নিং প্রত্যভাষত- কোহসীতি। এবং ব্রহ্মণা পৃষ্টোহগ্নিঃ অব্রবীৎ--অগ্নিঃ বৈ অগ্নির্নামাহং প্রসিদ্ধঃ, জাতবেদা ইতি চ, নামদ্বয়েন প্রসিদ্ধতয়া আত্মানং শ্লাঘয়ন্। ইত্যেবমুক্তবস্তুং ব্রহ্ম অবোচৎ-তস্মিন্ এবং প্রসিদ্ধগুণনামবতি ত্বয়ি কিং বীর্য্যং সামর্থ্যম্ ইতি? সোহব্রবীৎ-ইদং জগৎ সর্ব্বং দহেয়ং ভস্মীকুর্যাম্-যদিদং স্থাবরাদি পৃথিব্যাম্ ইতি। পৃথিব্যাম্ ইত্যুপ লক্ষণার্থম্; যতঃ অন্তরিক্ষস্থমপি দহ্যত এবাগ্নিনা। তস্মৈ এবমভিমানবতে ব্রহ্ম তৃণং নিদধৌ পুরোহগ্নে: স্থাপিতবৎ। ব্রহ্মণা ‘এতৎ-তৃণমাত্রং মমাগ্রতোদহ-ন চেদসি দগ্ধং সমর্থঃ, মুঞ্চ দগ্ধ ত্বাভিমানং সর্বত্র’, ইত্যুক্তঃ তৎ তৃণমুপপ্রেয়ায় তৃণসমীপং গতবান্ সর্ব্বজবেন সর্ব্বোৎসাহকৃতেন বেগেন, গত্বা তৎ ন শশাক নাশকৎ দগ্ধুম্। স জাতবেদীঃ তৃণং দগ্ধ মশক্তো ব্রীড়িতো হতপ্রতিজ্ঞঃ তত এব যক্ষাদেৰ তৃষ্ণীং দেবান্ প্রতি নিববৃতে নিবৃত্তঃ প্রতিগতবান্ নৈতৎ যক্ষম্ অশকং শক্তবান্ অহং বিজ্ঞাতুং বিশেষতঃ-যদেতদ্ যক্ষমিতি ৷ ১৬, ৩-১৯, ৬৷৷ ভাষ্যানুবাদ।
সেই দেবগণ দৃশ্যমান যক্ষের তত্ত্ব বুঝিতে না পারিয়া মনে মনে ভীত হইয়া, তাঁহার তত্ত্ব জানিবার ইচ্ছায় সর্বজ্ঞপ্রায় এবং সকলের অগ্রগামী অগ্নিকে বলিলেন-হে জাতবেদঃ! আমাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র তেজস্বী; অতএব আমাদের সন্নিহিত এই যক্ষটি কে, তাহা তুমি বিশেষ করি। অবগত হও, অর্থাৎ তুমিই উহার সংবাদ জানিয়া আইস। অগ্নি ‘তথাস্ত’ বলিয়া সেই যক্ষের অভিমুখে গমন করিলেন। অগ্নি তৎসমীপে উপস্থিত হইয়া, অনুদ্ধতভাবে তৃষ্ণীভূত হইয়া রহিলেন। তখন সেই যক্ষ অগ্নির পরিচয় জিজ্ঞাসু হইয়া বলিলেন- তুমি কে? অগ্নিদেব এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া, দুইটি প্রসিদ্ধ নামে আত্মশ্লাঘা-খ্যাপন-পুরঃসর বলিলেন-আমি জাতবেদাঃ ও অগ্নি নামে প্রসিদ্ধ। ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করিলেন-তুমি ত এবংবিধ গুণ ও নামান্বিত; তোমার বীর্য্য অর্থাৎ সামর্থ্য কিরূপ? অগ্নি বলিলেন-
এই পৃথিবীতে স্থাবরাদি যে কিছু পদার্থ আছে, সেই সমস্তকে আমি ভস্মীভূত করিতে পারি।[যেহেতু অগ্নি দ্বারা অন্তরিক্ষস্থ বস্তু-নিচয়ও ভস্মীভূত হয়, অতএব পৃথিবী পদটি অন্তরিক্ষেরও উপলক্ষণ বা বোধক বুঝিতে হইবে]। ব্রহ্ম তাদৃশ অভিমানী অগ্নির সম্মুখে একটি মাত্র তৃণ স্থাপন-পূর্ব্বক বলিলেন,-হে অগ্নে! তুমি আমার সম্মুখে এই তৃণটি দগ্ধ কর। যদি এই তৃণ-দাহে’ সমর্থ না হও, তবে নিজের দগ্ধত্বাভিমান(আমি সমস্তই দগ্ধ করিতে পারি, এইরূপ গর্ব) পরিত্যাগ কর। অগ্নিদেব ব্রহ্মের আদেশানুসারে সম্পূর্ণ বেগ ও উৎসাহ সহকারে সেই তৃণসমীপে উপস্থিত হইলেন; কিন্তু তিনি সেই তৃণটিকে দগ্ধ করিতে সমর্থ হইলেন না। জাতবেদা অগ্নি সেই তৃণ-দাহে অশক্ত হইলেন, এবং লজ্জিত ও প্রতিজ্ঞা-ভ্রষ্ট হইয়া মৌনিভাবে যক্ষের নিকট হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন‘। প্রতিনিবৃত্ত হইয়া দেবগণকে বলিলেন,-এই যক্ষ, ‘যে কি পদার্থ, তাহা আমি বিশেষভাবে অবগত হইতে পারিলাম না। ১৬, ৩-১৯, ৬॥
অথ বায়ুমব্রুবন্ বায়বেতদ্ বিজানীহি—কিমেতদ্ যক্ষ- মিতি। তথেতি ॥ ২০ ॥ ৭ ॥
অথ(অনন্তরম্)[দেবীঃ] বায়ুম্ অব্রবন্-হে বায়ো, কিম্ এতৎ যক্ষম্, ইতি এতৎ বিজানীহি। তথা(এবমস্তু) ইতি[বায়ুঃ অব্রবীদিতি শেষঃ]॥
অনন্তর, দেবগণ বায়ুকে বলিলেন,—হে বায়ো! তুমি জানিয়া আইস—এই যক্ষটি কে? বায়ু বলিলেন—তাহাই হউক ॥ ২০ ॥ ৭ ॥
তদভ্যদ্রবৎ; তমভ্যবদৎ—কোহসীতি। বায়ুর্বা অহমস্মী- ত্যব্রবীন্মাতরিশ্বা বা অহমস্মীতি ॥ ২১ ॥ ৮ ॥
[বায়ুশ্চ] তৎ(যক্ষম্) অভি(লক্ষ্যীকৃত্য) অদ্রবৎ।[যক্ষং চ] তম্(বায়ুম্)
অভ্যবদৎ(পপ্রচ্ছ)—[ত্বম্] কঃ অসি। বায়ুঃ বৈ অহম্ অস্মি ইতি, মাতরিশ্বা বৈ অহম্ অস্মি ইতি চ[বায়ুঃ] অব্রবীৎ॥
বায়ু সেই যক্ষের নিকট উপস্থিত হইলেন। যক্ষ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—তুমি কে? বায়ু বলিলেন—আমি বায়ু, আমি মাতরিশ্বা ॥২১৷৷৮৷৷
তস্মিংস্তুয়ি কিং, বীর্য্যমিতি? অপীদং সর্ব্বমাদদীয়ম্ * — যদিদং পৃথিব্যামিতি ॥ ২২ ॥ ৯ ॥
তস্মিন্ ত্বয়ি কিং বীর্য্যম্ ইতি.[ যক্ষম্ অবোচৎ]।[ বায়ুঃ অন্নবীৎ]-ইদং সর্ব্বম্ অপি আদদীয়ম্(আদদীয় গৃহ্নীয়াম্)-যৎ ইদং পৃথিব্যাম্ ইতি ॥
সেই যক্ষ বায়ুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এতাদৃশ তোমার বীর্য্য বা ক্ষমতা কি প্রকার? বায়ু বলিলেন, এই পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে, আমি তৎসমস্তই আদানু অর্থাৎ গ্রহণ করিতে পারি ॥ ২২ ॥ ৯ ॥
তস্মৈ তৃণং নিদধাবেতদাদৎস্বেতি। তদুপপ্রেয়ায়। সর্ব্বজবেন তন্ন শশাকাদাতুম্। স তত এব নিববৃতে; নৈতদশকং বিজ্ঞাতুং যদেতদ্ যক্ষমিতি ॥ ২৩॥ ১০ ॥
[ যক্ষং ৮। তস্মৈ(বায়বে) তৃণং নিদধৌ এতৎ আদৎস্ব ইতি।[বায়ুঃ] তৎ(তৃণম্) উপপ্রেয়ায়। সর্ব্বজবেন তৎ ন শশাক আদাতুম্। সঃ(বায়ুঃ) ততঃ(যক্ষাৎ) এব নিববৃতে, ন এতৎ অশকং বিজ্ঞাতুং যৎ এতৎ যক্ষম্ ইতি ॥
যক্ষ তাদৃশ শক্তি-গব্বিত বায়ুর নিকট একটি তৃণ রক্ষা করিয়া বলিলেন— তুমি ইহা গ্রহণ কর। বায়ু সত্বর সেখানে উপস্থিত হইয়া সম্পূর্ণ বল ও উৎসাহ প্রয়োগেও তাহা গ্রহণ করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন দেবগণের নিকট
সর্ব্বমাদদীয় ইতি বা পাঠঃ। ১
‘প্রত্যাবৃত্ত হইয়য়া বলিলেন—এই যক্ষ যে কে, তাহা আমি জানিতে সমর্থ হইলাম না ॥ ২৩ ॥ ১০ ॥
অথ বায়ুমিতি। অথ অনন্তরং বায়ুমব্রুবন্—হে বায়ো এতদ্বিজানীহি ইত্যাদি- সমানার্থং পূর্ব্বেণ। বানাৎ—গমনাৎ, গন্ধনাদ্বা বায়ুঃ। মাতরি অন্তরিক্ষে শ্বয়তীতি মাতরিশ্বা। ইদং সর্ব্বমপি আদদীয় গৃহ্নীয়াম। যদিদং পৃথিব্যামিত্যাদি সমান- মেব ॥ ২০, ৭ ॥ ২১, ৮ ॥ ২২, ৯ ॥ ২৩, ৯০ ॥
অনন্তর, দেবগণ বায়ুকে বলিলেন,-হে বায়ো! তুমি এই যক্ষকে জানিয়া আইস, ইত্যাদি আর সমস্তই পূর্ব্বশ্রুতির অর্থের অনুরূপ। ‘বা’ ধাতুর অর্থ গমন অথবা গন্ধগ্রহণ; বায়ু সেই কার্য্য করে বলিয়া ‘বায়ু’ এবং অন্তরিক্ষে বিচরণ করে বলিয়া ‘মাতরিশ্বা’ সংজ্ঞায় ‘অভিহিত হয়। এই পৃথিবীতে যে কিছু পদার্থ আছে, তৎসমস্তই আমি গ্রহণ করিতে পারি ইত্যাদি অন্যান্য অংশের অর্থ পূর্ব্বের মত ॥ ২০,৭—২৩, ১০ ॥
অথেন্দ্রমব্রুবন্, মঘবন্নেতদ্ বিজানীহি—কিমেতদ্ যক্ষ- মিতি। তথেতি তদভ্যদ্রবৎ। তস্মাৎ তিরোদধে ॥ ২৪ ॥ ১১ ॥’
অথ(অনন্তরম্)[দেবাঃ] ইন্দ্রম্ অব্রুবন্—হে মঘবন্(পুজাশালিন্ ইন্দ্র)! কিম এতৎ যক্ষম্ ইতি, এতৎ বিজানীহি।[ইন্দ্রঃ চ] তথা(এবম্ অস্তু) ইতি [উক্তা] তৎ(যক্ষম) অভ্যদ্রবং।। ব্রহ্ম তু। তস্মাৎ(সমীপবর্ত্তিনঃ ইন্দ্রাৎ) তিরোদধে(অন্তর্হিতম্ অভূৎ)।॥
অনন্তর, দেবগণ ইন্দ্রকে বলিলেন,—হে পূজ্য ইন্দ্র! এই যক্ষটি কে, তাহা তুমি জানিয়া আইস। ইন্দ্রও ‘তথাস্তু’ বলিয়া যক্ষাভিমুখে গমন করিলেন, কিন্তু যক্ষ ইন্দ্রের নিকট হইতে অন্তর্হিত হইলেন ॥ ২৪ ॥ ১১।
ইতি তৃতীয়ঃ খণ্ডঃ।
ব্যাখ্যা।
সঃ(ইন্দ্রঃ) তস্মিন্ এব আকাশে স্ত্রিয়ং(স্ত্রীরূপাং) বহুশোভমানাং হৈমবতীং (হেমকৃতাভরণবতীম্ ইব; হিমবতঃ তনয়াং বা) উমাম্(দুর্গারূপেণ প্রাদুর্ভূতাম্) [ যক্ষ-বৃত্তান্ত-জ্ঞাপনসমর্থাং মত্বা] আজগাম, তাং হ(স্ফুটম্) উবাচ কিম্ এতৎ যক্ষম্ ইতি ॥
সেই অন্তরিক্ষে বহুবিধ শোভাসম্পন্ন, এবং যেন হেমাভরণে ভূষিত, অথবা হিমালয়-দুহিতা উমাকে স্ত্রীরূপে আবির্ভূত দেখিয়া যক্ষের বৃত্তান্ত জ্ঞাপনে সমর্থ মনে করিয়া, দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহার সমীপে গমন করিলেন, এবং তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই যক্ষটী কে? ১৫ ॥ ১২ ॥]
ইতি তৃতীয়ঃ খণ্ডঃ।
অথেন্দ্রমিতি। অথেন্দ্রমব্রুবন্-মঘবন্ এতদ্বিজানীহি ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ। ইন্দ্রঃ পরমেশ্বরো মঘবন্, বলবত্ত্বাৎ, তথেতি তদভ্যদ্রবৎ, তস্মাৎ ইন্দ্রাৎ আত্ম-সনীপং গতাৎ তদ্ ব্রহ্ম তিরোদধে তিরোভূতম্, ইন্দ্রস্য ইন্দ্রত্বাভিমানোহতিতরাং নিরাকর্তব্য ইতি, অতঃ সংবাদমাত্রমপি নাদাৎ ব্রহ্ম ইন্দ্রায়। তদ্ যক্ষং যস্মিন্ আকাশে আকাশপ্রদেশে আত্মানং দর্শয়িত্বা তিরোভূতম্, ইন্দ্রশ্চ ব্রহ্মণস্তিরোধানকালে যস্মিন্নাকাশে আসীৎ, স ইন্দ্রঃ তস্মিন্ এব আকাশে তস্থৌ, কিং তদ্ যক্ষমিতিধ্যায়ন্, ন নিববৃতেহগ্ন্যাদিবৎ, তস্য ইন্দ্রস্য যক্ষে ভক্তিং বুদ্ধা বিদ্যা উমারূপিণী প্রাদুরভূৎ স্ত্রীরূপা। স ইন্দ্রঃ তাম্ উমাং বহুশোভমানাং সর্ব্বেষাং হি শোভমানানাং শোভনতমাং বিদ্যাম্, তদা বহু- শোভমানামিতি বিশেষণমুপপন্নং ভবতি। হৈমবর্তীং হেমকৃতাভরণবতীমিব বহুশোভমানামিত্যর্থঃ। অথবা উমৈব হিমবতো দুহিতা হৈমবতী নিত্যমেব সর্বজ্ঞেন ঈশ্বরেণ সহ বর্ত্তত ইতি জ্ঞাতুং সমর্থেতি কৃত্বা তামুপজগাম। ইন্দ্রঃ
তাং হ উমাং কিল উবাচ পপ্রচ্ছ-ক্রহি, কিমেতদ্দর্শয়িত্বা তিরোভূতং যক্ষমিতি ॥২৪।১১৷২৫।১২॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবৎপাদকৃতৌ কেনোপনিষৎপদভাষ্যে তৃতীয়ঃ খণ্ডঃ ॥৩॥
অনন্তর দেবগণ ইন্দ্রকে বলিলেন-হে মঘবন্! ইহা জানিয়া আইস; ইত্যাদি পূর্ববৎ। ‘ইন্দ্র’ অর্থ পরমেশ্বর, এবং ‘মঘবন্’ অর্থ বলবান্। মঘবা ইন্দ্র ‘তথাস্তু’ বলিয়া যক্ষাভিমুখে ধাবিত হইলেন। ইন্দ্রের ঈশ্বরত্বাভিমান সম্পূর্ণরূপে অপনীত করিবার অভিপ্রায়ে ব্রহ্ম ইন্দ্রের সহিত কথা পর্য্যন্ত বলিলেন না। সেই যক্ষর্ষে আকাশ-প্রদেশে আপনাকে প্রকটিত করিয়া অন্তর্হিত হইয়াছিলেন, এবং যক্ষরূপী ব্রহ্মের অন্তর্ধানকালে ইন্দ্র যে আকাশ-প্রদেশে অবস্থিত ছিলেন, ইন্দ্র তখনও সেই আকাশ-প্রদেশেই অবস্থিত রহিলেন এবং সেই যক্ষটি কে, ইহা ধ্যান করিতে লাগিলেন, কিন্তু অগ্নি প্রভৃতির ন্যায় সে স্থান হইতে নিবৃত্ত হইলেন না। যক্ষের প্রতি ইন্দ্রের তাদৃশ ভক্তি দর্শনে উমারূপা তত্ত্ববিদ্যা স্ত্রীরূপে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। সর্বাধিক শোভা- সম্পন্না এই উমা আমার প্রার্থিত বিষয়ের উত্তর দানে সমর্থ হইবেন, মনে করিয়া ইন্দ্র তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন,-বল, এই যে দেখা দিয়া অন্তর্হিত হইল, সেই যক্ষ কে? এখানে উমা অর্থ বিদ্যা; হৈমবতী অর্থ যেন হেমাভরণ- সম্পন্না, অথবা সর্বজ্ঞ মহাদেবের সহিত নিত্যযুক্তা, হিমালয়সুতা- ভগবতী; উভয় অর্থেই ‘বহু-শোভমানা’ ও উত্তরদানে সামর্থ্য সুসঙ্গত হয়.॥ ২৪, ১১। ২৫, ১২ ॥
ইতি কেনোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদের তৃতীয় খণ্ড।
dgyurmed-pa’i-mchog-lugs-ba
সা ব্রহ্মেতি হোবাচ *। ব্রহ্মণো বা এতদ্বিজয়ে মহীয়ধ্ব- মিতি, ততো হৈব বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি ॥ ২৬। ১॥
সা(হৈমবতী) হ উবাচ—[এতৎ] ব্রহ্ম ইতি। ব্রহ্মণঃ বৈ বিজয়ে যূয়ম্ এতৎ(এবম্) মহীয়ধ্বম্(মহিমানং প্রাপ্নুথ) ইতি ততঃ(তদ্বাক্যাৎ) হ এব [এতৎ] ব্রহ্ম ইতি বিদাঞ্চকার ইতি শেষঃ ॥
সেই উমা ইন্দ্রকে বলিলেন—ইনি ব্রহ্ম; ব্রহ্মের বিজয়ে তোমরা এইরূপে মহিমা লাভ করিতেছ। অনন্তর ইন্দ্র ঐ যক্ষকে ব্রহ্ম বলিয়া অবগত হইয়াছিলেন ॥২৬৷৷১৷৷
সা ব্রহ্মেতি হোবাচ। হ কিল ব্রহ্মণঃ বৈ ঈশ্বরস্যৈব বিজয়ে ঈশ্বরেণৈব জিতা অসুরাঃ, যূয়ং তত্র নিমিত্তমাত্রম্। তস্যৈব বিজয়ে যূয়ং মহীয়ধ্বং মহিমানং প্রাপ্নুথ। এতদিতি ক্রিয়াবিশেষণার্থম্। মিথ্যাভিমানস্তু যুগ্মাকময়ম্—অস্মাক- মেবায়ং বিজয়োহম্মাকমেবায়ং মহিমেতি। ততঃ তস্মাৎ উমাবাক্যাৎ হ এব বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি ইন্দ্রঃ অবধারণাৎ ততো হৈবেতি ন স্বাতন্ত্র্যেণ ॥ ২৬। ১ ॥
সেই উমা বলিলেন,—উহা ব্রহ্ম, এবং এই বিজয় নিশ্চয়ই সেই ব্রহ্মকৃত, অর্থাৎ প্রকৃত পক্ষে ঈশ্বরই অসুন্নগণকে পরাজিত করিয়াছেন, তোমরা তাহাতে নিমিত্তমাত্র। তাঁহার বিজয়েই তোমরা এবংবিধ মহিমা অনুভব করিতেছ। ফলতঃ, ‘আমাদেরই এই বিজয়’, ‘আমাদেরই এই মহিমা’ এইরূপ তোমাদের যে অভিমান, ইহা মিথ্যা— অজ্ঞানকৃত। সেই উমা-বাক্য হইতেই ইন্দ্র বুঝিয়াছিলেন যে, ঐ যক্ষটি ব্রহ্ম; কিন্তু, স্ববুদ্ধি-বলে বুঝিতে সমর্থ হন নাই ॥ ২৬। ১॥
৯
তস্মাদ্ বা এতে দেবা অতিতরামিবান্যান্ দেবান্ যদগ্নি- বায়ুরিন্দ্রঃ, তে হ্যেনন্নেদিষ্ঠং পস্পশুস্তে হ্যেনৎ প্রথমো বিদাঞ্চ- কার ব্রহ্মেতি ॥ ২৭ ॥ ২॥
যৎ(যস্মাৎ) অগ্নিঃ, বায়ুঃ, ইন্দ্রঃ, তে হি এনৎ(এতৎ ব্রহ্ম) নেদিষ্ঠম্ (অন্তিকস্থং) পম্পশুঃ(বিদিতবন্তঃ),[যস্মাৎ চ] তে হি প্রথমঃ(প্রথমাঃ সন্তঃ) এনৎ(এতৎ) ব্রহ্ম ইতি বিদাঞ্চকার(বিদাঞ্চক্রুঃ-বিজ্ঞাতবস্তুঃ)। তস্মাৎ(হেতোঃ) এতে বৈ দেবাঃ(অগ্ন্যাদয়ঃ), অন্যান্ দেবান্ অতিতরাম্ (অতিশেরতে”) ইব(এব) ॥
যেহেতু অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র এই দেবতাত্রয় নেদিষ্ঠ(সমীপবর্তী) এই ব্রহ্মকে স্পর্শ করিয়াছিলেন, অর্থাৎ কথোপকথনের দ্বারা তাঁহার সন্নিহিত হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন, এবং যেহেতু তাঁহারাই প্রথম বা প্রধানরূপে উহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানিয়াছিলেন, সেই কারণে তাঁহারা অন্য সকল দেবতাকে গুণাদি দ্বারা অতিক্রম করিয়াছিলেন॥ ২৭। ২॥
যস্মাৎ অগ্নিবায়িন্দ্রা এতে দেবা ব্রহ্মণঃ সংবাদ-দর্শনাদিনা সামীপ্যমুপগতাঃ, তস্মাৎ ঐশ্বর্য্যগুণৈঃ অতিতরামিব শক্তিগুণাদি-মহাভাগ্যৈঃ অন্যান্ দেবান্ অতি- তরাম্ অতিশয়েন শেরত ইব এতে দেবাঃ। ইবশব্দোহনর্থকোহবধারণার্থো বা। যৎ অগ্নিঃ বায়ুঃ ইন্দ্রঃ তে হিদেবা যস্মাৎ এনৎ ব্রহ্ম নেদিষ্ঠম্ অন্তিকতমং প্রিয়তমং স্পস্পশুঃ স্পৃষ্টবস্তো যথোক্তৈঃ ব্রহ্মণঃ সংবাদাদিপ্রকারৈঃ; তে হি যস্মাচ্চ হেতোঃ এনৎ ব্রহ্ম প্রথমঃ—প্রথমাঃ প্রধানাঃ সন্ত ইত্যেতদ্ বিদাঞ্চকার—বিদাঞ্চক্রুরিত্যে- তদ্ ব্রহ্মেতি ॥ ২৭ ॥ ২ ॥
যেহেতু অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র এই দেবতাত্রয় কথোপকথন প্রভৃতি দ্বারা ব্রহ্মের সামীপ্য লাভ করিয়াছিলেন, সেই কারণে ঐশ্বর্য্য-গুণে অর্থাৎ শক্তি, গুণ ও মহিমা প্রভৃতি সৌভাগ্যে তাঁহারা অপরাপর দেবকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, অর্থাৎ সকলের মধ্যে প্রাধান্য
লাভ করিয়াছিলেন। শ্রুতির ‘ইব’ শব্দটি অর্থহীন; আর যদি সার্থক হয়, তাহা হইলে উহা অবধারণার্থক(নিশ্চয়ার্থক) বুঝিতে হইবে। যেহেতু অগ্নি, বায়ু ও ইন্দ্র এই দেবতাগণ নিতান্ত নিকটবর্তী বা প্রিয়তম ব্রহ্মকে পূর্ব্বোক্তপ্রকার কথোপকথনাদি দ্বারা স্পর্শ করিয়াছিলেন, এবং যেহেতু তাঁহারাই প্রধানতমরূপে ঐ যক্ষকে ব্রহ্ম বলিয়া অবগত হইয়াছিলেন[সেই কারণে তাঁহারা অপরাপর দেবতার মধ্যে প্রাধান্যলাভ করিয়াছিলেন] ॥ ২৭।২॥
তস্মাদ্ বা ইন্দ্রোহতিতরামিবান্যান্ দেরান্; স হ্যেনন্নেদিষ্ঠং পস্পর্শ, স হ্যেনৎ প্রথমো বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি॥ ২৮॥ ৩
সঃ(ইন্দ্রঃ) হি(যতঃ) এনৎ নেদিষ্ঠম্(সন্নিহিতম্)[ব্রহ্ম] পস্পর্শ, হি (যতঃ) সঃ প্রথমঃ(প্রধানঃ সন্) এনৎ(এতৎ যক্ষম্) ব্রহ্ম ইতি বিদাঞ্চকার, তস্মাৎ ইন্দ্রঃ বৈ অন্যান্ দেবান্ অতিত্বরাম্(অতিশেতে) ইব(এব) ॥
যেহেতু ইন্দ্রই সেই সন্নিহিত ব্রহ্মকে স্পর্শ করিয়াছিলেন অর্থাৎ জানিয়া- ছিলেন, এবং প্রথমে ঐ যক্ষকে ব্রহ্ম বলিয়া জানিয়াছিলেন, সেই কারণে তিনি অপরাপর দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন ॥ ২৮ ॥ ৩ ॥
যস্মাৎ অগ্নিবায়ু অপি ইন্দ্রবাক্যাদেব বিদাঞ্চক্রতুঃ, ইন্দ্রৈণ হি উমাবাক্যাৎ প্রথমং শ্রুতং ব্রহ্মেতি, অতঃ তস্মাদ্ বৈ ইন্দ্রঃ অতিতরাম্ অতিশয়েন শেতে ইব অন্যান্ দেবান্। স হ্যেনৎ নেদিষ্ঠং পস্পর্শ, যস্মাৎ স হ্যেনৎ প্রথমো বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি উক্তার্থং বাক্যম্ ॥ ২৮ ॥ ৩
যেহেতু অগ্নি এবং বায়ু উভয়েই ইন্দ্র-বাক্য হইতে[ঐ তত্ত্ব] অবগত হইয়াছিলেন—কেননা, ইন্দ্রই প্রথমে উমা-বাক্য হইতে ঐ ব্রহ্মের কথা শ্রবণ করিয়াছিলেন, যেহেতু ইন্দ্র ঐ সন্নিহিত ব্রহ্মকে স্পর্শ করিয়াছিলেন, এবং যেহেতু ইন্দ্রই প্রথমে উহার ব্রহ্মত্ব বুঝিয়া-
ছিলেন, সেই কারণে তিনি অপরাপর দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অপরাংশ পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে ॥২৮৷৷৩৷৷
তস্যৈষ আদেশো যদেতদ্ বিদ্যুতো ব্যদ্যুতদ্ আ, ইতীন্- ন্যমীমিষদ্ আ ইত্যধিদৈবতম্ ॥ ২৯ ॥ ৪ ॥
তস্য(ব্রহ্মণঃ) এবঃ আদেশঃ(উপমোপদেশঃ-) যৎ এতৎ বিদ্যুতঃ (তড়িতঃ) ব্যদ্যুতৎ,(বিদ্যোতনং কৃতবৎ-অর্থাৎ বিদ্যোতনম্), আ(ইব- তদিব) ইতি,[যচ্চ চক্ষুঃ] ন্যমীমিষৎ(নিমেষং কৃতবৎ) আ(ইব) ইৎ(চ, তদিব চ ইত্যর্থঃ)। ইতি অধিদৈবতম্(দেবতাবিষয়কমিদমুপমানপ্রদর্শনম্) ॥
সেই ব্রহ্ম সম্বন্ধে উপদেশ এই,—এই যে বিদ্যুতের স্ফুরণ এবং এই যে চক্ষুর নিমেষ, ব্রহ্মের বিকাশ ও প্রতীতি তদনুরূপ। ইহা দেবতা বিদ্যুতের সাদৃশ্যানুসারে প্রদত্ত হওয়ায়, ‘অধিদৈবত’ নামে প্রসিদ্ধ ॥২৯৷৷৪৷৷
তস্য প্রকৃতস্থ্য ব্রহ্মণঃ এষঃ আদেশঃ উপমোপদেশঃ। নিরুপমস্য ব্রহ্মণো যেন উপমানেন উপদেশঃ, সোহয়মাদেশ ইত্যুচ্যতে। কিং তৎ? যদেতৎ প্রসিদ্ধং লোকে বিদ্যুতঃ ব্যদ্যুতৎ বিদ্যোতনং কৃতবদিতি, এতদনুপপন্নমিতি বিদ্যুতো বিদ্যোতনমিতি কল্প্যতে। আ-ইত্যুপমার্থে। বিদ্যুতো বিদ্যোতনমিবেত্যর্থঃ। “যথা সকৃদ্ বিদ্যুতম্” ইতি শ্রুত্যন্তরে চ দর্শনাৎ। বিদ্যুদিব হি সকৃদাত্মানং দর্শয়িত্বা তিরোভৃতং ব্রহ্ম দেবেভ্যঃ। অথবা বিদ্যুতঃ ‘তেজঃ’ ইত্যধ্যাহাৰ্য্যম্। ব্যদ্যুতৎ বিদ্যোতিতবৎ, ‘আ ইব। বিদ্যুতস্তেজঃ সকৃৎ বিদ্যোতিতবদিব ইত্যর্ভি- প্রায়ঃ। ইতিশব্দ আদেশপ্রতিনিৰ্দেশার্থ:-ইত্যয়মাদেশ ইতি। ইচ্ছদঃ সমুচ্চয়ার্থঃ। অয়ং চাপরস্তস্যাদেশঃ। কোহসৌ? ন্যমীমিষৎ। যথা চক্ষুঃ ন্যমীমিষৎ নিমেষং কৃতবৎ। স্বার্থে ণিচ্। উপমার্থ এব আকারঃ। চক্ষুষো বিষয়ং প্রতি প্রকাশতিরো- ভাব ইব চেত্যর্থঃ ইতি অধিদৈবতম্-দেবতাবিষয়ং ব্রহ্মণ উপমানদর্শনম্ ॥২৯৷৷৪৷৷
সেই প্রস্তাবিত ব্রহ্ম সম্বন্ধে সাদৃশ্যমূলক আদেশ এইরূপ,— নিরুপম বা উপমারহিত ব্রহ্মকে যে উপমা দ্বারা নির্দেশ করা,
তাহার নাম আদেশ। সেই আদেশটি কি প্রকার?[তাহা কথিত হইতেছে-] লোকে বিদ্যুতের আলোক যে প্রকার, ব্রহ্মও সেই প্রকার। ব্রহ্ম একবার বিদ্যুৎপ্রকাশের ন্যায়[প্রকাশ পান]-এই শ্রুতিতেও তাঁহার ঐরূপ প্রকাশই প্রতিপাদিত হইয়াছে। ব্রহ্মও বিদ্যুতের ন্যায় একবার মাত্র দেবগণের নিকট আত্ম-প্রকাশ করিয়া অন্তর্হিত হইয়াছিলেন। অথবা, বিদ্যুৎ শব্দের পর একটি ‘তেজঃ’ পদ যোগ করিতে হইবে। “ব্যদ্যুতৎ”-প্রকাশ পাইয়া- ছিলেন। “আ” অর্থ-সাদৃশ্য।’ ইহার সম্মিলিত অর্থ এইরূপ,- তিনি যেন বৈদ্যুতিক তেজের মত একবার প্রকাশ পাইয়াছিলেন। শ্রুত্যুক্ত ‘ইতি’ শব্দের অর্থ আদেশের প্রতিনির্দেশ, অর্থাৎ ইহাই সেই আদেশ। ‘ইৎ’ শব্দের অর্থ সমুচ্চয়(একই বস্তুর সহিত বহুর সম্বন্ধ-সূচক)। অর্থাৎ তৎসম্বন্ধে এই আর একটি আদেশ; সেই আদেশটি কি? না, চক্ষু’ যেরূপ নিমেষ করে, সেইরূপ। ‘আ’ শব্দটি উপমার্থক। অভিপ্রায় এই যে, রূপাদি বিষয়ে চক্ষুর যেরূপ প্রকাশ-তিরোভাব, ব্রহ্মের প্রকাশ এবং তিরোভাবও তদ্রূপ। দেবতা- বিষয়ে উপমান(সাদৃশ্য) প্রদর্শিত হওয়ায় ব্রহ্মের এই আদেশকে ‘অধিদৈবত’ আদেশ বা উপদেশ বলা হয় ॥২৯।৪৷৷
অথাধ্যাত্মম্। যদেতদ্ গচ্ছতীব চ মনোহনেন চৈতদুপ- স্মরত্যভীক্ষ্ণং সঙ্কল্পঃ॥ ৩০॥৫॥
অথ(অনন্তরম্) অধ্যাত্মম্(প্রত্যগাত্মবিষয়কঃ আদেশঃ উচ্যতে-)। মনঃ যৎ এতৎ(ব্রহ্ম) গচ্ছতি(বিষয়ীকরোতি) ইব,[নতু বিষয়ীকরোতি]। অনেন(‘মনসা) এতৎ(ব্রহ্ম) অভীক্ষম্(ভূশম্, নিরন্তরং বা) উপস্মরতি[সাধক ইতি শেষঃ]। এষঃ এব[ব্রহ্মবিষয়কঃ] সঙ্কল্পঃ ॥
অনন্তর ব্রহ্মবিষয়ে অধ্যাত্ম আদেশ উক্ত হইতেছে,—মন এই ব্রহ্মের নিকট
যেন গমনই করে(বস্তুতঃ তাঁহার নিকট যাইতে পারে না)। সাধক এই মনের দ্বারা নিরন্তর অতিশয়রূপে ব্রহ্মকে স্মরণ করিয়া থাকেন। ব্রহ্ম-বিষয়ে এই প্রকার মানস চিন্তা(সংকল্প) করিতে হয় ॥ ৩০ ॥ ৫ ॥
অথ অনন্তরম্ অধ্যাত্মং প্রত্যগাত্ম-বিষয় আদেশ উচ্যতে,-যদেতৎ গচ্ছতীব চ মনঃ এতদ্ ব্রহ্ম চৌকত ইব বিষয়ীকরোতীব। যচ্চ’অনেন মনসা এতদ্ ব্রহ্ম উপস্মরতি সমীপতঃ স্মরতি সাধকঃ, অতীক্ষ্ণং ভূশম্, সংকল্পশ্চ মনসো ব্রহ্ম- বিষয়ঃ, মনউপাধিকত্বাদ্ধি ‘মনসঃ সঙ্কল্পস্মৃত্যাদি-প্রত্যয়ৈঃ অভিব্যজ্যতে ব্রহ্ম বিষয়ীক্রিয়মাণ্মির। অতঃ স এষ ব্রহ্মণোহধ্যাত্মমাদেশঃ। বিদ্যুন্নিমেষণবৎ অধিদৈবতং দ্রুতপ্রকাশনধর্ম্মি, অধ্যাত্মং চ মনঃপ্রত্যয়-সমকালাভিব্যক্তি ধৰ্ম্মি ইত্যেষ আদেশঃ। এবমাদিশ্যমানং হি ব্রহ্ম মন্দবুদ্ধিগম্যং ভবতীতি ব্রহ্মণ আদেশোপদেশঃ। নহি নিরুপাধিকমেব ব্রহ্ম মন্দবুদ্ধিভিঃ আকলয়িতুং শক্যুম্ ॥ ৩০ ॥ ৫ ॥
অতঃপর অধ্যাত্ম অর্থাৎ প্রত্যগাত্মবিষয়ে আদেশ(উপদেশ) কথিত হইতেছে,-এই যে মন ব্রহ্মকে যেন বিষয়ীকৃত করে, অর্থাৎ ধরে ধরে বলিয়াই যেন বোধ হয়; সাধক ব্যক্তি এই মনের দ্বারা ব্রহ্মকে সন্নিহিত ভাবে পুনঃ পুনঃ স্মরণ করেন। মনই ব্রহ্মের উপাধি, মনের সংকল্প ও স্মৃতি প্রভৃতি প্রত্যয় বা জ্ঞানের দ্বারাই ব্রহ্ম অভিব্যক্ত হন, অর্থাৎ বিজ্ঞাতবৎ হন;, এই কারণে মনে মনে ব্রহ্ম- বিষয়েই সংকল্প বা ঐরূপ চিন্তা করিতে হয়; ইহাই ব্রহ্মসম্বন্ধে অধ্যাত্ম আদেশ। অধিদৈবত আদেশে বলা হইয়াছে, বিদ্যুৎ ও নিমেষের ন্যায় আত্ম-প্রকাশও অতি দ্রুত বা ক্ষণমাত্রস্থায়ী; আর অধ্যাত্ম উপদেশে মনোবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে আত্মার অভিব্যক্তি উক্ত হইল; ইহাই উভয় আদেশের মধ্যে বিশেষ। ব্রহ্ম দুর্বিবজ্ঞেয় হইলেও উক্তপ্রকার আদেশে মন্দমতি ব্যক্তিবর্গেরও বুদ্ধিগম্য হইতে পারেন; এই উদ্দেশ্যেই এইরূপ আদেশ উপদিষ্ট হইল; নচেৎ মন্দমতি
লোকেরা নিরুপাধিক ব্রহ্মকে কখনই বুদ্ধি-গম্য করিতে সমর্থ হইত না ॥৩০॥৫॥ *
তদ্ধ তদ্বনং নাম তদ্বনমিত্যুপাসিতব্যম্। স য এতদেবং বেদ, অভি হৈনং সর্ব্বাণি ভূতানি সংবাঞ্ছন্তি ॥৩১৷৬৷৷
তৎ(ব্রহ্ম) হ(কিল) তদ্বনম্(তস্য প্রাণিজাতস্য বনম্—সেব্যং সম্ভজনীয়ম্) নাম(প্রখ্যাতম্)।[তস্মাৎ ব্রহ্ম] ‘তদ্বনম্’ ইতি উপাসিতব্যম্। সঃ যঃ (কশ্চিৎ) এতৎ(যথোক্তং ব্রহ্ম). এবম্(যথোক্তগুণকম্) বেদ(উপাস্তে), এনম্(উপাসকম্) হ(কিল) সর্ব্বাণি ভূতানি অভিসংবাঞ্ছন্তি(‘প্রার্থয়ন্তে) ॥
পূর্ব্বোক্ত ব্রহ্মই প্রাণিগণের বন, অর্থাৎ ভজনীয়; এই কারণে ‘তদ্বন’ বলিয়াই তাহার উপাসনা করিবে। যে কোন লোক তাঁহাকে কথিতপ্রকার গুণ ও নামানু- সারে অবগত হয়, সমস্ত ভূতই তাঁহার নিকট[অভীষ্ট] প্রার্থনা করে ॥৩১॥৬৷৷
কিঞ্চ, তদ্ ব্রহ্ম হ কিল তদ্বনং নাম; তস্য বনং তদ্বনং তস্য প্রাণিজাতস্য প্রত্যগাত্মভূতত্বাৎ বনং বননীয়ং সম্ভজনীয়ম্। অতঃ তদ্বনং নাম—প্রখ্যাতং ব্রহ্ম তদ্বনমিতি যতঃ, তস্মাৎ ‘তদ্বনম্’ ইত্যনেনৈব গুণাভিধানেন উপাসিতব্যং চিন্তনীয়মিতি। অনেন নাম্না উপাসকস্য ফলুমাহ—স যঃ কশ্চিৎ এতদ্যথোক্তং ব্রহ্ম এবং যথোক্তগুণং বেদ উপাস্তে; অভি হ এনম্ উপাসকং সর্ব্বাণি ভূতানি অভিসংবাঞ্ছন্তি হ প্রার্থয়ন্ত এব, যথা ব্রহ্ম ॥ ৩১ ॥ ৬ ॥
অপিচ, সেই ব্রহ্মই ‘তদ্বন’ নামে প্রসিদ্ধ; অর্থাৎ ‘তৎ’ অর্থ— তাহার(প্রাণিগণের), এবং বন অর্থ—ভজনীয়(সেব্য); ব্রহ্ম সমস্ত
প্রাণীরই আত্মস্বরূপ; সুতরাং তিনি সকলেরই সেব্য। যেহেতু ব্রহ্ম সেই নামেই প্রসিদ্ধ, অতএব তাঁহার গুণ-ব্যঞ্জক ‘তদ্বন’ বলিয়াই তাঁহার উপাসনা করা আবশ্যক। এই নামে উপাসনা করিলে উপাসকের যে ফল লব্ধ হয়, তাহা কথিত হইতেছে,—যে কোন লোক পূর্ব্বোক্ত ব্রহ্মকে যথোক্ত গুণসম্পন্নরূপে অবগত হয়, লোক- সমূহ ব্রহ্মের নিকট যেরূপ প্রার্থনা করিয়া থাকে, তাঁহার নিকটও সেইরূপই নিজ নিজ অভীষ্ট ফল প্রার্থনা করে ॥ ৩১। ৬॥
উপনিষদং ভো ব্রূহীতি, উক্তা ত উপনিষৎ। ব্রাহ্মীং বাব ত উপনিষদমব্রুমেতি ॥ ৩২ ॥ ৭ ॥
[ এবম্ অনুশিষ্টঃ শিষ্যঃ আচার্য্যম্ উবাচ—] ভোঃ(ভগবন্) উপনিষদম্ (বেদরহস্যম্) ব্রূহি(মহ্যমিতি শেষঃ) ইতি।[ শিষ্যে এধম্ উক্তবতি সতি আচার্য্য আহ—] তে(তুভ্যম্) উপনিষৎ উক্তা(অভিহিতা)।[কা পুনঃ সা? ইত্যাহ—] ব্রাহ্মীম্(ব্রহ্মবিষয়াম্) বাব(এব) উপনিষদং তে(তুভ্যম্) অক্রম ইতি ॥
শিষ্য ঐরূপ উপদেশ লাভ করিয়া আচার্য্যকে বলিলেন—] ভগবন্! [আমাকে] উপনিষৎ(রহস্যবিদ্যা) সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করুন।[আচার্য্য বলিলেন—] আমি তোমাকে উপনিষৎ বলিয়াছি। সেই উপনিষৎ কি? না,— ব্রহ্মবিষয়েই আমি তোমাকে উপনিষৎ(রহস্য) বলিয়াছি ॥ ৩২ ॥ ৭ ॥
এবমনুশিষ্টঃ শিষ্য আচার্য্যমুবাচ-উপনিষদং রহস্যং যচ্চিন্ত্যম্, ভো ভগবন্ ক্রহীতি, এবমুক্তবতি শিষ্যে আহ আচার্য্যঃ,-উক্তা অভিহিতা তে তব উপনিষৎ। কা পুনঃ সা? ইত্যাহ,-ব্রাহ্মীং ব্রহ্মণঃ পরমাত্মন ইয়ং ব্রাহ্মী, তাং পরমাত্ম- বিষয়ত্বাৎ অতীতবিজ্ঞানস্য। বাব এব, তে উপনিষদম্ অক্রম ইতি উক্তামেব পরমাত্ম-বিষয়ামুপনিষদম্ অক্রম ইত্যবধারয়তি উত্তরার্থম্। পরমাত্মবিষয়া- মুপনিষদং শ্রুতবত উপনিষদং ভো ক্রহীতি পৃচ্ছতঃ শিষ্যস্য কোহভিপ্রায়ঃ? যদি তাবৎ শ্রুতস্যার্থস্থ্য প্রশ্নঃ কৃতঃ ততঃ পিষ্টপেষণবৎ পুনরুক্তোহনর্থক: প্রশ্নঃ
স্যাৎ। অথ সাবশেষোক্তোপনিষৎ স্যাৎ; ততস্তস্যাঃ ফলবচনেন উপসংহারো ন যুক্তঃ-“প্রেত্যাস্মাৎ লোকাদমৃতা ভবন্তি” ইতি। তস্মাদুক্তোপনিষচ্ছেদবিষয়ো- হপি প্রশ্নোহনুপপন্ন এব অনবশেষিতত্বাৎ। কস্তর্হি অভিপ্রায়ঃ প্রষ্টুরিতি? উচ্যতে,-কিং পূর্ব্বোক্তোপনিষচ্ছেদয়া তৎসহকারিসাধনাান্তরাপেক্ষা? অথ নিরপেক্ষৈব? সাপেক্ষা চেৎ; অপেক্ষিতবিষয়ামুপনিষদং ক্রহি। অথ নিরোপেক্ষা চেৎ; অবধারয় পিপ্পলাদবৎ “নাতঃ পরমস্তীতি” এবমভিপ্রায়ঃ। এতদুপপন্ন- মাচার্য্যস্য অবধারণবচনম্ “উক্তা ত উপনিষৎ” ইতি।
ননু নাবধারণমিদম্, যতোহন্যদ্বক্তব্যমিত্যাহ,-“তস্যৈ তপো দমঃ” ইত্যাদি। সত্যং বক্তব্যমুচ্যত আচার্য্যেণ, নতু উক্তোপনিষচ্ছেদয়য়া, তৎসহকারিসাধনান্তরা- ভিপ্রায়েণ বা। কিন্তু ব্রহ্মবিদ্যাপ্রাপ্ত্যুপায়াভিপ্রায়েণ, বেদৈস্তদঙ্গৈশ্চ সহ পাঠেন সমীকরণাৎ তপঃপ্রভৃতীনাম্। ন হি বেদানাং শিক্ষাদ্যঙ্গানাং চ সাক্ষাদ্ব্রহ্মবিদ্যা- শেষত্বম্, তৎসহকারিসাধনত্বং বা। সহপঠিতানামপি যথাযোগং বিভজ্য-বিনিয়োগঃ স্যাদিতি চেৎ; যথা সূক্ত-বাক্যানুমন্ত্রণ-মন্ত্রাণাং যথাদৈবতং বিভাগঃ, তথা তপোদম- কৰ্ম্ম-সত্যাদীনামপি ব্রহ্মবিদ্যাশেষত্বমু, তৎসহকারি-সাধনত্বং বেতি কল্প্যতে। বেদানাং তদঙ্গানাং চার্থপ্রকাশকত্বেন কর্মাত্মজ্ঞানোপায়ত্বম্, ইত্যেবং হ্যায়ং বিভাগো যুগ্যতে অর্থসম্বন্ধোপপত্তিসামর্থ্যাদিতি চেৎ? ন,-অযুক্তেঃ;-ন হ্যায়ং বিভাগো ঘটনাং প্রাঞ্চতি; ন হি সর্ব্বক্রিয়া-কারক-ফলভেদ-বুদ্ধিতিরস্কারিণ্যা ব্রহ্ম- বিদ্যায়াঃ শেষাপেক্ষা, সহকারিসাধনসম্বন্ধো বা যুগ্যতে; সর্ব্ববিষয়-ব্যাবৃত্তপ্রত্যগাত্ম- বিষয়নিষ্ঠত্বাচ্চ ব্রহ্মবিদ্যায়াস্তৎফলস্য চ নিঃশ্রেয়সস্থ্য; “মোক্ষমিচ্ছন্ সদা কৰ্ম্ম ত্যজেদেব সসাধনম্। ত্যজাতৈব হি তজজ্ঞেয়ং ত্যক্তঃ প্রত্যক্ পরং পদম্ ॥” ইতি। তস্মাৎ কৰ্ম্মণাং সহকারিত্বম্, কৰ্ম্মশেষাপেক্ষা বা ন জ্ঞানস্য উপপদ্যতে। ততোহসদেব সুক্তবাক্যনুমন্ত্রণবদ্যথাযোগং বিভাগ ইতি। তস্মাৎ অব- ধারণার্থ তৈব প্রশ্ন-প্রতিবচনস্থ্য উপপদ্যতে। এতাবত্যেবেয়ম্ উপনিষদুक्ता অন্যনিরপেক্ষা অমৃতত্বায় ॥ ৩২ ॥ ৭ ॥
শিষ্য এইরূপ উপদেশ লাভ করিয়া আচার্য্যকে বলিলেন— ভগবন্! যে উপনিষৎ(রহস্যবিদ্যা) চিন্তা করিতে হইবে, তাহা আমাকে বলুন। শিষ্যের এই কথার পর আচার্য্য বলিলেন, তোমাকে
১,
ত উপনিষৎ বলা হইয়াছে। সেই উপনিষৎ কি? না,-ব্রাহ্মী- ব্রহ্মসম্বন্ধিনী; কেননা পূর্বকথিত বিজ্ঞান(বিদ্যা) পরমাত্ম- বিষয়েই উপদিষ্ট হইয়াছে; অতএব, নিশ্চয়ই জানিবে, আমি তোমাকে ব্রাহ্মী অর্থাৎ পরমাত্ম-বিষয়ক উপনিষৎ(রহস্যবিদ্যা) বলিয়াছি। পূর্বোক্ত বিজ্ঞান যে ব্রহ্মবিদ্যা ভিন্ন আর কিছুই নহে, ইহা দৃঢ়ীকরণার্থ পুনশ্চ “অক্রম বাব”(নিশ্চয়ই বলা হইয়াছে) বলিয়া অবধারণ করিলেন। ভাল কথা, শিষ্য যদি পরমাত্ম-বিষয়ক উপনিষৎ নিশ্চয়ই শ্রবণ করিয়া থাকে, তাহা হইলে, “উপনিষদং ব্রূহি” বলিয়া পুনর্ব্বার প্রশ্ন করিবার অভিপ্রায় কি? আর যদি শ্রুত বিষয়েই প্রশ্ন হইয়া থাকে, তাহা হইলে পুনরুক্ত এই প্রশ্নটি পিষ্ট-পেষণবৎ সম্পূর্ণ নিরর্থক হইয়া পড়ে। আর যদি বল, পূর্ব্বে যে উপনিষৎ উক্ত হইয়াছে তাহা সাবশেষ(অসম্পূর্ণ), অর্থাৎ তৎসম্বন্ধে আরও বলিবার আছে, তাহা হইলেও পরবর্তী শ্রুতিতে ‘ইহলোক হইতে প্রয়াণের পর তাঁহারা অমৃত(মুক্ত) হন’ এইরূপ ফলোউল্লেখপূর্ব্বক উপনিষদের উপসংহার করা সঙ্গত হইতে পারে না। অতএব, পূর্বোক্ত উপনিষদেরই অবশিষ্ট বা অনুক্ত বিষয়ে প্রশ্নকল্পনাও যুক্তিসঙ্গত হয় না; কারণ পূর্বোক্ত উপনিয়ৎ সম্বন্ধে আরও যে কিছু বক্তব্য বা অবশিষ্ট আছে, তাহা কিছুতেই প্রমাণিত হয় না। জিজ্ঞাসা হইতে পারে যে, তাহা হইলে প্রশ্নকর্তার অভিপ্রায় কি? হ্যাঁ, বলা যাইতেছে, -শিষ্যের অভিপ্রায় এই যে, ইতঃপূর্ব্বে যে উপনিষৎ উক্ত হইয়াছে, তাহাতে আরও কোন সহকারী-সাধনের অপেক্ষা আছে কি না?- যদি সহকারী সাধনের অপেক্ষা থাকে, তাহা হুইলে, সেই অপেক্ষিত সাধন সহকারে উপনিষৎ বলুন; আর যদি অন্য সাধনের অপেক্ষা না থাকে, তাহা হইলেও পিপ্পলাদ মুনি যেমন বলিয়াছিলেন-“নাতঃ পরমস্তি” অর্থাৎ ইহার পর আর কিছুই বক্তব্য নাই, তেমনি আপনিও উহার নিরপেক্ষত্ব নির্ধারণ করিয়া বলুন। শিষ্যের এবংবিধ
অভিপ্রায় গ্রহণ করিলেই আচার্য্যের—“উক্তা তে উপনিষৎ,” অর্থাৎ আমি ত তোমাকে উপনিষৎ বলিয়াছি, এইরূপ সাবধানোক্তিও যুক্তি-সঙ্গত হইতে পারে।
ভাল, উক্ত বাক্যটি ত অবধারণ-বাক্য, নহে? কেননা, “তস্মৈ তপো- দমঃ” ইত্যাদি পরবর্তী বাক্যে অন্য কথাই বলা হইবে? হাঁ, আচার্য্য- কর্তৃক অপরাপর বিষয়ই উক্ত হইয়াছে সত্য, কিন্তু উক্ত বিদ্যার অবশিষ্ট অংশ বা সহকারী সাধনান্তর নিরূপণের অভিপ্রায়ে উহা উক্ত হয় নাই; পরন্তু, ব্রহ্মবিদ্যা-লাভের উপায় কুথনাভিপ্রায়েই উহা উক্ত হইয়াছে। এই কারণেই ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়ীভূত বেদ ও বেদাঙ্গ-পাঠের সহিত ঐ তপঃপ্রভৃতির নির্দেশ করা হইয়াছে। বেদ ও শিক্ষা প্রভৃতি বেদাঙ্গসমূহও * সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ‘কখনই ব্রহ্মবিদ্যার অঙ্গ বা সহকারী সাধন নহে(‘উহারা ব্রহ্মবিদ্যালাভের সহায় বা উপায় মাত্র)।
আশঙ্কা হইতে পারে যে; যদিও তপঃপ্রভৃতি সাধমসমূহ বেদ’ও বেদাঙ্গের সহিত পঠিত হইয়া থাকে, তথাপি যোগ্যতানুসারে ঐ সকলের ত পৃথক পৃথক্ প্রয়োগ হইতে পারে?—অর্থাৎ সূক্তবাক্য, অনুমন্ত্র(এক প্রকার বেদাংশ) ও মন্ত্র, এ সকল সহপঠিত হইলেও যেমন ভিন্ন ভিন্ন দেবতার কার্য্যে বিভিন্নভাবে প্রযুক্ত হইয়া থাকে, তেমনি তপঃ, দম ও সত্য প্রভৃতি সাধনগুলি বেদাদির সহিত একত্র পঠিত থাকিলেও যোগ্যতানুসারে উহাদের ব্রহ্ম-বিদ্যাঙ্গত্ব বা ব্রহ্ম- বিদ্যার সহকারী সাধনত্ব কল্পনা করা যাইতে’ পারে, এবং বেদ ও বেদাঙ্গসমূহ’ তদর্থ প্রকাশ করে বলিয়া, উহাদেরও কর্মোপযোগী
আত্মজ্ঞান-সাধনত্ব কল্পনা করিতে পারা যায়; সুতরাং এইরূপে উভয়েরই পৃথক্ পৃথক্ বিভাগ যুক্তি-সিদ্ধ হইতে পারে। বিশেষতঃ এই প্রকার বিভাগে বিভিন্নার্থ-প্রদর্শনেও কি কোন ব্যাঘাত ঘটে না? না,-এরূপ বিভাগ-কল্পনা যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে না; কেননা, উক্তপ্রকার বিভাগ প্রকৃত ঘটনার(বর্ণনীয় বিষয়ের) অনুগামী বা অনুকূল হয় না; কারণ, ব্রহ্মবিদ্যা যখন ক্রিয়া, কারক ও ক্রিয়াফল- বিষয়ক সর্ববিধ ভেদবুদ্ধি নিবারিত করিয়া দেয়, তখন সেই ব্রহ্ম- বিদ্যার আর কোনরূপ অঙ্গের অপেক্ষা কিংবা সহকারী সাধনান্তরের সম্বন্ধ থাকাও সঙ্গত হইতে পারে না। ‘বিশেষতঃ সর্ববিষয়-বিমুখ, পরমাত্ম-বোধনেই ব্রহ্মবিদ্যার পরিসমাপ্তি বা তাৎপর্য্য এবং ব্রহ্মবিদ্যার ফল-নিঃশ্রেয়সও(মোক্ষও) তদ্রূপ। ‘মোক্ষলাভেচ্ছু ব্যক্তি কৰ্ম্ম ও কর্মসাধন অবশ্য ত্যাগ করিবে; ত্যাগ করিলেই ত্যাগকর্তা স্বীয় পরমাত্মভাব জানিতে পারে’ এই বাক্যই উক্তার্থে প্রমাণ। কর্মসমূহ কখনই ব্রহ্মবিদ্যার সহকারী বা অঙ্গরূপে অপেক্ষিত হইতে পারে না। অতএব এখানে সূক্তবাক্ ও অনুমন্ত্রণের ন্যায় যোগ্যতানুসারে বিভাগকল্পনা কিছুতেই সঙ্গত হইতে পারে না; এইজন্যই প্রশ্ন ও তৎপ্রতিবচনে উক্তরূপ অবধারণার্থতাই সুসঙ্গত হয়। এপর্যন্ত যাহা কথিত হইল, তাহাই ‘মুক্তিলাভের সাধনীভূত উপনিষৎ; ইহাতে অন্য কোনও সাধনের অপেক্ষা নাই ॥৩২।৭৷৷ তস্মৈ তপো ‘দমঃ কর্ম্মেতি প্রতিষ্ঠা, বেদাঃ সর্ব্বাঙ্গানি সত্যমায়তনম্ ॥ ৩৩ ॥ ৮ ॥
তপঃ(কায়েন্দ্রিয়মনসাং নিগ্রহঃ), দমঃ(ইন্দ্রিয়সংযমঃ), কৰ্ম্ম(নিষ্কামম্, অগ্নিহোত্রাদি চ), বেদাঃ(ঋগাদয়ঃ), সর্ব্বাঙ্গানি(শিক্ষাদীনি), ইতি(অখদপি), তস্যৈ(তস্যাঃ উপনিষদঃ) প্রতিষ্ঠা(পাদৌ ইব)। যদ্বা, তপআদীনি এব প্রতিষ্ঠা পাদস্থানীয়ানি, বেদাঃ পুনঃ সর্ব্বাঙ্গানি অপবাঙ্গস্থানীয়াঃ।(তেষু হি সৎসু
ব্রাহ্মী উপনিষৎ প্রতিষ্ঠিততি প্রবর্ত্ততে; এতানি তপ-আদীনি ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ প্রাপ্ত্যুপায়ভূতানি ইত্যর্থঃ)। সত্যম্ আয়তনম্(তস্যাঃ আশ্রয়ভূতম্) ॥
দেহ, ইন্দ্রিয় ও মনের নিগ্রহরূপ তপস্যা, ইন্দ্রিয়-সংযমরূপ দম, নিত্য ও নিষ্কাম কৰ্ম্ম, ঋক্ প্রভৃতি বেদ, শিক্ষাশাস্ত্র প্রভৃতি বেদাঙ্গ, এবং এই জাতীয় অপরাপর সাধনসমূহও সেই পূর্ব্বোক্ত উপনিষদের প্রতিষ্ঠা(প্রাপ্তির উপায়), এবং সত্যনিষ্ঠা তাহার আয়তন অর্থাৎ আশ্রয়স্থান ॥ ৩৩ ॥৮॥
যামিমাং ব্রাহ্মীমুপনিষদং তরাগ্রেহক্রমেতি, তস্যৈ তস্যা উক্তায়া উপনিষদঃ প্রাপ্ত্যুপায়ভূতানি তপআদীনি। তপঃ কায়েন্দ্রিয়-মনসাৎ সমাধানম্। দম উপশমঃ। কৰ্ম্ম অগ্নিহোত্রাদি। এতৈহি সংস্কৃতস্য সত্ত্বশুদ্ধিদ্বারা তত্ত্বজ্ঞানোৎপত্তিদৃষ্টা। দৃষ্টা হ্যমৃদিতকল্মষস্যোক্তেহপি ব্রহ্মণি অপ্রতিপত্তিঃ বিপরীতপ্রতিপত্তিশ্চ, যথেন্দ্র- বিরোচনপ্রভৃতীনাম্। তম্মাদিহ বা অতীতেষু বা বহুযু জন্মান্তরেষু তপআদিভিঃ কৃতসত্ত্বশুদ্ধেঃ জ্ঞানং সমুৎপদ্যতে যথাশ্রুতম্,-“যস্য দেবে পরা ভক্তিযথা দেবে তথা গুরৌ। তস্যৈতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ। “জ্ঞানমুৎপদ্যতে পুংসাং ক্ষয়াৎ পাপস্য কৰ্ম্মণঃ” ইতি চ স্মৃতেঃ। ইতিশব্দ উপলক্ষণত্বপ্রদর্শনার্থঃ। ইতি এবমাদ্যন্যদপি জ্ঞানোৎপত্তেরুপকারকম্-“অমানিত্বদন্তিত্বম্” ইত্যাদ্যুপদর্শিতং ভবতি। প্রতিষ্ঠা পাদৌ-পাদাবিবাস্যাঃ; তেষু হি সৎসু প্রতিতিষ্ঠতি ব্রহ্মবিদ্যা- প্রবর্ততে পদ্ভ্যামিব পুরুষঃ। বেদাশ্চত্বারঃ; সর্ব্বাণি চাঙ্গানি শিক্ষাদীনি ষট্; কৰ্ম্ম- জ্ঞানপ্রকাশকত্বাৎ বেদানাম্, তদ্রক্ষণার্থত্বাদঙ্গানাং প্রতিষ্ঠাত্বম্।-অথবা, প্রতিষ্ঠা- শব্দস্য পাদরূপকল্পনার্থত্বাৎ বেদাস্ত ইতরাণি সর্ব্বাঙ্গানি শিরআদীনি। অস্মিন্ পক্ষে শিক্ষাদীনাং বেদগ্রহণেনৈব’ গ্রহণং কৃতং প্রত্যেতব্যম্। অঙ্গিনি হি গৃহীতেহঙ্গানি গৃহীতান্যেব ভবন্তি, তদায়ত্তত্বাদঙ্গানাম্। সত্যম্ আয়তনং যত্র তিষ্ঠত্যুপনিষৎ, তদায়তনম্। সত্যমিতি অমায়িতাহকৌটিল্যং বাত্মনঃকায়ানাম্। তেষু হ্যাশ্রয়তি বিদ্যা, যেমায়াবিনঃ সাধবঃ, নাসুর প্রকৃতিষু মায়াবিষু; “ন যেষু জিম্মমনৃতং ন মায়া চ” ইতি শ্রুতেঃ। তস্মাৎ সত্যমায়তনমিতি কল্প্যতে। তপআদিঘেব প্রতিষ্ঠাত্বেন প্রাপ্তস্থ্য সত্যস্য পুনরায়তনত্বেন গ্রহণং সাধনাতিশয়ত্বজ্ঞাপনার্থম্। “অশ্বমেধসহস্রঞ্চ সত্যঞ্চ তুলয়া ধৃতম্। অশ্বমেধসহস্রাচ্চ সত্যমেকং বিশিষ্যতে” ইতি স্মৃতেঃ ॥৩৩৷৷৮৷৷
[আচার্য্য বলিলেন]-তোমার নিকট এই যে ব্রহ্মবিদ্যা কথিত হইল, নিম্নলিখিত তপঃ প্রভৃতি ধৰ্ম্মই তাহার প্রাপ্তির উপায়। তপঃ -দেহ, ইন্দ্রিয় ও মনের স্থিরতাসম্পাদন। দম-উপশম, অর্থাৎ বিষয়পরাম্মুখতা। কৰ্ম্ম-অগ্নিহোত্র প্রভৃতি। এই সকলের দ্বারা পরিমার্জিত হইলে, মনের সত্ত্বশুদ্ধি হয়; তাহার ফলে তত্ত্বজ্ঞান সমুৎপন্ন হইতে দেখা যায়। পক্ষান্তরে, বুদ্ধিগত কল্মষ(পাপ) বিদূরিত না হইলে, উপদেশসত্ত্বেও ব্রহ্মবিষয়ে অজ্ঞান ও বিপরীত জ্ঞান সমুৎপন্ন হইতে দেখা গিয়াছে। ইন্দ্র ও বিরোচনপ্রভৃতি জিজ্ঞাসুগণই এ বিষয়ে উত্তম দৃষ্টান্ত।[ইন্দ্র ও বিরোচনের কথা পূর্বেই কথিত আছে।] অতএব ইহ জন্মেই হউক, আর অতীত বহু জন্মেই হউক, তপস্যা দ্বারা চিত্ত বিশুদ্ধ, হইলেই“যথাশ্রুত জ্ঞান • সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। ‘দেবতার প্রতি যাঁহার পরমা ভক্তি থাকে, এবং দেবতার ন্যায় গুরুতেও যাঁহার পরা ভক্তি থাকে, এই সমস্ত কথিত বিষয় সেই মহাত্মার নিকটই প্রকাশ পায় বা প্রতিভাত হয়’ এই মন্ত্র এবং ‘কর্মানুষ্ঠানে পাপক্ষয় হইলে পুরুষের তত্ত্ব-জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়’ এই স্মৃতিবাক্যও কথিত বিষয়ে প্রমাণ।” মূলের ‘ইতি’ শব্দটি উপলক্ষণার্থ; তাঁহার ফলে এবংবিধ অমানিত্ব, অদস্তিত্ব প্রভৃতি অন্যান্য ধর্মগুলিও যে ব্রহ্মবিদ্যার উপকারক বা সহায় হয়, তাহাও প্রদর্শিত হইল। ‘প্রতিষ্ঠা’ অর্থ পাদ। মনুষ্য যেরূপ পদের উপর ভর করিয়া কার্য্য করে, সেইরূপ উল্লিখিত তপস্যা প্রভৃতি বিদ্যমান থাকিলেই ব্রহ্ম-বিদ্যা প্রতিষ্ঠিত বা প্রবৃত্ত হয়; অতএব উক্ত তপস্যা প্রভৃতি ধৰ্ম্মসমূহ ব্রহ্ম-বিদ্যার পাদসদৃশ। ঋক্ প্রভৃতি চারি বেদ এবং শিক্ষা প্রভৃতি ছয়টি অঙ্গই কৰ্ম্ম ও জ্ঞানপ্রতিপাদক; এই কারণে বেদ ও বেদানুকূল অঙ্গসকল ব্রহ্ম-বিদ্যার প্রতিষ্ঠা বা অবস্থিতির কারণ হয়। অথবা ‘প্রতিষ্ঠা’ শব্দেই যখন পাদরূপ অর্থ প্রতিপাদিত
হইয়াছে,-তখন বেদসমূহকে মস্তকাদি অপরাপর অঙ্গস্থানীয় বলা যাইতে পারে। এই পক্ষে ‘বেদ’ শব্দেই শিক্ষাদি ষড়ঙ্গের গ্রহণ বুঝিতে হইবে। কেননা, অঙ্গসমূহ যখন প্রধানেরই অনুগত, তখন প্রধানের গ্রহণ করিলেই তদনুগত বিরয়সমূহও স্বতঃই গৃহীত হইয়া যায়। সত্যই ব্রহ্ম-বিদ্যার আয়তন(আশ্রয়); কেননা, ঐ উপনিষৎ (রহস্য-বিদ্যা) প্রধানতঃ সত্যকেই আশ্রয় করিয়া অবস্থিতি করে। ‘সত্য’ অর্থ অমায়িতা-বাক্য, মন ও শরীরগত কুটিলতার অভাব যাঁহারা মায়ারহিত-সাধু, ব্রহ্ম-বিদ্যা তাঁহাদিগকেই আশ্রয় করিয়া থাকে; কিন্তু অসুরস্বভাব মায়াবীকে আশ্রয় করিয়া থাকে না। শ্রুতি বলিয়াছেন,-‘যে সকল লোকে কুটিলতা, মিথ্যাচরণ ও মায়া না থাকে’[বিদ্যা সেই সকল ব্যক্তিতেই প্রতিভাত হয়]। এই কারণেই সত্যকে ব্রহ্ম-বিদ্যার আশ্রয় বলিয়া কল্পনা করা হয়। তপস্যং প্রভৃতিকে প্রতিষ্ঠা বলাতেই সত্যেরও আয়তনভাব-লব্ধ হইয়াছিল সত্য, তথাপি উহার পৃথক্ আয়তনত্ব উল্লেখের অভিপ্রায় এই যে, ব্রহ্ম-বিদ্যাপ্রাপ্তির যত প্রকার সাধন আছে, তন্মধ্যে সত্যই প্রধানতম সাধন;[অপর সাধন সকল এতদপেক্ষা হীন]। স্মৃতিতে আছে,- ‘সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞ ও সত্য এক তুলাদণ্ডে ধৃত হইয়াছিল, কিন্তু একমাত্র সত্যই সহস্র অশ্বমেধ অপেক্ষা বিশিষ্ট বা অধিক হইয়াছিল’ ॥৩৩৷৮৷৷
যো বা এতান্নবং বেদাপহত্য পাপ্যানমনন্তে স্বর্গে লোকে জ্যেয়ে প্রতিতিষ্ঠতি প্রতিতিষ্ঠতি ॥ ৩৪ ॥ ৯ ॥
যঃ বৈ এতাম্(ব্রহ্মবিদ্যাম্) এবং বেদ, সঃ পাপ্যানম্ অপহত্য(বিধূয়) অনন্তে(অপর্যন্তে) জ্যেয়ে(জ্যায়সি সর্ব্বমহত্তরে) স্বর্গে লোকে(পরমসুখাত্মকে ব্রহ্মণি) প্রতিতিষ্ঠতি(প্রতিবসতি)।[প্রতিতিষ্ঠতীতি পুনর্বচনং গ্রন্থসমাপ্তি- দ্যোতনার্থম্]॥ ৩৪। ৯॥
যে লোক যথোক্ত প্রকারে উক্ত ব্রহ্ম-বিদ্যা অবগত হয়, সে লোক স্বীয় পাপ বিধূত করিয়া অনন্ত, সুখাত্মক ও সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মে অবস্থিতি করে[আর সংসারে ফিরিয়া আইসে না] ॥ ৬৪ ॥ ৯ ॥
যো বৈ এতাং ব্রহ্মবিদ্যাং “কেনেষিতম্” ইত্যাদিনা যথোক্তাম্ এবং মহাভাগাং “ব্রহ্ম হ দেবেভ্যঃ” ইত্যাদিনা স্তুতাং সর্ব্ববিদ্যা প্রতিষ্ঠাং বেদ, “অমৃতত্বং হি বিন্দতে” ইত্যুক্তমপি ব্রহ্মবিদ্যাফলং, অন্তে নিগময়তি—অপহত্য পাপ্যানম্ অবিদ্যাকামকৰ্ম্ম- লক্ষণং সংসারবীজং বিধুর অনন্তে অপর্যন্তে, স্বর্গে লোকে সুখাত্মকে ব্রহ্মণীত্যে- তৎ। অনন্তে ইতি বিশেষণাৎ ন ত্রিবিষ্টপে। অনন্তশব্দ ঔপচারিকোহপি স্যাৎ ইত্যত আহ,—জ্যেয় ইতি। জ্যেয়ে জ্যায়সি সর্ব্বমহত্তরে স্বাত্মনি মুখ্যে এব প্রতি- তিষ্ঠতি; ন পুনঃ সংসারমাপদ্যতে ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৩৪ ॥ ৯ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য-শ্রীমচ্ছঙ্করভগবদ্পাদকৃতৌ কেনোপনিষৎ-পদভাষ্যে চতুর্থঃ খণ্ডঃ ॥ ৪ ॥
সমাপ্তমিদং শ্রীমচ্ছঙ্করাচার্য্যবিরচিতং তলবকারোপনিষদপর্যায়- কেনোপনিষৎপদভাষ্যম্ ॥
॥ * ॥ ওঁ তৎসং ওঁ ॥ * ॥
“কেনেষিতম্” ইত্যাদি বাক্যে উক্ত, এবং “ব্রহ্ম হ দেবেভ্যঃ” ইত্যাদি বাক্য দ্বারা প্রশংসিত, সর্ববিদ্যার আশ্রয়-স্বরূপ এই অত্যুত্তম ব্রহ্মবিদ্যাকে যে ব্যক্তি জানেন, তিনি সংসারের বীজভূত, অবিদ্যা ও কামকর্মাত্মক পাপ বিধৃত অর্থাৎ অপনীত করিয়া অনন্ত(অসীম), সর্বোত্তম স্বর্গলোকে অর্থাৎ সুখাত্মক ও আত্মস্বরূপ ব্রহ্মে অবস্থিতি করেন, আর সংসারে ফিরিয়া আইসেন না। পূর্ব্বে “অমৃতত্বং হি বিন্দতে” শ্রুতিতে যে মুক্তি-ফলের উল্লেখ করা হইয়াছে, এখানে
“স্বর্গে লোকে প্রতিতিষ্ঠতি” বাক্যে তাহারই নিগমন করা হইয়াছে। [ কথিত বিষয়ের যে প্রকারান্তরে পুনঃকথন, তাহাকে ‘নিগমন’ বলে।] যদিও ‘স্বর্গ’ শব্দটি সুরলোকবাচী, তথাপি ‘অনন্ত’ বিশেষণ থাকায়, এখানে উহার ‘ব্রহ্ম’ অর্থই গ্রহণ করিতে হইবে; কারণ, সুরলোকটি অনন্ত নহে—সীমাবদ্ধ। পাছে ‘অনন্ত’ শব্দের আপেক্ষিক ‘অনন্তত্ব’ অর্থ গ্রহণ করা হয়, এই আশঙ্কায় ‘জ্যেয়ে’(সর্ব্বাপেক্ষা) বিশেষণটি প্রদত্ত হইয়াছে ॥ ৩৪ ॥ ৯ ॥
ইতি কেনোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদের চতুর্থ খণ্ড। কেনোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥
১১
যজুর্ব্বেদীয়া
শ্রীমৎ-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শঙ্করভগবৎ- কৃত-পদভাষ্যসমেতা।
[ তৃতীয় সংস্করণ]
প্রকাশক— শ্রীক্ষীরোদচন্দ্র মজুমদার, ২১।১ ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা। ১৩৪১ সাল। All rights reserved.] মূল্য ২৫০ দুই টাকা বার আনা মাত্র
কলিকাতা ২২।৫ বি নং ঝামাপুকুর লেন, “বি, পি, এম্স্ প্রেসে” শ্রীআশুতোষ মজুমদার কর্তৃক মুদ্রিত।
চতুর্থ ও পঞ্চম সংখ্যায় কঠোপনিষৎ সমাপ্ত হইল। আমরা প্রথমেই বলিয়াছি যে, উপনিযৎসমূহ ব্রহ্মবিদ্যা-প্রকাশক, সেই ব্রহ্ম-বিদ্যাই সংসার- সাগরে নিমগ্ন মানব-মণ্ডলীর উদ্ধারের একমাত্র তরণী এবং ত্রিতাপ-তাপিত মানব-হৃদয়ের শান্তিপ্রদ মহৌষধি। কিন্তু যাহাদের পরলোকে বিশ্বাস নাই, আত্মার নিত্যত্বে শ্রদ্ধা নাই এবং বেদে ও ঋষিবাক্যে” আস্থা নাই, কেবল দেহ- পরিচালন ও তৎপরিপোষণই যাহাদের জীবনের একমাত্র কার্য্য, অধিকন্তু, “ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবাাত্মা পারলৌকিকঃ” স্বর্গ নাই, অপবর্গ(মোক্ষ) নাই, এবং পরলোকগামী আত্মাও নাই, ইহাই যাহাদের মূলমন্ত্র, অন্ধের নিকট দর্পণের ন্যায় ব্রহ্মবিদ্যাও তাহাদের সমীপে, আত্মপ্রকাশনে সমর্থ হয় না,-তৈলসিক্তদেহে জল- সেকের ন্যায় ভাসিয়া যায়। এই কারণে লোক-হিতৈষিণী শ্রুতি, মাতার ন্যায় পুত্রকল্প মুগ্ধ মানবমণ্ডলীর মায়া-মোহ-নিবারণার্থ নানা উপায়ে ও বিবিধ প্রকারে সেই ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ প্রদান করিয়াছেন।
বিষয় উৎকৃষ্ট হইলেও উত্তম আদর্শের অভাবে অনেক সময় তদ্বিষয়ে দৃঢ়তর ধারণা বা ঐকান্তিক আগ্রহ জন্মে না; পরন্তু উত্তম আদর্শ সম্মুখে থাকিলে, অতি দুর্বোধ্য বিষয়ও সহজেই শ্রোতার হৃদয়ে প্রবেশ করিতে সমর্থ হয়। এই কারণে শ্রুতি নিজেই দয়াপরবশ হইয়া এই উপনিষদে একটি সুন্দর আখ্যায়িকার অবতারণা করিয়া ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ করিয়াছেন।
সরলস্বভাব, শিশু, ঋষিকুমার নচিকেতা প্রশ্নকর্তা, আর স্বয়ং প্রেতাধিপতি যমরাজ তাহার উত্তরদাতা। প্রধান প্রষ্টব্য বিষয়—মৃত্যুর পর এই স্থূলদেহ বিনষ্ট হইয়া গেলে, আত্মার অস্তিত্ব থাকে কিনা অর্থাৎ সেই আত্মার লোকান্তরে গমন হয়, কি না? এই উপলক্ষে আখ্যায়িকার অবতারণা করা হইয়াছে।
একদা নচিকেতার পিতা বাজশ্রবস ঋষি একটি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। যজ্ঞটির নাম ‘বিশ্বজিৎ’। যজ্ঞান্তে উপযুক্ত দক্ষিণা দান না করিলে, সমুচিত ফল লাভ করা যায় না। দক্ষিণার মধ্যেও গো-দক্ষিণা সবিশেষ প্রশস্ত; তাই ঋষি
౬
বাজশ্রবস যজ্ঞ-দক্ষিণার্থ কতকগুলি অদেয় গাভী দান করিতে প্রস্তুত হইলেন। তদ্দর্শনে শিশু, সরলহৃদয় নচিকেতার মনে বড় বেদনা উপস্থিত হইল। নচিকেতা ভাবিতে লাগিলেন—পিতা এ কি কার্য্য করিতেছেন—শীর্ণকায়, আসন্নমৃত্যু এই সকল অদেয় গাভী দক্ষিণা দান করিয়া ধর্ম্মের বিনিময়ে যে অধর্ম্ম সঞ্চয় করিতেছেন! দুঃখময় নরকের দ্বার উন্মুক্ত করিতেছেন! আমি পুত্র, প্রাণ দিয়াও ইঁহার কিঞ্চিৎ উপকার সাধন করা আমার একান্ত কর্তব্য। তখন নচিকেতা আর স্থির থাকিতে পারিলেন না; শ্রদ্ধাপরবশ হইয়া ব্যাকুলহৃদয়ে পিতার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন—“পিতঃ! আপনি ত সমস্ত সম্পত্তিই দান করিতেছেন; আমিও আপনার একটা সম্পত্তি; আমাকে কাহার উদ্দেশে দান করিবেন?” বারংবার প্রত্যাখ্যাত হইয়াও যখন নচিকেতা নিবৃত্ত না হইয়া আত্মদানার্থ পিতাকে নির্ব্বন্ধাতিশয় জ্ঞাপন করিতে লাগিলেন, তখন পিতা বাজশ্রবস ক্রোধান্ধ হইয়া প্রাণসম প্রিয় পুত্রকে বলিয়া ফেলিলেন—“তোকে যমের উদ্দেশে দান করিলাম।”
শিশু নচিকেতা অতি অল্পমাত্রও বিচলিত না হইয়া পিতার আদেশ শিরো- ধারণপূর্ব্বক যমালয়াভিমুখে প্রস্থান করিলেন; যথাকালে তিনি যমভবনে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, যমরাজ গৃহে নাই। তিনি যমের আগমন প্রতীক্ষায় সেই স্থানেই অনশনে বাস করিতে লাগিলেন। এইরূপে ত্রিরাত্র অতীত হইল। যমরাজ যথাকালে প্রত্যাগত হইয়া নচিকেতার সংবাদ অবগত হইলেন এবং তৎসমীপে উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন—“হে ব্রাহ্মণ! তুমি তিন রাত্রি অনাহারে আমার গৃহে অতিথিরূপে বাস করিয়াছ; ইহাতে আমার মহা অপরাধ হইয়াছে। সেই তিন দিনের অপরাধ ক্ষালনের নিমিত্ত আমি তোমাকে তিনটি বর দিতেছি; তুমি ইচ্ছামত বর প্রার্থনা কর।”
নচিকেতা বয়সে শিশু হইলেও জ্ঞানে প্রবীণ; তাই তিনি প্রথম বরে পিতৃ- ভক্তির নিদর্শন-স্বরূপ পিতার মানসিক শান্তি বা অনুদ্বেগভাব প্রার্থনা করিলেন; দ্বিতীয় বরে স্বর্গসাধন অগ্নিবিদ্যা প্রার্থনা করিলেন। যমরাজ ‘তথান্ত’ বলিয়া বিনা আপত্তিতে ঐ উভয় প্রার্থনা পরিপূরণ করিলেন।
অনন্তর নচিকেতা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন—তৃতীয় বরে কি প্রার্থনা করি? দুর্লভদর্শন যমরাজের সমীপে সমাগত হইয়া যে অকিঞ্চিৎকর ও নশ্বর
ধন, জন, ভোগৈশ্বর্য্য প্রার্থনা করা, তাহা ঠিক রত্নাকরের নিকট উপস্থিত হইয়া শুক্তি-শম্বুক প্রার্থনারই অনুরূপ‘। অতএব, ঐ সকল বিষয় প্রার্থনা করা হইবে না। যমরাজ যখন মৃত্যুর ঈশ্বর—প্রেতাধিপতি, তখন ইঁহার নিকট হইতে পর- লোকের খবরটা জানিয়া লই—মানুষ মরিয়া কি হয়। যম ভিন্ন আর কেহই ইহার প্রকৃত তত্ত্ব জ্ঞাপনে সমর্থ হইবে না। অতএব ইঁহার নিকট পরলোকতত্ত্ব জিজ্ঞাসা করাই শ্রেয়ঃ। এইরূপ আলোচনার পর নচিকেতা যমরাজ-সমীপে প্রার্থনা করিলেন—
“যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে অন্তীতোকে নায়মস্তীতি চৈকে। এতদ্বিদ্যাম্ অনুশিষ্টস্বয়াহং বরাণামেষ বরস্তৃতীয়ঃ ॥”
“মনুষ্য মরিলে পর কেহ বলেন, সেই মনুষ্যাত্মা পরলোকে থাকে, আবার কেহ বলেন, থাকে না; এই যে, একটা বিষম সংশয় রহিয়াছে, আপনার নিকট ইহার প্রকৃত তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করি, অর্থাৎ মৃত্যুর পর দেহনাশেই সব শেষ হইয়া যায়, না—তাহার পরও আবার আত্মাকে সুখ-দুঃখ ভোগের নিমিত্ত ভিন্ন ভিন্ন লোকে বিভিন্নপ্রকার জন্ম পরিগ্রহ করিতে হয়? ইহার প্রকৃত তত্ত্ব উপদেশ দিয়া আমার পূর্ব্বোক্ত সংশয় ছেদন করুন।”
এখানে বলা আবশ্যক যে, খৃষ্টান ও মুসলমান ধর্ম্মে যেরূপ মৃত্যুর পর বিচারার্থ চিরাবস্থিতি এবং বিচারান্তে অনন্ত স্বর্গ বা অনন্ত নরকবাসের কল্পনা করা হয়,. নচিকেতা সেরূপ আত্মাস্তিত্ব জানিতে চাহেন নাই; তিনি জানিতে চাহেন, একই অভিনেতা যেমন আবশ্যকমত এক একটি পরিচ্ছদ পরিত্যাগপূর্ব্বক নানাবিধ নূতন নূতন পরিচ্ছদ পরিগ্রহ করিয়া থাকে, তেমনি একই আত্মা বিভিন্ন কর্মফল ভোগের উদ্দেশ্যে জন্মের পর জন্ম—মৃত্যুর পর মৃত্যু এবং দেহের পর দেহান্তর ধারণ করে কি না? ইহাই নচিকেতার প্রধান জিজ্ঞাস্য বিষয়।
যম দেখিলেন, এই বালকটি শিশু হইলেও বড় সহজ পাত্র নহে; একেবারে আমার গুহ্যতত্ত্ব—ঘরের খবর জানিতে চাহে! যাহা হউক, ইহাকে পরলোকতত্ত্ব বলা হইবে না, অপর বিষয় দিয়া বিদায় করিতে হইবে। ইহার পর তিনি নচিকেতাকে বিবিধ ভোগৈশ্বর্য্য ও দীর্ঘায়ু প্রভৃতির প্রলোভনে বিমুগ্ধ করিতে চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। কিন্তু ধীর-প্রকৃতি নচিকেতা অটল, অচল—কিছুতেই
লক্ষ্যভ্রষ্ট হইলেন না। তখন যমরাজ সন্তুষ্ট হইয়া নচিকেতার প্রশ্নের উত্তর দিতে আরম্ভ করিলেন।
তিনি বলিলেন,—সৎ, চিৎ ও আনন্দময় ব্রহ্মই একমাত্র সৎপদার্থ, তদতিরিক্ত সমস্তই অসৎ—মিথ্যা। সেই ব্রহ্মই প্রতিদেহে প্রবিষ্ট হইয়া জীবরূপে ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞায় অভিহিত হন। অগ্নি যেরূপ নানাবর্ণের কাচপাত্রের মধ্যগত হইয়া নানারূপে প্রতিভাত হয়, অথচ অগ্নি যাহা তাহাই থাকে, কিছুমাত্র বিকৃত হয় না, তদ্রূপ সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্মও জীবরূপে নানাবিধ উপাধিগত হইয়া নানাকারে প্রকাশমান হইয়াও আপনার সচ্চিদানন্দময় স্বভাব পরিত্যাগ করেন না, নিজে নিত্যশুদ্ধ, নির্বিকার রূপেই অবস্থান করেন।
জীব ও ব্রহ্ম মূলতঃ এক হইলেও ব্যবহার-ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য ঘটে। জীব শুভাশুভ কর্মফলে স্বর্গনরকাদি লোকে গমন করে, এবং সমুচিত সুখদুঃখ ভোগ শেষ করিয়া পুনশ্চ জন্মধারণ করে।
“যোনিমন্যে প্রপদ্যন্তে শরীরত্বায় দেহিনঃ। স্থাণুমন্যেহনুসংযন্তি যথাকর্ম্ম যথাশ্রুতম্॥”
কোন কোন দেহী নিজ নিজ কৰ্ম্ম ও জ্ঞান(উপাসনা) অনুসারে যোনিদ্বার প্রাপ্ত হয়(জরায়ুজ হয়); কেহ কেহ বা স্থাবরদেহ প্রাপ্ত হয়; কিন্তু, ব্রহ্ম কোনরূপ ফলই ভোগ করেন না—কেবল উদাসীন ভাবে জীবের কর্ম্ম ও ফলভোগ দর্শন করেন মাত্র। এই কারণেই শ্রুতি “ছায়াতপৌ ব্রহ্মবিদো বদন্তি” ইত্যাদি বাক্যে আলোক ও অন্ধকারের তুলনায় উভয়ের পার্থক্য প্রদর্শন করিয়াছেন।
জীব যখন নিত্য নির্ব্বিকার ব্রহ্মেরই স্বরূপ, তখন তাহার অত্যন্ত উচ্ছেদ বা বিকার কোন প্রকারেই সম্ভবপর হয় না; সুতরাং দেহপাতের সঙ্গে সঙ্গে তাহার বিনাশও কল্পনা করা যাইতে পারে না। তাই শ্রুতি অতি গম্ভীরস্বরে বলিয়াছেন যে, “অন্তীত্যেবোপলব্ধব্যঃ”, অর্থাৎ নিত্য সত্য আত্মা আছে, এইরূপই বুঝিতে হইবে; দেহপাতের পর বিনষ্ট হইয়া যায়, এরূপ মনে করিতে হইবে না।
কিন্তু, যাহারা দেহাত্মবাদী, অজ্ঞানান্ধ, প্রমত্ত, হিতাহিত-চিন্তারহিত এবং ধনমদে মত্ত, তাহারা কখনই এই ধ্রুবসত্য পরলোক-তত্ত্বটি উপলব্ধি করিতে পারে না, বা উপলব্ধি করা আবশ্যকও মনে করে না। তাহার ফলে পারলৌকিক
কল্যাণ সাধনেও প্রস্তুত হয় না এবং কোনরূপ সৎক্রিয়া বা, অধ্যাত্ম চিন্তায়, মনোনিবেশ করে না; পরন্তু উচ্ছৃঙ্খলভাবে যাহা ইচ্ছা, তাহাই করিয়া থাকে। তাহাদের সম্বন্ধে যমরাজ বলিয়াছেন—
ন সাম্পরায়ঃ প্রতিভাতি বালং প্রমাদ্যন্তং বিত্তমোহেন মুঢ়ম্। অয়ং লোকো নাস্তি পর ইতি মানী পুনঃ পুনর্বশমাপদ্যতে মে ॥
অর্থাৎ বালস্বভাব(অবিবেকী), প্রমাদগ্রস্ত ও ধনমোহে বিমুগ্ধ লোকের নিকট পরলোক-চিন্তা স্থান পায় না; তাহারা মনে করে, ইহলোক ছাড়া পরলোক বলিয়া কিছু নাই। তাহার ফলে তাহারা বারংবার আমার, অধীন হইয়া বিবিধ যাতনা ভোগ করিয়া থাকে।
আত্মার পরলোকে বিশ্বাস ও তদুপযোগী ক্রিয়ানুষ্ঠান এবং জীবের ব্রহ্মভাবে নিশ্চয় ও তদনুসারে যে ব্রহ্মাত্মৈকত্ব বোধ, ইহাই জীবের যমযাতনা-নিবৃত্তির এবং পরম শ্রেয়ঃ মোক্ষলাভের প্রধান উপায়। জীব যতকাল ব্রহ্মাত্মৈক উপলব্ধি করিতে অসমর্থ থাকে, ততকাল তাহার স্বর্গাদি সুখসম্ভোগ সম্ভবপর হয় বটে, কিন্তু পরমপুরুষার্থ মোক্ষলাভের আশা থাকে না। তাই শ্রুতি উপসংহারে বলিয়াছেন,-“তং স্বাৎ শরীরাৎ প্রবৃহেৎ মুঞ্জাৎ ইব ইষীকাং ধৈর্য্যেণ।” অর্থাৎ মুঞ্জতৃণ হইতে যেরূপ ইষীকা(গর্ভস্থ পত্র) উত্তোলন করে, সেইরূপ ধীরতা অবলম্বনপূর্ব্বক সেই আত্মাকে দেহ হইতে পৃথক্ করিতে হইবে; অর্থাৎ আত্মা যে জড়দেহ হইতে অত্যন্ত পৃথক্ পদার্থ, তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে হইবে; ইহারই নাম বিবেক এবং ইহাই মোক্ষলাভের প্রধান সহায়। বুদ্ধিমান্ মানব উক্তরূপ বিবেকলাভে যত্নপর হইবে। যজুর্বেদে ‘কঠ’ নামে একটি ব্রাহ্মণ এবং একটি সংহিতা আছে। এই ‘কঠোপনিষৎ’ যে কাহার অন্তর্গত, তাহা নির্ণয় করা কঠিন; তবে, অধিকাংশ ‘উপনিষৎ’ ব্রাহ্মণভাগ-প্রসূত; এই কারণে অনেকে মনে করেন যে, ইহাও কঠ ব্রাহ্মণেরই অন্তর্গত। কিন্তু আচার্য্য শঙ্কর স্বামী দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় বল্লীর ব্যাখ্যাস্থলে বলিয়াছেন,-“যদাপি আদিত্য এব মন্ত্রেণোচ্যতে, তদাপি ব্রাহ্মণব্যাপানেপি অবিবোধঃ।” অর্থাৎ যদি মনে কর এই মতে ব্রাহ্মণব্যাখ্যানেহপি অবিরোধঃ।” অর্থাৎ যদি মনে কর, এই যন্ত্রে
১২
॥০
আদিত্যই বর্ণিত হইয়াছেন, তাহা হইলেও আদিত্যই যখন ব্রহ্মস্বরূপ, তখন ব্রাহ্মণকৃত ব্যাখ্যার সহিত ইহার বিরোধ হইতে পারে না। আচার্য্য পরিশেষে “এক এবাত্মা জগতো নামভেদ ইতি মন্ত্রার্থঃ” বলিয়া ইহার মন্ত্রাত্মকতা স্পষ্টাক্ষরে নির্দেশ করিয়াছেন। অতএব, এই কঠোপনিষৎটি সংহিতাভাগের অন্তর্গত বলিয়াই আমাদের মর্নে হয়, ব্রাহ্মণভাগের অন্তর্গত নহে।
শ্রীদুর্গাচরণ শর্ম্মা
সম্পাদক।
প্রথম অধ্যায়।
Ho,
॥ ২০
४०
শ্লোক-সংখ্যা।
হইতে—পর্য্যন্ত।
২৪। আত্মজ্ঞানে মুক্তি, তদভাবে লোকান্তর-প্রাপ্তি; আদর্শাদি আশ্রয়ভেদে আত্ম-প্রতীতির পার্থক্য; ইন্দ্রিয়াদি হইতে পৃথক্ করিয়া আত্মোপলব্ধির উপদেশ; ইন্দ্রিয়াদি অপেক্ষা আত্মার সমুৎকর্ষ কথন এবং আত্মবিষয়ে চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের অগমন ও কেবল বিশুদ্ধ মনের মাত্র গমন......
২৫। পরা গতি বা মুক্তির স্বরূপ কথন; যোগের স্বরূপ নিরূপণ; এবং সোপাধিক ও নিরুপাধিকরূপে আত্মার অস্তিত্ব উপলব্ধির উপদেশ। হৃদয়স্থ সর্ব্ব বাসনা ত্যাগ ও সমস্ত গ্রন্থিচ্ছেদে এবং হৃদয়স্থ এক শত একটা নাড়ীর মধ্যে মূর্দ্ধন্য নাড়ীযোগে দেহত্যাগে ব্রহ্মপ্রাপ্তি, আর অন্যান্য নাড়ী দ্বারা নিষ্ক্রমণে লোকান্তরপ্রাপ্তি নিরূপণ; এবং হৃদয়স্থ অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত আত্মাকে দেহ হইতে বিবিক্তভাবে বা পৃথকরণে মুক্তিলাভ; পরিশেষে উপনিষৎপাঠের ফলশ্রুতি বর্ণন......
ওঁ পরমাত্মনে নমঃ। ওঁ নমো ভগবতে বৈবস্বতায় মৃত্যবে ব্রহ্মবিদ্যাচার্য্যায় নচিকেতসে চ। অথ কঠোপনিষদ্বল্লীনাং সুখার্থপ্রবোধনার্থমল্লগ্রন্থাবৃত্তিরারভ্যতে। সদের্ধাতোর্বিশরণগত্যবসাদনার্থস্য উপনিপূর্ব্বস্য কিপ্রত্যয়ান্তস্য রূপমিদম্ “উপনিষৎ” ইতি। উপনিষচ্ছব্দেন চ ব্যাচিখ্যাসিত-গ্রন্থ-প্রতিপাদ্যবেদ্য-বস্তুবিষয়া বিদ্যোচ্যতে। কেন পুনরর্থযোগেন উপনিষচ্ছব্দেন বিদ্যোচ্যত.ইতি? উচ্যতে, যে মুমুক্ষবো দৃষ্টানুশ্রবিকবিষয়বিতৃষ্ণাঃ সন্তু’ উপনিষচ্ছব্দবাচ্যাং বক্ষ্যমাণলক্ষণাং বিদ্যা- মুপসদ্যোপগম্য তন্নিষ্ঠতয়া নিশ্চয়েন শীলয়ন্তি, তেষামবিদ্যাদেঃ সংসারবীজন্য বিশরণাদ্ধিংসনাদ্ বিনীশনাৎ ইত্যনেনার্থযোগেন বিদ্যোপনিষদিত্যুচ্যতে। তথাচ বক্ষ্যতি, “নিচায্য তং মৃত্যুমুখাৎ প্রমুচ্যতে” ইতি। পূর্ব্বোক্তবিশেষণান্মুক্ষন্ বা পরং ব্রহ্ম গময়তি ইতি ব্রহ্মগময়িত্বেন যোগাদ্রহ্মবিদ্যা উপনিষৎ। তথাচ বক্ষ্যতি “ব্রহ্মপ্রাপ্তো বিরজোহভূদ্বিমৃত্যুঃ” ইতি। লোকাদিব্রহ্মজ্ঞঃ, যোহগ্নিঃ, তদ্বিষয়ারা বিদায়া দ্বিতীয়েন বরেণ প্রার্থ্যমানায়াঃ স্বর্গলোকফলপ্রাপ্তিহেতুত্বেন গর্ভ- বাসজন্মজরাদ্যপদ্রববৃন্দস্য লোকান্তরে পৌনঃপুন্যেন প্রবৃত্তস্থ্য অবসাদয়িত্বেন শৈথিল্যাপাদনেন ধাত্বর্থযোগাদগ্নিবিদ্যাপি উপনিষদিত্যুচ্যতে। তথাচ বক্ষ্যতি, “স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্তে” ইত্যাদি।
ননু চোপনিষচ্ছব্দেন অধ্যেতারো গ্রন্থমগ্যভিলপন্তি—‘উপনিষদমধীমহে উপ- নিষদমধ্যাপয়ামঃ’ ইতি চ। এবম্; নৈষ দোষঃ, অবিদ্যাদিসংসারহেতুব্বিশরণাদেঃ সদি-ধাত্বর্থস্য গ্রন্থমাত্রেহসম্ভবাদবিদ্যায়াঞ্চ সম্ভবাৎ গ্রন্থস্যাপি তাদর্থ্যেন তচ্ছব্দোপ- পত্তেঃ; “আয়ুর্ব্বে ঘৃতম্” ইত্যাদিবৎ। তস্মাবিদ্যায়াং মুখ্যয়া বৃত্ত্যা উপনিষচ্ছব্দো বর্ততে; গ্রন্থে তু ভক্ত্যেতি। এবমুপনিষন্নিৰ্বচনেনৈব বিশিষ্টোহধিকারী বিদ্যায়াম্ উক্তঃ। বিষয়শ্চ বিশিষ্ট উক্তো বিদ্যায়াঃ পরং ব্রহ্ম প্রত্যগাত্মভূতম্। প্রয়োজন- ঞ্চাস্থা, উপনিষদ আত্যন্তিকী সংসারনিবৃত্তিব্রহ্মপ্রাপ্তিলক্ষণা। সম্বন্ধশ্চৈবস্তুত- প্রয়োজনেনোক্তঃ। অতো যথোক্তাধিকারি-বিষয়-প্রয়োজন-সম্বন্ধায়া বিদ্যায়াঃ করতলন্যস্তামলকবৎ-প্রকাশকত্বেন বিশিষ্টাধিকারি-বিষয়-প্রয়োজন-সম্বন্ধা এতা বল্ল্যো ভবস্তীতি। অতস্তা যথাপ্রতিভানং ব্যাচক্ষ্মহে।
%
পরমাত্মার উদ্দেশে নমস্কার, ব্রহ্ম-বিদ্যাপ্রবর্ত্তক ভগবান্ বৈবস্বত ও তাঁহার শিষ্য নচিকেতার উদ্দেশে নমস্কার।(অথ *) উক্তপ্রকার মঙ্গলাচরণের পর কঠোপনিষদ্বল্লীসমূহের অনায়াসে অর্থগ্রহণোপ- যোগী অনতিবিস্তীর্ণ বৃত্তি(ব্যাখ্যা) আরব্ধ হইতেছে,—
‘সদ্’ ধাতুর অর্থ—বিশরণ(শিথিলীকরণ—জীর্ণতা-সম্পাদন), গতি ও অবসাদন(বিনষ্টকরণ)।[‘উপ’ অর্থ—নিকট ও সত্বর, এবং ‘নি’ অর্থ নিশ্চয় ও নিঃশেষ—সম্পূর্ণরূপে।] উক্তার্থ-সম্পন্ন উপ-নিপূর্ব্বক ‘সদ্’ ধাতু ‘হইতে ‘ক্বিপ্’ প্রত্যয় যোগে ‘উপনিষৎ’ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। এই ব্যাখ্যাতব্য গ্রন্থের প্রতিপাদ্য ‘বস্তুবিষয়ক বিদ্যাকে ‘উপনিষৎ’ বলা হয়।[‘সদ্’ ধাতুর যে তিনপ্রকার অর্থ আছে, তন্মধ্যে] কোন্ অর্থানুসারে ‘উপনিষৎ’ শব্দে বিদ্যাকে বুঝায়? বলা যাইতেছে,—যে সকল মুমুক্ষু পুরুষ ঐহিক(দৃষ্ট) ও পারলৌকিক (আনুশ্রবিক) বিষয় ভোগে বিতৃষ্ণ হইয়া। অর্থাৎ বৈরাগ্যসম্পন্ন
হইয়া ‘উপনিষৎ’ শব্দবাচ্য, বক্ষ্যমাণ বিদ্যার আশ্রয় লইয়া তদগতভাবে নিঃসংশয়-চিত্তে ঐ বিদ্যার অনুশীলন করে, তাহাদের সংসার-বীজ অর্থাৎ জন্ম-মরণকারণীভূত অবিদ্যা প্রভৃতিকে বিশীর্ণ(শিথিল বা ক্ষয়োমুখ) করে এবং হিংসা করে—বিনষ্ট করিয়া দেয়; এইরূপ অর্থযোগেই বিদ্যাকে ‘উপনিষৎ’ বলা হয়। এই উপনিষদেও বলিবেন যে, ‘তাঁহার সেবা করিয়া মৃত্যু-গ্রাস হইতে পরিত্রাণ পায়’ অথবা, পূর্ব্বোক্ত লক্ষণ-সম্পন্ন মুমুক্ষুগণকে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত করায়, অর্থাৎ ব্রহ্ম- সমীপে লইয়া যায়; এই- ব্রহ্মপ্রাপ্তি-সাধনত্বরূপ অর্থানুসারেও ‘উপনিষৎ’ শব্দে ব্রহ্ম-বিদ্যা বুঝায়। এ গ্রন্থে এরূপ কথা এখানেও বলা হইবে,[নচিকেতা ব্রহ্মবিদ্যা-বলে] ‘বিরজ(ধর্মাধৰ্ম্মরহিত) ও বিমৃত্যু(কামনা ও অবিদ্যাবর্জিত) হইয়া ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।’ তা‘ছাড়া, নচিকেতা দ্বিতীয় বরে, ভূঃপ্রভৃতি লোকসমুদয়ের অগ্রেজাত ও ব্রহ্মসম্ভূত যে অগ্নির তত্ত্ব(অগ্নিবিদ্যা) জানিবার অভিলাষ করিয়া- ছিলেন, সেই অগ্নিবিদ্যার বলে স্বর্গলোক লাভ করা যায়, এবং তাহার ফলে ভিন্ন ভিন্ন লোকে যে বারংবার গর্ভবাস, জন্ম, জরা ও মরণাদি উপদ্রব ভোগ করিতে হয়, তাহার অবসাদন বা শৈথিল্য করা হয়; এই কারণে উক্ত ধাত্বর্থানুসারে অগ্নিবিদ্যাকেও ‘উপনিষৎ’ বলা যাইতে পারে। এখানেও ‘স্বর্গগামীরা অমৃতত্ব ভোগ ‘করে’ ইত্যাদি বাক্যে ঐরূপ কথাই বলিবেন।
এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, কেন পাঠকগণ’ ব্রহ্মবিদ্যাপ্রতিপাদক গ্রন্থকেও ‘উপনিষৎ’ বলিয়া থাকে? যথা—‘আমরা উপনিষৎ অধ্যয়ন করিতেছি এবং অধ্যাপনা করিতেছি’ ইত্যাদি। হ্যাঁ, ওরূপ ব্যবহারে দোষ হয় না; কারণ, সংসারের কারণীভূত অবিদ্যাদি দোষসমূহের বিশরণ বা শৈথিল্য-সম্পাদন প্রভৃতি ‘সদ্’ ধাতুর যে সমুদয় অর্থ উক্ত আছে, শুধু গ্রন্থে তাহার সম্ভব হয় না, পরন্তু বিদ্যাতেই সম্ভব হয়; অথচ সেই ব্রহ্মবিদ্যা প্রতিপাদনই যখন গ্রন্থের উদ্দেশ্য, এই কারণে
۱۷
‘আয়ুর্বৈ ঘৃতম্’, অর্থাৎ ঘৃতই আয়ুঃ, এইস্থলে যেরূপ আয়ুর কারণ বলিয়া ঘৃতকেই ‘আয়ু’ বলা হইয়া থাকে, সেইরূপ ব্রহ্ম-বিদ্যা-প্রতি- পাদক গ্রন্থেও তৎপ্রতিপাদ্য বিদ্যা-বোধক ‘উপনিষৎ’ শব্দের প্রয়োগ অসঙ্গত হয় না বা হইতে পারে না। অতএব, ব্রহ্ম-বিদ্যাই উপনিষদের মুখ্য অর্থ, গ্রন্থে তাহার গৌণ অর্থ। ‘উপনিষৎ’ শব্দের উক্ত প্রকার অর্থ নির্বচনেই ব্রহ্মবিদ্যা সম্বন্ধে অধিকারিগত বিশেষও উক্ত হইল বুঝিতে হইবে। উপনিষদের বিষয় হইল—সর্বভূতের আত্মস্বরূপ পরব্রহ্ম; প্রয়োজন—আত্যন্তিক সংসার-নিরুক্তিরূপ(যে নিবৃত্তির পর আর জন্ম-মরণাদিরূপ সংসার হয় না)’ ব্রহ্মপ্রাপ্তি, এবং উক্তপ্রকার প্রয়োজনের সহিত উপনিষদের প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদকত্বরূপ সম্বন্ধও কথিত হইল। পূর্ব্বোক্তপ্রকার(‘মুমুক্ষু) অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন-সম্পন্ন এই বিদ্যা, করতলন্যস্তামলকের ন্যায় আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে, এই কারণে এই কঠোপনিষদের বল্লী বা অধ্যায়সমূহ বিশিষ্ট অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন-সম্পন্ন; অতএব, আমরা (ভাষ্যকার) যথামতি সেই সকল বল্লীর ব্যাখ্যা করিব।
—:*:—
প্রথমা বল্লী।
ওঁ সহ নাববতু। সহ, নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বি, নীবধীতমস্তু ‘মা বিদ্বিষাবহৈ ॥ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥
উশন্ হ বৈ বাজশ্রবসঃ সর্ব্ববেদসন্দদৌ। তস্য হ নচিকেতা নাম পুত্র আস ॥ ১ ॥
প্রণম্য গুরুপাদাজং স্বত্বা শঙ্কর-ভাষিতম্। কঠোপনিষদাং ব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে॥
[অথ ব্রহ্মবিদ্যাং বিবক্ষুঃ বেদপুরুষঃ শ্রোতুঃ শ্রদ্ধাসমুৎপাদনায় আখ্যায়িকা- মাহ উশন্নিত্যাঙ্গিনা]। বাজশ্রবসঃ(বাজমন্নম্, তদ্দানাদিনিমিত্তং শ্রবঃ যশঃ- যস্য, সুঃ বাজশ্রবাঃ, তস্য নপ্তরূপগোত্রাপত্যং বাজশ্রবসঃ ঔদ্দালকির্নাম ঋষিঃ) [বিশ্বজিতা সর্ব্বমেধেন ঈজে]। স উশন্ স্বর্গলোকমিচ্ছন্নিত্যর্থঃ হ বৈ[হ বৈ ইতি ঐতিহ্যস্মারকৌ নিপাতৌ], সর্ব্ববেদসং(সর্ব্বস্বং) দদৌ(ব্রাহ্মণেভ্যো দত্তবান্)। তস্য হ(‘প্রসিদ্ধস্য বাজশ্রবসস্থ্য) নচিকেতাঃ নাম(নচি- কেতোনামা প্রসিদ্ধঃ) পুত্রঃ আস(আসীৎ)।[‘আস’ ইতি পদং ছান্দসং তিঙন্ত প্রতিরূপকমব্যয়ং বা]॥
[ বক্ষ্যমাণ ব্রহ্মবিদ্যায় শ্রোতার শ্রদ্ধা সমুৎপাদনার্থ বেদ নিজেই একটি আখ্যায়িকার অবতারণা করিতেছেন],—বাজ অর্থ—অন্ন, সেই অন্নদান করিয়া যিনি যশস্বী হইয়াছিলেন, তিনি ‘বাজশ্রবাঃ’; তাঁহার পৌত্র প্রভৃতি সন্তানকে
‘বাজশ্রবস’ বলা যায়। উদ্দালক-পুত্র সেই বাজশ্রবস মুনি ‘বিশ্বজিৎ’ নামক যজ্ঞ করিয়াছিলেন; তিনি তাহাতে স্বর্গলোক লাভের ইচ্ছায় সমস্ত সম্পত্তি দান করিয়াছিলেন। ‘নচিকেতা’ নামে তাঁহার একটি পুত্র ছিল ॥ ১॥
তত্রাখ্যায়িকা বিদ্যাস্তত্যর্থা।” উশন্ কাময়মানঃ, হ বৈ ইতি বৃত্তার্থস্মরণার্থৌ নিপাতৌ। বাজমন্নম্, তদ্দানাদিনিমিত্তং শ্রবো যশো যস্য, সঃ বাজশ্রবাঃ, রূঢ়িতো বা, তস্যাপত্যং বাজশ্রবসঃ। সঃ বাজশ্রবসঃ কিল বিশ্বজিতা সর্ব্বমেধেনেজে —তৎফলং কাময়মানঃ। স চৈতস্মিন্ ক্রতৌ সর্ব্ববেদসং সর্ব্বস্বং ধনং দদৌ দত্তবান্। তস্য যজমানস্য হ নচিকেতানাম, পুত্রঃ কিলু আস বভূব ॥ ১ ॥
এই উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যার স্তুতি বা প্রশংসার্থ আখ্যায়িকা(গল্প) প্রদত্ত হইয়াছে। ‘উশন্’ অর্থ—ফলকামী, ‘হ’ ও ‘বৈ’ কথা দুইটি নিপাত শব্দ(ব্যাকরণের কোন নিয়মে সিদ্ধ নহে), অতীত ঘটনা স্মরণ করান ঐ দুইটি পদের উদ্দেশ্য। ‘বাজ’ অর্থ—অন্ন; অন্নদানে যাঁহার যশঃ হইয়াছে, তাঁহার নাম ‘বাজশ্রবা’। অথবা, উহা অর্থহীন নাম মাত্র। বাজশ্রবার সন্তান—‘বাজশ্রবস’ নামক ঋষি যজ্ঞের যথোক্ত ফল পাইবার নিমিত্ত সর্ব্বমেধ(যাহাতে সমস্ত সম্পত্তি দান করিতে হয় এমন) ‘বিশ্বজিৎ’ নামক যজ্ঞ করিয়া- ছিলেন। তিনি এই যজ্ঞে(নিজের) সমস্ত সম্পত্তি দান করিয়া- ছিলেন। সেই ‘যজমানের(যিনি যজ্ঞ করিয়াছেন) নচিকেতা নামে এক পুত্র ছিল॥ ১॥
তৎহ কুমারহংসন্তং দক্ষিণাসু নীয়মানাসু শ্রদ্ধাবিবেশ, সোহমন্যত ॥ ২ ॥
দক্ষিণাসু নীয়মানাসু(পিত্রা জরা-জীর্ণাসু গোযু ব্রাহ্মণেভ্যো দক্ষিণার্থং দীয়মানান্বিত্যর্থঃ)। তৎ কুমারৎ সন্তং(বাল্যে বয়সি স্থিতং নচিকেতসং) শ্রদ্ধা (আস্তিক্যবুদ্ধিঃ) আবিবেশ(প্রবিবেশ, স শ্রদ্ধাবান্ বভূবেত্যর্থঃ)।[জরঠ-নির্বীর্য্য-
গবাদ্যনুপযুক্তবস্তুদানসময়ে অনুপযুক্তগবাদিকমস্বর্গ্যং কিমর্থং দদাতি পিতা, ন দেয়মিতি বদামীতি পুত্রস্য বুদ্ধিরাসীদিতি ভাবঃ] সঃ(নচিকেতাঃ) অমন্যত (মনসি অকরোৎ) ॥
পিতা যজ্ঞীয় দক্ষিণা-স্বরূপ জরাজীর্ণ গোসকল ব্রাহ্মণকে দান করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এমন সময়ে সেই বালক নচিকেতার হৃদয়ে শ্রদ্ধার উদ্রেক হইল; তিনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন ॥ ২ ॥
তং হ নচিকেতসং কুমারং প্রথমবয়সং সন্তমপ্রাপ্তপ্রজননশক্তিং বালমেব শ্রদ্ধা আস্তিক্যবুদ্ধিঃ পিতুর্হিতকামপ্রযুক্তা আবিবেশ প্রবিষ্টবতী। কস্মিন্ কালে? ইত্যাহ, —ঋত্বিগভ্যঃ সদস্যেভ্যশ্চ দক্ষিণাসু নীয়মানাসু বিভাগেনোপনীয়মানাসু দক্ষিণার্থাসু গোষু স আবিষ্টশ্রদ্ধো নচিক্কেতাঃ অমন্যত ॥ ২ ॥
সেই নচিকেতা কুমার—প্রথমবয়সে স্থিত অর্থাৎ তখনও সন্তানোৎপাদন শক্তি লাভ করে নাই, এরূপ বালক হইলেও পিতার হিতাকাঙ্ক্ষা বশতঃ তাঁহাতে তাঁহার হৃদয়ে) শ্রদ্ধা অর্থাৎ আস্তিক্য- বুদ্ধি(শাস্ত্রের ও ঋষিবাক্যের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস) আবির্ভূত হইল। কোন্ সময়? তাই বলিতেছেন,—পিতা যখন ঋত্বিক্ ও সদস্যগণের উদ্দেশে দক্ষিণা লইয়া যাইতেছেন, অর্থাৎ যজ্ঞের ব্রতী ও ক্রিয়ার দোষগুণ-পরীক্ষক সদস্যগণের দক্ষিণার্থ পৃথক্ পৃথক্ ভাবে গোসকল উপস্থাপিত করিতেছেন *, সেই সময় নচিকেতা শ্রদ্ধা- যুক্ত হইয়া মুনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন ॥ ২ ॥
পীতোদকা জঘ্নতৃণা দুগ্ধদোহা নিরিন্দ্রিয়াঃ। অনন্দা নাম তে লোকাস্তান্ স গচ্ছতি তা দদৎ ॥৩৷৷
[শ্রদ্ধাপ্রযুক্তং মননপ্রকারমেব অভিব্যনক্তি-পীতোদকা ইত্যাদিনা]। পীতোদকাঃ(পীতম্ উদকং যাভিঃ, ন পুনঃ পাতব্যমস্তি, তাঃ) জগ্ধতৃণাঃ(জগ্ধ- মেব তৃণং যাভিঃ, ন তু জগ্ধব্যমস্তি, তাঃ তথোক্তাঃ ভোগশক্তিহীনা ইতি যাবৎ) দুগ্ধদোহাঃ(দুহ্যত ইতি দোহঃ ক্ষীরম্; দুগ্ধ এব দোহো যাসাম্, ন পুনঃ দোগ্ধব্যমস্তি, তা দুগ্ধহীনাঃ) নিরিন্দ্রিয়াঃ(ইন্দ্রিয়শক্তিশূন্যাঃ বৃদ্ধা ইতি ভাবঃ) তাঃ (উক্তরূপা গাঃ) দদৎ(প্রযচ্ছন্) সঃ(পুমান্) তান্(লোকান্) গচ্ছতি, অনন্দাঃ(অবিদ্যমানসুখাঃ) নাম তে(প্রসিদ্ধাঃ)[যে লোকাঃ সন্তি ইতি শেষ:]
যে সকল গো জন্মের মত জল পান করিয়াছে, তৃণ ভক্ষণ করিয়াছে, দুগ্ধ দান করিয়াছে এবং ইন্দ্রিয়রহিত হইয়াছে, যে ব্যক্তি সেই সকল গো দান করে, সে অনন্দ অর্থাৎ দুঃখ-বহুলরূপ প্রসিদ্ধ লোকে গমন করে॥ ৩॥
কথম্?—ইত্যুচ্যতে—পীতোদকা ইত্যাদিনা। দক্ষিণার্থা গাবো বিশেষ্যন্তে,— পীতমুদকং যাভিঃ তাঃ পীতোদকাঃ। জগ্ধং ভক্ষিতং তৃণং যাভিঃ তাঃ জগ্ধতৃণাঃ। দুগ্ধো দোহঃ ক্ষীরাখ্যো যাসাং তা দুগ্ধদোহাঃ। নিরিন্দ্রিয়াঃ প্রজননাসমর্থাঃ জীর্ণাঃ নিষ্ফলা গাব ইত্যর্থঃ। তা এবস্তুতাঃ গাঃ ঋত্বিগভ্যো দক্ষিণাবুদ্ধ্যা দদৎ প্রযচ্ছন্, অনন্দা অনানন্দাঃ অসুগ্রা নাম ‘যে তে লোকাঃ, তাঁন্ স যজমানো গচ্ছতি ॥ ৩ ॥
কিরূপ ভাবনা করিয়াছিলেন? ‘পীতোদকাঃ’ ইত্যাদি বাক্যে তাহা কথিত হইতেছে। দক্ষিণার্থ প্রদেয় গোসকলের বিশেষণ প্রদত্ত হইতেছে,—যে সকল গো পীতোদক—যাহারা শেষ উদক (জল) পান করিয়াছে(আর পান করিবে না), জঘ্নতৃণ—যাহারা [জন্মের মত] তৃণ ভক্ষণ করিয়াছে(আর ভক্ষণ করিবে ‘না), দুগ্ধদোহ—যাহাদের শেষ ক্ষীর দোহন করা হইয়াছে(আর দোহন,
করিতে হইবে না), এবং নিরিন্দ্রিয়—আর সন্তানোৎপাদনে অসমর্থ, অর্থাৎ জরাজীর্ণ ও নিষ্ফল। যে যজমান(যজ্ঞকর্তা) এবংভূত গোসকলকে দক্ষিণাবুদ্ধিতে প্রদান করে, সেই যজমান তাদৃশ দানের ফলে সেই যে, প্রসিদ্ধ আনন্দরহিত—অসুখময় লোক, তাহাতে গমন করে ॥ ৩ ॥
স হোবাচ পিতরং তত কস্মৈ মাং দাস্যসীতি।
দ্বিতীয়ং তৃতীয়ং তংহোবাচ’ মৃত্যবে ত্বা দদামীতি ॥ ৪ ॥
[মনন প্রকারমুপসংহরন্ উক্তিপ্রকারমাহ—স হোবাচেতি]। সঃ(নচিকেতাঃ) হ (ঐতিহ্যদ্যোতকমব্যয়ম্) পিতরম্[উপগম্য] উবাচ তত(হে তাত), কম্মৈ (ঋত্বিজে) মাম্[দক্ষিণার্থম্] দাস্যসি ইতি[মাং দত্ত্বাপি যজ্ঞোপকারঃ কথঞ্চিৎ করণীয়- ইত্যভিপ্রায়ঃ]। দ্বিতীয়ং তৃতীয়ম্(এবম্প্রকারেণ দ্বিতীয়বারং তৃতীয়বারমপি উবাচ—কস্মৈ মাং দাস্যসীতি)।[অনন্তরং পিতা ক্রুদ্ধঃ সন্] তম্(পুত্রম্) ই, (কিল) উবাচ ত্বা(ত্বাম্) মৃত্যবে(যমায়) দদামি(ত্বং ম্রিয়স্ব ইত্যর্থঃ)॥
নচিকেতার চিন্তা-প্রণালীর উপসংহার করতঃ এখন উক্তির প্রণালী নির্দেশ করিতেছেন। সেই ‘নচিকেতা পিতাকে বলিলেন,—পিতঃ! আপনি আমাকে কোন্ ঋত্বিকের উদ্দেশে দান করিবেন? অভিপ্রায় এই যে, যদি পুত্রকে দান করিয়াও যজ্ঞের কথঞ্চিং উপকার হইতে পারে, তাহা করা উচিত। নচিকেতা এইরূপে দুইবার, তিনবার পিতাকে বলিলেন;[ অনন্তর, পিতা ক্রুদ্ধ হইয়া] পুত্রকে বলিলেন,—তোমাকে যমের উদ্দেশে দান করিলাম ॥৪॥
তদেবং ক্রত্বসম্পত্তিনিমিত্তং পিতুরনিষ্টং ফলং ময়া পুত্রেণ সতা নিবারণীয়ম্ আত্মপ্রদানেনাপি ক্রতুসম্পত্তিং কৃত্বা, ইত্যেবং মন্যমানঃ পিতরমুপগম্য স হোবাচ পিতরম্, হে তত তাত কম্মৈ ঋত্বিবিশেষায় দক্ষিণার্থং মাং দাস্যসীতি প্রযচ্ছগীতি। এতদেবমুক্তেনাপি পিত্রা উপেক্ষ্যমাণোহপি দ্বিতীয়ং তৃতীয়মপি
উবাচ—কম্মৈ মাং দাস্যসি কম্মৈ মাং দাস্যসীতি। নায়ং কুমারস্বভাব ইতি ক্রুদ্ধঃ সন্ পিতা তং হ পুত্রং কিল উবাচ—মৃত্যবে বৈবস্বতায় ত্বাং দদামীতি ॥৪॥
নচিকেতা ভাবিতে লাগিলেন,-এইরূপে যজ্ঞের অপূর্ণতা বা অঙ্গহীনতা-নিবন্ধন পিতার যে অনিষ্ট ফল হইতেছে, আমি তাঁহার পুত্র বিধায় আমার পক্ষে প্রাণ দিয়াও যজ্ঞের পূর্ণতা সম্পাদনপূর্ব্বক সেই অনিষ্ট নিবারণ করা আবশ্যক। নচিকেতা এইরূপ মনে করিয়া পিতার সমীপে উপস্থিত হইলেন এবং পিতাকে বলিতে লাগিলেন,- তত(পিতঃ)! আমাকে দক্ষিণাস্বরূপ কোন্ ঋত্বিকের উদ্দেশে প্রদান করিবেন? নচিকেতা এইরূপ বলিলেও পিতা প্রথমতঃ তাহা উপেক্ষা করিলেন। কিন্তু নচিকেতা উপেক্ষিত হইয়াও আবার বলিতে লাগিলেন,-আমাকে কাহার উদ্দেশে দান করিবেন, আমাকে কাহার উদ্দেশে দান করিবেন? নচিকেতা দুই তিনবার এইরূপ বলিলে পর, পিতা বুঝিলেন যে, ইহার স্বভাব ত বালকের মত নহে[নিতান্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ]! তখন ক্রোধ সহকারে পুত্রকে বলিলেন,-বৈবস্বত(সূর্য্য-পুত্র) মৃত্যুর উদ্দেশে তোমাকে দান করিতেছি ॥ ৪ ॥
বহুনামেমি প্রথমে বহুনামেমি মধ্যমঃ।
কিংশ্বিদ্ যমস্য কর্ত্তব্যং যন্ময়াদ্য করিষ্যতি ॥ ৫ ॥
[পিত্রা এবমুক্তঃ সন্ নচিকেতাঃ এবং চিন্তিতবান্—বহুনামিতি]। বহুনাম্ (শিষ্য-পুত্রাদীনাম্)[মধ্যে][অহম্] ‘প্রথমঃ[সন্][প্রথময়া গুরুশুশ্রূষায়াং মুখ্যয়া শিষ্যাদিবৃত্ত্যা] এমি(ভবামি)। বহুনাম্(মধ্যমানাং চ)[মধ্যে] মধ্যমঃ[বা সন্] [মধ্যময়া শিষ্যাদিবৃত্ত্যা বা] এমি। যমস্য কিং স্বিৎ(কিং বা), কর্তব্যম্ (তৎপ্রয়োজনমস্তি),[পিতা] অদ্য[প্রদত্তেন] ময়া(পুত্রেণ) যৎ(যৎপ্রয়োজনম্) করিষ্যতি(সম্পাদরিষ্যতি)।[কিমপি প্রয়োজনং নাস্তি, কেবলং ক্রোধবশাৎ অহং পিত্রা এবমুক্তোহস্মি ইত্যাশয়ঃ]॥.
পিতার উক্তি শ্রবণের পর নচিকেতা এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন,— বহুর অর্থাৎ পিতার উত্তম শিষ্য-পুত্রাদির মধ্যে গুরুশুশ্রূষাকার্য্যে আমি প্রথম (শ্রেষ্ঠ) হইয়া থাকি, এবং বহু মধ্যমের মধ্যেও আমি[অন্ততঃ] মধ্যম হইয়া থাকি; কিন্তু কখনও অধম(নিকৃষ্ট শ্রেণীভুক্ত) হই’না।[তথাপি] যমের নিকট পিতার এমন কি কর্তব্য বা প্রয়োজন ছিল, যাহা অদ্য আমার দ্বারা সম্পাদন করিবেন? ৫ ॥
স এবমুক্তঃ পুত্র একান্তে, পরিদেরয়াঞ্চকার। কথমিতি উচ্যতে—বহুনাং শিষ্যাণাং পুত্রাণাং বা এমি গচ্ছামি প্রথমঃ সন্ মুখ্যয়া শিষ্যাদিবৃত্ত্যা ইত্যর্থঃ। মধ্যমানাঞ্চ বহুনাং মধ্যমো মধ্যময়ৈব বৃত্ত্যা এমি; নাধময়া কদাচিদপি। তমেবং বিশিষ্টগুণমপি পুত্রং মাং “মৃত্যবে ত্বা দদামি” ইত্যুক্তবান্ পিতা। স কিং স্বিদ্ যমস্য কর্তব্যং প্রয়োজনং ময়া প্রদত্তেন করিয্যতি, যৎ কর্তব্যমদ্য। নূনং প্রয়োজনমনপেক্ষ্যৈব ক্রোধবশাদুক্তবান্ পিতা। তথাপি তৎ পিতুর্ব্বচো মৃষু মাভূদিতি ॥৫॥
ক্রুদ্ধ পিতা এইরূপ বলিলে পর, পুত্র নচিকেতা নির্জ্জনে বসিয়া বহুক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিলেন। কি প্রকার চিন্তা, তাহা বলা হই- তেছে,—শিষ্য ও পুত্র প্রভৃতির যাহা উত্তম বৃত্তি(ব্যবহার), সেই ব্যবহারের গুণে বহু শিষ্য বা পুত্রগণের মধ্যে আমি প্রথম স্থান লাভ করিয়া থাকি,[অন্ততঃ] বহুতুর মধ্যম-শ্রেণীর শিষ্যাদির মধ্যে মধ্যম বৃত্তির(মাঝামাঝি ব্যবহারের) দ্বারা মধ্যম স্থানও অধিকার করিয়া থাকি; কিন্তু কখনও অধম বৃত্তি দ্বারা[অধম হই না]*। আমি
২
এরূপ বিশিষ্টগুণসম্পন্ন পুত্র হইলেও পিতা আমাকে ‘মৃত্যুর উদ্দেশে তোমাকে দান করিতেছি’ বলিলেন! তিনি অদ্য আমাকে দান করিয়া, আমার দ্বারা যমের কি প্রয়োজন সম্পাদন করিবেন? নিশ্চয়, পিতা কোন প্রয়োজন চিন্তা না কবিয়াই কেবল ক্রোধবশে আমাকে ঐরূপ বলিয়াছেন মাত্র।[যাহা হউক,] তথাপি পিতার বাক্য মিথ্যা না হউক * ॥ ৫ ॥
[কথন-প্রকারমেবাহ অনুপশ্যেত্যদিনা--অনুপশ্যেতি]। ‘পূর্ব্বে(পূর্ব্ববর্তিনঃ পিতৃ- পিতামহাদয়ঃ) যথা(যেন প্রকারেণ)[গর্তাঃ, তান্] অনুপশ্য[পূর্ব্বক্রমেণ আলোচয়] তথা পরে(বর্তমানাঃ সাধবশ্চ)[যথা বর্তন্তে, তান্ অপি] প্রতিপশ্য(বিচারয়)। আলোচ্য চ ভবানপি তেষামের চরিত্রমনুসরতু ইত্যাশয়ঃ অসত্যাচরণং তু মাকার্ষীৎ ইত্যাশয়েনাহ-] মর্ত্যঃ(মরণশীলো মনুষ্যঃ)[যতঃ] শস্যম্ ইব পচাতে[কালকৰ্ম্মবশাৎ মরণোমুখো ভবতি-ম্রিয়তে ইতি যাবৎ]। শস্যম্ ইব পুনঃ আজায়তে(কালকৰ্ম্মবশাৎ উৎপদ্যতে চ)।[অতঃ মর্ত্যানাং জন্ম-মরণয়োঃ অবশ্যম্ভাবিত্বাৎ যমায় মাং প্রযচ্ছতো ভবতঃ শোকো ন যুক্ত ইতি ভাবঃ] ॥
[ অনুপশ্য ইত্যাদি শ্লোকে নচিকেতার, উক্তি বর্ণিত হইতেছে]—পূর্ব্বতন পিতৃপিতামহগণ যেরূপে গিয়াছেন, অর্থাৎ যে প্রকার আচরণ করিয়াছেন, উত্তমরূপে তাঁহাদের সেই চরিত্র একে একে আলোচনা করিয়া দেখুন, এবং
বর্তমান সাধু জনেরাও যেরূপ আচরণ করিয়া থাকেন, তাহাও বেশ করিয়া চিন্তা করিয়া দেখুন[তাঁহাদের চরিত্র চিন্তা করিয়া আপনিও তদনুরূপ আচরণ করুন, কখনই সত্যভঙ্গ করিবেন না]। যেহেতু মরণশীল মনুষ্য শস্যের মত নিজ নিজ কর্মানুসারে সময়-বিশেষে মরিয়া যায়, এবং শস্যেরই মত কৰ্ম্মবশে পুনর্ব্বার জন্ম-লাভ করে, অর্থাৎ মনুষ্যের জন্ম-মরণ অবশ্যম্ভাবী[অতএব যমের উদ্দেশে দান করায় আপনার শোক করা উচিত হয় না] ॥ ৬॥
এবং মত্বা পরিবেদনা-পূর্ব্বকমাহ পিতরং শোকাবিষ্টম্ ‘কিং ময়োক্তম্’ ইতি। অনুপশ্য আলোচয়—বিভাবয় অনুক্রমেণ—যথা যেন প্রকারেণ বৃত্তাঃ পূর্ব্বে অতি- ক্রান্তাঃ পিতৃপিতামহাদয়স্তব; তান্ দৃষ্টা চ তেষাং বৃত্তম্ অনুষ্ঠাতুম্ অর্হসি। বর্ত্ত- মানাশ্চ অপরে সাধবো যথা বর্ত্তন্তে তাংশ্চ তথা প্রতিপশ্য আলোচয়। ন চ তেষাং মৃষাকরণং বৃত্তং বর্তমানং বা অস্তি। তদ্বিপরীতমসতাঞ্চ বৃত্তং মৃষাকরণম্। ন চ মৃষাভূতং কৃত্বা কশ্চিদজরামরো ভবতি। যতঃ শস্যমিব মর্ত্যো মনুষ্যঃ পচ্যতে জীর্ণো ম্রিয়তে, মৃত্বা চ শস্যমিব আজায়তে আবির্ভবতি পুনঃ। এবমনিত্যে জীবলোকে কিং মৃষাকরণেন?—পালয়াত্মনঃ সত্যম্;—প্রেষয় মাং যমায়েত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৬ ॥
এইরূপ মনে করিয়া দীর্ঘচিন্তার পর, ‘আমি কি বলিয়া ফেলি- লাম!’ এই ভাবনায় শোকান্বিত পিতাকে বলিতে লাগিলেন,- [হে পিতঃ!] আপনার পূর্বতন’ পিতৃ-পিতামহগণ যেরূপ বৃত্তি (ব্যবহার) অবলম্বন করিয়া গিয়াছেন, এবং বর্তমান সাধুগণও যেরূপ বৃত্তি বা ব্যবহার অবলম্বন করিয়া থাকেন, এক একটি করিয়া তাহা দর্শন করুন, অর্থাৎ উত্তমরূপে আলোচনা(চিন্তা) করুন। আলোচনা করিয়া আপনারও তাঁহাদেরই চরিত্র(ব্যবহার) অবলম্বন করা উচিত। তাঁহাদের চরিত্রে মিথ্যাচরণ কখনও ছিল না, এবং বর্তমানেও নাই। অসাধু জনেরাই মিথ্যা বা অসত্য আচরণ করিয়া থাকে; কিন্তু সেই মিথ্যা আচরণ করিয়া কেহই জরামরণরহিত(অজর ও অমর) হইতে পারে না। কারণ, মর্ত্য(মরণশীল) মনুষ্য শস্যের মত
(ধান্যাদির ন্যায়) পক্ক হয়, অর্থাৎ জরাজীর্ণ হয় ও মরিয়া যায়, এবং মরিয়া আবার শস্যেরই মত পুনর্ব্বার জন্ম বা আবির্ভাব প্রাপ্ত হয়। [অতএব] এই অনিত্য জীবলোকে(সংসারে) মিথ্যা আচরণের কি প্রয়োজন? নিজের সত্যপালন করুন—আমাকে যমের উদ্দেশে প্রেরণ করুন ॥ ৬ ॥
[অথ পিত্রা যমায় প্রেষিতো নচিকেতাঃ যমস্যানুপস্থিতিকালে যমভবনং গত্বা, তত্র যমমপশ্যন্ দিনত্রয়মুপবাসেন তস্থৌ, ততশ্চ প্রবাসাৎ আগতং যমং দৃষ্ট্বা তদীয়া অমাত্যাদয় উচুঃ,-বৈশ্বানর ইতি]। ব্রাহ্মণঃ অতিথিঃ সন্ বৈশ্বানরঃ(অগ্নিরিব- দহন্ ইব) গৃহান্ প্রবিশতি।[ব্রাহ্মণোহতিথিঃ গৃহমাগতঃ অনাদৃতঃ সন্ অগ্নিরিব গৃহাইণাৎ সর্ব্বমর্থৎ দহতি ইত্যাশয়ঃ]। তস্য(অগ্নেরিব প্রবিষ্টস্য অতিথেঃ) এতাম্ (শাস্ত্রোক্তাং পাদ্যার্সনাদি-দানরূপাম্) শান্তিং কুর্ব্বন্তি[মহান্তো গৃহিণঃ]।[অতো হেতোঃ] হে বৈবস্বত(বিবস্বৎপুত্র যম)! উদকম্(পাদ্যার্থং জলম্)[অম্মৈ ব্রাহ্মণায়] হর(আহর, এনং পূজয়েত্যর্থঃ) ॥
[নচিকেতা পিতা কর্তৃক যমোদ্দেশে প্রেষিত হইয়া যমভবনে উপস্থিত হইলেন। তখন যম অন্যত্র ছিলেন। নচিকেতা যমকে উপস্থিত না দেখিয়া তিন দিন পর্যন্ত উপবাস করিয়া সেখানে বাস করিতে লাগিলেন। যম প্রবাস হইতে প্রত্যা- গত হইলে পর তাঁহার মন্ত্রিপ্রভৃতি তাঁহাকে বলিতে লাগিলেন,-] ব্রাহ্মণ অতিথি-রূপে অগ্নির ন্যায় গৃহে প্রবেশ করেন।[সাধু গৃহস্থগণ] তজ্জন্য এই (পাদ্যর্ঘ্যাদি-দানরূপ) শান্তি করিয়া থাকেন। অতএব, হে বৈবস্বত-সূর্য্য- পুত্র! তুমি[ইঁহার পাদপ্রক্ষালনার্থ] জল আনয়ন কর।[অভিপ্রায় এই যে, ব্রাহ্মণ অতিথিরূপে গৃহে উপস্থিত হইয়া যদি উপযুক্ত আদর না পান, তাহা হইলে গৃহস্থের অতিশয় অকল্যাণ ঘটে। সেই অকল্যণ-প্রশমনের নিমিত্ত অতিথির আদর ও অর্চ্চনা করিতে হয়] ॥ ৭॥
স এবমুক্তঃ পিতা আত্মনঃ সত্যতায়ৈ প্রেষয়ামাস। স চ যমভবনং গত্বা তিস্রো রাত্রীরুবাস যমে প্রোষিতে। প্রোষ্যাগতং যমম্ অমাত্যা ভার্য্যা বা উচুর্বোধয়ন্তঃ—বৈশ্বানরঃ অগ্নিরেব সাক্ষাৎ প্রবিশত্যতিথিঃ সন্ ব্রাহ্মণো গৃহান্ দহন্নিব; তস্য দাহং শময়ন্ত ইবাগ্নেঃ এতাং পাদ্যাসনাদিদানলক্ষণাৎ শান্তিং কুর্ব্বন্তি সন্তোহতিথেঃ যতঃ, অতো হর আহর,—হে বৈবস্বত! উদকং নচিকেতসে পাদ্যার্থম্। যতশ্চাকরণে প্রত্যবায়ঃ ক্রয়তে ॥ ৭ ॥
পিতা(বাজশ্রবস) পুত্রের ঐ প্রকার বচন শ্রবণ করিয়া নিজের সত্যসংরক্ষণার্থ পুত্রকে যমসদনে প্রেরণ করিলেন। পুত্র’ নচিকেতা যমভবনে গমন করতঃ সেখানে ত্রিরাত্র বাস করিলেন; তৎকালে যমরাজ প্রবাসে ছিলেন। তিনি প্রবাস হইতে গৃহে প্রত্যাগত হইলে অমাত্যগণ, কিংবা পত্নীগণ তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিতে লাগিলেন,- সাক্ষাৎ অগ্নিই ব্রাহ্মণ অতিথিরূপে যেন দগ্ধ করিবার জন্যই গৃহে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ গৃহে উপস্থিত হন। যেহেতু সাধুগণ সেই অতিথিরূপ অগ্নির দাহপ্রশমনার্থই যেন এই-পাদ্য ও আসনাদি দানরূপ শান্তি করিয়া থাকেন। অতএব, হে বৈবস্বত(সূর্য্যতনয়- যম)! এই নচিকেতার পাদপ্রক্ষালনার্থ জল আনয়ন করুন; কারণ, এইরূপ না করিলে শাস্ত্রে প্রত্যবায়ের(পাপের) কথা শ্রুত হয় ॥ ৭॥
আশা-প্রতোকে সঙ্গতংসূনৃতাক
ইষ্টা-পূর্ব্বে পুত্র-পশূংশ সর্ব্বান্।
এতদ্বৃঙ্ক্তে পুরুষস্যাল্পমেধসো যস্যানশন্ বসতি ব্রাহ্মণো গৃহে ॥৮॥
[অতিথিপূজায়া অকরণে অনিষ্টফলমাহ,-আশেতি]। ব্রাহ্মণোহনন্নন্(অজু- জানঃ সন্) যস্য গৃহে বসতি,[তস্য] অল্পয়েধসঃ(অল্পবুদ্ধেঃ) পুরুষস্য আশা-প্রতীক্ষে
(আশা চ প্রতীক্ষা চ তে; অত্যন্তাপরিজ্ঞাত-সুবর্ণাচলাদিবস্তুপ্রাপ্ত্যর্থং যা বাসনা সাঁ আশা, বিজ্ঞাতপ্রাপ্যবস্তুবিষয়েচ্ছা প্রতীক্ষা) সঙ্গতম্(সুহৃৎসঙ্গতিফলম্) সুনৃতাম্ (সাধুপ্রিয়বার্তাম্), ইষ্টাপূর্তে(ইষ্টং চ পূর্তং চ তে, ইষ্টং যজনম্—তৎফলম্, পূর্তং তড়াগোদ্যানাদি প্রদানফলমু), সর্ব্বান্ পুত্র-পশূন্ চ(পুত্রান্ পশূংশ্চেত্যর্থঃ)। এতৎ[সর্ব্বম্][অনশনেন ব্রাহ্মণস্য গৃহেহবস্থানম্] বৃক্তে(আবর্জয়তি— সর্ব্বং নাশয়তীতি যাবৎ) ॥
যে অল্পবুদ্ধি পুরুষের গৃহে ব্রাহ্মণ অনশনে বাস করেন, তাহার ফলে তাহার আশা অর্থাৎ যে বিষয়ের প্রাপ্তিতে নিশ্চয় বা‘স্থিরতা নাই, তাহার প্রার্থনা, আর প্রতীক্ষা অর্থাৎ যে বস্তুর প্রাপ্তিতে নিশ্চয় বা’ স্থিরতা আছে, সেই বস্তু পাইতে ইচ্ছা, অর্থাৎ তদুভয়ের সফলতা, সঙ্গত—সজ্জন-সমাগমের ফল, সুনৃতা—উত্তম প্রিয় সংবাদ, ইষ্ট—যজ্ঞাদি ক্রিয়া, পূর্ত্ত—জলাশয়, উদ্যান প্রভৃতি দান, অর্থাৎ তদুভয়ের ফল, এবং পুত্র ও পশু, এই সমস্ত বিনষ্ট হইয়া যায় ॥ ৮ ॥
আশা-প্রতীক্ষে—অনিজ্ঞাতপ্রাপ্যেষ্টার্থপ্রার্থনা আশা, নির্ঘাত-প্রাপ্যার্থ- প্রতীক্ষণং প্রতীক্ষা, তে আশা-প্রতীক্ষে। সঙ্গতম্—সৎসংযোগজং ফলম্। সূনৃতাং চ—সূনৃতা হি প্রিয়া বাক্, তন্নিমিত্তঞ্চ। ইষ্টাপূর্তে—ইষ্টং যাগজং ফলম্, পূর্তম্ আরামাদিক্রিয়াজং ফলম্। পুত্রপশূংশ—পুত্রাংশ পশূংশ সর্ব্বান্, এতৎ সর্ব্বং যথোক্তং বৃক্তে আবর্জ্জয়তি—বিনাশয়তীত্যেতৎ; পুরুষস্য অল্পমেধসঃ অল্প- প্রজ্ঞস্য; যস্য অনশন্ অভুঞ্জানঃ ব্রাহ্মণঃ গৃহে বসতি। তস্মাদনুপেক্ষণীয়: সর্ব্বাবস্থাস্বপি অতিথিরিত্যর্থঃ ॥ ৮ ॥
অবিজ্ঞাত প্রাপ্য বস্তুর প্রার্থনার নাম ‘আশা’, আর’ বিজ্ঞাতরূপ প্রাপ্য বস্তু বিষয়ে প্রার্থনার নাম ‘প্রতীক্ষা’। এই উভয়-আশা ও প্রতীক্ষা, সঙ্গত-সজ্জনসঙ্গের ফল, সূনৃতা-প্রিয় বাক্য কথনের ফল, ইষ্টাপূর্ত্ত-ইষ্ট অর্থ যাগফল, পূর্ত্ত অর্থ উদ্যানাদি দানের ফল, এবং সমস্ত পুত্র ও পশু(গবাদি), সেই ব্যক্তি এই সমস্তই বিনষ্ট করে।[কে এবং কাহার? না-] যেই অল্পবুদ্ধি পুরুষের
গৃহে ব্রাহ্মণ অতিথি অনশনে বাস করেন[সেই অনশনে অবস্থিতিই গৃহস্থের ঐ সমস্ত সম্পদ নষ্ট করিয়া দেয়]। অতএব কোন অবস্থায়ই অতিথি উপেক্ষণীয় নহে * ॥৮॥
তিস্নে। রাত্রীর্যদবাৎসীর্ভূহে,মে ইনশন্ ব্রহ্মমতিথিনমস্যঃ।
নমস্তেহস্তু ব্রহ্মন্, স্বস্তি মেহস্তু, তস্মাৎ প্রতি ত্রীন্ বরান্ বৃণীষ ॥ ৯ ॥
[ এবং প্রবোধিতো যমো নচিকেতসমুপগম্য পূজাপুরঃসরমাহ—তিস্র ইতি]। হে ব্রহ্মন্,[ ত্বম্] অতিথিঃ[ অতএব] নমস্যঃ(পূজার্হঃ সন্) যৎ মে গৃহে তিস্রঃ রাত্রীঃ(দিনত্রয়ম্) অনশ্নন্(অভুঞ্জানঃ সন্) অবাৎসীঃ(বাসমকার্যীঃ), তস্মাৎ হে ব্রহ্মন্! তে(তুভ্যম্) নমোহস্তু। মে মহ্যং স্বস্তি মঙ্গলম্[অস্তু ইতি শেষঃ]।[ তস্য প্রতীকারায়] প্রতি(তিস্রঃ রাত্রীঃ প্রতি) ত্রীন্ বরান্ বৃণীস্ব(একৈকাং রাত্রিং- প্রতি একৈকং বরং যথাভিলাষং প্রার্থয়স্ব ইতি ভাবঃ)।
[ যম এইরূপ উপদেশাত্মক প্রবোধবাক্য শ্রবণ করিয়া নচিকেতার সমীপে
* তাৎপর্য্য,--অতিথিসম্বন্ধে অথর্ব্ববেদের ১২৭ সংখ্যক অনুবাকে এইরূপ কথিত আছে,- ‘শ্রিয়ং চ বা এষ সংবিদং চ গৃহাণামশ্নাতি যঃ পূর্ব্বোহতিথেরশ্নাতি’। ৬। ‘এষ বা অতিথিঃ যৎ শ্রোত্রিয়ঃ, তস্মাৎ পূর্ব্বো নাম্নীয়াৎ॥ ৭॥ অর্থাৎ যে লোক অতিথির পূর্ব্বে ভোজন করে, বস্তুতঃ সে লোক স্বীয় গৃহের সৌভাগ্য ও জ্ঞানই ভোজন করে অর্থাৎ তাহার ঐ উভয়ই বিনষ্ট হইয়া যায়। ৬। যিনি শ্রোত্রিয়(বেদজ্ঞ), তিনিই প্রকৃত অতিথি; তাঁহার পূর্ব্বে কখনও ভোজন করিবে না। ৭। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, অতিথিকে অনশনে রাখিয়া ভোজন করিলেই অমঙ্গল’হয়, বিশেষতঃ শ্রোত্রিয় অতিথিকে। যমরাজের পরোক্ষভাবে সেই অপরাধই ঘটিয়াছে; সুতরাং তন্নিবারণার্থ ঐরূপ উপদেশ করা মন্ত্রিপ্রভৃতির উপযুক্ত কার্য্যই হইয়াছে। মনু তৃতীয়াধ্যায়ে বলিয়াছেন,-“সংপ্রাপ্তায় স্বতিপয়ে প্রদদ্যাদাসনোদকে। অন্নং চৈব যথাশক্তি সৎকৃত্য বিধিপূর্ব্বকম্‘। ৯৯। ‘শিলানপুঞ্ছতো নিতাং পঞ্চাগ্নীনপি জুহ্বতঃ। সর্ব্বং সুকৃতমাদত্তে ব্রাহ্মণোহর্নচ্চিতো বসন্‘। ১০০। অর্থাৎ উত্তম অতিথি সমাগত হইলে তাহাকে যথাবিধি অর্চ্চনা(আদর) করিয়া আসন, জল ও যথাশক্তি অন্নদান করিবে। ৯৯। যে লোক ইহা না করে, সে লোক শিলোঞ্ছবৃত্তিই হউক, আর নিত্য পঞ্চাগ্নিতেই হোম করুক; ব্রাহ্মণ অতিথি অনাদৃতভাবে গৃহে বাস করিলে, সে তাহার সেই সমস্ত শুভফল গ্রহণ করে। ১০০। এই অপরাধ নিবারণের জন্য গৃহস্থকে সাবধান হইতে হয়।
সমাগত হইয়া পূজাপূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন],—হে ব্রহ্মন্! তুমি অতিথি; সুতরাং আমার নমস্য(পূজার্হ); যেহেতু তুমি আমার গৃহে ত্রিরাত্র অনশনে বাস করিয়াছ, অতএব তোমাকে নমস্কার করিতেছি; আমার মঙ্গল হউক। অধিকন্তু, প্রতি অর্থাৎ এক এক রাত্রির জন্য এক একটি করিয়া—ত্রিরাত্রের জন্য ইচ্ছামত তিনটি বর প্রার্থনা কর॥ ৯॥
এবমুক্তো মৃত্যুরুবাচ নচিকেতসমুপগম্য পূজাপুরঃসরম্। কিং তৎ? ইত্যাহ, —তিস্রো রাত্রীঃ যৎ যস্মাৎ অবাৎসীঃ উষিতবানসি গৃহে মে মম অনশ্নন্, হে ব্রহ্মন্, অতিথিঃ সন, নমস্যো নমস্কারার্হশ্চ; ‘তস্মাৎ নমস্তে তুভ্যমস্তু ভবতু। হে ব্রহ্মন্, স্বস্তি ভদ্রং মেহন্ত। তস্মাদ ভবতোহনশনেন মদগৃহবাসনিমিত্তাৎ দোষাৎ তৎপ্রাপ্ত্যুপশমেন যদ্যপি ভবদনুগ্রহেণ সর্ব্বং মম স্বস্তি স্যাৎ, তথাপি ত্বদধিক- সম্প্রসাদনার্থমনশনেনোপোষিতামেকৈকাং রাত্রিং প্রতি ত্রীন্ বরান্ বৃণীঘাভি- প্রেতার্থবিশেষান্ প্রার্থয়স্ব মত্তঃ ॥ ৯ ॥
মৃত্যু ঐ কথা শ্রবণ করিয়া নচিকেতার সমীপে উপস্থিত হইয়া পূজা বা সম্মান প্রদর্শনপূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন। মৃত্যু কি বলিলেন? তাহা বলিতেছেন,—হে ব্রহ্মন্(ব্রাহ্মণ)! তুমি যেহেতু অতিথি, এবং নমস্কারাই হইয়াও ত্রিরাত্র অনশনে(উপবাস করিয়া) ‘আমার গৃহে বাস করিয়াছ, ‘অতএব হে ব্রহ্মন্! তোমাকে নমস্কার; আমার কল্যাণ হউক; অর্থাৎ তুমি আমার গৃহে অনশনে বাস করায় যে দোষপ্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল, তাহার প্রশমনে আমার মঙ্গল হউক। যদিও তোমার অনুগ্রহেই আমার সর্ববিধ মঙ্গল হইবে সত্য, তথাপি তোমার অধিকতর প্রসন্নতা সম্পাদনের জন্য[বলিতেছি যে,] তুমি এখানে অনশনে বা উপবাসে যে কয়েক রাত্রি যাপন করিয়াছ, তাহার এক একটি রাত্রির জন্য(ফলতঃ ত্রিরাত্রের জন্য) তিনটি বর বরণ কর, অর্থাৎ তিন বরে নিজের অভিপ্রেত বিষয়সমূহ আমা হইতে প্রার্থনা কর ॥ ৯॥
যমেনৈবমুক্তো নচিকেতাঃ প্রথমমাহ,-শান্তেতি। -হে মৃত্যো, গৌতমঃ (মম পিতা) শান্তসঙ্কল্পঃ(মদনিষ্ট-সম্ভাবনয়া জায়মানঃ সংকল্পঃ শান্তঃ যস্য, সঃ), সুমনাঃ(প্রসন্নমনাঃ) মা অভি(মাং প্রতি) বীতমন্যুঃ(অপগত- কোপঃ চ) যথা স্যাৎ প্রতীতঃ(স’ এবায়ং মম পুত্রঃ সমাগত ইত্যেবং লব্ধস্মৃতিঃ সন্) ত্বৎপ্রসৃষ্টম্(ত্বয়া প্রেষিতম্) মা অভি(মাং প্রতি) যথা বদেৎ(ময়া সহ আলপেদিত্যর্থঃ) এতৎ ত্রয়াণাং[বরাণাং মধ্যে] প্রথমং বরং বৃণে[পিতুঃ পরিতোষণমেব প্রথমেন বরেণ প্রার্থয়ে ইত্যাশয়ঃ] ॥
যমের কথা শুনিয়া নচিকেতা প্রথমে বলিলেন,—আমার পিতা গৌতম যেন শান্তসংকল্প হন, অর্থাৎ আমার জন্য তাঁহার যে সকল দুশ্চিন্তা উপস্থিত হইয়াছে, তাহা প্রশমিত হউক; তিনি যেন আমার প্রতি প্রসন্নচিত্ত এবং ক্রোধশূন্য হন। আর আপনি আমাকে পাঠাইলে, অর্থাৎ আপনকার নিকট হইতে গেলে পর তিনি যেন আমাকে চিনিতে পারেন এবং ‘আমার সহিত, কথাবার্তা বলেন। বরত্রয়ের মধ্যে ইহাই আমি প্রথম বরে প্রার্থনা করিতেছি ॥১০০॥
অতো নচিকেতাস্তু আহ—যদি দিৎসুপূর্ব্বান্; শান্তসংকল্পঃ—উপশান্তঃ সঙ্কল্পো যস্য মাং প্রতি, ‘যমং প্রাপ্য কিন্নু করিষ্যতি মম পুত্রঃ’ ইতি, স শান্ত- সঙ্কল্পঃ। সুমনাঃ প্রসন্নমনীশ যথা স্যাৎ বীতমন্যুর্বিগতরোষশ্চ, গৌতমো মম পিতা, মা অভি মাং প্রতি, হে মৃত্যো। কিঞ্চ, ত্বংপ্রসৃষ্টং ত্বয়া বিনির্মুক্তম্— প্রেষিতং গৃহং প্রতি মা মাম্ অভিবদেৎ, প্রতীতো লব্ধস্মৃতিঃ—স এবায়ং পুত্রো মমাগতঃ ইত্যেবং প্রত্যভিজানন্ ইত্যর্থঃ। এতৎ প্রয়োজনং ত্রয়াণাং বরাণাং প্রথমমাদ্যং বরং বৃণে প্রার্থয়ে, যৎ পিতুং পরিতোষণম্॥ ১০॥
৩
অতঃপর নচিকেতা বলিলেন,-হে মৃত্যু! যদি আপনি বর দিতে ইচ্ছুক হইয়া থাকেন, তাহা হইলে, আমার পিতা গৌতম যাহাতে শান্তসংকল্প, সুমনা(প্রসন্নচিত্ত) এবং আমার প্রতি ক্রোধশূন্য হন, তাহা করুন।—অর্থাৎ আমার পিতার হৃদয়গত যে সংকল্প— ‘আমার পুত্র যমের সমীপে উপস্থিত হইয়া কি করিবে’ ইত্যাদি- প্রকার যে দুশ্চিন্তা, তাহা প্রশমিত হউক; তাঁহার মানসিক উদ্বেগ নিবৃত্ত হউক, এবং আমার প্রতি যদি তাঁহার ক্রোধ হইয়া থাকে, তাহাও বিদুরিত হউক। আরও এক কথা,—আপনি আমাকে স্বগৃহাভিমুখে প্রেরণ করিলে অর্থাৎ আপনকার নিকট হইতে আমি গৃহে উপস্থিত হইলে, আমার কথা যেন তাঁহার স্মরণ হয়, অর্থাৎ ‘এই আমার সেই পুত্র আসিয়াছে’ এই প্রকারে আমাকে যেন চিনিতে পারেন। বরত্রয়ের মধ্যে এই বরই আমি প্রার্থনা করিতেছি। পিতার পরিতোষ সম্পাদনই আমার প্রথম প্রয়োজন ॥ ১০ ॥
যথা পুরস্তাদবিতা প্রতীত- ঔদ্দালকিরারুণির্মৎপ্রসৃষ্টঃ। সুখরাত্রীঃ শয়িতা বাতমন্যু- ত্ত্বাং দদৃশিবান্ মৃত্যুমুখাৎ প্রমুক্তম্॥ ১১॥
[ এবং প্রার্থিতো মৃত্যুঃ নচিকেতসমাহ]—আরুণিঃ( অরুণস্যাপত্যং পুমান্), ঔদ্দালকিঃ( উদ্দালক এব ঔদ্দালকিঃ, দ্ব্যামুষ্যায়ণো বা;—উদ্দালকস্যাপত্যমিত্যর্থঃ, ন তু জারজঃ)[ তব পিতা] পুরস্তাৎ( মমালয়ে সমাগমাৎ প্রাক্)[ ত্বয়ি] যথা প্রতীতঃ( স্নেহবান্ আসীৎ), মৎপ্রসৃষ্টঃ( ময়া অনুজ্ঞাতঃ সন্, মৎপ্রেরণাবশাদিতি ভাবঃ)[ অতঃ পরমপি] মৃত্যুমুখাৎ( মম অধিকারাৎ) প্রমুখম্( নিষ্ক্রান্তম্) ত্বাং দদৃশিবান্( দৃষ্টবান্ সন্) বীতমন্যুঃ( বিগতকোপশ্চ) ভবিতা[ ময়া যমায়
প্রেষিতোহপি নচিকেতাঃ কিমিতি প্রত্যাগত ইত্যেবং ন কুপ্যেদিতি ভাবঃ] [তথৈব] প্রতীতঃ[ভবিতা]।[পবা অপি] রাত্রীঃ সুখং শরিতা(সুখেন নিদ্রিতো ভবিতা) ॥
এইরূপ প্রার্থনায় মৃত্যু নচিকেতাকে বলিলেন,—তোমার পিতা অরুণ-তনয় ঔদ্দালকি(উদ্দালক) পূর্ব্বেও যেরূপ তোমার উপর স্নেহসম্পন্ন ছিলেন, আমার আজ্ঞা বা প্রেরণার ফলে ইতঃপরও সেইরূপই প্রীত ও অভিজ্ঞানবান্ থাকিবেন। [তুমি না যাওয়া পর্য্যন্ত] সকল রাত্রিতেই সুখে নিদ্রা যাইবেন, এবং তোমাকে মৃত্যুর অধিকার, হইতে, নির্ম্মুক্ত দর্শন, করিয়াও তিনি ক্রোধ করিবেন না॥ ১১ ॥
মৃত্যুরুবাচ,-যথা বুদ্ধিত্বয়ি পুরস্তাৎ পূর্ব্বমাসীৎ স্নেহসমন্বিতা পিতুস্তব, ভবিতা প্রীতিসমন্বিতস্তব পিতা তথৈব, প্রতীতঃ প্রতীতবান্ সন্। ঔদ্দালকিঃ উদ্দালক এব ঔদ্দালকিঃ। অরুণস্যাপত্যম্ আরণিঃ দ্ব্যামুষ্যায়নো বা; মৎ- প্রসৃষ্টো ময়াহনুজ্ঞাতঃ সন্ উত্তরা অপি রাত্রীঃ সুখং প্রসন্নমনাঃ শয়িতা স্বপ্তা বীতমন্যুঃ বিগতমন্যুশ্চ ভবিতা স্যাৎ, ত্বাং পুত্র দদৃশিবান্ দৃষ্টবান্ সন্ মৃত্যুমুখাৎ মৃত্যুগোচরাৎ প্রমুক্তং সন্তম্ ॥ ১১ ॥
মৃত্যু বলিলেন,—ইতঃপূর্ব্বে তোমার উপর তোমার পিতার যেরূপ স্নেহপূর্ণ বুদ্ধি ছিল, অরুণ-তনয় ঔদ্দালকি তোমার পিতা আমার অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া তোমাকে চিনিতে পারিয়া[তোমার প্রতি] সেইরূপই স্নেহবান্ হইবেন’; আগামী রাত্রিসকলেও সুখে—প্রসন্ন- চিত্তে নিদ্রা যাইবেন, এবং পুত্ররূপী তোমাকে মৃত্যুর কবল হইতে অর্থাৎ মৃত্যুর নিকট হইতে নির্ম্মুক্ত দেখিয়াও তিনি ক্রোধ করিবেন না। ‘আরুণি’ অর্থ—অরুণনামক কোন ব্যক্তির পুত্র; আর ‘ঔদ্দালকি’ অর্থ—উদ্দালক এখানে স্বার্থে তদ্ধিত প্রত্যয় হইয়াছে।
অথবা ঔদ্দালকি দ্ব্যামুষ্যায়ণ পুত্র, * সুতরাং অপত্যার্থেই তদ্ধিত প্রত্যয় বুঝিতে হইবে ॥ ১১ ॥
স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চনাস্তি ন তত্র ত্বং নৃ জরয়া বিভেতি। উভে তীর্ত্বা অশনায়া-পিপাসে শোকাতিগো মোদতে স্বর্গলোকে ॥ ১২ ॥
[স্বর্গ্যাগ্নি-স্বরূপজ্ঞানলক্ষণং দ্বিতীয়ং ‘বরং প্রার্থয়ন্ নচিকেতা আহ,-স্বর্গ- ইতি]। স্বর্গে লোকে কিঞ্চন(কিমপি) ভয়ং নাস্তি। তত্র(স্বর্গ-লোকে) ত্বং(মৃত্যুঃ) নাসি(ন প্রভবসি), ন চ জরয়া(জরায়াঃ বার্দ্ধক্যাৎ) বিভেতি, অথবা—জরয়া[যুক্তঃ সন্ কুতশ্চিৎ অপি] ন বিভেতি[স্বর্গলোকং গত ইতি শেষঃ]। উভে অশনায়া-পিপাসে তীর্থা(অতিক্রম্য) শোকাতিগঃ (শোকান্ অতিক্রান্তঃ সন্) স্বর্গলোকে মোদতে(সুখমনুভবতি)।[স্বর্গলোক ইতি পুনরুক্তিরাদরাতিশয়জ্ঞাপনার্থা]॥
[ নচিকেতা দ্বিতীয় বর প্রার্থনার উদ্দেশে বলিতে লাগিলেন]—হে মৃত্যো! স্বর্গলোকে কিছুমাত্র ভয় নাই। সেখানে আপনি নাই, এবং জরা হইতেও কেহ ভয় পায় না, অথবা জরায়ুক্ত—বৃদ্ধ হইয়া কাহারও নিকট ভয় পায় না। লোক স্বর্গলোকে[ যাইয়া] ক্ষুধা ও পিপাসা অতিক্রম করিয়া এবং শোক-দুঃখ-সমুত্তীর্ণ হইয়া আনন্দ ভোগ করিয়া থাকে ৷ ১২ ॥
নচিকেতা উবাচ,—স্বর্গে লোকে রোগাদিনিমিত্তং ভয়ং কিঞ্চন কিঞ্চিদপি নাস্তি। ন চ তত্র ত্বং মৃত্যো সহসা প্রভবসি, অতো জরয়া যুক্ত ইহ লোকে ইব ত্বত্তো ন বিভেতি কশ্চিৎ তত্র। কিঞ্চ, তে উভে অশনায়া-পিপাসে তীর্থা অতিক্রম্য শোকমতীত্য গচ্ছতীতি শোকাতিগঃ। সন মানসেন দুঃখেন বর্জিতো মোদতে হৃষ্যতি স্বর্গলোকে দিব্যে॥ ১২॥
নচিকেতা বলিলেন, স্বর্গলোকে রোগাদিজনিত কোনও ভয় নাই। হে মৃত্যু! সেখানে আপনিও সহসা প্রভুত্ব করিতে পারেন না; এই কারণে ইহলোকের ন্যায় সেখানে কেহ জরাযুক্ত হইয়া আপনার নিকট ভয় প্রাপ্ত হয় না। আরও এক কথা,—দিব্য(অলৌকিক) স্বর্গলোকে[যাহারা বাস করে, তাহারা] অশনায়া(ভোজনেচ্ছা— ক্ষুধা) ও পিপাসা অতিক্রম করিয়া এবং শোকাতিগ্ণ হইয়া অর্থাৎ মানসদুঃখরহিত হইয়া মোদ বা হর্ষ অনুভব করিয়া থাকে। ‘শোকা- তিগ’ অর্থ—যাহারা শোককে অতিক্রম করিয়া যায় ॥ ১২ ॥
স ত্বমগ্নিস্বর্গ্যমধ্যেষি মৃত্যো, প্রক্রহি তংশ্রদ্দধানায় মহ্যম্।
স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্তে।
এতদ্ দ্বিতীয়েন বৃণে বরেণ ॥ ১৩ ॥
সম্বন্ধী আমুষ্যায়ণঃ—দ্ব্যামুষ্যায়ণঃ)। ইহাকে ‘পুত্রিকাপুত্র’ বলা যাইতে পারে। পুত্রিকাপুত্রের নিয়ম এই যে—নিঃসন্তান ব্যক্তি কোন এক ভ্রাতৃহীনা কন্যাকে দত্তকপুত্রের ন্যায় গ্রহণ করিতে পারে, কন্যার পিতা দানের সময় বলিয়া দেন যে, “অস্যাং যো জায়তে পুত্রঃ স মে পুত্রো ভবিষ্যতি।” অর্থাৎ এই কন্যাতে যে পুত্র জন্মিবে, সে আমার পুত্রস্থানীয় হইয়া আমার জল- পিণ্ড প্রদান করিবে। অতএব এই পুত্রিকা-পুত্রের পক্ষে জনকও যেরূপ পিতা, মাতামহও তেমনি পিতৃস্থানীয় জলপিণ্ডভাগী; সুতরাং সেই পুত্রকে ‘দ্ব্যামুষ্যায়ণ’ বলা যাইতে পারে। কেহ কেহ এই সকল গোলযোগের ভয়ে অর্থ করেন যে, অরুণায়া অপত্যং আরুণিঃ, অর্থাৎ অরুণা উঁহার মাতার নাম, এবং উদ্দালক উঁহার পিতার নাম; কাজেই এ পক্ষে আর পিতৃদ্বয়ের সম্ভাবনার ভয় থাকে না।
[এবং স্বর্গ্যাগ্নিজ্ঞানফলং নিরূপ্য অগ্নিস্তত্যা যমং প্রসাদয়ন্ নচিকেতা আহ,-স ত্বমিতি]। হে মৃত্যো! স ত্বং স্বর্গাম্(উক্তরূপস্বর্গসাধনম্) অগ্নিম্ (অগ্রগামিতাদিগুণযুক্ততয়া অগ্নিনামকং প্রসিদ্ধমগ্নিং বা) অধ্যেষি(জানাসি)। তম্(অগ্নিম্) শ্রদ্দধানায়(শ্রদ্ধাবতে) মহ্যং প্রব্রূহি(কথয়)।[কুতঃ, ন হি স্বর্গ- সাধনত্বমাত্রেণ তদ্বচনমাবশ্যকমিত্যাহ,-স্বর্গেতি] স্বর্গলোকাঃ(স্বর্গোলোকো যেষাম্, তে তথোক্তাঃ);[মন্বন্তরপর্য্যন্তঃ স্বর্গলোকে স্থিত্বা পশ্চাৎ] অমৃতত্বম্ (দেবত্বম্) ভজন্তে(প্রাপ্নুবন্তি)। এতৎ(অগ্নি-বিজ্ঞানম্) দ্বিতীয়েন বরেণ বৃণে (প্রার্থয়েয়মিত্যর্থঃ) ॥
সম্প্রতি নচিকেতা অগ্নিব স্তুতি দ্বারা যমের প্রসন্নতা সমুৎপাদনার্থ বলিতে লাগিলেন,—হে মৃত্যো(যম)! আপনি সেই প্রসিদ্ধ স্বর্গ-সাধন(যাহার সেবায় স্বর্গ লাভ হয় এরূপ) অগ্নির[যথাযথ স্বরূপটি] অবগত আছেন।[অতএব] শ্রদ্ধাবান্ আমাকে সেই অগ্নিতত্ত্ব উপদেশ দিন। কারণ, যাহারা স্বর্গলোকে গমন করে, তাহারা অমৃতত্ব ভোগ করে। ইহাই আমি দ্বিতীয় বরে প্রার্থনা করিতেছি ॥১৩৷৷
এবংগুণবিশিষ্টস্য স্বর্গলোকস্থ্য প্রাপ্তিসাধনভূতমগ্নিং স্বর্গ্যং স ত্বং মৃত্যুরধ্যেষি স্মরসি জানাসীত্যর্থঃ, হে মৃত্যো! যতত্ত্বম্ প্রব্রূহি কথয় শ্রদ্দধানায় শ্রদ্ধারতে মহ্যৎ স্বর্গার্থিনে। ফেনাগ্নিনা চিতেন স্বর্গলোকাঃ স্বর্গো লোকো যেষাং তে স্বর্গলোকাঃ যজমানাঃ অমৃতত্বম্ অমরণতা দেবত্বং ভজন্তে প্রাপ্নুবন্তি। তদেতদগ্নিবিজ্ঞানং দ্বিতীয়েন বরেণ বৃণে ॥ ১৩॥
হে মৃত্যো! যেহেতু স্বর্গলোকের প্রাপ্তি-সাধন স্বর্গ্য অগ্নির তত্ত্ব আপনিই স্মরণ করেন, অর্থাৎ অবগত আছেন;[অতএব] শ্রদ্ধা- সম্পন্ন এবং স্বর্গার্থী আমাকে তাহা বলুন। যে অগ্নির চয়ন(যজ্ঞ- সম্পাদন) করিলে যজমানগণ স্বর্গলোক লাভ করিয়া অমৃতত্ব মরণ-
রাহিতা—দেবত্ব প্রাপ্ত হন, সেই অগ্নিবিদ্যা আমি দ্বিতীয় বরে, প্রার্থনা করিতেছি ॥ ১৩ ॥
প্র তে ব্রবীমি তদু মে নিবোধ স্বর্গ্যমগ্নিং নচিকেতঃ প্রজানন্। অনন্তলোকাপ্তিমথো প্রতিষ্ঠাং বিদ্ধি ত্বমেত’ নিহিতং গুহায়াম্ ॥ ১৪ ॥
[ এবং যাচিতো যমঃ প্রত্যুবাচ, —প্রতে ইতি]।[‘হে নচিকেতঃ][অহম্] স্বর্গ্যম্ অগ্নিং প্রজানন্(বিশেষেণ জানন্) তে(তুভ্যম্) প্রব্রবীমি(কথয়ামি)। তৎ উ(এব) মে(মৎসকাশাৎ) নিবোধ(একাগ্রচিত্তঃ সন্ শৃণুঘ)।[হে নচিকেতঃ!] ত্বম্ এতম্(উক্তরূপম অগ্নিম্) অনন্তলোকাপ্তিম্(অনন্তস্য দীর্ঘ- কালস্থায়িনঃ স্বর্গলোকস্য আপ্টিং প্রাপ্তিসাধনম্), অথো(অপি) প্রতিষ্ঠাম্ (সর্ব্বলোকস্থিতিহেতুম্), গুহারাম্(সর্ব্বপ্রাণিহৃদয়ে) নিহিতম্(নিতরাম্ স্থিতম্). বিদ্ধি(জানীহি) ॥
এইরূপ প্রার্থনার পর যম বলিলেন, হে নচিকেতঃ! আমি সেই স্বর্গ-সাধন অগ্নিকে উত্তমরূপে জানি, এবং তোমাকে তাহা বলিতেছি, স্থির চিত্তে শ্রবণ কর। তুমি জানিও,—এই অগ্নিই অনন্ত লোক(স্বর্ণলোক) প্রাপ্তির উপায়, অথচ সর্ব্ব- জগতের বিধারক; অধিকন্তু ইনি সর্ব্বপ্রাণীর হৃদয়রূপ গুহায় বাস করিতেছেন ॥১৪॥
মৃত্যোঃ প্রতিজ্ঞেয়ম্, -তে তুভ্যং প্রব্রবীমি, যৎ ত্বয়া প্রার্থিতম্, তৎ উ মে মম বচসঃ নিবোধ বুধ্যস্ব একাগ্রমনাঃ সন্, স্বর্গ্যম্-স্বর্গায় হিতং স্বর্গসাধন- মগ্নিং হে নচিকেতঃ প্রজানন্ বিজ্ঞাতবানহং সন্ ইত্যর্থঃ। প্রব্রবীমি, তন্নিবোধেতি চ শিষ্যবৃদ্ধিসমাধানার্থং বচনম্। অধুনা অগ্নিং স্তৌতি,--অনন্তলোকাপ্তিং স্বর্গ- লোক-ফল-প্রাপ্তিসাধনমিত্যেতৎ। অথো অপি প্রতিষ্ঠাম্-আশ্রয়ং জগতো বিরাডরূপেণ তমেতমগ্নিং ময়োচ্যমানং বিদ্ধি বিজানীহি ত্বম্, নিহিতং স্থিতং গুহায়াং বিদুষাং বুদ্ধৌ নিবিষ্টমিত্যর্থঃ ॥ ১৪ ॥
এটি মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা, অর্থাৎ বক্তব্যনির্দেশ। হে নচিকেতঃ! তুমি যাহা(বলিবার জন্য) প্রার্থনা করিয়াছিলে, আমি সেই স্বর্গহিত, অর্থাৎ স্বর্গ-সাধন অগ্নিকে উত্তমরূপে জানিয়া তোমাকে বলিতেছি; তুমি একাগ্রমনে আমার উপদেশ হইতে তাহা অবগত হও। বক্তব্য বিষয়ে শিষ্যের মনোযোগ সম্পাদনার্থ “প্রব্রবীমি”(প্রকৃষ্টরূপে বলিতেছি) ও “নিবোধ”(অবগত হও), এই দুইটি ক্রিয়াপদ একত্র প্রযুক্ত হইয়াছে। এখন অগ্নির স্তব করিতেছেন,-অনন্তলোকাপ্তি, অর্থাৎ দীর্ঘকালস্থায়ী’ স্বর্গলোকের ‘প্রাপ্তিসাধন, এবং বিরাটরূপে সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতির হেতুএই যে অগ্রির কথা বলিতেছি, তুমি জানিও,-সেই অগ্নি পণ্ডিতগণের বুদ্ধিরূপ গুহায় নিহিত বা সন্নিবিষ্ট রহিয়াছেন, অর্থাৎ তাঁহারাই তাঁহার তত্ত্ব জানেন ৷ ১৪ - লোকাদিমগ্নিং তমুবাচ তস্মৈ যা ইষ্টকা যাবতীর্ব্বা যথা বা। স চাপি তৎ প্রত্যবদদ্ যথোক্ত- মথাস্য মৃত্যুঃ পুনরেবাহ তুষ্টঃ ॥ ১৫ ॥
ব্যাখ্যা।[যমঃ] তস্মৈ(নচিকেতসে) লোকাদিম্(লোকানাম্ আদিং কারণভূতম্) তম্ (প্রসিদ্ধম্) অগ্নিম্(অগ্নিবিজ্ঞানম্) উবাচ(উক্তবান্)।[কিঞ্চ] যাঃ(যৎস্বরূপাঃ), যাবতীঃ(যাবৎসংখ্যকাঃ) বা ইষ্টকাঃ(চেতব্যাঃ), যথা(যেন প্রকারেণ) বা [অগ্নিঃ চীয়তে];[এতৎ সর্ব্বম্ উক্তবান্]। সঃ(নচিকেতাঃ) চ অপি তৎ (মৃত্যুনা কথিতম্) যথোক্তম্(যথাবৎ) প্রত্যবদৎ(অনূদিতবান্—প্রত্যুচ্চারিতবান্)। অথ(অনন্তরম্) মৃত্যুঃ[অস্য যথাবৎ প্রত্যুচ্চারণেন] তুষ্টঃ[সন্] পুনঃ এব (অপি) আহ ॥
যমরাজ নচিকেতাকে লোকাদি—জগৎকারণীভূত, প্রসিদ্ধ অগ্নি-তত্ত্ব উপদেশ করিলেন, এবং যজ্ঞীয় ইষ্টকের স্বরূপ, সংখ্যা(পরিমাণ) এবং অগ্নিচয়নের
প্রণালী, এই সমস্তই নচিকেতাকে বলিলেন। নচিকেতাও মৃত্যুর সমস্ত কথা যথাযথরূপে আবৃত্তি করিলেন। অনন্তর মৃত্যু নচিকেতার তাদৃশ প্রত্যুচ্চারণে পরিতুষ্ট হইয়া পুনশ্চ বলিতে লাগিলেন—॥ ১৫ ॥
ইদং শ্রুতেৰ্ব্বচনম্। লোকাদিম্-লোকানামাদিং প্রথমশরীরিত্বাৎ, অগ্নিং তং প্রকৃতং নচিকেতসা প্রার্থিতম্ উবাচ উক্তবান্ মৃত্যুঃ তস্মৈ নচিকেতসে। কিঞ্চ, যা ইষ্টকাঃ চেতব্যাঃ স্বরূপেণ, যাবতীর্ব্বা সংখ্যয়া, যথা বা চীয়তেহগ্নিরেন প্রকারেণ; সর্ব্বমেতদুক্তবানিত্যর্থঃ। স চাপি নচিকেতাঃ তৎ প্রত্যবদৎ-তৎ মৃত্যুনোক্তম্ * যথাবৎ প্রত্যয়েনাবদৎ প্রত্যুচ্চারিতবান্। অথ অন্য † প্রত্যুচ্চারণেন তুষ্টঃ সন্ মৃত্যুঃ পুনরেবাহ-বরত্রয়ব্যতিরেকেণাহন্যং বরং দিৎসুঃ ॥ ১৫০৷৷
এই পঞ্চদশ শ্লোকের কথা শ্রুতির উক্তি।[শ্রুতি বলিতে- ছেন-][মৃত্যু] প্রথম শরীরী অথবা প্রথমোৎপন্নত্ব-নিবন্ধন ঞ সর্ব্ব- লোকের কারণীভূত, নচিকেতার প্রার্থিত সেই অগ্নির তত্ত্ব নচিকেতাকে বলিলেন। আর, যেরূপ যতগুলি ইষ্টক[যজ্ঞস্থান প্রস্তুত-করণার্থ] চয়ন বা সংগ্রহ করিতে হইবে, এবং যে প্রকারে অগ্নি চয়ন করিতে হয়, এ সমস্ত কথা[নচিকেতাকে বলিলেন]। নচিকেতাও মৃত্যুর কথিত সেই সমস্ত কথা যথাযথরূপে প্রত্যুচ্চারণ করিলেন। অনন্তর, মৃত্যু ‘নচিকেতার সেই প্রত্যুচ্চারণে পরিতুষ্ট ‘হইয়া(প্রতিশ্রুত) বরত্রয়ের অতিরিক্ত আরও একটি বর প্রদানের ইচ্ছায় পুনশ্চ বলিতে লাগিলেন—॥ ১৫ ॥
‘প্রত্যবদৎ যথোক্তম্ অথাস্য তন্ম ত্যুনোক্তম্’ ইতি কচিৎ পাঠঃ। ‘তস্য’ ইতি কচিৎ পাঠঃ? তাৎপর্য্য,—এখানে অগ্নি শব্দে বিরাট্ পুরুষ বুঝিতে হইবে। “স বৈ শরীরী প্রথমঃ স বৈ পুরুষ উচ্যতে। আদিকর্তা স ভূতানাং ব্রহ্মাগ্রে সমবর্ত্তত।”
8
তমব্রবীৎ প্রীয়মাণো মহাত্মা! বরং তবেহাদ্য দদামি ভূয়ঃ।
তবৈব নাম্না ভবিতায়মগ্নিঃ, সৃষ্ণাঞ্চেমামনেকরূপাং গৃহাণ ॥ ১৬ ॥
[অথ যমস্যোক্তিপ্রকারমাহ,-] মহাত্মা(যমঃ)[নচিকেতসঃ শিষ্যযোগ্যতা- বলোকনেন] প্রীয়মাণঃ(প্রীতিমান্ সন্) তম্(নচিকেতসম্) অব্রবীৎ-ইহ(অস্মিন্ বিষয়ে) এব অদ্য(ইদানীম্) তব ভূয়ঃ(পুনরপি) বরম্(বরত্রয়াদন্যং চতুর্থম্) দদামি (প্রযচ্ছামি)। অয়ম্(ময়া বর্ণিতঃ) অগ্নিঃ তব এব নাম্না(নাচিকেত-সংজ্ঞয়া ‘প্রসিদ্ধঃ) ভবিতা(ভবিষ্যতি)।[কিঞ্চ], ইমাম্ অনেকরূপাম্(বিচিত্রাং রত্নময়ীম্) সৃঙ্কাম্(শব্দবতীং মালাম্), যদ্বা, সৃঙ্কাম্(অনিন্দিতাং গতিং কৰ্ম্মবিজ্ঞান- মিত্যর্থঃ) গৃহাণ(স্বীকুরু) ॥
[ অনন্তর, যমের উক্তিপ্রকার কথিত হইতেছে,—]মহাত্মা যম নচিকেতাকে উপযুক্ত শিষ্য দেখিয়া প্রীতিসহকারে বলিলেন,—আমি এই বিষয়েই তোমাকে আর একটি(তিনটির অতিরিক্ত—চতুর্থ একটি) বর প্রদান করিতেছি। আমি তোমাকে যে অগ্নি-বিদ্যা বলিলাম, সেই অগ্নি তোমার নামেই(নাচিকেত নামেই) প্রসিদ্ধ হইবে। অপিচ, বিচিত্ররূপা—রত্নময়ী, এই ‘সৃঙ্কা’(মালা) গ্রহণ কর। অথবা সৃঙ্কা অর্থ অনিন্দিত গতি, অর্থাৎ উত্তম কর্ম্ম-বিদ্যা বিষয়ে উপদেশ গ্রহণ কর ॥ ১৬ ॥
কথম্?—তং নচিকেতসমব্রবীৎ প্রীয়মাণঃ শিষ্যস্য যোগ্যতাং পশ্যন্ প্রীয়মাণঃ প্রীতিমনুভবন্ মহাত্মা অক্ষুদ্রবুদ্ধিঃ বরং তব চতুর্থম্ ইহ প্রীতিনিমিত্তম্ অদ্য—ইদানীং দদামি ভূয়ঃ পুনঃ প্রযচ্ছামি। তবৈব নচিকেতসো নাম্না অভিধানেন, প্রসিদ্ধো ভবিতা ময়োচ্যমানোহয়মগ্নিঃ। কিঞ্চ সৃঙ্কাং শব্দবতীং রত্নময়ীং মালাম্ ইমাম্ অনেকরূপাং বিচিত্রাং গৃহাণ স্বীকারু। যদ্বা, সৃঙ্কামকুৎসিতাং গতিং কৰ্ম্মময়ীং গৃহাণ। অন্যদপি কর্মবিজ্ঞানমনেকফলহেতুত্বাৎ স্বীকারু ইত্যর্থঃ ॥ ১৬ ॥
কি প্রকার?[তাহা’ বলা হইতেছে]-মহাত্মা, অর্থাৎ মহা- বুদ্ধিবিশিষ্ট যম নচিকেতার শিষ্য-যোগ্যতা দর্শন করিয়া প্রীতি অনুভব করিয়া বলিলেন,-[আমি] প্রীতিবশতঃ এ বিষয়ে এখনই তোমাকে পুনর্ব্বার চতুর্থ একটি বর প্রদান করিতেছি-আমি যে অগ্নির কথা বলিতেছি, সেই অগ্নি তোমারই-নচিকেতারই নামে(নাচিকেত সংজ্ঞায়) প্রসিদ্ধ হইবে। অনেকরূপা অর্থাৎ বিচিত্ররূপা শব্দযুক্ত এই রত্নময়ী সৃঙ্কা(মালা) তুমি গ্রহণ কর। অথবা, সৃঙ্কা অর্থ অনিন্দিত কর্মগতি অর্থাৎ অনেকফলপ্রদ, অপুর একটি কর্মবিদ্যা গ্রহণ কর ॥১৬৷৷
ত্রিণাচিকেতস্ত্রিভিরেত্য সন্ধিং
ত্রিকর্ম্মকৃৎ তরতি জন্মমৃত্যু। ব্রহ্মজজ্ঞং দেবমীড্যং বিদিত্বা নিচায্যেমাংশান্তিমত্যন্তমেতি ॥ ১৭ ॥
[অগ্নেঃ ‘নাচিকেত’-নামকরণানন্তরং পুনঃ তদারাধন-ফলমাহ, -ত্রিণাচিকেত- ইতি]। ত্রিভিঃ(ত্রিভিঃ বেদৈঃ, মাতৃপিত্রাচার্য্যৈঃ বা সহ) সন্ধিম্(সন্ধানং সম্বন্ধং মাত্রাদ্যনুশাসনং বা) এত্য(প্রাপ্য) ত্রিণাচিকেতঃ(ত্রিঃ নাচিকেতঃ অগ্নিঃ চিতঃ যেন, সঃ। যদ্বা, ত্রয়ো নাচিকেতা যস্যাসৌ, ত্রিণাচিকেতঃ। নাচিকেতাপ্নেরধ্যয়ন বিজ্ঞানানুষ্ঠানবান্ বা),[তথা] ত্রিকর্ম্মকৃৎ(ইজ্যাধ্যয়ন- দানানাং কর্তা)[পুমান] জন্ম-মৃত্যু তরতি(অতিক্রামতি)।[কিঞ্চ], ঈড্যম্(স্তুত্যম্) ব্রহ্মজজ্ঞম্(ব্রহ্ম বেদস্তত্র ব্যক্তত্বাদ্ ব্রহ্মজো বিষ্ণুঃ, যদ্বা, ব্রহ্মণঃ হিরণ্যগর্ভাজজাতঃ ব্রহ্মজঃ, সঃ চ অসৌ জ্ঞঃ চ ইতি, ব্রহ্মজজ্ঞঃ-সর্ব্বজ্ঞঃ তম্) দেবম্(দ্যোতমানম্) বিদিত্বা(শাস্ত্রতঃ জ্ঞাত্বা) নিচায্য(আত্মস্বরূপেণ দৃষ্টা বিচার্য্য বা) ইমাম্ (স্বানুভবগম্যাম্) শান্তিম্ অত্যন্তম্ এতি(অতিশয়েন প্রাপ্নোতি)॥
[ অগ্নির ‘নাচিকেত’ নাম করণের পর তাঁহার আরাধনার ফল বলা হইতেছে] —যে লোক বেদত্রয়ের সহিত সম্বন্ধ লাভ করিয়া, অথবা মাতা, পিতা ও আচার্য্যের
উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া তিনবার নাচিকেত অগ্নির চয়ন(অর্চ্চনা করে, অথবা নাচিকেত অগ্নিবিদ্যার অধ্যয়ন, অনুভূতি ও অনুষ্ঠান করে, এবং ইজ্যা (জ্যোতিষ্টোমাদি যাগ), বেদাধ্যয়ন ও দান করে, সে লোক জন্ম ও মৃত্যু অতিক্রম করে। আর হিরণ্যগর্ভসম্ভূত, জ্ঞানাদিগুণসম্পন্ন, স্তবনীয় ও স্বপ্রকাশ এই অগ্নিদেবকে শাস্ত্রোপদেশ হইতে অবগত হইয়া এবং আত্মস্বরূপে অনুভূত করিয়া স্বীয় অনুভবগম্য শান্তি সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্ত হয় ॥ ১৭ ॥
পুনরপি কৰ্ম্মস্তুতিমেবাহ,-ত্রিণাচিকেতঃ-ত্রিঃ নাচিকেতোহগ্নিশ্চিতো যেন, সঃ ত্রিণাচিকেতঃ, তদ্বিজ্ঞানঃ, তদধ্যয়নঃ, তদনুষ্ঠানবান্ বা। ত্রিভিৰ্মাতৃ- পিত্রাচার্য্যৈঃ এত্য প্রাপ্য সন্ধিং সন্ধানং সম্বন্ধম্, মাত্রাদ্যনুশাসনং যথাবৎ প্রাপ্যে- ত্যেতৎ। তদ্ধি প্রামাণ্যকারণং শ্রুত্যন্তরাদবগম্যতে,-“যথা মাতৃমান্ পিতৃমান্” ইত্যাদেঃ; বেদ-স্মৃতি-শিষ্টৈর্ব্বা, প্রত্যক্ষানুমানাগমৈর্ব্বা, তেভ্যো হি বিশুদ্ধিঃ প্রত্যক্ষা। ত্রিকৰ্ম্মকৃৎ-ইজ্যাধ্যয়নদানানাং কর্তা, তরতি অতিক্রামতি জন্মমৃত্যু।
কিঞ্চ, ব্রহ্মজস্তম্—ব্রহ্মণো হিরণ্যগর্ভাৎ জাতো ব্রহ্মজঃ, ব্রহ্মজশ্চাসৌ জ্ঞশ্চেতি ব্রহ্মজজ্ঞঃ, সর্ব্বজ্ঞো ‘হ্যাসৌ। তং দেবং দ্যোতনাৎ, জ্ঞানাদিগুণবন্তম্ ঈড্যং স্তুত্যং বিদিত্বা শাস্ত্রতঃ, নিচায্য দৃষ্টা চাত্মভাবেন, ইমাং স্ববুদ্ধিপ্রত্যক্ষাং শান্তিম্ উপরতিম্ অত্যন্তম্ এতি অতিশয়েন এতি—বৈরাজং পদং জ্ঞান-কর্মসমুচ্চয়ানুষ্ঠানেন প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ ॥ ১৭ ॥
পুনশ্চ কৰ্ম্ম-বিজ্ঞানের প্রশংসা অভিহিত হইতেছে,-‘ত্রিণাচি- কেত’ অর্থ-যাঁহারা উক্ত ‘নাচিকেত‘-নামক অগ্নির তিনবার চয়ন বা আরাধনা করিয়াছেন, অথবা যাঁহারা উক্তপ্রকার অগ্নিবিদ্যা অধ্যয়ন করিয়াছেন, বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন, এবং তদনুযায়ী অনুষ্ঠান করিয়াছেন। মাতা, পিতা, আচার্য্য এই তিনের সহিত সন্ধি- সম্বন্ধ, অর্থাৎ যথাযথরূপে মাতা, পিতা ও আচার্য্যের উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া-‘মাতৃমান্ পিতৃমান্’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, [ ধৰ্ম্মতত্ত্ব-জিজ্ঞাসুর পক্ষে] তাঁহাদের উপদেশই ধর্মজ্ঞানে প্রধান
প্রমাণ *। অথবা ‘ত্রিভিঃ’ অর্থ—বেদ, স্মৃতি ও শিষ্টজন, কিংবা প্রত্যক্ষ, অনুমান ও আগম বা শাস্ত্র ‘এ সকল হইতেও চিত্তের বিশুদ্ধি বা নির্ম্মলতা লাভ প্রত্যক্ষসিদ্ধ। ‘ত্রিকর্ম্মকৃৎ’ অর্থ—ইজ্যা (যাগ), অধ্যয়ন ও দানের কর্ত্তা; এবংবিধ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি জন্ম ও মৃত্যু অতিক্রম করে।
অপিচ, ব্রহ্ম—হিরণ্যগর্ভ হইতে সমুৎপন্ন—ব্রহ্মজ, এবং সর্বজ্ঞতা নিবন্ধনজ্ঞ, সুতরাং তিনি ‘ব্রহ্মজ-জ্ঞ’ এবং দ্যোতন বা স্বপ্রকাশতা বশতঃ দেব অর্থাৎ জ্ঞান-প্রভৃতিগুণসম্পন্ন। স্তবনীয় সেই অগ্নিদেবকে শাস্ত্র হইতে অবগত হইয়া, এবং আত্মস্বরূপে উপলব্ধি করিয়া এই স্বহৃদয়বেদ্য শান্তি, অর্থাৎ ভোগনিবৃত্তি অতিশয়রূপে লাভ করে।— অর্থাৎ জ্ঞান ও কর্ম্মের সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠানের ফলে ‘বৈরাজ’ পদ ( বিরাটপুরুষের অধিকার) প্রাপ্ত হয় ॥ ১৭ ॥
ত্রিণাচিকেতস্তয়মেতদ্ বিদিত্বা য এবং বিদ্বাঙ্শ্চিনুতে নাটিকেতম্।
* তাৎপয্য,—অন্যত্র শ্রুতিতে আছে, “যথা মাতৃমান্, পিতৃমান্ আচাৰ্য্যবান্ ক্রয়াৎ, তথা তৎশৈলিনোহব্রবীৎ।” উপযুক্ত মাতা, পিতা ও আচার্য্য হইতে শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেরূপ (প্রকৃত তত্ত্ব) বলিয়া থাকেন, শৈলিনও ঠিক সেইরূপই বলিয়াছিলেন। শৈলিন এক জনের নাম। অভিপ্রায় এই যে,—উপনয়ন না হওয়া পর্য্যন্ত মাতার নিকট, বেদাধ্যয়ন কাল পর্য্যন্ত পিতার নিকট এবং তৎপরে আচার্য্যের নিকট যাঁহারা শিক্ষা প্রাপ্ত হন, তাঁহারা ধর্ম্মের গূঢ় তত্ত্ব সম্যক্ উপলব্ধি করিতে পারেন; এই কারণে তাঁহাদের কথাও প্রমাণ বা বিশ্বাসযোগ্য হইয়া থাকে।
শাস্ত্রে আচার্য্যের লক্ষণ এইরূপ লিখিত আছে,—
“আর্চিনোতি চ শাস্ত্রার্থমাচারে স্থাপয়ত্যপি। স্বয়মাচরতে যস্মাদাচাৰ্য্যন্তেন কীৰ্ত্তিতঃ॥” অর্থাৎ যিনি শাস্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য্য সংগ্রহ করেন, লোককে শাস্ত্রানুযায়ী আচারে সংস্থাপিত করেন, এবং নিজেও শাস্ত্রোক্ত আচার প্রতিপালন করেন, তাঁহাকে ‘আচার্য্য’ বলা হয়। + তাৎপর্য্য,—ধৰ্ম্মতত্ত্ব জানিতে হইলে প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শাস্ত্র, এই ত্রিবিধ প্রমাণের সাহায্য গ্রহণ করিতে হয়। মনু বলিয়াছেন,—“প্রত্যক্ষমনুমানং চ শাস্ত্রং বিবিধমাগমম্। এয়ং সুবিদিতং কার্য্যং ধৰ্ম্মশুদ্ধিমভীপ্সতা।” অর্থাৎ যে লোক ধর্ম্মের বিশুদ্ধি লাভ করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহার পক্ষে প্রত্যক্ষ, অনুমান ও বিবিধ শাস্ত্র উত্তমরূপে জানা আবশ্যক।
[ইদানীমগ্নি-বিজ্ঞান-চয়ন-ফলমুপসংহরন্ আহ,-ত্রিণাচিকেত ইতি]। যঃ ত্রিণাচিকেতঃ(বারত্রয়ং নাচিকেতাগ্নিসেবকঃ) এতৎ(যথোক্তম্) ত্রয়ম্[যাঃ ইষ্টকাঃ, যাবতীঃ বা, যথা বা ইতি] বিদিত্বা, নাচিকেতম্(অগ্নিম্) এবম্(আত্মস্বরূপেণ) বিজ্ঞান্(জানন্) চিনুতে(তদ্বিষয়কং ধ্যানং সম্পাদয়তি, শ্যেন-কুৰ্মাদ্যাকারেণ ইষ্টকাদিভির্বেদিৎ করোতি বা), সঃ পুরতঃ(শরীরপাতাৎ পূর্ব্বম্ এব) মৃত্যুপাশান্ (অধৰ্ম্মজ্ঞান-রাগ-দ্বেষাদিলক্ষণান্) প্রণোদ্য(প্রণুদ্য-নিরস্য) শোকাতিগঃ(দুঃখ- বর্জিতঃ সন্) স্বর্গলোকে(বৈরাজে ধামনি) মোদতে(সুখমনুভবতি) ॥
এখন পূর্ব্বোক্ত অগ্নিবিদ্যা ও অগ্নিচয়নৈর ফল প্রদর্শনপূর্ব্বক প্রকরণ পরিসমাপ্ত করিতেছেন,—বারত্রয় নাচিকেত অগ্নির সেবক যে লোক পূর্ব্বোক্ত যজ্ঞীয় ইষ্টকার স্বরূপ; সংখ্যা ও সংগ্রহপ্রণালী অবগত হইয়া নাচিকেত অগ্নিকে আত্মস্বরূপে জানিয়া তদ্বিষয়ে ধ্যান সম্পাদন করেন, তিনি অগ্রে অধর্ম্ম, অজ্ঞান প্রভৃতি মৃত্যু-পাশ ছিন্ন করিয়া সর্ব্বদুঃখ অতিক্রম করতঃ স্বর্গলোকে আনন্দ উপভোগ করেন ॥ ১৮ ॥
ইদানীমগ্নিবিজ্ঞান-চয়ন-ফলমুপসংহরতি প্রকরণঞ্চ; ত্রিণাচিকেতঃ—ত্রয়ং যথোক্তম্[যা ইষ্টকা যাবতীর্ব্বা যথা বা ইত্যেতৎ] বিদিত্বা অবগম্য যশ্চ এবম্ আত্ম- রূপেণ অগ্নিং বিদ্বান্ চিনুতে নির্ব্বর্ত্তয়তি নাচিকেতমগ্নিং ক্রতুম্; স মৃত্যুপাশান্ অধর্মাজ্ঞানরাগদ্বেষাদিলক্ষণান্ পুরতোহগ্রতঃ পূর্ব্বমের শরীরপাতাদিত্যর্থঃ। প্রণোদ্য অপহায় শোকাতিগো মানসৈদুঃখৈর্ব্বর্জিত ইত্যেতৎ। মোর্দতে স্বর্গলোকে বৈরাজে বিরাড়াত্মস্বরূপ-প্রতিপত্ত্যা ॥ ১৮ ॥
এখন অগ্নিবিজ্ঞান ও অগ্নিচয়নের ফল এবং প্রকরণের উপ- সংহার করিতেছেন,—ত্রিণাচিকেত অর্থাৎ বারত্রয় নাচিকেত’ অগ্নির সেবকরূপে যে লোক পূর্ব্বোক্ত ইষ্টকার স্বরূপ, সংখ্যা ও সংগ্রহপ্রণালী,
এই ত্রিবিধ বিষয় অবগত হইয়া এবং নাচিকেত অগ্নিকে আত্মস্বরূপে জানিয়া তদ্বিষয়ে ক্রতু অর্থাৎ ধ্যান করেন, তিনি অগ্রে— দেহপাতের পূর্ব্বেই অধর্ম্ম, অজ্ঞান, রাগ ও দ্বেষাদিরূপ মৃত্যু-পাশ (মৃত্যুর আকর্ষণরজ্জু) সকল ছিন্ন করিয়া, মানসদুঃখরূপ-শোকরহিত হইয়া বিরাডরূপী অগ্নিকে আত্মস্বরূপে উপলব্ধি করিয়া স্বর্গলোকে— বিরাটপদে আনন্দভোগ করেন ॥ ১৮ ॥
এষ তেহগ্নির্নচিকেতঃ স্বর্গ্যো যমবৃণীথা দ্বিতীয়েন বরেণ। এতমগ্নিং তবৈব প্রবক্ষ্যন্তি জনাস- তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীঘ ॥ ১৯ ॥ ব্যাখ্যা।
[অথ মৃত্যুঃ তৃতীয়ং বরং স্মারয়ন্ প্রকরণমুপসংহরতি,—এষ ইতি]। হে নচিকেতঃ! তে(তুভ্যম্) এষঃ স্বর্গ্যঃ(স্বর্গসাধনভূতঃ) অগ্নিঃ(তৎসম্বন্ধীয়ঃ বরঃ) [ দত্তঃ], যম্(বরম্) দ্বিতীয়েন বরেণ অবৃণীথাঃ(বৃতবান্)[অসি],[ত্বম্ ইতি শেষঃ]। জনাসঃ(জনাঃ) এতম্ অগ্নিং তব এব[নাম্না] প্রবক্ষ্যন্তি,(ব্যবহরিষ্যন্তি)। [অধুনা] হে নচিকেতঃ! তৃতীয়ম্(অবশিষ্টম্) বরং বৃণীঘ(প্রার্থয়স্ব) ॥
[অনন্তর, মৃত্যু নচিকেতাকে তৃতীয় বর স্মরণ করাইয়া প্রকরণ পরিসমাপ্ত করিতেছেন],—হে নচিকেতঃ! তোমাকে স্বর্গ-সাধনীভূত এই অগ্নিসম্বন্ধীয় উপদেশ প্রদান করা হইল,—তুমি দ্বিতীয় বরে যাহা প্রার্থনা করিয়াছিলে। জনগণ তোমারই নামে এই অগ্নির ব্যবহার করিবে। হে নচিকেতঃ! তুমি এখন অবশিষ্ট তৃতীয় বর প্রার্থনা কর॥ ১৯ ॥
এষঃতে তুভ্যমগ্নির্ব্বরো হে নচিকেতঃ স্বর্গ্যঃ স্বর্গসাধনঃ, যম্ অগ্নিং বরম্ অবনীথাঃ বৃতবান্ প্রার্থিতবানসি দ্বিতীয়েন বরেণ, সোহগ্নির্ব্বরো দত্ত ইত্যুক্তোপসংহারঃ। কিঞ্চ, এতম্ অগ্নিং তবৈব নাম্না প্রবক্ষ্যন্তি জনাসো জনাঃ ইত্যেতৎ। এব বরো
দত্তো ময়া চতুর্থঃ তুষ্টেন। ‘তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীঘ। তস্মিন্ হ্যদত্তে ঋণবানহমিত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৯ ॥
হে নচিকেতঃ! তুমি দ্বিতীয় বরে যে অগ্নিবিজ্ঞান প্রার্থনা করিয়াছিলে, স্বর্গ্য—স্বর্গসাধনীভূত এই সেই অগ্নিবিদ্যারূপ দ্বিতীয় বর প্রদত্ত হইল। এটি পূর্ব্বোক্ত কথারই উপসংহার মাত্র। আরও এক কথা, সমস্ত লোকে এই অগ্নিকে তোমারই নামে অভিহিত করিবে। আমি পরিতুষ্ট হইয়া এই চতুর্থ বর প্রদান করিলাম। হে নচিকেতঃ! [ এখন] তৃতীয় বর প্রার্থনা কর। অভিপ্রায় এই যে, পূর্ব্বপ্রতিশ্রুত সেই(তৃতীয়) বর প্রদান না করিলে আমি ঋণগ্রস্ত থাকিব॥ ১৯ ॥
যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে অস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি চৈকে। এতদ্ বিদ্যামনুশিষ্টস্ত্বয়াহং বরাণামেষ বরস্তৃতীয়ঃ ॥ ২০ ॥
[অথ তৃতীয়বর-প্রার্থনা-প্রকারমাহ,—যেয়মিতি]। নচিকেতা আহ— মনুষ্যে(প্রাণিমাত্রে) প্রেতে(মৃতে সতি) যা(সর্ব্বজনবিদিতা) ইয়ং বিচিকিৎসা (সংশয়ঃ)—অয়ম্(পরলোকগামী)[আত্মা] অস্তি ইতি একে(কেচন বাদিনঃ বদন্তি), অয়ম্(পরলোকগামী আত্মা) নাস্তি ইতি চ একে(কেচিং বাদিনঃ বদন্তি), অহং ত্বয়া অনুশিষ্টঃ(উপদিষ্টঃ সন্) এতৎ(পরলোক-তত্ত্বম্) বিদ্যাম্(বিজানীয়াম্)। বরাণাম্[মধ্যে] এযঃ তৃতীয়ঃ বরঃ[ময়া বৃতঃ]॥
[অনন্তর নচিকেতার তৃতীয় বর প্রার্থনার প্রণালী কথিত হইতেছে],—নচি- কেতা বলিলেন,—মনুষ্য মরিলে পর, কেহ কেহ বলেন, পরলোকগামী আত্মা আছে; আবার কেহ কেহ বলেন—আত্মার পরলোক-গমন নাই; এই যে, সর্ব্বজন- বিদিত সংশয়,[হে মৃত্যো!] আপনকার উপদেশে এই তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করি। ইহাই আমার তৃতীয় বর॥ ২০॥
এতাবদ্ব্যতিক্রান্তেন বিধি-প্রতিষেধার্থেন মন্ত্র-ব্রাহ্মণেন অবগন্তব্যম্,-যদ্বৎ বরদ্বয়সূচিতং বস্তু নাত্মতত্ত্ববিষয়-যাথাত্ম্যবিজ্ঞানম্। অতো বিধি-প্রতিষেধার্থ- বিষয়স্য আত্মনি ক্রিয়া-কারক-ফলাধ্যারোপলক্ষণস্য স্বাভাবিকস্যাজ্ঞানস্য সংসার- বীজস্য নিবৃত্ত্যর্থং তদ্বিপরীতব্রহ্মাত্মৈকত্ববিজ্ঞানঃ ক্রিয়া-কারক-ফলাধ্যারোপ- লক্ষণশূন্যম্ আত্যন্তিকনিঃশ্রেয়সপ্রয়োজনং বক্তব্যম্; ইত্যুত্তরো গ্রন্থ আরভ্যতে। তমেতমর্থং দ্বিতীয়-বরপ্রাপ্ত্যাপি অকৃতার্থত্বং তৃতীয়বরগোচরম্ আত্মজ্ঞানমন্তরেণ ইত্যাখ্যায়িকয়া প্রপঞ্চয়তি।
যতঃ পূর্ব্বস্মাৎ কর্মগোচরাৎ সাধ্য-সাধন-লক্ষণাদনিত্যাদ্বিরক্তস্য আত্ম- জ্ঞানেহধিকারঃ; ইতি তন্নিন্দার্থং পুত্রাদ্যপন্যাসেন প্রলোভনং, ক্রিয়তে। নচিকেতা উবাচ—‘তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীঘ’ ইত্যুক্তঃ সন্; যেয়ং বিচিকিৎসা সংশয়ঃ প্রেতে মৃতে মনুষ্যে, অস্তীত্যেকে,—অস্তি শরীরেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধিব্যতিরিক্তো দেহান্তরসম্বন্ধ্যাত্মা ইত্যেকে মন্যন্তে, নায়মস্তীতি চৈকে—নায়মেবংবিধোহস্তীতি চৈকে। অতশ্চাম্মাকং ন প্রত্যক্ষেণ নাপ্যনুমানেন নির্ণয়বিজ্ঞানম্। এতদ্বিজ্ঞানা- ধীনো হি পরঃ পুরুষার্থ ইত্যত এতৎ বিদ্যাং বিজানীয়াম্ অহম্ অনুশিষ্টঃ জ্ঞাপিত- স্বয়া। বরাণামেষ বরস্তৃতীয়োহবশিষ্টঃ ॥ ২০॥
বিধি-প্রতিষেধার্থক অর্থাৎ মানবীয় প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তিবোধক অতীত মন্ত্র-ব্রাহ্মণাত্মক গ্রন্থে বরদ্বয় উপলক্ষে যে যে বিষয় উল্লিখিত হইয়াছে *, বুঝিতে হইবে, তৎসমস্তই সাংসারিক বিষয়; কোনটিই আত্ম-তত্ত্ব-বিষয়ক যথার্থ জ্ঞান নহে। অতএব বিধি- নিষেধাত্মক শাস্ত্রের বিষয়—যাহা আহাতে ক্রিয়া, কারক(কর্ত্রাদি) ও তৎফলের অধ্যারোপাত্মক এবং জীবের স্বভাব-সিদ্ধ, সংসার-বীজ-
৫
ভূত সেই অজ্ঞানের নিবৃত্তির জন্য, এখন তদ্বিপরীত—ক্রিয়া, কারক ও তৎফলের অধ্যারোপশূন্য এবং আত্যন্তিক মুক্তিসাধন ব্রহ্ম ও আত্মার একত্ববিষয়ক জ্ঞানের প্রতিপাদন আবশ্যক; এই উদ্দেশে পরবর্তী গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে। তৃতীয় বরে যে আত্মজ্ঞানের উল্লেখ হইয়াছে, তাহা না পাইলে দ্বিতীয় বর লাভেও কৃতার্থতা হইতে পারে না, এই বিষয়টিই আখ্যায়িকা বা উপস্থিত গল্প দ্বারা বিস্তৃত- ভাবে বর্ণনা করিতেছেন।
যেহেতু পূর্বোক্ত সাধ্য-সাধনাত্মক অনিত্য কৰ্ম্মফল হইতে বিরক্ত অর্থাৎ কর্মফলে তৃষ্ণারহিত ব্যক্তিরই আত্মজ্ঞানে অধিকার জন্মে, এই কারণে তাহার নিন্দাপ্রকাশার্থ[প্রথমতঃ] পুত্রাদি ফলের উল্লেখ দ্বারা নচিকেতার লোভোৎপাদন করা হইতেছে।(হে নচিকেতঃ! তুমি তৃতীয় বর প্রার্থনা কর, এইরূপে অভিহিত হইয়া নচিকেতা বলিলেন, এই যে একটা সংশয় আছে,-এক সম্প্রদায় বলেন মনুষ্য মৃত্যুর পরও বর্তমান থাকে, অর্থাৎ তাঁহারা বলেন যে, শরীর, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি হইতে পৃথক এবং দেহান্তরগামী আত্মা আছে; আবার অন্য সম্প্রদায় বলেন যে, না—ঐ প্রকার আত্মা নাই বা থাকিতে পারে না। এই তত্ত্বটি প্রত্যক্ষ কিংবা অনুমান দ্বারাও আমাদের নিশ্চয়রূপে জানিবার উপায় নাই; অথচ পরম পুরুষার্থ (মুক্তি) লাভ এই বিজ্ঞানেরই অধীন। অতএব আপনকার উপদেশে আমি এই তত্ত্ব জানিতে চাই। বরসমূহের মধ্যে ইহাই অবশিষ্ট তৃতীয় বর ॥ ২০॥)
দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং পুরা ন হি সুবিজ্ঞেয়মণুরেষ ধৰ্ম্মঃ। অন্যং বরং নচিকেতো বৃণীঘ মা মোপরোৎসীরতি মা সৃজৈনম্ ॥ ২১ ॥
যমস্ত নচিকেতসা এবং প্রার্থিতঃ সন্ উবাচ—দেবৈঃ অপি অত্র(অস্মিন্ বিষয়ে) পুরা(পূর্ব্বম্) বিচিকিৎসিতম্(সংশয়িতম্)।[ইদং তত্ত্বং শ্রুতমপি প্রাকৃতৈঃ জনৈঃ] নহি সুবিজ্ঞেয়ং চ(নৈব সম্যক্ বিজ্ঞাতুং শক্যম্)।[যতঃ] ধৰ্ম্মঃ (জগদ্ধারকঃ) এষঃ(আত্মা) অণুঃ(অণুবৎ স্বভাবতএব দুর্ব্বিজ্ঞেয়ঃ)।[অতঃ] হে নচিকেতঃ! অন্যং(পরলোকতত্ত্বভিন্নং) বরং বৃণীঘ(প্রার্থয়স্ব)। মা(মাং) মা উপরোৎসীঃ(উপরোধম্ আগ্রহাতিশয়ং মা কাষীঃ); মা(মাং প্রতি) এনং (বরং) অতিসৃজ(পরিত্যজ);[মাং প্রতি নৈবং প্রশ্নঃ কার্য্যস্থয়া, ইত্যাশয়:]।
যম নচিকেতার এইরূপ প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া বলিলেন,—হে, নচিকেতঃ! ইতঃপূর্ব্বে দেবগণও এ বিষয়ে সন্দেহ করিয়াছেন। এই আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়াও সাধারণ লোকে উত্তমরূপে বুঝিতে পারে না; কারণ, ধৰ্ম্ম(জগদ্ধারক) এই আত্মা স্বভাবতই অণু অর্থাৎ দুর্বিজ্ঞেয়। অতএব হে নচিকেতঃ! তুমি অন্য বর প্রার্থনা কর; এ বিষয়ে আমাকে আর উপরোধ করিও না;[আমার সম্বন্ধে এই প্রশ্ন পরিত্যাগ কর] ॥ ২১ ॥
কিময়মেকান্ততো নিঃশ্রেয়স-সাধনাত্মজ্ঞানাহো ন বা? ইত্যেতৎ-পরীক্ষার্থ- মাহ—দেবৈরপি অত্র এতস্মিন্ বস্তুনি বিচিকিৎসিতং সংশয়িতং পুরা পূর্ব্বম্। ন হি সুবিজ্ঞেয়ং সুষ্ঠু বিজ্ঞেয়ম্ অসকৃৎ শ্রুতমপি প্রাকৃতৈর্জনৈঃ, যতঃ অণুঃ সূক্ষ্মঃ এষঃ আত্মাখ্যো ধৰ্ম্মঃ। অতঃ অন্যম্ অসন্দিগ্ধফলং বরং নচিকেতঃ বৃণীঘ। মা মাং মা উপরোৎসীঃ উপরোধং মাকার্ষীরধমর্ণমিবোত্তমর্ণঃ। অতিসৃজ বিমুঞ্চ এনং বরং মা মাং প্রতি ॥ ২১ ॥
এই নচিকেতা মোক্ষ-সাধন আত্মজ্ঞানের উপযুক্ত পাত্র কি না? ইহা পরীক্ষা করিবার উদ্দেশে যম বলিতে লাগিলেন,-পূর্ব্বে দেব- গণও এই বস্তুবিষয়ে সংশয় করিয়াছেন; অর্থাৎ দেবগণেরও এই বিষয়ে ‘সংশয় আছে। যেহেতু এই সূক্ষম আত্মরূপ ধর্মটি অতীব দুর্জেয়; অজ্ঞ লোকেরা বারংবার শ্রবণ করিয়াও এই তত্ত্ব বুঝিতে
পারে না। অতএব, হে নচিকেতঃ! অসন্দিগ্ধ ফলজনক(যাহার ফল বিষয়ে সন্দেহ নাই, এমন) বর প্রার্থনা কর; উত্তমর্ণ(ঋণদাতা) যেমন অধমর্ণকে(ঋণগ্রহীতাকে) বাধ্য করে, তেমনি তুমিও আমাকে আর উপরোধ করিও না; আমার নিকট ঐ বর-প্রার্থনা পরিত্যাগ কর ॥ ২১ ॥
বক্তা চাস্য ত্বাদৃগন্যো ন লভ্যো- নান্যো বরস্তুল্য এতস্য কশ্চিৎ ॥ ২২ ॥
[অথ নচিকেতাঃ প্রত্যুবাচ]—মৃত্যো! অত্র(বিষয়ে) কিল(কিলেতি ঐতিহ্যসূচকং, পুরা ইত্যাশয়ঃ)। দেবৈঃ অপি বিচিকিৎসিতং, ত্বং চ যৎ ন সুজ্ঞেয়ম্ আথ(কথয়সি)। অন্য(তত্ত্বস্য) বক্তা চ ত্বাদৃক্(ত্বৎসদৃশঃ) অন্যঃ ন লভ্যঃ; [অতঃ] এতস্য(নরস্য) তুল্যঃ অন্যঃ কশ্চিৎ বরঃ ন[অস্তি ইতি মন্যে।]
অনন্তর নচিকেতা বলিলেন,—হে মৃত্যো! দেবগণও এ বিষয়ে সন্দেহ করিয়াছেন; এবং তুমিও এই বিষয়টি অনায়াসবোধ্য নয় বলিতেছ; অথচ এ বিষয়ে তোমার মত অপর বক্তাও লাভ করা সম্ভবপর নহে। অতএব[আমি মনে করি যে,] ইহার তুল্য অন্য কোন বর নাই, অথবা অন্য কোন বরই ‘ইহার তুল্য হইতে পারে না ॥ ২২ ॥
এবমুক্তো নচিকেতা আহ,-দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং কিলেতি ভবত এব- মুপশ্রুতম্ *; ত্বঞ্চ মৃত্যো যদ্ যস্মাৎ ন সুজ্ঞেয়ম্ আত্মতত্ত্বম্ আখ কথয়সি। অতঃ পণ্ডিতৈরপ্যবেদনীয়ত্বাৎ বক্তা চাস্য ধর্মস্য ত্বাদৃক্ ত্বত্তুল্যোহন্যঃ পণ্ডিতশ্চ ন লভ্যঃ অন্বিষ্যমাণোহপি। অয়ং তু বরো নিঃশ্রেয়স-প্রাপ্তিহেতুঃ। অতো নান্যো বরস্তুল্যঃ সদৃশোহস্তি এতস্য কশ্চিদপি; অনিত্যফলত্বাদন্যস্য সর্ব্বস্যৈবেত্যভিপ্রায়ঃ ॥২২॥
এই কথার পর নচিকেতা বলিলেন,—হে মৃত্যো! দেবগণও এবিষয়ে সংশয় করিয়াছেন, অর্থাৎ তাঁহাদেরও এবিষয়ে সংশয় আছে, এইরূপ কথা আপনার নিকটই শ্রবণ করিলাম, আর যেহেতু আপনিও এই আত্ম-তত্ত্বকে সুজ্ঞেয় নয়, বলিতেছেন, অতএব ইহা যখন পণ্ডিতগণেরও অবিজ্ঞেয়, তখন অন্বেষণ করিয়াও এই ধর্মতত্ত্বের বক্তা আপনকার সদৃশ অপর কোন পণ্ডিতকে লাভ করা যাইবে না। অথচ এই বরই নিঃশ্রেয়স-প্রাপ্তির(মোক্ষ-লাভের)[একমাত্র] উপায়; অতএব ইহার তুল্য অন্য কোনও বর নাই। অভিপ্রায় এই যে, অন্য সমস্তেরই ফল যখন অনিত্য, তখন’অন্য কোন বরই ইহার সদৃশ হইতে পারে না ॥ ২২ ॥
শতায়ুঃ পুত্রপৌত্রান্ বৃণীষ বহূন্ পশূন্ হস্তি-হিরণ্যমশ্বানী ভূমের্মহদায়তনং বৃণীষ স্বয়ঞ্চ জীব শরদো যাবদিচ্ছসি ॥ ২৩ ॥
[মৃত্যুঃ নচিকেতসম্ আত্মবিদ্যাধিকার-পরীক্ষার্থং পুনরপি প্রলোভয়ন্ আহ],— [হে নচিকেতঃ! ত্বম্] শতায়ুষঃ(শতং বর্ষাণি আয়ুংষি যেষাং তান্) পুত্রপৌত্রান্ বৃণীঘ(প্রার্থয়স্ব), তথা বহুন্ পশূন্(গবাদীন), হস্তি-হিরণ্যম্ (হস্তী চ হিরণ্যং চ, তৎ), অশ্বান্, ভূমেঃ(পৃথিব্যাঃ) মহৎ(বিস্তীর্ণম্) আয়তনম্(সাম্রাজ্যমিত্যর্থঃ) বৃণীঘ। স্বয়ং.চ(স্বয়মপি) যাবৎ শরদঃ(বর্ষাণি) [জীবিতুম্] ইচ্ছসি,[তাবৎ] জীব(শরীরং ধারয়) ॥
নচিকেতার আত্মবিজ্ঞানে অধিকার আছে কিনা, ইহার পরীক্ষার্থ পুনশ্চ প্রলোভন প্রদর্শনপূর্ব্বক য়ম বলিতে লাগিলেন,—হে নচিকেতঃ! তুমি শতবর্ষ- জীবী পুত্র-পৌত্র, বহু গবাদি পশু, হস্তী, সুবর্ণ ও অশ্বসমূহ প্রার্থনা কর।
পৃথিবীর বিশাল আয়তন, অর্থাৎ সাম্রাজ্য প্রার্থনা কর; এবং নিজেও যত বৎসর ইচ্ছা কর, জীবন ধারণ কর ॥ ২৩॥
এবমুক্তোহপি পুনঃ প্রলোভয়ন্ন বাচ মৃত্যুঃ, —শতাবুষঃ—শতং বর্ষাণি আয়ুংষি যেষাং তান্ শতায়ুষঃ, পুত্রপৌত্রান্ বৃণীঘ। কিঞ্চ, গবাদিলক্ষণান্ বহুন্ পশূন্, হস্তিহিরণ্যম্—হস্তী চ হিরণ্যঞ্চ হস্তিহিরণ্যম্, অশ্বাংশ। কিঞ্চ, ভূমেঃ পৃথিব্যাঃ মহৎ বিস্তীর্ণম্ আয়তনম্ আশ্রয়ম্—মণ্ডলং সাম্রাজ্যং * বৃণীঘ। কিঞ্চ, সর্ব্বমপি এতদনর্থকং স্বয়ং চেৎ অল্লায়ুরিত্যত ‘আহ,—স্বয়ঞ্চ ত্বং জীব—ধারয় শরীরং সমগ্রেন্দ্রিয়কলাপম্, শরদো বর্ষাণি যাবদিচ্ছসি, জীবিতুমিত্যর্থঃ ॥ ২৩ ॥
এই কথা শ্রবণ করিয়া মৃত্যু পুনশ্চ প্রলোভন-প্রদর্শনপূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন,—শতবর্ষ-পরিমিত যাহাদের আয়ুঃ(জীবনকাল), এবংবিধ অর্থাৎ শতবর্ষজীবী পুত্রপৌত্রগণ প্রার্থনা কর। অপিচ গো প্রভৃতি বহু পশু, হস্তী, হিরণ্য(সুবর্ণ) এবং অশ্বসমূহ(প্রার্থনা কর)। আর ভূমির অর্থাৎ পৃথিবীর বিস্তীর্ণ আয়তন আশ্রয় বা মণ্ডল, অর্থাৎ সাম্রাজ্য প্রার্থনা কর। আরও এক কথা, নিজে অল্লায়ুঃ হইলে এই সমস্তই বৃথা বা বিফল; এই কারণে বলিলেন,—তুমি নিজেও যত বৎসর জীবন ধারণ করিতে ইচ্ছা কর,[তত বৎসর] বাঁচিয়া থাক, অর্থাৎ সমগ্র ইন্দ্রিয়-সম্পন্ন শরীর ধারণ কর ॥ ২৩॥
এতত্তুল্যং যদি মন্যসে বরং বৃণীষ বিত্তং চিরজীবিকাঞ্চ। মহাভূমৌ নচিকেতত্ত্বমেধি কামানাং ত্বা কামভাজং করোমি ॥২৪॥
[হে] নচিকেতঃ![ত্বম্] যদি এতত্তুল্যম্(মৎপ্রদত্ত-বরতুল্যম্, আত্মতত্ত্ব-
সদৃশং বা অপরং কঞ্চন) বরং মন্যসে,[তদা তমপি] বৃণীঘ।[অপিচ] বিত্তম্, চিরজীবিকাম্(চিরজীবিত্বম্) চ[বৃণীঘ]। যদ্বা, হে নচিকেতঃ! ত্বং যদি চিরজীবিকাম্(দীর্ঘকালজীবনধারণহেতুভূতম্) বিত্তম্(ধনম্) চ এতত্তুল্যং বরং মন্যসে,[তর্হি তমপি বৃণীঘ ইত্যর্থঃ]।[আদরাতিশয়খ্যাপনার্থং প্রাগুক্তস্য পুররুক্তিঃ] মহাভূমৌ(বিস্তীর্ণভূমিভাগে) ত্বম্ এধি(রাজা ভব ইত্যাশয়ঃ)। ত্বা(ত্বাম্) কামানাম্ (দিব্যানাং মানুষাণাং চ কাম্যমানানাম্) কামভাজম্(কামভাগিনম্) করোমি [অহমিতি শেষঃ] ॥
হে নচিকেতঃ! তুমি যদি ইহার অনুরূপ অপর বর(প্রার্থনীয়) আছে, মনে কর, তাহা হইলে তাহাও প্রার্থনা করিতে পার, এবং দীর্ঘজীবন ও জীবন- রক্ষার্থ প্রভূত বিত্তও প্রার্থনা করিতে পার। হে নচিকেতঃ! তুমি বিস্তীর্ণ ভূমিতে থাক, অর্থাৎ ঐরূপ ভূভাগের রাজা হও। আমি তোমাকে স্বর্গীয় ও পার্থিব সমস্ত কাম্যফলের ভোগভাগী করিতেছি ॥ ২৪ ॥
এততুল্যম্ এতেন যথোপদিষ্টেন সদৃশম্ অন্যমপি যদি মন্যসে বরম, তমপি বৃণীঘ। কিঞ্চ, বিত্তং প্রভূতং হিরণ্যরত্নাদি, চিরজীবিকাঞ্চ সহ বিত্তেন বৃণীঘেত্যেতৎ। কিং বহুনা, মহাভূমৌ মহত্যাং ভূমৌ রাজা নচিকেতত্ত্বমেধি ভব। কিঞ্চান্যৎ, কামানাং দিব্যানাং মানুষাণাঞ্চ ত্বা ত্বাং কামভাজং কামভাগিনং কামার্হং করোমি; সত্যসঙ্কল্লো হ্যহং দেব ইতি ভাবঃ ॥ ২৪ ॥
হে নচিকেতঃ![তুমি] যদি ইহার তুল্য অর্থাৎ কথিত বরের সদৃশ অন্য বরও আছে, মনে কর, তাহাও প্রার্থনা কর। অপিচ, বিত্ত অর্থাৎ প্রভূত সুবর্ণ-রত্নাদি এবং বিত্তের সহিত চিরজীবিকা (দীর্ঘজীবন) অথবা বংশানুক্রমে জীবিকা নির্বাহের উপায় বিত্ত প্রার্থনা কর। আর অধিক কথায় প্রয়োজন কি? হে নচিকেতঃ! তুমি মহাভূমিতে অর্থাৎ বিস্তীর্ণ ভূমিতে রাজা হও। আরও এক কথা, দেবতা ও মনুষ্যের উপভোগ্য যত প্রকার কাম্য পদার্থ আছে,
আমি তোমাকে সেই ‘কামভাগী অর্থাৎ কাম ভোগের উপযুক্ত করিতেছি। অভিপ্রায় এই যে, আমি সত্য-সংকল্প দেবতা, অর্থাৎ তুমি জানিয়া রাখ, আমি ইচ্ছামাত্রে কার্য্য সম্পাদন করিতে পারি ॥ ২৪ ॥
যে যে কামা দুর্লভা মর্ত্যলোকে সর্ব্বান্ কামাশ্চন্দতঃ প্রার্থয়স্ব। ইমা রামাঃ সরথাঃ সতূর্য্যা ন হীদৃশ। লম্ভনীয়া মনুষ্যৈঃ। আভির্মৎপ্রত্তাভিঃ পরিচারয়স্ব নচিকেতো মরণং মানুপ্রাক্ষীঃ ॥২৫॥ ব্যাখ্যা।
যে যে ইতি।[অপিচ] মর্ত্যলোকে(ভূলোকে, মানুষদেহে বা)। যে যে কামাঃ(প্রার্থনীয়াঃ) দুর্লভাঃ(দুঃখেন লব্ধং শক্যাঃ),[তান্] সর্ব্বান্ কামান্ (ভোগ্যবস্তুনি) ছন্দতঃ(স্বেচ্ছানুসারেণ) প্রার্থয়স্ব। কিঞ্চ, ইমাঃ রূপশীলাদিগুণবত্যঃ সরথাঃ(রথস্থাঃ), সতূর্য্যাঃ(বাদিত্রাদিসমন্বিতাঃ) রামাঃ(রময়ন্তি প্রীণয়ন্তি পুরুষান্ ইতি রামাঃ স্ত্রিয়ঃ অপ্সরসো বা)[বর্তন্তে ইতি শেষঃ]। ঈদৃশাঃ(এবংবিধা রামাঃ) [অম্মদাদ্যনুগ্রহং বিনা] মনুষ্যৈঃ(নরৈঃ) ন হি লম্ভনীয়াঃ(নৈব লভ্যা ইত্যর্থঃ)। [তদুপযোগম্ আহ]-হেঁ নচিকেতঃ! আভিঃ(রথাদ্যপেতাভিঃ) মৎপ্রস্তাভিঃ (মদ্দত্তাভিঃ স্ত্রীভিঃ) পরিচারয়স্ব(আত্মানং সেবয়)। মরণম্(মরণবিষয়কং প্রশ্নম্) মানুপ্রাক্ষীঃ(নৈবং পৃচ্ছেত্যর্থঃ)[তস্য দুর্ব্বাচ্যত্বাদিতি ভাবঃ] ॥
অপিচ,[হে নচিকেতঃ!] মর্ত্যলোকে যে সকল পদার্থ প্রার্থনীয় অথচ দুর্লভ, তুমি স্বেচ্ছানুসারে সে সমুদয় প্রার্থনা কর।[দেখ] রথস্থ ও বাদিত্রাদি, সমন্বিত এই রমণী বা অপ্সরোগণ রহিয়াছে। এরূপ রমণীগণ মনুষ্যের লাভ করা সম্ভব নহে। আমার প্রদত্ত এই রমণীগণ দ্বারা নিজের পরিচর্যা করাও। হে নচিকেতঃ! মরণবিষয়ক প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা করিও না ॥ ২৫ ॥
যে যে কামাঃ প্রার্থনীয়া দুর্লভাশ্চ মর্ত্যলোকে, সর্ব্বান্ তান্ কামান্ ছন্দতঃ ইচ্ছাতঃ প্রার্থয়স্ব। কিঞ্চ, ইমাঃ দিব্যা অপ্সরসঃ, রময়ন্তি পুরুষানিতি রামাঃ, সহ রথৈর্ব্বর্ত্তন্ত ইতি সরথাঃ, সতূর্য্যাঃ সবাদিত্রাঃ তাশ্চ নহি লম্ভনীয়াঃ প্রাপণীয়াঃ, ঈদৃশা এবংবিধাঃ মনুষ্যৈঃ মর্ত্যৈঃ অস্মদাদিপ্রসাদমুন্তরেণ। আভিঃ মৎপ্রত্তাভিঃ ময়া দত্তাভিঃ পরিচারিকাভিঃ পরিচারয় আত্মানম্-পাদপ্রক্ষালনাদিশুশ্রূষাং কারয় আত্মন ইত্যর্থঃ। হে নচিকেতঃ মরণং মরণসম্বদ্ধং প্রশ্নম্-প্রেত্যাস্তি নাস্তীতি কাকদন্তপরীক্ষারূপং মা অনুপ্রাক্ষীঃ মৈবং প্রষ্টুমহসি ॥ ২৫ ॥
মর্ত্যলোকে যাহা যাহা, কাম্য অর্থাৎ মনুষ্যের প্রার্থনীয়; অথচ দুর্লভ,[হে নচিকেতঃ! তুমি] তৎসমুদয় ইচ্ছামত প্রার্থনা কর। আর[দেখ] পুরুষের প্রীতিকর এই দিব্য অপ্সরোগণ বাদ্যযন্ত্র- সহকারে রথের সহিত বর্তমান রহিয়াছে; ঈদৃশ রমণীগণ অস্মদীয় অনুগ্রহ ব্যতীত মনুষ্যগণের লাভযোগ্য হয় না। আমার প্রদত্ত এই সকল পরিচারিকাদ্বারা পরিচর্যা করাও, অর্থাৎ নিজের পাদ- প্রক্ষালনাদি শুশ্রূষাকার্য্য করাও। হে নচিকেতঃ। কাকদন্ত-পরীক্ষার ন্যায় অনাবশ্যক ‘মৃত্যুর পর আত্মা থাকে কি না’ এই মরণ-বিষয়ক প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা করা তোমার উচিত হয় না ॥ ২৫ ॥
শ্বোভাবা মর্ত্যস্য যদন্তকৈতৎ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাং জরয়ন্তি তেজঃ। অপি সর্ব্বং জীবিতমল্লমেব তবৈব বাহাস্তব নৃত্য-গীতে ॥ ২৬ ॥ ব্যাখ্যা।
[এবং প্রলোভ্যমানোহপি নচিকেতাঃ অক্ষুব্ধ এব শতায়ুষ ইত্যাদেঃ উত্তরমাহ— শ্ব ইত্যাদিনা।]—হে অন্তক(মৃত্যো)![ ত্বয়া উপন্যস্তাঃ পুত্রাপ্সরঃপ্রভৃতয়ঃ ভোগাঃ] স্বোভাবাঃ(শ্বঃ আগামিনি দিনে স্থাস্যতি বা ন বা ভাবঃ সত্তা যেষাম্, তথাভূতাঃ),[তথা] মর্ত্যস্য(মনুষ্যস্য) যদেতৎ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাং তেজঃ(বীর্য্যম্),[তৎ]
৬
জরয়ন্তি(শিথিলীকুর্ব্বস্তি)।{ অতঃ-ত্বয়োক্তা ভোগা অনর্থায় এব সম্পদ্যন্তে ইতি ভাবঃ];[যদপি স্বয়ং চ জীবেত্যাদ্যুক্তম্, তস্যোত্তরমাহ], -সর্ব্বম্ অপি[কিং বহুনা ব্রহ্মণোহপি] জীবিতম্(আয়ুঃ) অল্পমেব[পরিমিতত্বাদিত্যাশয়ঃ]।[ইমা রামা ইত্যস্যোত্তরমাহ-তবৈবেতি]; বাহাঃ(অশ্বরথাদয়ঃ) তবৈব[সন্তু], নৃত্য-গীতে চ তব[এব স্তাম্] ॥
[নচিকেতা পূর্ব্বোক্তপ্রকারে যমকর্তৃক প্রলোভিত হইয়াও চঞ্চল না হইয়া যমের কথার উত্তর দিতে লাগিলেন। নচিকেতা বলিলেন],—হে অন্তক! (যম!)[আপনি পুত্র অপ্সরা প্রভৃতি যে সমুদয় ভোগ্যবস্তুর উল্লেখ করিয়াছেন, তৎসমস্তই] স্বোভাব অর্থাৎ কল্য পর্য্যন্ত থাকিবে কিনা, সন্দেহের বিষয়, এবং মর্ত্যের অর্থাৎ মরণশীল মানবের সমস্ত ইন্দ্রিয়-শক্তিকে জীর্ণ করিয়া দেয়। [আর যে দীর্ঘজীবনের কথা বলিয়াছেন, সেই] সমস্ত জীবন—[এমন কি ব্রহ্মার জীবন পর্য্যন্ত] নিশ্চয়ই অল্প।[অতএব] বাহ অর্থাৎ অশ্ব-রথাদি বাহনসমূহ আপনকারই থাকুক, নৃত্যগীতও আপনকারই থাকুক[আমার ঐ সকলে প্রয়োজন নাই] ॥৫২৬॥
মৃত্যুনা এবং প্রলোভ্যমানোহপি নচিকেতা মহাহ্রদবদক্ষোভ্য আহ,-শ্বো- ভবিষ্যন্তি ন ভবিষ্যন্তি বেতি সন্দিহ্যমান এব যেষাং ভাবো ভবনম্, -ত্বয়োপ- ন্যস্তানাং ভোগানাম্, তে শ্বোভাবাঃ। কিঞ্চ, মর্ত্যস্য মনুষ্যস্য অন্তক-হে মৃত্যো যদেতৎ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাং ‘তেজঃ, তৎ জরয়ন্তি অপক্ষপয়ন্তি। অপ্সরঃপ্রভৃতয়ো ভোগাঃ অনর্থায়ৈবৈতে ধৰ্ম্মবীর্য্য প্রজ্ঞাতেজোষশঃপ্রভৃতীনাং ক্ষপয়িতৃত্বাৎ। যাৎ চাপি দীর্ঘজীবিকাং ত্বং দিৎসসি, তত্রাপি শৃণু,-সর্ব্বম্-যব্রহ্মণোহপি জীবিতম্ আয়ুঃ অল্পমেব, কিমুতাম্মদাদিদীর্ঘজীবিকা। অতস্তবৈব তিষ্ঠন্তু বাহাঃ রথাদয়ঃ, তথা তব নৃত্যগীতে চ ॥ ২৬॥
নচিকেতা এইরূপ প্রলোভিত হইয়াও সমুদ্রের ন্যায় অক্ষুব্ধভাবে বলিতে লাগিলেন,—হে অন্তক(যম)! আপনি যে সকল ভোগ্য বস্তুর উপন্যাস করিয়াছেন, সে সকলের ভাব অর্থাৎ সত্তা বা অস্তিত্ব
কল্য থাকিবে কি থাকিবে না—সন্দেহের বিষয়;[ অতএব সে সকল বস্তু] শোভাব। আরও এক কথা,—অপ্সরা প্রভৃতি ভোগ্যবস্তুসমূহ মর্ত্যের(মনুষ্যের) এই যে সমস্ত ইন্দ্রিয়গত তেজঃ(শক্তি), তাহাকে জীর্ণ করে, অর্থাৎ ক্ষয়োন্মুখ করে। ধৰ্ম্ম, বীর্য্য, জ্ঞান, তেজঃ ও যশ প্রভৃতিকে ক্ষয় করে বলিয়া, এ সমস্ত বস্তু অনর্থেরই কারণ। আর আপনি যে সুদীর্ঘ জীবন দিতে ইচ্ছা করিয়াছেন, তাহাতেও বলিতেছি শ্রবণ করুন,—সমস্ত জীবন, অধিক কি, ব্রহ্মার যে জীবন বা আয়ুঃ, তাহাও যখন নিশ্চয়ই অল্প, তখন আমাদের ন্যায় লোকদিগের আর কথা কি? অতএব, রথাদি বাহনসমূহ আপনকারই থাকুক, এবং নৃত্য-গীতও আপনকারই থাকুক ॥ ২৬ ॥
ন বিভেন তর্পণীয়ো, মনুষ্যো।
লপ্স্যামহে বিত্তমদ্রাক্ষ চেত্ত্বা। জীবিষ্যামো যাবদীশিষ্যসি ত্বং
বরস্তু মে বরণীয়ঃ স এব ॥ ২৭ ॥
বাখ্যা।
[বৃণীঘ বিত্তমিত্যাদেরুত্তরমাহ—ন বিত্তেনেতি।]—মনুষ্যঃ বিত্তেন(ধনেন) ন তর্পণীয়ঃ(আপ্যায়নীয়ঃ, প্রার্থনীয়ঃ)[ইত্যাহ], লপ্স্যামহ ইতি। ত্বা(ত্বাম্) চেদ্ অদ্রাক্ষ্ম(দৃষ্টবস্তুঃ স্মঃ)[তর্হি] বিত্তং লপ্স্যামহে। ত্বং যাবৎ ঈশিষ্যসি(যাম্যে পদে প্রভুঃ স্থাস্যসি)[তাবৎ] জীবিষ্যামঃ[বয়মিতি শেষঃ],[তাবৎ তব প্রভু- স্বাদিতি ভাবঃ];[অতঃ তদ্বিষয়ে পৃথক্ প্রার্থনামনুচিতম্]।[তস্মাৎ] বয়ন্ত (বরঃ পুনঃ) স এব(প্রাযাচিতঃ এব) মে(মম) বরণীয়ঃ(প্রার্থনীয়ঃ),[নান্যঃ সংসারগোচর ইত্যাশয়ঃ];[তু শব্দঃ অন্য বরস্য সর্ব্বাতিশায়িতাদ্যোতকঃ]॥
[ এখন নচিকেতা যথোক্ত ‘বৃণীঘ বিত্তম্” ইত্যাদি বাক্যের উত্তর দিতেছেন।] —মনুষ্য বিত্ত বা ধনদ্বারা তর্পণীয়(তৃপ্তিলাভের যোগ্য) হইতে পারে না। [ বিশেষতঃ] আপনাকে যখন দর্শন করিয়াছি, তখন নিশ্চয়ই বিত্তলাভ করিব। আর আপনি যে পর্য্যন্ত যমপদের প্রভু, থাকিবেন, আমরা তাবৎকাল নিশ্চয়ই
জীবিত থাকিব[তাহার জন্য আর প্রার্থনায় প্রয়োজন নাই]। অতএব, আমার প্রথমোক্ত বরই প্রার্থনীয় ॥ ২৭ ॥
কিঞ্চ ন প্রভৃতেন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যঃ। ন হি লোকে বিত্তলাভঃ কস্যচিৎ তৃপ্তিকরো দৃষ্টঃ। যদি নাম অস্মাকং বিত্ততৃষ্ণা স্যাৎ, লপ্স্যামহে প্রাপ্স্যামহে বিত্তম্ অদ্রাক্ষ্ম দৃষ্টবস্তো বয়ং চেৎ ত্বা ত্বাম্; জীবিতমপি তথৈব; জীবিষ্যামঃ যাবদ যাম্যে পদে ত্বম্ ঈশিষ্যসি—ঈশিষ্যসে প্রভুঃ স্যাঃ। কথং হি মর্ত্যঃ ত্বয়া সমেত্য অল্পধনায়ুর্ভবেৎ? বরস্ত মে বরণীয়ঃ স এব, যদাত্মবিজ্ঞানম্ ॥ ২৭ ॥
আরও এক কথা, মনুষ্য প্রচুরতর ধন দ্বারা তর্পণীয়(হয়) না। কারণ, জগতে বিত্তলাভ কাহারও পক্ষে তৃপ্তিকর হইতে দেখা যায় নাই। আমাদের যদি ধন-তৃষ্ণা থাকে, তবে নিশ্চয়ই আমরা তাহা পাইব; কারণ—আপনাকে দর্শন করিয়াছি; জীবনের সম্বন্ধেও সেইরূপই,—আপনি যে পর্য্যন্ত যম-রাজ্যে ঈশ্বর—প্রভু থাকিবেন; কেননা, মর্ত্যজন আপনার সহিত সাক্ষাৎলাভ করিয়া কেনই বা অল্পধন ও অল্লায়ুঃ হইবে? সেই যে(পূর্ব্ব-কথিত) আত্ম-বিজ্ঞান, তাহাই কিন্তু আমার প্রার্থনীয় বর ॥ ২৭ ॥
অজীর্য্যতামমৃতানামুপেত্য
‘জীর্য্যমর্ত্ত্যঃ কথংস্থঃ প্রজানন্।
অভিধ্যায়ন্ বর্ণরতি-প্রমোদা- নতিদীর্ঘে জীবিতে কো রমেত ॥ ২৮ ॥
ব্যাখ্যা।
[পূর্ব্বোক্তমেব বিবৃণোতি—অজীর্য্যতামিতি]।[হে মৃত্যো!] কধঃস্থঃ (কুঃপৃথিবী, অধঃ অন্তরিক্ষলোকাপেক্ষয়া, তস্যাং তিষ্ঠতীতি কধঃস্থ) কো, জীর্য্যন্ মর্ত্যঃ(জরামরণসম্পন্নঃ জনঃ) অজীর্য্যতাম্(জরারহিতানাম্) অমৃতানাম্(দেবানাম্) [সকাশম্] উপেত্য প্রজানন্(আত্মনঃ উৎকৃষ্টং প্রয়োজনান্তরং প্রাপ্তব্যমস্তীতি অবগচ্ছন্ সন্) বর্ণরতিপ্রমোদান্(বর্ণো ব্রাহ্মণাদিঃ দেহগতশোভাবিশেষো বা,
রতিঃ বিষয়ানুভবজং সুখম্ প্রমোদঃ প্রকৃষ্টবিষয়ানুভবজৎ সুখম্, এতান্ পূর্ব্বানুভূতাম্ ইদানীং নিবৃত্তান্ বিষয়ান্ অপ্সরঃপ্রভৃতীন্ বা) অভিধ্যায়ন্(চিন্তয়ন্ অনবস্থিততয়া নিরূপয়ন্) অতিদীর্ঘে জীবিতে রমেত[ন কোহপীত্যর্থঃ]।[বয়োহধিকত্বে জরাদ্যাপত্যা ভোগশক্তেরভাবাৎ প্রত্যুত ক্লেশ এব ভবেদিতি ভাবঃ] ॥
নচিকেতা পূর্ব্বোক্ত কথাই পুনর্ব্বার বিবৃত করিতেছেন,—হে মৃত্যো! ভূতলস্থ, জরা-মরণশীল কোন্ লোক জরা-মরণহীন দেবগণের সান্নিধ্য লাভ করিয়া, অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া, অপ্সরা প্রভৃতি বর্ণ-রতি-প্রমোদসমূহকে অর্থাৎ শরীর- শোভা, ক্রীড়া ও তজ্জনিত সুখকে, অস্থির অনিত্য বলিয়া হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াও অতিশয় দীর্ঘজীবনে আনন্দ অনুভব করে? ২৮॥
যতশ্চ অজীর্য্যতাং বয়োহানিমপ্রাপ্ন বতাম্ অমৃতানাং সকাশম্ উপেত্য উপগম্য আত্মন উৎকৃষ্টং প্রয়োজনান্তরং প্রাপ্তব্যম্, তেভ্যঃ প্রজানন্ উপলভমানঃ স্বয়ন্ত জীর্য্যন্ মর্ত্যঃ-জরামরণবান, কধঃস্থঃ-কুঃ পৃথিবী, অধঞ্চাসাবন্তরিক্ষাদিলোকাপেক্ষয়া, তস্যাং তিষ্ঠতীতি কধঃস্থঃ সন্ কথমেবমবিবেকিভিঃ প্রার্থনীয়ং পুত্রবিত্তহিরণ্যাদ্যস্থিরং বৃণীতে। ‘ক তদাস্থঃ’ ইতি বা পাঠান্তরম্। অস্মিন্ পক্ষে চ এবমক্ষর-যোজনা-তেষু পুত্রাদিযু আস্থা আস্থিতিঃ তাৎপর্য্যেণ বর্তনং যস্য, স তদাস্থঃ। ততোহধিকতরং পুরুষার্থং দুষ্প্রাপমপি অভিপ্রেপ্সুঃ ক তদাস্থো ভবেৎ? ন কশ্চিৎ তদসারজ্ঞ: তদর্থী স্যাদিত্যর্থঃ। সর্ব্বো. হি উপর্যুপর্য্যের বুভূষতি লোকঃ, তস্মান্ন পুত্রবিত্তাদিলোভৈঃ প্রলোভ্যোহহম্। কিঞ্চ অপ্সরঃ প্রমুখান্ বর্ণরতিপ্রমোদান্ অনবস্থিতরূপতয়া অভিধ্যায়ন্ নিরূপয়ন্ যথাবৎ অতি দীর্ঘে জীবিতে কো বিবেকী ‘রমেত? ২৮৷৷
যেহেতু অজীর্য্যৎ অর্থাৎ বয়সের হানি(জরাপ্রাপ্তি) রহিত অমৃত দেবগণের সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের নিকট হইতে নিজের অন্য প্রকার উৎকৃষ্ট প্রয়োজন প্রাপ্ত হওয়া উচিত, ইহা বুঝিতে পারিয়া এবং নিজে জীর্য্যৎ ও মর্ত্য অর্থাৎ জরা-মরণসম্পন্ন ও কধঃস্থ হইয়া,—‘কু’ অর্থ পৃথিবী, উহা অন্তরীক্ষের নিম্নবর্তী, সুতরাং ‘অধঃ’ শব্দবাচ্য, সেই কধঃ অর্থাৎ পৃথিবীতলে বাস করিয়া
কিরূপে অজ্ঞ-জন-প্রার্থনীয় ও অনিত্য পুত্র, বিত্ত ও হিরণ্য প্রভৃতি বিষয় প্রার্থনা করিতে পারে?[কধঃস্থ স্থানে] ‘ক তদাস্থঃ’ পাঠান্তর আছে। এই পক্ষে ইহার শব্দার্থ এইরূপ, সেই সকলে (পুত্রাদিতে) আস্থা—স্থিতি অর্থাৎ তন্ময়ভাবে অবস্থিতি যাহার, সেই লোক ‘তদাস্থ’। সেই পুত্রাদি অপেক্ষাও অধিকতর, অথচ দুর্লভ পুরুষার্থ পাইতে ইচ্ছুক লোক কোথায় ‘তদাস্থ’ হয়? অভিপ্রায় এই যে, যে লোক সার পদার্থ জানে না, সে-ই ঐ সকল বিষয়ের প্রার্থী হইয়া থাকে, কারণ, সমস্ত লোকই উত্তরোত্তর উন্নত হইতে ইচ্ছা করে; অতএব আমি পুত্রাদির প্রলোভনে প্রলোভ্য নহি। আরও কথা,—বর্ণ-রতি-প্রমোদ অর্থাৎ শরীর-শোভা, ক্রীড়া-কৌতুক ও প্রমোদ-পরায়ণ অপ্সরা প্রভৃতিকে যথাযথরূপে অর্থাৎ উৎপত্তি- ধ্বংসশীল অনিত্যরূপে অবগত হইয়া কোন্ বিবেচক পুরুষ অতিদীর্ঘ জীবনে প্রীতি অনুভব করে? ২৮॥
ধস্মিন্নিদং বিচিকিৎসন্তি মৃত্যো
যৎ সাম্পরায়ে মহতি ব্রূহি নস্তৎ। যোহয়ং বরো গূঢ়মনুপ্রবিষ্টো।
নান্যং তস্মান্নচিকেতা বৃণীতে ॥ ২৯ ॥ ইতি কাঠকোপনিষদি প্রথমাধ্যায়ে প্রথমা বল্লী ॥১॥১॥
[নচিকেতাঃ প্রকৃতপ্রশ্নার্থং স্মারয়ন্ স্বাভিপ্রায়মাহ।]—হে মৃত্যো![ময়া প্রার্থিতম্] যস্মিন্(যদ্বিষয়ে) ইদম্(আত্মা অস্তিন বেতি)‘যৎ(ধম্মাৎ) বিচিকিৎসন্তি(সন্দিহতে জনাঃ), তং(তদেব আত্মতত্ত্বম্) মহতি সাম্পরায়ে (পরলোকবিষয়ে)[মোক্ষার্থং মহাপ্রয়োজনায়] নঃ(অস্মভ্যম্) ক্রহি(উপদিশ)। [সাম্পরায়পদস্য শ্রেয়োমাত্রসাধারণ্যাৎ মুক্ত্যর্থত্বলাভায় মহতীত্যুক্তম্]; যোহয়ং বরঃ(আত্মতত্ত্বোক্তিপ্রার্থনরূপঃ) গূঢ়ম্(গূঢ়ত্বং গোপ্যতাম্) অনুপ্রবিষ্টঃ ‘(প্রাপ্তঃ), তস্মাৎ(বরাৎ) অন্যম্(অপরং বরম্) নচিকেতা ন বৃণীতে ইতি ॥ ২৯ ॥
এখন নচিকেতা প্রকৃত প্রশ্নের কথা যমকে স্মরণ করাইয়া স্বীয় অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিতেছেন,—হে মৃত্যো! যেহেতু আত্মার পরলোকাস্তিত্ব সম্বন্ধে লোক সংশয় করিয়া থাকে, অতএব পারলৌকিক মহৎ প্রয়োজন সিদ্ধির নিমিত্ত তাহা আপনি আমাদিগকে বলুন; যে আত্ম-তত্ত্ব-বিষয়ক বরটি অতিশয় গোপনীয়তা প্রাপ্ত হইয়াছে,—অর্থাৎ গোপন করিতে চেষ্টা করিতেছেন,[জানিবেন] নচিকেতা ঐ বর ভিন্ন অন্য বর প্রার্থনা করে না ॥ ২৯ ॥
অতো বিহায় অনিত্যৈঃ কামৈঃ’ প্রলোভনম্, যৎ ময়া প্রার্থিতম্;—যস্মিন্ প্রেতে ইদং বিচিকিৎসনং বিচিকিৎসন্তি ‘অস্তি নাস্তীত্যেবংপ্রকারম্।’ হে মৃত্যো সাম্পরায়ে পরলোকবিষয়ে মহতি মহৎপ্রয়োজননিমিত্তে আত্মনো নির্ণয়বিজ্ঞানং যৎ তদ্ক্রহি কথয় নোহম্মভ্যম্। কিং বহুনা, যোহয়ং প্রকৃতাত্মবিষয়ো বরো গূঢ়ং গহনং দুর্বিবেচনং প্রাপ্তোহনুপ্রবিষ্টঃ, তস্মাৎ বরাদন্যম্ অবিবেকিভিঃ প্রার্থনীয়ম্ অনিত্যবিষয়ং বরং নচিকেতা ন বৃণীতে মনসাপীতি শ্রুতের্বচনমিতি॥ ২৯ ॥ ইতি শ্রীমদ্ভাগবতভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবৎপ্রণীতে কঠোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমাধ্যায়ে প্রথম- বল্লী-ভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ১ ॥
অতএব অনিত্য কাম্যফলে প্রলোভন পরিত্যাগ করিয়া আমি যাহা প্রার্থনা করিয়াছি—সেই প্রেত বা মৃত ব্যক্তি, সম্বন্ধে একটা সংশয় আছে; অর্থাৎ[পরলোক] আছে, কি নাই—লোকে এব- প্রকার সংশয় করিয়া থাকে। হে মৃত্যো! পরলোকে মহৎ প্রয়ো- জন কা অভীষ্ট সাধনের উপযোগী যে আত্ম-তত্ত্ব-বিজ্ঞান, তাহা আমাদের উদ্দেশে উপদেশ করুন। আর অধিক কথায় প্রয়োজন কি? এই যে প্রস্তাবিত আত্ম-তত্ত্ববিষয়ক বর, যাহা অত্যন্ত গহন বা চিন্তার অগম্যভাবাপন্ন, তদ্ব্যতীত—যাহা বিবেকহীন পুরুষের প্রার্থনাযোগ্য অনিত্য বিষয়ে বর, নচিকেতা তাহা মনে মনেও প্রার্থনা করে না। এই অংশটুকু শ্রুতির কথা ॥ ২৯ ॥
অন্যচ্ছেয়োহন্যদুতৈব প্রেয়- স্তে উভে নানার্থে পুরুষসিনীতঃ ॥ তয়োঃ শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবতি, হীয়তেহর্থাদ্ য উ প্রেয়ো বৃণীতে ॥৩০॥১৷৷
[দীয়মানমপি পুত্রাদিকামং হিত্বা আত্ম-বিদ্যামের যাচমানস্য নচিকেতসঃ বৈরাগ্যম্ আত্মবিদ্যাগ্রহণযোগ্যতাং চ’ অনুভূয় ‘আত্ম-তত্ত্বম্ উপদিদিক্ষুঃ প্রথমং বিদ্যাবিদ্যয়োঃ গুণ-দোষৌ আহ যমঃ—অন্যদিত্যাদিনা]।—শ্রেয়ঃ(ব্রহ্মজ্ঞানম্) অন্যৎ(পৃথক্), প্রেয়ঃ উত(প্রিয়তমং দারাপত্যাদিকাম্যমানং বস্তুপি) অন্যৎ এব। তে উভে(শ্রেয়ঃপ্রেয়সী) নানার্থে(ভিন্নপ্রয়োজনকে মোক্ষ-ভোগ-সাধকে) পুরুষম্(দেহিনম্) সিনীতঃ(বন্নীতঃ)[মোক্ষায় অভ্যুদয়ায় চ পুরুষপ্রবৃত্তেঃ ইত্যর্থঃ]।[“ততঃ কিমিত্যত আহ], তয়োঃ(শ্রেয়ঃপ্রেয়সোমধ্যে) শ্রেয়ঃ (ব্রহ্মবিদ্যাম্) আদদানস্য(উপাসীনস্য) সাধু(ভদ্রং সংসারমোচনরূপম্) ভবতি। যউ(যঃ পুনঃ) প্রেয়ঃ(দারাপত্যাদিকামম্) বৃণীতে(উপাদত্তে) [সঃ] অর্থাৎ(পরমপুরুষার্থাৎ) হীয়তে(হীনো ভবতি)[ভবপাশৈঃ এব বদ্ধো ভবতীত্যাশয়ঃ]॥
[পুত্রাদি কাম্য-পদার্থনিচয় প্রদান করিলেও নচিকেতা তৎসমুদয় পরিত্যাগ- পূর্ব্বক আত্মবিদ্যাই প্রার্থনা করিতেছে, দর্শন করিয়া, যমরাজ আত্মবিদ্যা উপদেশের ইচ্ছায় প্রথমতঃ বিদ্যা ও অবিদ্যার গুণ ও দোষ প্রদর্শন করিয়া বলিতেছেন]—শ্রেয়ঃ অর্থাৎ পরম-কল্যাণময় আত্ম-জ্ঞান নিশ্চয়ই প্রেয়ঃ হইতে পৃথক্ এবং প্রেয়ঃও(পুত্র-বিত্তাদি অর্থও) অন্য বা পৃথক্। তদুভয়ের প্রয়োজনও বিভিন্নরূপ, অর্থাৎ শ্রেয়ের প্রয়োজন মুক্তিলাভ, আর প্রেয়ের প্রয়ো- জন অভ্যুদয় লাভ। এই উভয়েই পুরুষকে আবদ্ধ করে। যিনি তদুভয়ের মধ্যে শ্রেয়ঃ গ্রহণ করেন, তাঁহার কল্যাণ হয়, আর যিনি প্রেয়ঃ গ্রহণ করেন, তিনি প্রকৃত পুরুষার্থ(মোক্ষ) হইতে বিচ্যুত হন ॥ ৩০ ॥ ১ ॥
পরীক্ষ্য শিষ্যং বিদ্যাযোগ্যতাঞ্চ অবগম্যাহ-অন্যৎ পৃথগেব শ্রেয়ো নিঃশ্রেয়সম্, তথা অন্যৎ উতৈব অপি চ প্রেয়ঃ প্রিয়তরমপি; তে প্রেয়ঃশ্রেয়সী উভে নানার্থে ভিন্নপ্রয়োজনে সতী পুরুষমধিকৃতং বর্ণাশ্রমাদিবিশিষ্টং সিনীত: বন্নীতঃ; তাভ্যাং বিদ্যাবিদ্যাভ্যাম্ আত্মকর্তব্যতয়া প্রযুজ্যতে সর্ব্বঃ পুরুষঃ। শ্রেয়ঃপ্রেয়সোর্হি অভ্যু- দয়ামৃতত্বার্থী পুরুষঃ প্রবর্ততে। অতঃ শ্রেয়ঃ-প্রেয়ঃ প্রয়োজন-কর্তব্যতয়া তাভ্যাং বন্ধ ইত্যুচ্যতে সর্ব্বঃ পুরুষঃ। তে যদ্যপি একৈকপুরুষার্থসম্বন্ধিনী,[তথাপি] বিদ্যা-বিদ্যারূপত্বাদবিরুদ্ধে; ইত্যন্যতরাপরিত্যাগেন একেন পুরুষেণ সহানুষ্ঠাতু- মশক্যত্বাৎ তয়োর্হিত্বা অবিদ্যারূপং প্রেয়ঃ, শ্রেয়ঃ এব কেবলম্ আদদানস্য উপাদানং কুর্ব্বতঃ সাধু শোভনং শিবং ভবতি।’ যস্ত অদূরদর্শী বিমুঢ়ো হীয়তে বিযুজ্যতে অর্থাৎ পুরুষার্থাৎ পারমার্থিকাৎ প্রয়োজনান্নিত্যাৎ প্রচ্যবত ইত্যর্থঃ। কোহসৌ? য উ প্রেয়ো বৃণীতে উপাদত্তে ইত্যেতৎ ॥ ৩০ ॥ ১ ॥
যমরাজ[এইরূপে] শিষ্যকে পরীক্ষা করিয়া এবং তাহার বিদ্যা- গ্রহণের যোগ্যতা দর্শন করিয়া বলিতে লাগিলেন,-শ্রেয়ঃ অর্থাৎ নিঃশ্রেয়স পৃথক্(শ্রেয়ঃ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদার্থ), তেমনি প্রেয়ঃ অর্থাৎ লৌকিক প্রিয় পদার্থসমূহও[নিঃশ্রেয়স হইতে] পৃথক্। সেই শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, উভয়ই বিভিন্ন প্রয়োজনের সাধক; এই কারণে যিনি আপনাকে বর্ণাশ্রমাদি ধর্মযুক্ত মনে করেন, তাদৃশ অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তিকে আবদ্ধ করিয়া থাকে। ‘বিদ্যা ও অবিদ্যা এবং শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, এতদুভয়ই পুরুষের কর্তব্য নির্দেশ করে; সমস্ত পুরুষ সেই নির্দেশানুসারে নিজ নিজ কর্তব্য-বোধে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন; কেননা, যিনি মোক্ষাভিলাষী, তিনি শ্রেয়ঃ-পথে, আর যিনি অভ্যুদয় অর্থাৎ স্বর্গাদি উন্নত লোকাভিলাষী, তিনি প্রেয়ঃ- পথে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন। অতএব শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ উদ্দেশে পুরুষ প্রবৃত্ত হয় বলিয়া সমস্ত পুরুষকে তদুভয়ের দ্বারা আবদ্ধ বলা হইয়াছে। সেই শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ যদিও[মোক্ষ ও অভ্যুদয়রূপ] বিভিন্ন প্রকার
৭
পুরুধার্থের সাধক হউক, তথাপি উহারা যখন বিদ্যা ও অবিদ্যা-স্বরূপ, তখন নিশ্চয়ই পরস্পরে বিরুদ্ধ; সুতরাং একই ব্যক্তি[ঐ দুইটির মধ্যে] একটি পরিত্যাগ না করিয়া কখনই এক সঙ্গে দুইটিরই অনুষ্ঠান করিতে পারে না;[সুতরাং দুইটির মধ্যে একটিকে ত্যাগ করিতে হইবে]। যে লোক তদুভয়ের মধ্যে অবিদ্যাত্মক প্রেয়ঃ পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবলই শ্রেয়ঃ গ্রহণ করে, তাঁহার মঙ্গল হয়। কিন্তু যিনি অদূরদর্শী মোহগ্রস্ত, তিনি নিত্য ও পারমার্থিক পুরুষার্থরূপ প্রয়োজন হইতে বিযুক্ত হন, অর্থাৎ মোক্ষ হইতে বিচ্যুত হন। ইনি কে? না,—যিনি:[শ্রেয়ঃ ‘পরিত্যাদপূর্ব্বক] প্রেয়ঃ গ্রহণ করেন ॥ ৩০ ॥ ১,॥
শ্রেয়শ্চ প্রেয়শ্চ মনুষ্যমেত- স্তৌ সম্পরীত্য বিবিনক্তি ধীরঃ। শ্রেয়ো হি ধীরোহভি প্রেয়সো বৃণীতে, প্রেয়ো মন্দো যোগ-ক্ষেমাদ বৃণীতে ॥৩১৷২৷৷
[বিদ্বদবিদুষোঃ শ্রেয়ঃ প্রেয়গ্রহণপ্রভেদমাহ-শ্রেয়শ্চেতি]।[ ‘এতঃ’ ইত্যত্র আ+ইতঃ ইতি পদচ্ছেদঃ]।[উক্তরূপম্] শ্রেয়শ্চ প্রেয়শ্চ(দ্বে এব) মনুষ্যম্ এতঃ (প্রাপ্য তিষ্ঠতঃ)। ধীরো(জ্ঞানী), তৌ(শ্রেয়-প্রেয়ঃশব্দিতোঁ বিদ্যাবিদ্যারূপৌ) সম্পরীত্য(সম্যক্ আলোচ্য) বিবিনক্তি(শ্রেয়ঃ মোচকম্, প্রেয়শ্চ বন্ধকমিতি নিশ্চিনোতি)।[এবং বিবিচ্য কিং করোতীত্যত আহ,-] ধীরঃ(বিবেকী) প্রেয়সঃ(প্রিয়তমান্ দারাপত্যাদিকামান) অভি(অবজ্ঞায়) শ্রেয়ঃ(ব্রহ্মবিদ্যাম্) বৃণীতে। মন্দো(বিবেকহীনঃ) যোগক্ষেমাৎ(অপ্রাপ্তকামপ্রাপ্তির্যোগঃ, তস্য পরি- রক্ষণং ক্ষেমঃ, তন্নিমিত্তম্) প্রেয়ঃ(ধনাদি) বৃণীতে(প্রার্থয়তে)।[বিবেকী গুণাতিশয়ং দৃষ্টা শ্রেয়ো গৃহ্লাতি; অবিবেকী তু আপাতরমণীয়ং প্রেয়ঃ এব গৃহ্লাতীতি ভাবঃ] ॥
[এখন বিদ্বান্ ও অবিদ্বান্, উভয়ের মধ্যে শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ-গ্রহণে পার্থক্য বলিতেছেন,-] শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, উভয়েই মনুষ্যের নিকট উপস্থিত হয়;
জ্ঞানী জন আলোচনা করিয়া উভয়ের স্বরূপ(একটি বিদ্যাত্মক, অপরটি অবিদ্যা- ত্মক; এইরূপ) নির্দ্ধারণ করেন, এবং নির্দ্ধারণ করিয়া প্রেয়ঃ পরিত্যাগ-পূর্ব্বক শ্রেয়ঃ গ্রহণ করেন। আর অল্পবুদ্ধি লোক দেহাদি-রক্ষার্থ প্রেয়ঃ গ্রহণ করে। অর্থাৎ বিবেকী গুণাধিক্য দর্শনে শ্রেয়ঃ গ্রহণ করেন, আর অবিবেকী আপাত-মনোরম প্রেয়ঃ(ধনাদি) গ্রহণ করে ॥ ৩১ ॥ ২ ॥
যদ্যুভে অপি কর্তৃং স্বায়ত্তে পুরুষেণ, কিমর্থং প্রেয় এবাদত্তে বাহুল্যেন লোক ইতি? উচ্যতে-সত্যং স্বায়ত্তে, তথাপি সাধনতঃ ফলতশ্চ মন্দবুদ্ধীনাং দুর্বিবেকরূপে সতী ব্যামিশ্রীভূতে ইব মনুষ্যম্ এতঃ পুরুষম্ আ+ইতঃ প্রাপ্নুতঃ শ্রেয়শ প্রেয়শ। অতো হংস ইবান্তসঃ পয়ঃ, তৌ শ্রেয়ঃ-প্রেয়ঃপদার্থৌ সম্পরীত্য সম্যক্ পরিগম্য মনসা সম্যক্ আলোচ্য গুরুলাঘবং বিবিনক্তি-পৃথক্ করোতি ধীরঃ ধীমান্। বিবিচ্য চ শ্রেয়ো হি শ্রেয় এব অভিবৃণীতে প্রেয়সোহভ্যর্হিতত্বাৎ শ্রেয়সঃ। কোহসৌ?-ধীরঃ। যস্তু মন্দোহল্পবুদ্ধিঃ, স সদসদ্বিবেকাসামর্থ্যাৎ যোগক্ষেমাদ যোগক্ষেমনিমিত্তং শরীরাদ্যুপচয়-রক্ষণনিমিত্তমিত্যেতৎ, প্রেয়ঃ পশুপুত্রাদিলক্ষণং বৃণীতে ॥ ৩১ ॥ ২ ॥
[ভাল,] শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ উভয়েরই অনুষ্ঠান করা যদি পুরুষের ইচ্ছাধীন হয়, তবে অধিকাংশ লোকই প্রেয়ঃ গ্রহণ করে কেন? [উত্তর] বলা যাইতেছে,-উভয়ই নিজের আয়ত্ত বটে, কিন্তু আয়ত্ত হইলেও ঐ শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, সাধন ও ফল উভয়েতেই অবিবিক্তরূপে -পরস্পর মিশ্রিত, ভাবেই যেন পুরুষের সমীপে উপস্থিত হয়। অতএব ধীর’ ব্যক্তি জল হইতে দুগ্ধগ্রাহী হংসের মত সেই শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ পদার্থ দুইটিকে মনে মনে উত্তমরূপে আলোচনা করিয়া উভয়ের উৎকর্ষাপকর্ষ বিচার করেন, অর্থাৎ তদুভয়ের লাঘব ও গৌরবের বিশ্লেষণ করেন। এইরূপ বিচারের পর প্রেয়ঃ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বলিয়া শ্রেয়ঃই গ্রহণ করেন। ইনি কে? না-ধীরব্যক্তি(ধৈর্য্য- সহকারে যাহার বিচার করিবার ক্ষমতা আছে, সে)। আর যে
লোক অল্পবুদ্ধি, বিচারশক্তির অভাববশতঃ সে লোক যোগক্ষেমের নিমিত্ত অর্থাৎ শরীর প্রভৃতির বৃদ্ধি ও পরিরক্ষণোদ্দেশে পশুপুত্রাদি- রূপ প্রেয়ঃ বস্তু প্রার্থনা করে ॥ ৩১ ॥ ২ ॥
স ত্বং প্রিয়ান্ প্রিয়রূপাংশ কামা- নভিধ্যায়ন্ নচিকেতোহত্যস্রাক্ষীঃ। নৈতাঙ্গৃষ্কাং বিত্তময়ীমবাপ্তো যস্যাং মজ্জন্তি বহবো মনুষ্যাঃ ॥৩২॥৩৷৷
[পুনরাপি যমঃ নচিকেতসং প্রশংসন্ আহ-সঃ ত্বমিতি]। হে নচিকেতঃ, স ত্বম্(ময়া প্রলোভ্যমানোহপি) প্রিয়ান্(সম্বন্ধবশাৎ ‘প্রীতিপ্রদান্ দারাপুত্রা- দীন্), প্রিয়রূপান্ চ(স্বভাবতো রমণীয়ান্ গৃহারামক্ষেত্রাদীন্ চ) কামান্(কাম্য- মানান্) অতিধ্যায়ন্(অস্থিরতয়া চিন্তয়ন্) অত্যস্রাক্ষীঃ(ত্যক্তবানভূরিত্যর্থঃ)। বিত্তময়ীম্(সুবর্গময়ীম্) এতাম্(সন্নিহিততরাম্) সৃঙ্কম্(মালাম্, যদ্বা কুৎসিতাং সংসারগতিম্) ন অবাপ্তঃ(ন স্বীকৃতবান্ অসি)।[সৃঙ্কেয়মতিশ্লাঘ্যা, ইত্যাহ,-] বহবো মনুষ্যাঃ যস্যাং মজ্জন্তি(আসক্তা ভবন্তি)।[তাদৃশীমপি ময়া দীয়মানাং ন গৃহীতবান্ অসি, অতত্ত্বং মহাসত্তোহসি ইতি ভাবঃ]।
[ যমরাজ পুনশ্চ নচিকেতাকে, প্রশংসা করিয়া বলিলেন],—হে নচিকেতঃ! সেই তুমি[ আমা, দ্বারা প্রলোভিত হইয়াও] স্বভাবসৌন্দর্য্যে ও গুণে রমণীয় স্ত্রীপুত্রাদি কাম্য বিষয়সমূহকে অনিত্য মনে করিয়া পরিত্যাগ করিয়াছ। বহুমূল্য এই সুবর্ণমালা, অথবা ক্লেশবহুল নিকৃষ্ট সংসারগতি প্রাপ্ত হও নাই, সাধারণতঃ বহু মনুষ্য যাহাতে মগ্ন হইয়া থাকে।[ অতএব তুমি মহাসত্ত্ব]॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
স ত্বং পুনঃ পুনর্ময়া প্রলোভ্যমানোহপি প্রিয়ান্ পুত্রাদীন্ প্রিয়রূপাংশ্চ অপ্সরঃ- প্রভৃতিলক্ষণান্ কামান্ অভিধ্যায়ন্ চিন্তয়ন্—তেষাম্ অনিত্যত্বাসারত্বাদিদোষান্, হে নচিকেতঃ! অত্যস্রাক্ষীঃ অতিসৃষ্টবান্ পরিত্যক্তবানসি; অহো বুদ্ধিমত্তা তব
ন এতাম্ অবাপ্তবানসি সৃঙ্কাং স্মৃতিং কুৎসিতাং মূঢ়জনপ্রবৃত্তাং বিত্তময়ীং ধন প্রায়াম্। যস্যাং সূতৌ মজ্জন্তি সীদন্তি বহবঃ অনেকে মুঢ়াঃ মনুষ্যাঃ ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
[যম বলিলেন—] হে নচিকেতঃ! আমি তোমাকে পুনঃ পুনঃ প্রলোভন দেখাইলেও তুমি[ভোগ্যসমূহের] অনিত্যত্ব ও অসারত্বাদি দোষ দর্শন করিয়া প্রিয়(স্বভাবতঃ মনোহর) পুত্র প্রভৃতি ও প্রিয়- রূপ(রূপে-গুণে মধুর) অপ্সরাপ্রভৃতি কাম্যনিচয়কে পরিত্যাগ করিয়াছ। অহো তোমার আশ্চর্য্য বুদ্ধি! তুমি মূঢ়জনের প্রবৃত্তি- জনক ধনবহুল এই কুৎসিত সুষ্কা অর্থাৎ সংসারগতি বা রত্নমাল্য গ্রহণ কর নাই। এই পথে একজন নহে—বহুতর মূঢ় মনুষ্য নিমগ্ন বা অবসন্ন হইয়াছে ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
দূরমেতে বিপরীতে বিষূচী অবিদ্যা যা চ বিদ্যেতি জ্ঞাতা। বিদ্যাভীপ্সিনং নচিকেতসং মন্যে ন ত্বা কামা বহবোহলোলুপন্ত ॥
[শ্রেয়ঃপ্রেয়সোর্বিপরীতফলত্বং কুত ইত্যাকাঙ্ক্ষয়া তত্র হেতুং প্রদর্শয়ন্ নচি- কেতসং স্তৌতি—দূরমিতি]। যা অবিদ্যা(বিদ্যাভিন্না)[ঐহিকসুখসাধনত্বেন] জ্ঞাতা, যা চ বিদ্যা[অমৃতত্বসাধনম্ ইতি][জ্ঞাতা], এতে দূরম্(অতিশয়েন) বিপরীতে(অন্যোন্যপৃথক্সভাবে)।[তদেব স্পষ্টয়তি—] বিষুচী(বিরুদ্ধফলহেতু)। নচিকেতসং ত্বা(ত্বাম্) বিদ্যাভীপ্সিনম্(বিদ্যাভিকাঙ্ক্ষিণম্) মন্যে(জানামি)। [যতঃ] বহবঃ কামাঃ[ত্বাম্] ন অলোলুপন্ত(শ্রেয়ঃপথাৎ ন বিচালিতং কৃতবস্তু ইত্যর্থঃ)।[ত্বং কৈরপি কামৈঃ প্রলুব্ধো ন ভবসীতি ভাবঃ]॥
[শ্রেয়ঃ এবং প্রেয়ঃ, এতদুভয়ে বিরুদ্ধফল সমুৎপাদন করে কেন? ইহার কারণপ্রদর্শনপূর্ব্বক নচিকেতার প্রশংসা করিতেছেন,—] এই যে সর্ব্বজনবিদিত অবিদ্যা ও বিদ্যা, এই উভয়ই বিপরীতস্বভাব ও বিরুদ্ধফলপ্রদ।[হে নচি-
কেতঃ!] তোমাকে আমি বিদ্যাভিলাষী মনে করি; কারণ,[মৎপ্রদর্শিত’] বহুতর কাম্য বস্তুও তোমার লোভ সমুৎপাদন করিতে পারে নাই, অর্থাৎ তোমাকে শ্রেয়ঃপথ হইতে ভ্রষ্ট করিতে পারে নাই ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥
“তয়োঃ শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবতি, হীয়তেহর্থাদ্ য উ প্রেয়ো বৃণীতে” ইত্যুক্তম্। তৎ কস্মাৎ? যতো দূরং দূরেণ মহতা অন্তরেণ এতে বিপরীতে অন্যোন্যব্যাবৃত্তরূপে বিবেকাবিবেকাত্মকত্বাৎ তমঃ-প্রকাশাবিব। বিষূচী বিষূচ্যো নানাগতী ভিন্নফলে সংসারমোক্ষহেতুত্বেন ইত্যেতৎ। কে তে? ইত্যুচ্যতে—যা চ অবিদ্যা প্রেয়োবিষয়া, বিদ্যেতি চ “শ্রেয়োবিষয়া জ্ঞাতা নির্জাতা অবগতা পণ্ডিতৈঃ। তত্র বিদ্যাভীপ্সিনং বিদ্যার্থিনং নচিকেতসং ত্বামহং মন্যে। কস্মাৎ? যস্মাৎ অবিদ্ববুদ্ধিপ্রলোভিনঃ কামাঃ অপ্সরঃপ্রভৃতয়ো বহবোহপি ত্বা ত্বাং ন অলোলুপন্ত ন বিচ্ছিন্নং কৃতবন্তঃ শ্রেয়োমার্গাৎ আত্মোপভোগাভিবাঞ্ছাসম্পাদনেন। অতো বিদ্যার্থিনং শ্রেয়োভাজনং মন্যে ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥
পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে,—‘তদুভয়ের মধ্যে শ্রেয়োগ্রাহীর মঙ্গল হয়, আর প্রেয়োগ্রাহী পরম পুরুষার্থ(মোক্ষ) হইতে ভ্রষ্ট হয়’। এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, ইহার কারণ কি?[উত্তর],—যেহেতু এই উভয়ই অত্যন্ত ব্যবধানে বিপরীত অর্থাৎ এতদুতয়ের পার্থক্য অত্যন্ত অধিক; কেননা শ্রেয়ঃ বস্তুটি বিবেক-স্বরূপ, আর প্রেয়ঃ- পদার্থটি অবিবেকস্বরূপ; সুতরাং আলোক ও অন্ধকারের ন্যায় এই উভয়ই(শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ) পরস্পর পৃথক্-স্বভাবসম্পন্ন। অধিকন্তু, সংসার ও মোক্ষফল সমুৎপাদন করে বলিয়া উভয়ই বিষুচী ‘অর্থাৎ বিভিন্ন পথে বিভিন্ন ফলপ্রদ। সেই উভয় কে কে? না,—পণ্ডিতগণ প্রেয়োবিষয়ে যাহাকে অবিদ্যা বলিয়া এবং শ্রেয়োবিষয়ে যাহাকে বিদ্যা বলিয়া নিশ্চিতরূপে জানিয়াছেন। তন্মধ্যে নচিকেতা নামক তোমাকে আমি বিদ্যাভিলাষী মনে করিতেছি, কেননা, যেহেতু অজ্ঞজনের চিত্ত-প্রলোভনজনক অপ্সরা প্রভৃতি বহুতর কাম্য পদার্থও
তোমাকে প্রলুব্ধ করিতে পারে নাই। অভিপ্রায় এই যে, স্বীয় সম্ভোগ-বাঞ্ছা সমুৎপাদন দ্বারা শ্রেয়ঃপথ হইতে তোমাকে বিচ্ছিন্ন করিতে পারে নাই; এই কারণই তোমাকে বিদ্যার্থী—শ্রেয়ঃপাত্র বলিয়া মনে করিতেছি ॥ ৩৩॥ ৪ ॥
অবিদ্যায়ামন্তরে বর্ত্তমানাঃ
স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতম্মন্যমানাঃ।
দন্দ্রম্যমাণাঃ পরিযন্তি মূঢ়া- অন্ধেনৈব নীয়মানা যথান্ধাঃ ॥ ৩৪ ॥ ৫ ॥
ব্যাখ্যা।
[অবিদ্যাপরপর্যায়-প্রেয়সঃ ফলপ্রদর্শনেন নিন্দামাহ—] অবিদ্যায়ামিতি। অবিদ্যায়াম্(অবিবেকরূপায়াম্) অন্তরে(মধ্যে) বর্তমানাঃ(কেবলং তন্মাত্রোপা- সকাঃ অপি), স্বয়ং ধীরাঃ(স্বয়মেব ধীমন্ত ইতি বদন্তঃ) পণ্ডিতম্মন্যমানাঃ (আত্মানং পণ্ডিতং চ অবগচ্ছন্তঃ), দন্দ্রম্যমাণাঃ(বক্রগতয়ঃ, কুটিলস্বভাবাঃ)। মূঢ়াঃ(কামভোগেন মোহিতাঃ), পরিযন্তি(পরিতঃ স্বর্গনরবাদীন গচ্ছন্তি)। [তত্র দৃষ্টান্তঃ]—অন্ধেন এব নীয়মানাঃ(পরিচালিতাঃ) অন্ধাঃ যথা[তেহপি তথা ইত্যাশয়ঃ]॥
অবিদ্যা যাহার অপর নাম, সেই প্রেয়ের মন্দফলপ্রদর্শনে নিন্দা বলিতেছেন, —অবিবেকরূপ অবিদ্যার অভ্যন্তরে অবস্থিত হইয়াও যাহারা আপনারাই আপনাদিগকে ধীর ও পণ্ডিত বলিয়া মনে করে, সেই বক্রগতি মূঢ়গণ অন্ধ- পরিচালিত অন্ধের ন্যায়[নানা লোকে] পরিভ্রমণ করিয়া থাকে[কখনই মুক্তি- লাভ করিতে পারে না] ॥ ৩৪ ॥ ৫ ॥
যে তু সংসারভাজো জনাঃ অবিদ্যায়াম্ অন্তরে মধ্যে ঘনীভূতে ইব তমসি বর্তমানাঃ বেষ্ট্যমানাঃ পুত্রপশ্বাদিতৃষ্ণাপাশশতৈঃ, স্বয়ং ধীরাঃ প্রজ্ঞাবন্তঃ পণ্ডিতাঃ শাস্ত্রকুশলাশ্চেতি মন্যমানাঃ, তে দন্দ্রম্যমাণাঃ অত্যর্থং কুটিলাম্ অনেকরূপাং গতিং গচ্ছন্তো জরামরণরোগাদিদুঃখৈঃ পরিযন্তি পরিগচ্ছন্তি মূঢ়া অবিবেকিনঃ,
অন্ধেনৈব দৃষ্টিবিহীনেনৈব নীয়মানাঃ বিষমে পথি যথা বহবোঽন্ধা মহান্তমনর্থ- মৃচ্ছন্তি, তদ্বৎ ॥ ৩৪ ॥ ৫॥
কিন্তু যে সকল লোক সংসারভাগী এবং গাঢ়তম অন্ধকারের ন্যায় অবিদ্যামধ্যে অবস্থিত—পুত্র পশু প্রভৃতিবিষয়ক শত শত তৃষ্ণায় সংবেষ্টিত; পরন্তু, আপনারাই আপনাদিগকে ধীর অর্থাৎ প্রকৃষ্ট জ্ঞান- সম্পন্ন ও পণ্ডিত অর্থাৎ শাস্ত্রাভিজ্ঞ বলিয়া মনে করে; বহুতর অন্ধ- ব্যক্তি যেরূপ দুর্গম পথে অপর অন্ধ অর্থাৎ দৃষ্টিহীন লোকদ্বারা পরি- চালিত হইয়া প্রভূত অনর্থ(দুঃখ), প্রাপ্ত হয়; সেইরূপ, সেই সকল বিবেকহীন মূঢ়গণ জরা, মরণ ও রোগাদিজনিত বহু দুঃখে অত্যন্ত বক্র(দুর্বোধ) বিবিধ কর্মগতি লাভ করতঃ অনর্থ প্রাপ্ত হয় ॥ ৩৪ ॥ ৫ ॥
নু সাম্পরায়ঃ প্রতিভাতি বালং , প্রমাদ্যন্তং বিত্তমোহেন মূঢ়ম্। অয়ং লোকো নাস্তি পর ইতি মানী পুনঃ পুনর্ব্বশমাপদ্যতে মে ॥ ৩৫ ॥ ৬ ॥
ব্যাখ্যা।
[কুত এবম্? ইত্যাহ-ন সাম্পরায় ইতি]।[সম্(সম্যক্) পরা(পরাকালে দেহপাতাদূর্দ্ধমেব) ঈয়তে(গম্যতে) ইতি সম্পরায়ঃ পরলোকঃ, তৎপ্রাপ্তিপ্রয়োজনঃ শাস্ত্রীয়সাধনবিশেষঃ সাম্পরায়ঃ]। স সাম্পরায়ঃ বালম্(বালকসদৃশম্, অবিবেকিন- মিতি যাবৎ); বিত্তমোহেন মূঢ়ম্(অজ্ঞান-তমসাচ্ছন্নম্) অতএব[প্রমাদ্যন্তং] (প্রমাদোপেতম্-সর্ব্বদা অনবধানং জনম্) প্রতি ন ভাতি(প্রতীতিবিষয়ো ন ভবতি)।[তদেব ব্যনক্তি-অয়ং লোক ইতি]। অয়ম্(দৃশ্যমান এব) লোকঃ (ভূলোকঃ) অস্তি, পরো লোকঃ(আমুষ্মিকঃ স্বর্গাদিঃ) ন অস্তি ইতি মানী (ইত্যেবং মননশীলঃ, অভিমানীতি বা) পুনঃ পুনঃ মে(মম যমস্য) বশম্ (অধীনতাম্) আপদ্যতে।[উক্তলক্ষণাঃ জনাঃ বিত্তাদিকং নিত্যং মম্বানা মৃত্বা মৃত্বা যমযাতনামেবানুভবন্তীত্যর্থঃ]।
[কেন এরূপ হয়? তাহা বলিতেছেন,—] যে লোক বালক(বালকের ন্যায় বিবেকহীন), প্রমাদগ্রস্ত এবং ধন-মোহে বিমূঢ়, তাহার নিকট সাম্পরায় অর্থাৎ পরলোকসাধন বা পরলোক-চিন্তা প্রতিভাত হয় না। এই উপস্থিত লোকই আছে,[এতদতিরিক্ত] পরলোক(মৃত্যুব পর ভাবী স্বর্গ-নরকাদি লোক) নাই— এইরূপ অভিমানগ্রস্ত ব্যক্তি পুনঃ পুনঃ আমার বশ্যতা প্রাপ্ত হয় ॥ ৩৫ ॥ ৬ ॥
অতএব মূঢ়ত্বাৎ, ন সাম্পরায়ঃ প্রতিভাতি। সম্পরেয়ত ইতি সম্পবায়ঃ পবলোকঃ, তৎপ্রাপ্তিপ্রয়োজনঃ সাধনবিশেষঃ শাস্ত্রীয়ঃ সাম্পবায়ঃ, স চ বালম্ অবিবেকিনং প্রতি ন ভাতি ন প্রকাশতে নোপতিষ্ঠত ইত্যেতৎ। প্রমাদ্যন্তং প্রমাদং কুর্ব্বন্তং পুত্রপশ্বাদিপ্রয়োজনেষু আসক্তমনসম্, তথা বিত্তমোহেন বিত্তনিমিত্তেন অবিবেকেন মূঢ়ং তমসাচ্ছন্নম্। স তু, অয়মেব লোকঃ-যোহয়ং দৃশ্যমানঃ স্ব্যন্নপানাদিবিশিষ্টঃ, নাস্তি পবঃ অদৃষ্টো লোকঃ, ইত্যেবং মননশীলো মানী পুনঃ পুনঃ জনিত্বা বশম্ অধীনতাম্ আপদ্যতে মে মৃত্যোর্ন্ম। জননমরণাদি- লক্ষণদুঃখপ্রবন্ধাকচ এব ভবর্তীত্যর্থঃ। প্রায়েণ হ্যেবংবিধ এব লোকঃ ॥ ৩৫ ॥ ৬॥
এবংবিধ মূঢ়তাবশতঃই সাম্পরায় প্রতিভাত হয় না। দেহপাতের পর যাহা সম্যরূপে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহার নাম ‘সম্পরায়’ (স্বর্গাদি লোক), সেই সম্পরায়-প্রাপ্তিই যাহার প্রয়োজন, শাস্ত্রোক্ত তাদৃশ বিশেষ বিশেষ সাধনের নাম ‘সাম্পরায়’; তাঁহা বালক অর্থাৎ বিবেকহীন ব্যক্তির নিকট প্রতিভাত হয় না—প্রকাশ পায় না, অর্থাৎ উপস্থিত হয় না; প্রমাদী—প্রমাদকারী(অমনোযোগী) অর্থাৎ পুত্র, পশু প্রভৃতির উদ্দেশেই আসক্তচিত্ত; বিত্তজনিত মোহে মুঢ়, অর্থাৎ তমোময় অবিবেকে সমাচ্ছন্ন।[এই প্রকার লোকের নিকট পূর্ব্বোক্ত ‘সাম্পরায়’ প্রতিভাত হয় না]। ‘এই যে স্ত্রীবিশিষ্ট ও অন্নপানাদিময় পরিদৃশ্যমান লোক, একমাত্র এই লোকই আছে, [এতদতিরিক্ত] অদৃষ্ট(যাহা প্রত্যক্ষ হয় না, এরূপ) কোনও লোক
ব
বর্তমান নাই; এইরূপ চিন্তাশীল অভিমানী ব্যক্তি বারংবার জন্মধারণ করিয়া মৃত্যুরূপী আমার বশ্যতা প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ জন্ম- মরণাদিরূপ দুঃখ-ধারা প্রাপ্ত হয়। প্রায় অধিকাংশ লোকই এই প্রকার ॥ ৩৫ ॥ ৬॥
শ্রবণায়াপি বহুভির্যো ন লভ্যঃ, শৃণ্বন্তোহপি বহবো যং ন বিদ্যুঃ। আশ্চর্য্যোহস্য * বক্তা, কুশলোহস্য লব্ধা, আশ্চর্য্যে। জ্ঞাতা কুশলানুশিষ্টঃ ॥ ৩৬ ॥ ৭ ॥ ব্যাখ্যা।
[সাম্পরায়প্রকাশাভাবে হেত্বন্তরমাহ,-শ্রবণায়েতি]। ‘যঃ(সাম্পরায়ঃ) বহুভিঃ (জনৈঃ) শ্রবণায় অপি(শ্রোতুমপি) ন লভ্যঃ,[অনেকে এব তচ্ছুবণসৌভাগ্য- শালিনো ন ভবত্তি]।[তর্হি কিং শব্দাবেদ্য এব? নেত্যাহ]-শৃণ্বতোহপি (শাস্ত্রাৎ তং জানন্তোহপি) বহবঃ যং ন বিদ্যুঃ(যথাযথরূপেণ ন জানন্তি)। [কুতো ন বিদ্যুরিত্যত আহ]-অস্য(সাম্পরায়স্য) বক্তা(যথাবৎ তৎস্বরূপো- পদেষ্টা) আশ্চর্য্যঃ(বিস্ময়নীয়:-দুর্লভঃ)। অন্য লব্ধা(প্রাপ্তা শ্রোতাপি) কুশলঃ(নিপুণ এব) কুশলানুশিষ্টঃ(কুশলৈঃ আত্মদর্শিভিঃ যথাবদনুশিক্ষিতঃ) জ্ঞাতা(বোদ্ধা চ) আশ্চর্য্যঃ(দুর্লভ ইত্যর্থঃ) ॥
[কেন যে পরলোক প্রতিভাত হয় না, তাহার আরও কারণ প্রদর্শিত হইতেছে]—বহু লোকে সাম্পরায়কে শ্রবণ করিতেও পায় না, এবং বহু লোকে ইহা শ্রবণ করিয়াও বুঝিতে সমর্থ হয় না; কারণ, ইহার বক্তা আশ্চর্য্য- ভূত(দুর্লভ)। কুশল বা অভিজ্ঞ লোকই ইহার লব্ধা, অর্থাৎ ‘শ্রোতা’ ‘হইয়া থাকে এবং কুশলানুশিষ্ট, অর্থাৎ আত্মদর্শী লোকের নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিই ইহা জানিতে পারে; তাদৃশ জ্ঞাতাও আশ্চর্য্যভূত ॥ ৩৬ ॥ ৭ ॥
যব শ্বেতোহর্থী, সহস্রে কশ্চিদেব আজ্ঞাবিদ ভবতি তদ্বিষঃ, যস্মাৎ শ্রবণেঽপি
শ্রবণার্থং শ্রোতুমপি যো ন লভ্য আত্মা বহুভিঃ অনেকৈঃ, শৃণ্বন্তোহপি বহুবঃ অনেকে অন্যে যম্ আত্মানং ন বিদুঃ ন বিদন্তি অভাগিনঃ অসংস্কৃতাত্মানো ন বিজানীযুঃ। কিঞ্চ, অন্য বক্তাপি আশ্চর্য্যঃ অদ্ভুতবদেব অনেকেষু কশ্চিদেব ভবতি। তথা শ্রুত্বাপি অস্য আত্মনঃ কুশলো নিপুণ এবানেকেষু লব্ধা কশ্চিদেব ভবতি। যস্মাৎ আশ্চর্য্যো জ্ঞাতা কশ্চিদেব, কুশলানুশিষ্টঃ কুশলেন নিপুণেনা- চার্য্যেণানুশিষ্টঃ সন্ ॥ ৩৬,৷ ৭ ॥
যিনি প্রকৃত কল্যাণার্থী, তোমার ন্যায় তাদৃশ আত্মজ্ঞ লোক সহস্রের মধ্যে কেহ(অতি অল্পই) হইয়া থাকে; যেহেতু, অনেকে আত্মাকে শ্রবণ করিতেও পায় না; এবং অপর বহু লোক আত্মাকে জানিতে(বুঝিতে) পারে না,-অর্থাৎ, ভাগ্যহীন অপরি- শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিরা ইহাকে জানিতেও পারে না। আরও এক কথা, ইহার বক্তাও(স্বরূপপ্রকাশকও) আশ্চর্য্যভূত, অর্থাৎ অনেকের মধ্যে কেহ হইয়া থাকে; সেইরূপ এই আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়া কুশল বা নিপুণ ব্যক্তিই অর্থাৎ অনেকের মধ্যে অতি-অল্প লোকই সমর্থ হয়,-যেহেতু কুশল আচার্য্যজন কর্তৃক শিক্ষিত হইয়া যেরূপ লোক ইহা জানিতে পারে, নিশ্চয়ই সেরূপ লোকও অতি অল্প।(খ) ॥৩৬৷৭॥
ন নরেণাবরেণ প্রোক্ত এষ সুবিজ্ঞেয়ো বহুধা চিন্ত্যমানঃ। অনন্য-প্রোক্তে গতিরত্র নাস্তি অণীয়ান্ হ্যতর্ক্যমণু প্রমাণাৎ ॥ ৩৭ ॥ ৮ ॥
(খ) তাৎপর্য্য,—এই শ্রুতির অনুরূপ ভাব ভগবদ্গীতার নিম্নলিখিত শ্লোকে উক্ত আছে। সেই শ্লোকটি এই,—“আশ্চর্য্যবৎ পুশ্যতি কশ্চিদেনমাশ্চর্য্যবদ্ বদতি তথৈব চান্যঃ।
আশ্চর্য্যবিচক্ষণমস্যঃ শ্লথোতি, প্রবাপ্যেনং বেদ নটৈব কশ্চিৎ। এস্থলে কথিত হইয়াছে যে, “আত্মাকে যিনি দর্শন করেন, তিনি অপর লোকের নিকট আশ্চর্য্য পদার্থরূপে প্রতীত হন, কিংবা নিজেই আশ্চর্যান্বিত—বিস্ময়াভিভূত হইয়া আত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন; এই প্রকার বক্তা ও শ্রোতা, উভয়ই আশ্চর্য্যবৎ এবং অনেকে আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়াও উহার রহস্য বুঝিতে পারেন না।” অতএব, উক্ত গীতাবাক্যের সহিত এই শ্রুতিবাক্যের যে ভাবগত সম্পূর্ণ ঐক্য রহিয়াছে, ইহা বলা অসঙ্গত হয় না।
[ পদ-পদার্থ-জ্ঞানবতা আচার্য্যেণ অনুশিষ্টঃ শিষ্যঃ কুতো ন জ্ঞাতা? ন বা লব্ধা ভবতি? ইত্যত আহ—ন নরেণেতি]। অবরেণ(প্রাকৃতবুদ্ধিশালিনা) নরেণ(মনুষ্যেণ) প্রোক্তঃ(উপদিষ্টঃ)[অপি] সু(সম্যক্ যথাবত্তথা) বিজ্ঞেয়ো ন[ভবতি]। বহুধা(অস্তি,, নাস্তি, কর্তা অকর্তা ইত্যাদ্যনেকপ্রকারেণ) চিন্ত্যমানঃ(প্রতীয়মানঃ) এষঃ(আত্মা) অনন্যপ্রোক্তে(অহং ব্রহ্মণোহনন্যঃ অপৃথক্ ইত্যেবং জ্ঞানবতা আচার্য্যেণ উপদিষ্টে) অত্র(আত্মনি) গতিঃ(পূর্ব্বোক্তো বিকল্পঃ) নাস্তি(ন প্রসরতি)।[অথবা, অত্র আত্মনি অনন্যত্বেন স্বস্বরূপেণ প্রোক্তে সতি জগদ্ভেদস্য গতিঃ অবগতিঃ নাস্তীত্যর্থঃ]।[ননু ব্যাখ্যাতৃবচনত আত্মজ্ঞানা- ভাবেৎপি প্রত্যক্ষানুমানাভ্যাং স্যাৎ ইত্যত আহ,—অণীয়ানিতি]। অণুপ্রমাণাৎ (অণুপরিমাণতোহপি) অণীয়ান্(অতিসূক্ষ্মঃ)[অতো ন প্রত্যক্ষঃ] অতর্ক্যঃ (তর্কস্যাবিষয়ঃ)[অনুমানাগোচরশ্চ, কেবলানুমানস্য প্রতিপক্ষাদিবাধিতত্বাদিতি ভাবঃ]॥
[ভাল কথা, পদ ও পদার্থ-জ্ঞানসম্পন্ন আচার্য্যের উপদেশে শিষ্য আত্মাকে জানিতে ও বুঝিতে সমর্থ হয় না কেন? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন],—অবর (সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন) নর বা মনুষ্যরূপী আচার্য্যকর্তৃক উপদিষ্ট হইলেও এই আত্মা সম্যরূপে জ্ঞানগোচর হয় না; কারণ, এই আত্মা ‘আছে, নাই; কর্তা অকর্তা’ ইত্যাদি বহুপ্রকার তর্কে সমাক্রান্ত। যিনি ব্রহ্মকে অনন্য বা অপৃথরূপে জানিয়া- ছেন, তাদৃশ আচার্য্যকর্তৃক এই আত্মা উপদিষ্ট হইলে[শিষ্যের নিকট] পূর্ব্বোক্ত বিতর্কের গতি বা সম্ভাবনা থাকে না। অধিকন্তু, এই আত্মা অণুপরিমাণ হইতেও অতিশয় অণু—অণীয়ান্(অতিসূক্ষ্ম),[সুতরাং প্রত্যক্ষের বিষয়] এবং অতর্ক্য অর্থাৎ তর্ক বা অনুমানেরও অগম্য ॥ ৩৭ ॥ ৮ ॥
কস্মাৎ? ন হি নরেণ মনুষ্যেণ অবরেণ প্রোক্তোহবরেণ হীনেন প্রাকৃতবুদ্ধিনা ইত্যেতৎ, উক্তঃ এষঃ আত্মা, যং ত্বং মাং পৃচ্ছসি। নহি সুষ্ঠু সম্যক্ বিজ্ঞেয়ো বিজ্ঞাতুং শক্যঃ, যস্মাৎ বহুধা—অস্তি নাস্তি, কর্তা অকর্তা, শুদ্ধোহশুদ্ধ ইত্যাদ্য- নেকধা চিন্ত্যমানো বাদিভিঃ।
কথং পুনঃ সুবিজ্ঞেয়ঃ? ইত্যুচ্যতে-অনন্যপ্রোক্তে অনন্যেন অপৃথগ্দর্শিনা আচার্য্যেণ প্রতিপাদ্য-ব্রহ্মাত্মভূতেন প্রোক্তে উক্তে আত্মনি গতিঃ অনেকধা- অস্তিনাস্তীত্যাদিলক্ষণা চিন্তা গতিরস্মিন্নাত্মনি নাস্তি ন বিদ্যতে, সর্ব্ববিকল্পগতি- প্রত্যন্তমিতরূপত্বাদাত্মনঃ। অথবা, স্বাত্মভূতে অনন্যস্মিন্ আত্মনি প্রোক্তে-অনন্য- প্রোক্তে গতিঃ অত্র অন্যস্যাবগতির্নাস্তি জ্ঞেয়স্যান্যস্যাভাবাৎ। জ্ঞানস্য হোষা পরা নিষ্ঠা, যদাম্মৈকত্ববিজ্ঞানম্। অতঃ অবগন্তব্যাভাবাৎ ন গতিরত্রাবশিষ্যতে। সংসার- গতির্বাত্র নাস্তি, অনন্য আত্মনি প্রোক্তে নান্তরীয়কত্বাৎ তদ্বিজ্ঞানফলস্য মোক্ষস্য। অথবা, প্রোচ্যমানব্রহ্মাত্মভূতেনাচার্য্যেণ অনন্যতয়া প্রোক্তে আত্মনি অগতিঃ অনব- বোধোহপরিজ্ঞানমত্র নাস্তি; ভবত্যেবাবগতিস্তদ্বিষয়া শ্রোতুঃ ‘তদনন্যোহহমিতি’ আচার্য্যস্যেবেত্যর্থঃ। এবং সুবিজ্ঞেয় আত্মা আগমবতা’ আচার্য্যেণ অনন্যতয়া প্রোক্ত ইত্যর্থঃ। ইতরথা, অণীয়ান্ অণুপ্রমাণাদপি সম্পদ্যতে আত্মা। অতর্ক্যম্ অতর্ক্যঃ স্ববুদ্ধ্যভ্যুহেন, কেবলেন তর্কেণ তর্ক্যমাণোহণুপরিমাণে কেনচিৎ স্থাপিতে আত্মনি ততোহণুতরমন্যোহভ্যুহতি, ততোহপ্যন্যোহণুতমমিতি। ন হি তর্কস্য নিষ্ঠা কচিদ্ বিদ্যুতে ॥ ৩৭ ॥ ৮ ॥
কারণ কি? না,—তুমি আমাকে যে আত্ম-বিষয়ে প্রশ্ন করিতেছ, সেই আত্মা অবর অর্থাৎ বিবেকহীন, সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মনুষ্যকর্তৃক উক্ত বা ব্যাখ্যাত হইলে নিশ্চয়ই সু অর্থাৎ সুষ্ঠু—সম্যরূপে(যথা- যথরূপে) বিজ্ঞেয় অর্থাৎ জানিবার যোগ্য হয় না; কারণ, বাদিগণ- কর্তৃক(বিভিন্ন মতাবলম্বিগণ কর্তৃক)[এই আত্মা.] আছে, নাই, কর্তা ও অকর্তা(কর্তা নহে) ইত্যাদি বহুবিধরূপে চিন্তিত(বিতর্কিত) হইয়া থাকে। তাহা হইলে, কিরূপে ইহা সুবিজ্ঞেয় হয়? এই প্রশ্নাভিপ্রায়ে বলিতেছেন—অনন্য অর্থাৎ সর্বত্র অভেদদর্শী এবং(যাহার কথা প্রতিপাদন করিতে হইবে, সেই) প্রতিপাদ্য ব্রহ্ম যাহার আত্মস্বরূপ, অর্থাৎ মিনি ব্রহ্মে ও আত্মায় ভেদ দর্শন করেন না, এবংবিধ আচার্য্য- কর্তৃক কথিত হইলেই এই আত্মাতে ‘আছে, নাই’ ইত্যাদিরূপ বহু-
বিধ চিন্তার গতি বা সম্ভাবনা থাকে না; কারণ, সর্ব্বপ্রকার বিকল্প বা ভেদপ্রতীতিরাহিত্যই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ। অথবা, অনন্য বা অভিন্ন আত্মা উপদিষ্ট হইলে পুর এ জগতে অপর কোন বস্তুরই প্রতীতি হয় না; কারণ, তখন জানিবার যোগ্য অন্য কোন বস্তুই থাকে না, কেননা, আত্মার একত্ব বিজ্ঞান উপস্থিত হইলে জ্ঞানের (বুদ্ধিবৃত্তির) পরিসমাপ্তি হইয়া যায়। অতএব, জ্ঞাতব্য বিষয়ের অভাববশতঃই আর কোনও জ্ঞান অবশিষ্ট থাকে না। অথবা [‘গতিরত্র নাস্তি’ কথার অর্থ]-সংসারগতি আর থাকে না, অর্থাৎ তাহার আর পুনর্ব্বার জন্ম হয় না; ‘কেননা, আত্মা ব্রহ্ম হইতে অনন্য বা অভিন্ন, এই উপদেশ উক্ত হইলে পর, মোক্ষলাভ সেই বিজ্ঞানের অবশ্যম্ভাবী ফল। অথবা, যে আচার্য্য বক্ষ্যমাণ ব্রহ্মকে আত্মস্বরূপে অবগত হইয়াছেন, সেই আচার্য্য আত্ম-তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিলে, তদ্বিষয়ে আর অনবগতি বা জ্ঞানের অভাব থাকে না, অর্থাৎ আচার্য্যের ন্যায় শ্রোতারও তদ্বিষয়ে ‘আমি ব্রহ্ম হইতে অনন্য বা অপৃথক্’, এই জ্ঞান নিশ্চয়ই সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, এইপ্রকার শাস্ত্র- জ্ঞানসম্পন্ন আচার্য্যকর্তৃক অনন্যরূপে অভিহিত হইলে, আত্মা সম্যক্ জ্ঞানের বিষয়ীভূত হয়; নচেৎ, আত্মা অণুপ্রমাণ বা সূক্ষ্ম বস্তু অপেক্ষাও অণীয়ান্ অতিশয় সূক্ষ্ম(দুর্বিজ্ঞেয়) হইয়া পড়ে।[উক্ত আত্মা] কেবল স্বীয় বুদ্ধির বলে সম্ভাবিত তর্ক দ্বারা বিচারণীয় হইতে’ পারে না; কারণ, কোন ব্যক্তি তর্ক সাহায্যে আত্মাকে অণুপরিমাণ সাব্যস্ত করিলে, অপরে আবার তদপেক্ষাও ‘অণুতর’ বলিয়া তর্ক করিতে পারে, অপরে আবার তদপেক্ষাও সূক্ষ্ম অণু বলিয়া ‘অণুতম’ সম্ভাবিত করিতে পারে; কেননা, তর্কের ত কখনও কোথাও বিশ্রাম বা শেষ নাই বা হইতে পারে না।(গ) ॥ ৩৭ ॥৮॥
নৈষা তর্কেণ মতিরাপনেয়া, প্রোক্তান্যেনৈব সুজ্ঞানায় প্রেষ্ঠ। যাং ত্বমাপঃ সত্যধৃতির্বতাসি, ত্বাদৃনো ভূয়ান্নচিকেতঃ প্রষ্টা ॥৩৮॥৯৷৷
[ইদানীমাত্মজ্ঞানোপায়ং বক্ত মুপক্রমতে,-নৈষেতি]। হে প্রেষ্ঠ(প্রিয়তম) ত্বং যাম্[মতিম্] আপঃ(প্রাপ্তবানসি), এষা(ব্রহ্মগোচরা) মতিঃ তর্কেণ(স্ববুদ্ধি- পরিকল্পিতেন বিচারেণ) ন[আ+অপ+নেয়া ইতি পদচ্ছেদঃ] আপনেয়া(প্রাপ্যা ন ভবতি]। অথবা, তর্কেণ ন আ-সম্যক্ অপনেয়া(নৈব দূরীকর্তব্যা’)।[পরন্তু] অন্যেন(‘ব্রহ্মণোহনন্যোইহমিতি’ জানতা) প্রোক্তা(তদুপদেশজন্যা সতী) সুজ্ঞানায় (সম্যক্ জ্ঞানায়)[ভবতি]। হে নচিকেতঃ![ত্বং সত্যধৃতিঃ(সত্যসঙ্কল্পঃ, অচাল্য- ধৈর্য্যবানিতি বা) অস্মি(ভবসি)। বত[বতেত্যনুকম্পায়াম্, নানাপ্রকারেণ প্রলো- ভিতোহপি ব্রহ্মস্বরূপবোধবিষয়ে ধৈর্য্যং ন মুক্তবানসি ইত্যভিপ্রায়ঃ] ত্বাদৃক্ (ত্বতুল্যঃ) প্রষ্টা(পৃচ্ছকঃ) নো ভূয়াৎ(ন ভবেৎ)।[নঃ(অস্মভ্যম্) ত্বাদৃক্ প্রষ্টা ভূয়াদিতি বা] ॥
এখন আত্মজ্ঞানের উপায় নিরূপণার্থ বলিতেছেন—হে প্রেষ্ঠ(প্রিয়তম!) তুমি যে মতি(সদ্বুদ্ধি) প্রাপ্ত হইয়াছ, তর্ক দ্বারা এই মতি লাভ করা যায় না;
থাকে, সুতরাং তাঁহার উপদেশে শিষ্য-হৃদয়েও পরোক্ষ জ্ঞান ভিন্ন কখনই অপরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান সমুৎপন্ন হইতে পারে না। আত্মতত্ত্বোপদেশ সম্বন্ধেও সেই কথা, যে আচার্য্য কেবল শাস্ত্রলব্ধ জ্ঞানে ও স্বীয় প্রতিভার সাহায্যে আত্মতত্ত্বের উপদেশ দেন, তাঁহার উপদেশ সত্য হইতে পারে এবং শ্রোতারও হৃদয়রঞ্জক হইতে পারে সত্য, কিন্তু তাহা কখনই শ্রোতার হৃদয়-গত সন্দেহ-শঙ্কা সম্পূর্ণরূপে অপনীত করিতে পারে না; কাজেই তাদৃশ আচার্য্যোক্ত আত্মতত্ত্ব শিষ্যের নিকট সুক্ষ্মাদপি সূক্ষ্মতম বলিয়া প্রতীত হয়। পক্ষান্তরে, যে আচার্য্য স্বয়ং আত্মতত্ত্ব অনুভব করিয়াছেন, এবং আত্মা ও ব্রহ্মের একত্ব সাক্ষাৎকার করিয়াছেন, তাঁহার নিকট আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিলে সম্পূর্ণরূপে আত্মতত্ত্ব স্ফূর্ত্তি পায়, সমস্ত ভেদবুদ্ধি তিরোহিত হইয়া যায়, এবং জগতে তাঁহার কোনও জ্ঞাতব্য অবশিষ্ট থাকে না। এই কারণেই শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ, সমিৎপাণিঃ শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্।’ অর্থাৎ সেই আত্মতত্ত্ব বিজ্ঞানের উদ্দেশে শিশু সমিৎপাণি হইয়া শ্রোত্রিয় ও ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর সমীপে উপস্থিত হইবে। অভিপ্রায় এই যে, গুরুর কেবল বেদাভিজ্ঞতা থাকিলেই হইবে না, ব্রহ্মনিষ্ঠাও থাকা আবশ্যক।
অথবা তর্কের সাহায্যে এই সদ্বুদ্ধি অপনীত করা উচিত হয় না।[পরন্তু] অন্য অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মদর্শী আচার্য্য কর্তৃক উপদিষ্ট হইলেই(আত্মা) যথাযথরূপে জ্ঞানের যোগ্য হয়। হে নচিকেতঃ! তুমি সত্যসন্ধ আছ; তোমার ন্যায় প্রশ্নকারী(জিজ্ঞাসু) আর হয় না। অথবা আমাদের নিকট তোমার ন্যায় প্রষ্টা(আরও) হউক ॥৩৮৷৷৯৷৷
অতোহনন্যপ্রোক্তে আত্মনি উৎপন্না যেয়মাগম প্রতিপাদ্যা আত্ম-মতিঃ, নৈষা তর্কেণ স্ববুদ্ধ্যভ্যুহমাত্রেণ আপনেয়া নাপনীয়া ন প্রাপণীয়েত্যর্থঃ। নাপনেতব্যা বা নোপহন্তব্যা। তার্কিকো হনাগমজ্ঞঃ স্ববুদ্ধিপরিকল্পিতং যৎকিঞ্চিদেব কল্পয়তি। অত এব চ যেয়মাগম প্রসূতা মতিঃ অন্যেনৈব আগমাভিজ্ঞেন আচার্য্যেণৈব তার্কিকাৎ প্রোক্তা সতী‘সুজ্ঞানায় ভবতি, হে প্রেষ্ঠ প্রিয়তম! কা পুনঃ সা তর্কাগম্যা মতি- রিতি? উচ্যতে-যাং ত্বং মতিং মদ্বরপ্রদানেন আপঃ প্রাপ্তবানসি। সত্যা অবি- তথবিষয়া ধৃতির্যস্য তব, স ত্বং সত্যধৃতিঃ, বতাসীত্যনুকম্পয়ন্নাহ মৃত্যুর্নচিকেতসম্-, বক্ষ্যমাণবিজ্ঞানস্তুতয়ে, ত্বাদৃক্ ত্বতুল্যো নোহস্মভ্যং ভূয়াৎ ভবতাৎ। ভবতু অন্যঃ পুত্রঃ শিষ্যো বা পেষ্টা। কীদৃক্? যাদৃক্ ত্বং হে নচিকেতঃ প্রষ্টা ॥৩৮৷৷৯৷৷
অতএব, অনন্য-কর্তৃক অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মদর্শী আচার্য্যকর্তৃক উক্ত আত্মা বিষয়ে এই যে আগম-গম্য বুদ্ধি সমুৎপন্ন হইয়াছে,[শাস্ত্র- নিরপেক্ষ] কেবল স্বীয় বুদ্ধিপ্রসূত তর্ক দ্বারা এই বুদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া যায় না, অথবা[এই বুদ্ধি] অপনীত বা নিহত করা কর্তব্য নহে। শাস্ত্রজ্ঞান-রহিত তার্কিক ব্যক্তি স্বীয় বুদ্ধিবৃত্তি অনুসারে যে কোন একটাকে(আত্মা বলিয়া) কল্পনা করিয়া থাকে। অতএব, হে প্রিয়তম! তার্কিক অপেক্ষা আগমাভিজ্ঞ আচার্য্যকর্তৃক অভিহিত হইলেই উক্ত মতি সম্যরূপে হৃদয়ঙ্গম হইবার যোগ্য হয় *। ভাল, তর্কের অগম্য
সেই মতিটি কি? তাহা বলা যাইতেছে,—তুমি আমার বরপ্রদান অনুসারে যে মতি প্রাপ্ত হইয়াছ। তুমি সত্যধৃতি অর্থাৎ তোমার ধৃতি বা ধারণাশক্তি সত্য—যথার্থ বিষয়ে সমুৎপন্ন হইয়াছে। অনন্তরোক্ত বিদ্যার প্রশংসার্থ ‘বত’ ও ‘অসি’ শব্দ প্রয়োগে মৃত্যু নচিকেতার প্রতি দয়া প্রকাশপূর্ব্বক, বলিতেছেন—আমাদের নিকট অপর পুত্র বা শিষ্যও তোমার ন্যায় প্রষ্টা(প্রশ্নকর্তা) হউক। কিরূপ প্রষ্টা? না, হে নচিকেতঃ! তুমি আমার নিকট যেরূপ প্রশ্ন করিয়াছ ॥ ৩৮ ॥ ৯ ॥
জানাম্যহং শেবধিরিত্যনিত্যং ন হ্যধ্রুবৈঃ প্রাপ্যতে হি ধ্রুবং তৎ।” ততোঁ ময়া নাচিকেতশ্চিতোহগ্নি- রনিত্যৈদ্রব্যৈঃ প্রাপ্তবানস্মি নিত্যম্ ॥৩৯৷১০॥
[ মৃত্যুঃ নচিকেতসং প্রোৎসাহয়ন্ পুনরপ্যাহ—জানামীতি]শ শেবধিঃ(নিধিঃ কৰ্ম্মফললক্ষণঃ) অনিত্যম্(অনিত্যঃ) ইতি অহং জানামি। হি(যস্মাৎ) ধ্রুবম্ (শাশ্বতং তৎ ব্রহ্ম) অধ্রুবৈঃ(অনিত্যৈঃ)[যদ্বা ন বিদ্যতে ধ্রুবং ব্রহ্ম যেষাম্, তৈঃ অধ্রুবৈঃ জ্ঞানরহিতৈঃ সাধনৈঃ] ন হি প্রাপ্যতে। ততঃ(তস্মাৎ হেতোঃ) ময়া অনিত্যৈদ্রব্যৈঃ(চয়নসাধনৈঃ) নাচিকেতঃ অগ্নিঃ(ইষ্টকাচিতিস্থোহগ্নিঃ) চিতঃ (গৃহীতঃ আরাধিতঃ)।[তেন চ অহমধিকারাপন্নঃ সন্] নিত্যম্(আপেক্ষিক- সত্যং যাম্যপদম্) প্রাপ্তবান্ অস্মি ॥’
৯
যম নচিকেতার উৎসাহ সংবর্দ্ধনার্থ পুনর্ব্বার বলিতে লাগিলেন, শেবধি অর্থাৎ কৰ্ম্মফলরূপ স্বর্গাদি সম্পৎ যে অনিত্য, ইহা আমি জানি। যেহেতু অনিত্য সাধনের দ্বারা ধ্রুব(নিত্য বস্তু) সেই আত্মাকে প্রাপ্ত হওয়া যায় না; সেই কারণেই আমি অনিত্য দ্রব্যময় সাধন দ্বারা নাচিকেত অগ্নির চয়ন করায়, অর্থাৎ অনিত্য দ্রব্য দ্বারা অগ্নি চয়ন-পূর্ব্বক যজ্ঞ সম্পাদন করায় আপেক্ষিক নিত্য[এই যমাধিকার] প্রাপ্ত হইয়াছি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥
পুনরপি তুষ্ট আহ—জানাম্যহং শেবধিঃ নিধিঃ কৰ্ম্মফললক্ষণঃ নিধিরিব প্রার্থত ইতি। অসৌ অনিত্যম্ অনিত্য ইতি জানামি। ন হি যস্মাদ অনিত্যৈঃ অধ্রুবৈঃ যৎ নিত্যং ধ্রুবং তৎ প্রাপ্যতে পরমাত্মাখ্যঃ শেবধিঃ। যস্তু অনিত্য- সুখাত্মকঃ শেবধিঃ, স এব অনিত্যৈঃ দ্রব্যৈঃ প্রাপ্যতে হি যতঃ, ততঃ তস্মাৎ ময়া জানতাপি নিত্যম্ অনিত্যসাধননৈর্ন প্রাপ্যতইতি, নাচিকেতঃ চিতঃ অগ্নিঃ অনিত্যৈঃ দ্রব্যৈঃ পশ্বাদির্ভিঃ স্বর্গসুখসাধনভূতোহগ্নিঃ নির্ব্বর্তিত ইত্যর্থঃ। তেনাহম্ অধিকারা- পন্নো নিত্যং যাম্যং স্থানং স্বৰ্গাখ্যং নিত্যম্ আপেক্ষিকং প্রাপ্তবানস্মি ॥৩৯৷৷১০৷৷
যম সন্তুষ্ট হইয়া পুনর্বার বলিতে লাগিলেন, শেবধি অর্থ-নিধি (ধনরাশি), কৰ্ম্মফলও নিধিরই মত প্রার্থিত হয়, এই কারণে কৰ্ম্ম- ফলকেও ‘নিমি’ বলা হইয়া থাকে; ইহা যে অনিত্য, তাহা আমি জানি।(হি) যেহেতু অধ্রুব বা অনিত্য সাধন দ্বারা নিত্য সেই পরমাত্ম-নামক শেবধি প্রাপ্ত হওয়া যায় না; পরন্তু, যাহা অনিত্য- সুখাত্মক শেবধি, অনিত্য দ্রব্য দ্বারা তাহাই প্রাপ্ত ‘হওয়া’ যায়। অনিত্য সাধনে নিত্য বস্তু লাভ করা যায় না, ইহা জানিয়াও আমি অনিত্য পশু প্রভৃতি দ্রব্য দ্বারা স্বর্গসাধন নাচিকেত অগ্নি চয়ন করিয়াছি, এবং তাহা দ্বারা অধিকার প্রাপ্ত হইয়া আপেক্ষিক নিত্য (অপর পদার্থ অপেক্ষা দীর্ঘকালস্থায়ী), স্বর্গসংজ্ঞক এই যমপদ প্রাপ্ত হইয়াছি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥
কামস্যাপ্তিং জগতঃ প্রতিষ্ঠাং ক্রতোরনন্ত্যমভয়স্য পারম্।
স্তোমমহদুরুগায়ং প্রতিষ্ঠাং দৃষ্ট্বা ধৃত্যা ধীরো নচিকেতোহত্যস্রাক্ষীঃ ॥৪০॥১১॥
ব্যাখ্যা।
[ন কেবলমহমেব জানামি, মৎপ্রসাদাৎ ত্বমপি জানাসি ইত্যাহ-কামস্যেতি]। হে নচিকেতঃ![ত্বম্] ধৃত্যা(ধৈর্য্যেণ মনোদার্যেন) ধীরঃ(ধীমান্ সন্) কামস্য (অভিলষিতার্থস্য) আপ্তিম্(সমাপ্তিম্) জগতঃ প্রতিষ্ঠাম্(আশ্রয়ম্), ক্রতোঃ (যজ্ঞস্য) অনন্ত্যম্(অনন্তফলম্) অভয়স্য ধারম্(পরাং নিষ্ঠাম্), স্তোমমহৎ(স্তোমং স্তুত্যম্, মহৎ-অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যাদ্যনেকগুণযুক্তম্), উরুগায়ম্,(প্রশস্তং বৈরাজং পদম্), প্রতিষ্ঠাম্(আত্মন উত্তমাং স্থিতিঞ্চ) দৃষ্টা(বিচার্য্য)[সর্ব্বমেতৎ সংসার- ভোগজাতম্] অত্যস্রাক্ষীঃ(ত্যক্তবান্ অসি)। “অনন্তলোকাপ্তিমথো প্রতিষ্ঠাম্” ইতি প্রাগুক্তদ্বয়স্য “জগতঃ প্রতিষ্ঠাম্, ক্রতোরনন্ত্যম্” ইতি বিশেষণদ্বয়েনানুবাদঃ। “স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্তে” ইত্যস্য “অভয়স্য পারম্” ইত্যনেনানুবাদঃ। “ব্রহ্মজজ্ঞং দেবমীড্যম্” ইত্যাদিনোক্তং “স্তোমমহদুরুগায়ম্” ইত্যনেনানুদিতমিতি জ্ঞেয়ম্ ॥
[কেবল যে, আমিই ইহা জানি, তাহা নহে, আমার অনুগ্রহে তুমিও জানিয়াছ; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন]—হে নচিকেতঃ! তুমি স্বীয়, ধৈর্য্যগুণে সুবুদ্ধি- সম্পন্ন হইয়া অভিলষিত বিষয়ের পরাকাষ্ঠা, জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতিসাধন, যজ্ঞের অনন্ত ফল, সর্ব্বভয়-বিনিবারক, স্তবনীয় ও মহৎ বৈরাজ পদ বা হিরণ্য- গর্ভাধিকার এবং নিজের অত্যুত্তম গতিলাভ, এই সমস্ত ভোগ্য বস্তু বিচারপূর্ব্বক পরিত্যাগ করিয়াছ ॥৪০॥১১৷৷
ত্বং তু কামস্য আপ্টিং সমাপ্তিম্, অত্র হি সর্ব্বে কামাঃ পরিসমাপ্তাঃ, জগতঃ সাধ্যা- স্মাধিভূতাধিদৈবাদেঃ, প্রতিষ্ঠাম্ আশ্রয়ং সর্ব্বাত্মকত্বাৎ, ক্রতোঃ উপাসনায়াঃ ফলং হৈরণ্যগর্ভৎ পদম্ অনন্ত্যম্ আনন্ত্যম্। অভয়স্য চ পারং পরাং নিষ্ঠাম্। স্তোমং স্তুত্যং, মহৎ—অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যাদ্যনেকগুণসহিতম্, স্তোমঞ্চ তন্মহচ্চ নিরতিশয়ত্বাৎ—
স্তোমমহৎ। উরুগায়ং বিস্তীর্ণং গতিম্। প্রতিষ্ঠাং স্থিতিমাত্মনঃ অনুত্তমামপি দৃষ্টা, ধৃত্যা ধৈর্য্যেণ ধীরো ধীমান্ সন্ নচিকেতঃ! অত্যস্রাক্ষীঃ-পরমেবাকাঙ্ক্ষন্ অতি- সৃষ্টবান্ অসি সর্ব্বমেতৎ সংসারভোগজাতম্। অহো বত অনুত্তমগুণোহসি! ॥৪০৷৷১১
হে নচিকেতঃ! তুমি কিন্তু ধৈর্য্যগুণে, ধীর হইয়া যাহাতে সমস্ত কাম বা অভিলাষের পরিসমাপ্তি হয়, সেই কামাপ্তি, অধ্যাত্ম, অধিভূত ও অধিদৈবতাত্মক সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আশ্রয়—কারণ, ইহাই সর্বাত্মক বা সর্বময়, সর্বভয়-নিবৃত্তির পরা- কাষ্ঠা, ‘স্তোম’ অর্থ-স্তনীয়(প্রশংসার্হ’), ‘মহৎ’ অর্থ—অণিমাদি ঐশ্বর্য্য প্রভৃতি অনেক গুণসমন্বিত, সর্বাপেক্ষা অতিশয় বলিয়া স্তোম-মহৎ এবং ‘উরুগায়’ অর্থ—বিস্তীর্ণা(সুদীর্ঘ) গতি(শুভফল), অনন্ত ক্রতুফল—হিরণ্যগর্ভাধিকার এবং প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ নিজের অত্যুত্তম গতি বা পরিণাম বিচারপূর্ব্বক পরিত্যাগ করিয়াছ, অর্থাৎ পরম পদ পাইবার আকাঙ্ক্ষায় পূর্ব্বোক্ত সাংসারিক ভোগ্যবস্তুসমূহ পরিত্যাগ করিয়াছ। বড় আহলাদের বিষয় যে, তুমি অত্যুত্তম গুণসম্পন্ন হইয়াছ ॥ ৪০ ॥ ১১ ॥
তং দুর্দ্দর্শং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টং , গুহাহিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম্। অধ্যাত্ম-যোগাধিগমেন দেবং মত্বা ধীরো হর্ষ-শোকৌ জুহাতি ॥৪১৷১২৷৷ ব্যাখ্যা।[ ইদানীং দেহব্যতিরিক্তাত্মদর্শিনঃ ফলকথনেন প্রশংসামাহ—তমিতি]। দুর্দ্দর্শম্(দুঃখেন প্রযত্নাতিশয়েন দ্রষ্টুং শক্যং জ্ঞেয়মিতি যাবৎ), গূঢ়ম্(অনভি- ব্যক্তস্বরূপম্), অনুপ্রবিষ্টম্(প্রেরকতয়া সর্ব্বজগদন্তঃ প্রবিষ্টম্), গুহাহিতম্(গুহায়াং প্রাণিবুদ্ধৌ আহিতং সংস্থিতম্), গহ্বরেষ্ঠম্(গহ্বরে—রাগদ্বেষাদ্যনর্থসংকুলে দেহে স্থিতম্), পুরাণম্(সনাতনম্) তং দেবম্(দ্যোতমানং স্বপ্রকাশং বা
আত্মানম্)[অত্র গূঢ়ত্বমনুপ্রবিষ্টত্বং গুহাহিতত্বং চ গহবরেষ্ঠত্বে হেতুঃ, তচ্চ দুর্দর্শত্বে হেতুরিতি জ্ঞেয়ম্]। অধ্যাত্মযোগাধিগমেন(অধ্যাত্মযোগেন আত্মবিষয়ক- সমাধি-যোগেন জাতো যোহধিগমঃ, তেন) মত্বা(জ্ঞাত্বা) ধীরো হর্ষশোকৌ জহাতি[সংসারাৎ মুচ্যতে ইতি ভাবঃ]।
দুর্দ্দর্শ(অতিশয় প্রয়াসবেদ্য—দুর্বিজ্ঞেয়), গূঢ়(অব্যক্ত-স্বরূপ), সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট, সকলের বুদ্ধিরূপ গুহায় অবস্থিত, রাগদ্বেষ প্রভৃতি অনর্থসমাকুল দেহরূপ গহ্বরে অধিষ্ঠিত এবং পুরাণ অর্থাৎ নিত্য ও প্রকাশময় সেই পরমাত্মাকে সমাধিযোগ দ্বারা অবগত হইয়া ধীরব্যক্তি হর্ষ ও শোক অর্থাৎ সুখ ও দুঃখ অতিক্রম করে, অর্থাৎ হর্ষ-শোকময় সংসার হইতে মুক্তিলাভ করে ॥৪১৷৷১২৷৷
যং ত্বং জ্ঞাতুমিচ্ছসি আত্মানম্, তং দুৰ্দ্দর্শম্-দুঃখেন দর্শনমস্যেতি দুৰ্দ্দর্শম্, অতি- সূক্ষ্মত্বাৎ। গূঢ়ং গহনম্, অনুপ্রবিষ্টং প্রাকৃতবিষয়বিকারবিজ্ঞানৈঃ প্রচ্ছন্নমিত্যেতৎ। গুহাহিতং-গুহায়াং বুদ্ধৌ হিতং নিহিতং স্থিতম্, তত্রোপলভ্যমানত্বাৎ। গহ্বরেষ্ঠম্ -গহ্বরে বিষমে অনেকানর্থসঙ্কটে তিষ্ঠতীতি গহ্বরেষ্ঠম্। যত এবং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টো’ গুহাহিতশ্চ, অতোহসৌ গহ্বরেষ্ঠঃ, অতো দুর্দ্দর্শঃ। তং পুরাণং পুরাতনম্ অধ্যাত্ম- যোগাধিগমেন-বিষয়েভ্যঃ প্রতিসংহৃত্য চেতস আত্মনি সমাধানম্ অধ্যাত্মযোগঃ, তস্যাধিগমঃ প্রাপ্তিঃ, তেন মত্বা দেবম্ আত্মানং ধীরো হর্ষ-শোকৌ আত্মন উৎকর্ষাপকর্ষয়োরভাবাৎ জহাতি ॥ ৪১ ॥ ১২ ॥
[হে নচিকেতঃ!] তুমি যে আত্মাকে জানিতে ইচ্ছা করিয়াছ, সেই আত্মা দুর্দর্শ অর্থাৎ অতিশয় সূক্ষ্মতাহেতু অতি কষ্টে তাহার দর্শন হয়; গূঢ়(দুজ্ঞেয়) ও অনুপ্রবিষ্ট, অর্থাৎ লৌকিক শব্দাদি-বিষয়- গ্রাহী বিজ্ঞানে সমাচ্ছন্ন; গুহাহিত অর্থাৎ বুদ্ধিরূপ গুহায় অবস্থিত; কেননা, সেই স্থানেই আত্মার উপলব্ধি হইয়া থাকে। আর রাগদ্বেষাদি অনেকপ্রকার অনর্থসঙ্কুল দেহাদিতে অবস্থান করে বা প্রতীয়মান হয় বলিয়া গহ্বরেষ্ঠ, পুরাণ অর্থ—পুরাতন, সেই দেব—আত্মাকে অধ্যাত্মযোগাধিগম দ্বারা(বিষয়, হইতে চিত্তকে প্রত্যাহৃত করিয়া
আত্মাতে স্থিরীকরণের নাম অধ্যাত্মযোগ, তাহার যে অধিগম অর্থাৎ আয়ত্তীকরণ, তাহা দ্বারা) মনন বা ধ্যান করিয়া ধীর ব্যক্তি হর্ষ ও শোক পরিত্যাগ করেন; কারণ, আত্মাতে[হর্ষ ও শোকের কারণীভূত] উৎকর্ষ বা অপকর্ষ, কিছুই নাই ॥৪১॥১২৷৷
এতচ্ছ ত্বা সম্পরিগৃহ্য মর্ত্যঃ. প্রবৃহ্য ধর্ম্মমণুমেনমাপ্য। স মোদতে মোদনীয়হি লব্ধ। বিবৃতসং নচিকেতসং মন্যে ॥৪২॥১৩৷৷
[কিঞ্চ],[যো] মর্ত্যঃ(মনুষ্যঃ) এতৎ(ব্রহ্ম)[আচার্য্যেভ্যঃ] শ্রুত্বা, ধৰ্ম্ম্যম্(জগদ্ধারকম্) অণুম্(সূক্ষ্মম্)[আত্মানম্] প্রবৃহা(শরীরাদেঃ জড়বর্গাৎ পৃথক্বৃত্য) সম্পরিগৃহ্য(সম্যক্ আত্মভাবেন জ্ঞাত্বা)[আস্তে], স এনং ‘মোদনীয়ম্(আনন্দকরম্ আত্মানম্) আপ্য(প্রাপ্য) মোদতে, হি(নিশ্চয়ে)। [এনম্ আত্মানম্] লব্ধ।[স্থিতম্] নচিকেতসম্(ত্বাং প্রতি) সদ্ম(ব্রহ্মস্থানম্) বিবৃতম্(অপাবৃতদ্বারম্) মন্যে(জানামি)।[ত্বং হি ব্রহ্মজ্ঞতয়া সর্ব্বকামত্যাগেন বিশেষতো মোক্ষার্হোহসীতি ভাবঃ]॥
যে মনুষ্য আচার্য্যের নিকট এই ব্রহ্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়া ধর্মানুমোদিত এই সূক্ষ্ম আত্মাকে দেহাদি, জড় পদার্থ হইতে পৃথক্ করিয়া সম্যরূপে আত্মস্বরূপ জানিয়া থাকে, সে এই মোদনীয়(আনন্দকর) আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া নিশ্চয়ই আনন্দ লাভ করে। নচিকেতার(তোমার) আশ্রয়(ব্রহ্মদসন) বিবৃতদ্বার বলিয়া মনে করি ॥৪২৷৷১৩৷৷
কিঞ্চ, এতদাত্মতত্ত্বম্, যদহং বক্ষ্যামি, তৎ শ্রুত্বা আচার্য্যসকাশাৎ সম্যগাত্ম- ভাবেন পরিগৃহ্য উপাদায় মর্ত্যো মরণধৰ্ম্মা ধর্মাদনপেতং ধৰ্ম্ম্যং প্রবৃহ্য উদ্যম্য পৃথক্বৃত্য শরীরাদেঃ, অণুং সূক্ষ্মম্ এতমাত্মানমাপ্য প্রাপ্য, স মর্ত্যো বিদ্বান্ মোদতে মোদনীয়ং হি হর্ষণীয়মাত্মানং লব্ধা। তদেতদেবংবিধং ব্রহ্ম সদ্ম ভবনং
নচিকেতসং ত্বাং প্রতি অপাবৃতদ্বারং বিবৃতম্ অভিমুখীভূতং মন্যে; মোক্ষাইহ ত্বাং মন্যে ইত্যতিপ্রায়ঃ ॥৪২॥১৩৷৷
আমি যে আত্মতত্ত্বের কথা বলিব, মরণধৰ্ম্মশীল মনুষ্য সেই আত্মতত্ত্ব আচার্য্য-সমীপে শ্রবণ করিয়া—পরে আত্মরূপে তাহা স্বীকার করিয়া—ধর্মসম্মত এই সূক্ষ্ম আত্মাকে শরীর প্রভৃতি[অনাত্ম পদার্থ] হইতে পৃথক্ করিয়া—মোদনীয় অর্থাৎ হর্ষের কারণীভূত সেই আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া সেই বিদ্বান্ মনুষ্য আনন্দ লাভ করেন। এবংবিধ সেই ব্রহ্মরূপ ভবনকে(আশ্রয়-স্থানকে) নচিকেতার—তোমার পক্ষে বিস্তৃতদ্বার বা তোমার অভিমুখীভূত বলিয়া মনে করি। অর্থাৎ তোমাকে মোক্ষের উপযুক্ত পাত্র মনে করি ॥৪২৷৷১৩৷৷
অন্যত্র ধর্ম্মাদন্যত্রাধৰ্মা- দন্যত্রাস্মাৎ কৃতাকৃতাৎ। অন্যত্র ভূতাচ্চ ভব্যাচ্চ যত্তৎ পশ্যসি তদ্বদ ॥৪৩৷৷১৪৷৷ ব্যাখ্যা।
[ অলং মৎপ্রশংসয়া, তত্ত্বং ব্রূহীত্যাহ নচিকেতাঃ,-অন্যত্রেতি]। ধর্মাৎ (শাস্ত্রোক্তাৎ ধর্ম্মানুষ্ঠানাদেঃ) অন্যত্র, অধর্মাৎ অন্যত্র(ধর্মাধৰ্ম্মাতীতমিতি যাবৎ)। অস্মাৎ কৃতাকৃতাৎ(কৃতং কার্য্যম্, অকৃতং কারণম্, তস্মাৎ) অন্যত্র (তদুভয়বিলক্ষণমিতি যাবৎ)। ভূতাৎ(অতীতাৎ) চ, ভব্যাৎ(আগামিনশ্চ) [চকারাৎ বর্তমানাৎ অপি] অন্যত্র(তত্রিতয়বিলক্ষণমিতি যাবৎ);[কৃতা- কৃতাদিত্যস্য বিবরণং বা ভূতাচ্চেত্যাদি]। তৎ(লোকবিলক্ষণতয়া প্রসিদ্ধম্) যৎ(বস্তু) পশ্যসি(জানাসি) তৎ বদ[মহ্যমিতি শেষঃ]॥
[নুচিকেতা বলিলেন, আমার প্রশংসায় আর প্রয়োজন নাই] ধৰ্ম্ম ও অধর্ম্মের অতীত, কার্য্য ও কারণ হইতে পৃথক্ এবং অতীত, অনাগত ও বর্তমান হইতেও ভিন্ন, যে বস্তু আপনি জানেন, তাহা আমাকে বলুন ॥ ৪৩ ॥ ১৪ ॥]
এতৎ শ্রুত্বা নচিকেতাঃ পুনরাহ—যদ্যহং যোগ্যঃ প্রসন্নশ্চাসি ভগবন্ মাং প্রতি, অন্যত্র ধর্মাৎ শাস্ত্রীয়াৎ ধর্ম্মানুষ্ঠানাৎ, তৎফলাৎ তৎকারকেভ্যশ্চ পৃথগভূতমিত্যর্থঃ। তথা অন্যত্র অধর্মাৎ বিহিতাকরণরূপাৎ পাপাৎ, তথা অন্যত্রাস্মাৎ কৃতাক্বতাৎ; কৃতং কার্য্যম্, অকৃতং কারণম্, অম্মাদন্যত্র। কিঞ্চ, অন্যত্র ভূতাচ্চ অতিক্রান্তাৎ কালাৎ, ভব্যাচ্চ ভবিষ্যতশ্চ, তথা অন্যত্র বর্তমানাৎ, ‘কালত্রয়েণ যন্ন পরিচ্ছিদ্যত ইত্যর্থঃ। যৎ ঈদৃশং বস্তু সর্ব্ব-ব্যবহারগোচরাতীতং পশ্যসি জানাসি, তৎ বদ মহ্যম্ ॥ ৪৩ ॥ ১৪ ॥
নচিক্যেতা পুনর্ব্বার বলিলেন,—আমি যদি(উপদেশের) যোগ্য হইয়া থাকি, এবং আপনিও যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, [তাহা হইলে] ধৰ্ম্ম হইতে অর্থাৎ শাস্ত্রোক্ত ধর্মানুষ্ঠান, ধর্ম-ফল ও ধৰ্ম্ম-সাধন হইতে পৃথক্, সেইরূপ অধর্ম হইতে পৃথক্, আর এই কৃত ও অকৃত হইতে পৃথক্, অর্থাৎ কৃত অর্থ—কার্য্য, অকৃত অর্থ—কারণ, তদুভয় হইতেও পৃথক্, ভূত—অতীত কাল, ভব্য—ভবিষ্যৎকাল এবং বর্তমান কাল হইতে ভিন্ন, অর্থাৎ উক্ত কালত্রয়ের দ্বারা অপরিচ্ছিন্ন, এবং সর্ব্বপ্রকার লৌকিক ব্যবহারের অগোচর এবংবিধ যে বস্তু আপনি দর্শন করেন অর্থাৎ জানেন, তাহা আমায় বলুন ॥৪৩৷৷১৪৷৷
সর্ব্বে বেদা যৎ পদমামনন্তি তপাসি সর্ব্বাণি চ যদ্ বদন্তি। যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য্যং চরন্তি, তত্তে পদসংগ্রহেণ ব্রবীম্যোমিত্যেতৎ ॥৪৪॥১৫৷৷ ব্যাখ্যা।
[নচিকেতসা পৃষ্টং ব্রহ্মস্বরূপং তন্মহিমোক্তিপূর্ব্বকং বক্তমুপক্রমতে, সর্ব্ব- ইতি]। সর্ব্বে বেদাঃ(বেদৈকদেশাঃ উপনিষদঃ) যৎ(বস্তু) পদম্(পদনীয়ং প্রাপ্তব্যমিত্যর্থঃ), আমনন্তি(মুখ্যবৃত্ত্যা বোধয়ন্তি), সর্ব্বাণি তপাংসি(কর্মাণি)
চ যৎ বদন্তি(যৎপ্রাপ্তয়ে বিহিতানি); যৎ ইচ্ছন্তঃ ব্রহ্মচর্য্যং(গুরুগৃহবাসাদিরূপম্, ঊর্দ্ধরেতত্ত্বাদিব্রতং বা) চরন্তি’(অনুতিষ্ঠন্তি)[সাধবইতি শেষঃ]। তৎ পদং তে(তুভ্যম্) সংগ্রহেণ(সঙ্ক্ষেপেণ) ব্রবীমি—‘ওম্’ ইতি এতৎ।[তৎ পদম্ ‘ওম্’ ইত্যুচ্যত ইত্যর্থঃ] ॥
সমস্ত বেদ(বেদের একদেশ—উপনিষৎসমূহ) যাহাকে পদ বা প্রাপ্তব্য বলিয়া নির্দেশ করেন, সমস্ত তপস্যা(কর্ম্মসমূহও) যাহা প্রতিপাদন করিয়া থাকে,[এবং] সাধুগণ-যাহার ইচ্ছায় ব্রহ্মচর্য্য(গুরুগৃহে বাস ও ইন্দ্রিয়সংযমাদি) আচরণ করেন, আমি সংক্ষেপে সেই পদ বলিতেছি—‘ওম্’ই সেই পদ ॥ ৪৪॥১৫॥
ইত্যেবং পৃষ্টবতে মৃত্যুরুবাচ পৃষ্টং বস্তু বিশেষণান্তরঞ্চ বিবক্ষন্, —সর্ব্বে বেদাঃ যৎ পদং পদনীয়ং গমনীয়ম্ অবিভাগেন অবিরোধেন আমনন্তি প্রতিপাদয়ন্তি, তপাংসি সর্ব্বাণি চ যৎ বদন্তি, যৎপ্রাপ্ত্যর্থানীত্যর্থঃ। যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য্যং গুরুকুল- বাসলক্ষণম্ অন্যদ্বা ব্রহ্মপ্রাপ্ত্যর্থং চরন্তি; তৎ তে তুভ্যং পদং যজ্জ্ঞাতুমিচ্ছসি; সংগ্রহেণ সক্ষেপতো ব্রবীমি,—ওম্ ইত্যেতৎ; তদেতৎ পদং যৎ বুভুৎসিতং ত্বয়া, তদেতদোমিতি ওম্-শব্দবাচ্যম্, ওমশব্দপ্রতীকঞ্চ ॥৪৪৷১৫৷
এইপ্রকার প্রশ্নকারী নচিকেতাকে জিজ্ঞাসিত বস্তু ও তদ্বিষয়ক অপরাপর বিশেষণ বলিবার অভিপ্রায়ে যম বলিতে লাগিলেন,-সমস্ত বেদ(বেদাংশ উপনিষৎ শাস্ত্রসমূহ) যাহাকে অভিন্নরূপে পদ অর্থাৎ পদনীয়(প্রাপ্তব্য) বলিয়া থাকেন; সমস্ত তপস্যাও(কর্মরাশিও) যাহাকে বলিয়া থাকেন, অর্থাৎ যাহার প্রাপ্তির উদ্দেশে তপস্যা (অভিহিত হইয়াছে);[সাধুগণ] যাহার প্রাপ্তির ইচ্ছায় গুরুগৃহে বাসরূপ অথবা অন্যপ্রকার ব্রহ্মচর্য্য আচরণ করিয়া থাকেন; তুমি যাহা জানিতে ইচ্ছা করিতেছ; আমি সংক্ষেপে তোমাকে সেই পদ বলিতেছি-‘ওম্’, ইহাই তোমার বুভুৎসিত(যাহা বুঝিতে ইচ্ছা করিয়াছ) সেই পদ; অর্থাৎ এই যে, ‘ওম্’ শব্দের অর্থ
১০
ওঁ ব্রহ্ম-প্রতীক ‘ওম্’ শব্দ; এই উভয়কেই সেই ‘পদ’ বলিয়া জানিবে * ॥৪৪॥১৫৷৷
একাদ্যবাক্ষরং ব্রহ্ম এতদ্ব্যবাক্ষরং পরম্।
এতদ্ব্যবাক্ষরং জ্ঞাথো যো যদিচ্ছতি তস্য তৎ ॥৪৫॥১৬।
[ ওঙ্কারস্য উপাসনাং বিধায় তৎফলং প্রদর্শয়ন্ স্তুতিমাহ—এতদ্ব্যেবেতি]। এতৎ(ওঙ্কাররূপম্) অক্ষরম্ এব হি ব্রহ্ম(অপরং ব্রহ্ম)। এতদেব হি অক্ষরং পরম্[ব্রহ্ম—পরমাত্মাখ্যম্]।[হি-শব্দৌ উভয়ত্র প্রসিদ্ধিদ্যোতকৌ]। এতৎ এব হি অক্ষরং জ্ঞাত্বা যঃ(অধিকারী) যৎ ইচ্ছতি(কাময়তে), তস্য তৎ[সিধ্যতীতি শেষঃ]॥
এই অক্ষরই(ওঙ্কারই) প্রসিদ্ধ[অপর] ব্রহ্মস্বরূপ এবং এই অক্ষরই প্রসিদ্ধ পরব্রহ্মস্বরূপ। এই অক্ষরকে জানিয়া যে যাহা ইচ্ছা করে, তাহার তাহাই সিদ্ধ হয় ॥ ৪৫ ॥ ৯৬ ॥
অত এতদ্ব্যেবাক্ষরং ব্রহ্ম অপরম্, এতদ্ব্যেবাক্ষরং পরঞ্চ। তয়োর্হি প্রতীক- মেতদক্ষরম্। এতদ্ব্যেবাক্ষরং জ্ঞাত্বা উপাস্য ব্রহ্মেতি, যো যদিচ্ছতি পরমপরং বা, তস্য তদ্ভবতি,-পরং চেৎ-জ্ঞাতব্যম্, অপরং চেৎ-প্রাপ্তব্যম্৷ ৪৫ ॥ ১৬ ॥
অতএব প্রসিদ্ধ এই অক্ষরই(ওঙ্কারই) অপরব্রহ্মস্বরূপ(কার্য্য- ব্রহ্মস্বরূপ) এবং এই অক্ষরই পরব্রহ্মস্বরূপও; কারণ এই অক্ষরই উক্ত উভয়প্রকার ব্রহ্মের প্রতীক বা আলম্বন। এই
অক্ষরকেই ব্রহ্মরূপে জানিয়া—উপাসনা করিয়া যে যাহা ইচ্ছা করে —পর বা অপর ব্রহ্ম পাইতে ইচ্ছা করে, তাহার তাহাই সিদ্ধ হয়, অর্থাৎ পর ব্রহ্মকে যদি আলম্বন করেন,[তবে] তিনি জ্ঞাতব্যরূপে সিদ্ধ হন, আর অপর ব্রহ্মকে যদি আলম্বন করেন[তাহা হইলে] তিনি প্রাপ্তব্যরূপে(গন্তব্যরূপে) সিদ্ধ হন * ॥৪৫৷১৬৷৷
এতদালম্বনং শ্রেষ্ঠমেতদালম্বনং পরম্। এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে॥৪৬॥১৭॥
এতৎ(ওঙ্কাররূপম্) আলম্বনং শ্রেষ্ঠম্(অপরব্রহ্মপ্রাপ্তিসাধনানাং মধ্যে প্রশস্যতমম্)। এতৎ আলম্বনং পরম্[পরব্রহ্মবিষয়ত্বাদিতি ভাবঃ]। এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে[ব্রহ্মভূতো ব্রহ্মবৎ পূজ্যো ভবতীতি ভাবঃ]॥
এই ওঙ্কারই[ অপর ব্রহ্মপ্রাপ্তিসাধন আলম্বনের মধ্যে] শ্রেষ্ঠ আলম্বন; [ এবং] এই আলম্বনই[ পরব্রহ্মের প্রাপ্তিসাধন বলিয়া] পর। এই আলম্বন অবগত হইয়া ব্রহ্মলোকে[ ব্রহ্মের ন্যায়] পূজ্য হয় ॥ ৪৬ ॥ ১৭ ॥
যত এবম্, অতএব এতৎ আলম্বনম্ এতদ্ ব্রহ্মপ্রাপ্ত্যালম্বনানাং শ্রেষ্ঠং প্রশস্য- তমম্। এতদালম্বনং পরম্ অপরঞ্চ, পরাপরব্রহ্মবিষয়ত্বাৎ। অতঃ এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে। পরস্মিন্ ব্রহ্মণি অপরস্মিংশ্চ ব্রহ্মভূতো ব্রহ্মবদুপাস্যো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ৪৬ ॥ ১৭ ॥
যেহেতু এই অক্ষরই পর ও অপর ব্রহ্মের প্রাপ্তিসাধন, অতএব এই আলম্বনই ব্রহ্ম-প্রাপ্তি-সাধন আলম্বনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—
অতিশয় প্রশংসনীয় আলম্বন, এবং এই আলম্বনই পর ও অপর ব্রহ্ম- বিষয়ত্ব নিবন্ধন পর ও অপর। অতএব, সাধক এই আলম্বন জানিয়া ব্রহ্মলোকে পূজিত হন। পরব্রহ্মেই হউক বা অপর ব্রহ্মেই হউক, নিজে ব্রহ্মস্বরূপ হইয়া ব্রহ্মেরই ন্যায় উপাস্য হন ॥৪৬৷৷১৭৷৷
ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিৎ, নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ। অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥৪৭৷১৮৷৷ ব্যাখ্যা।
[ইদানীম্ আত্মনঃ স্বরূপং নিৰ্দ্দিশন্ আহ,-ন জায়তে ইতি]। বিপশ্চিং (আত্মজ্ঞঃ) ন জায়তে(ন উৎপদ্যতে), ম্রিয়তে বা(ন চ নশ্যতি), [দেহযোগবিয়োগনিবন্ধন-জনিমৃতিযুক্তো ন ভবতীত্যর্থঃ]।[কুতইত্যতো হেতুদ্বয়মাহ-] অয়ম্(আত্মা) কুতশ্চিৎ(কারণাৎ) ন বভূব,[অস্মাচ্চ আত্মনঃ] কশ্চিৎ(অন্যঃ) ন বভূব।[জন্ম-মৃত্যুহীনত্বাৎ] পুরাণঃ(পুরং দেহম্ অণতি গচ্ছতীতি পুরাণঃ, সদাতনো বা)।[অতঃ] অজো নিত্যঃ(স্বরূপেণ জন্ম-মরণহীনঃ), শাশ্বতঃ(অবিকারশ্চ) অয়ম্(আত্মা) শরীরে(আত্মন উপাধিভূতে দেহে) হন্যমানে(সতি, স্বয়ম্) ন হন্যতে(ন হিংস্যতে)॥
বিপশ্চিৎ(আত্ম-তত্ত্বাভিজ্ঞ) ব্যক্তি[জানেন যে,] এই আত্মা জন্মে না, অথবা মরে না;[আত্মাও] কোন কিছু হইতে হয় নাই এবং ইহা হইতেও কেহ জন্মে নাই। এই হেতু এই আত্মা অজ(জন্মরহিত), নিত্য, শাশ্বত(নির্বিকার) ও পুরাণ অর্থাৎ দেহপ্রবিষ্ট বা চিরবর্তমান। দেহ নিহত হইলেও সে নিহত হয় না ॥ ৪৭ ॥ ১৮ ॥
অন্যত্র ধর্ম্মাদিত্যাদিনা পৃষ্টস্য আত্মনোহশেষবিশেষরহিতস্য আলম্বনত্বেন প্রতীকত্বেন চোঙ্কারো নির্দিষ্টঃ; অপরস্য চ ব্রহ্মণো মন্দমধ্যম প্রতিপত্তুন্ প্রতি অথেদানীং তস্যোঙ্কারালম্বনস্যাত্মনঃ সাক্ষাৎস্বরূপনিদ্দিধারয়িষয়া ইদমুচ্যতে,—
, ন জায়তে নোৎপদ্যতে, ম্রিয়তে বা ন ম্রিয়তে চ, উৎপত্তিমতো বস্তুনোহনিত্য স্যানেকা বিক্রিয়াঃ, তাসামাদ্যন্তে’ জন্মবিনাশলক্ষণে বিক্রিয়ে ইহাত্মনি প্রতিষি- ধ্যেতে প্রথমং সর্ব্ববিক্রিয়াপ্রতিষেধার্থং “ন জায়তে ম্রিয়তে বা” ইতি। বিপশ্চিৎ মেধাবী সর্ব্বজ্ঞঃ, অপরিলুপ্তচৈতন্যস্বভাবত্বাৎ।
কিঞ্চ, নায়মাত্মা কুতশ্চিৎ কারণান্তরাৎ বভূব ন প্রভূতঃ। স্বস্মাচ্চ আত্মনো ন বভূব কশ্চিদর্থান্তরভূতঃ। অতোহয়মাত্মা অজো নিত্যঃ, শাশ্বতোহপক্ষয়বিবর্জিতঃ। যো হ্যশাশ্বতঃ, সোহপক্ষীয়তে; অয়ন্তু শাশ্বতঃ; অতএব পুরাণঃ পুরাপি নব এবেতি; যো হ্যবয়বোপচয়দ্বারেণ অভিনির্বর্ত্যতে, স ইদানীং নবঃ, যথা—কুম্ভাদিঃ, তদ্বিপরীতস্তু আত্মা পুরাণো বৃদ্ধিবিবর্জ্জিত ইত্যর্থঃ। যত এবম্, অতো ন হন্যতে ন হিংস্যতে হন্যমানে শস্ত্রাদিভিঃ শরীরে, তৎস্থোহপ্যাকাশবদেব ॥৪৭৷৷১৮৷৷
[ইতঃপূর্ব্বে] “অন্যত্র ধর্মাৎ” ইত্যাদি বাক্যে যে নির্বিশেষ আত্মা জিজ্ঞাসিত হইয়াছিল, তাহার আলম্বন(বিষয়) ও প্রতীক- রূপে ওঙ্কার নির্দিষ্ট হইয়াছে; এবং মধ্যম ও অধম বোদ্ধাদের জন্যও, অপর ব্রহ্মের[আলম্বন ও প্রতীকরূপে ওঙ্কার নির্দিষ্ট হইয়াছে]। অতঃপর এখন সেই ওঙ্কারের আলম্বনীভূত আত্মার সাক্ষাৎসম্বন্ধে স্বরূপ নির্দ্ধারণেচ্ছায় ইহা কথিত হইতেছে,—
বিপশ্চিৎ অর্থ ধারণাশক্তিসম্পন্ন—সর্বজ্ঞ, যেহেতু তাহার স্বভাব- সিদ্ধ চৈতন্য বা জ্ঞানস্বভাব বিলুপ্ত(বিস্মৃত) হয় না;[অতএব সে] জন্মে না—উৎপন্ন হয় না; অথবা মরে না। উৎপত্তিশালী বস্তু- মাত্রেরই অনেকপ্রকার(ছয় প্রকার) বিকার[আছে]; তন্মধ্যে, জন্ম ও মরণরূপ দুইটিমাত্র বিকারের প্রতিষেধেই অন্য সমস্ত বিকারেরও প্রতিষেধ হইতে পারে, এই কারণে এখানে “ন জায়তে ম্রিয়তে বা” কথায় প্রথমতঃ জন্ম ও মরণরূপ আদি ও অন্ত বিকার- দ্বয়ের প্রতিষেধ করা হইল।
আরও এক কথা, এই আত্মা অপর কোনও কারণ হইতে সম্ভূত হয় নাই, এই আত্মা হইতেও অপর কোন পদার্থ জন্মে নাই।
অতএব, এই আত্মা অজ(জন্মরহিত), নিত্য ও শাশ্বত—ক্ষয়রহিত.; কেননা, যাহা শাশ্বত নহে, তাহা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; কিন্তু এই আত্মা শাশ্বত, অতএব পুরাণ, অর্থাৎ পূর্ব্বেও নূতনই ছিল; কারণ, অবয়ব-বৃদ্ধির দ্বারা যে বস্তু নিষ্পন্ন হয়(অভিব্যক্ত হয়), তাহাই ‘এখন নূতন’(বলিয়া ব্যবহৃত হয়), যেমন—কলস প্রভৃতি। কিন্তু আত্মা ঠিক তাহার বিপরীত—পুরাণ অর্থাৎ বৃদ্ধিরহিত। যেহেতু আত্মা এইরূপ, অতএব, শস্ত্রাদি দ্বারা শরীর নিহত হইলেও শরীরস্থ আকাশের ন্যায় আত্মা নিহত বা হিংসার বিষয় হয় না * ॥৪৭৷১৮৷৷
হন্তা চেন্মন্যতে হন্তহুতশ্চেন্মন্যতে হতম্। উভৌ তৌ-ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ॥ ৪৮৷১৯৷৷ ব্যাখ্যা।
[নম্বেবং হন্তা হতশ্চাহমিতি প্রতীতিঃ কথং সম্পদ্যতে? ভ্রান্ত্যা; ইত্যাহ,— হন্তেতি]।[দেহাত্মবুদ্ধিসম্পন্নঃ] হন্তা(হননকারী জনঃ) চেৎ(যদি) হন্তুম্(হনিষ্যামি ‘এনম্ ইতি) মন্যত্বে(চিন্তয়তি),[তথা] হতঃ[অপি] চেৎ(যদি)[আত্মানম্] হতম্(অন্যেন বিনাশিতম্) মন্যতে;[তর্হি] তৌ উভৌ[অপি] ন বিজানীতঃ (সামান্যতো জানন্তৌ অপি বিশেষেণ ন জানীতঃ)।[যতঃ] অয়ম্(আত্মা) ন হন্তি[কঞ্চিৎ, স্বয়ং চ পরৈঃ] ন হন্যতে।[অয়মাত্মা হননক্রিয়ায়াঃ কর্তা কর্ম্ম চ ন ভবতীত্যাশয়ঃ] ॥
হত্যাকারী ব্যক্তি যদি মনে করে যে, আমি(অমুককে) হনন করিব;
এবং হত ব্যক্তিও যদি মনে করে যে, আমি হত হইয়াছি, তাহারা উভয়েই বিশেষরূপে[আত্মতত্ত্ব] জানে না। কারণ, এই আত্মা[অপরকে] হনন করে না, এবং নিজেও অপর কর্তৃক হত হয় না ॥ ৪৮। ১৯॥
এবস্তুতমপ্যাত্মানং শরীরমাত্রাত্মদৃষ্টিঃ হন্তা চেদ্ যদি মন্যতে চিন্তয়তি ইচ্ছতি হন্তুম্—হনিষ্যাম্যেনমিতি; যোহপ্যন্যো হতঃ, সোহপি চেৎ মন্যতে হতমাত্মানং— হতোহহমিতি; উভাবপি তৌ ন বিজানীতঃ স্বমাত্মানম্। যতো নায়ং হস্তি অবি- ক্রিয়ত্বাদাত্মনঃ। তথা ন হন্যতে আকাশবদবিক্রিয়ত্বাদেব। অতোহনাত্মজ্ঞবিষয় এব ধর্মাধর্মাদিলক্ষণঃ সংসাবো ন ব্রহ্মজ্ঞস্য, শ্রুতিপ্রামাণ্যাৎ, ন্যায়াচ্চ ধর্ম্মাহধৰ্ম্মাদ্যনু- পপত্তেঃ ॥৪৮৷৷১৯৷৷
যে লোক কেবল দেহকেই আত্মা বলিয়া জানে, তাদৃশ হন্তা ব্যক্তি যদি হনন করিতে, অর্থাৎ ‘আমি ইহাকে বধ করিব’ এইরূপ মনে করে বা চিন্তা করে; আর অপর যে লোক হত হয়, সেও যদি ‘আমি’ হত’ বলিয়া আত্মাকে হত মনে করে, তাহারা উভয়েই স্বীয় আত্মাকে বিশেষরূপে জানে না; যেহেতু অবিক্রিয়ত্বনিবন্ধন এই আত্মা(কাহা- কেও) বধ করে না, সেইরূপ আকাশের ন্যায় নির্বিকারত্ব হেতু(অপর- কর্তৃক) হতও হয় না। অতএব, আত্মজ্ঞান-রহিত ব্যক্তির পক্ষেই ধৰ্ম্মাধর্মাদিময় সংসার, কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞের পক্ষে নহে। কারণ, শ্রুতি- প্রামাণ্য এবং ন্যায় বা যুক্তি অনুসারে জানা যায় যে, আত্মাতে ধৰ্ম্মা- ধর্মাদিময় সংসার সম্ভবপর হয় না * ॥৪৮৷১৯৷৷
অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ আত্মাস্য জন্তোর্নিহিতো গুহায়াম্।
[বিপশ্চিত আত্মদর্শনপ্রকারমাহ—অণোরণীয়ানিতি]। অণোঃ(সূক্ষ্মাৎ পরমাণুপ্রভৃতেঃ) অণীয়ান্(অতিশয়েন সূক্ষ্মঃ),[তথা] মহতঃ(আকাশাদেরপি) মহীয়ান্(অতিশয়েন মহান্) আত্মা(পূর্ব্বোক্তলক্ষণঃ), অন্য জন্তোঃ(প্রাণিনঃ) গুহায়াম্(হৃদয়ে) নিহিতঃ(নিয়তং স্থিতঃ)[অস্তি]।[নাস্তি ক্রতুঃ সংকল্পঃ—কামনা যস্য, সঃ] অক্রতুঃ(বীতরাগঃ)[অতএব] বীতশোকঃ (বিগতদুঃখশ্চ সন্) ধাতুপ্রসাদাৎ(ধাতুনাং ‘মনআদিকরণানাং নৈর্ম্মল্যাৎ) আত্মনঃ তম্’(পূর্ব্বোক্তম্) মহিমানং(অবিক্রিয়ত্বাদিকম্) পশ্যতি(সাক্ষাৎ করোতি)॥
বিপশ্চিৎ ব্যক্তি যে প্রকারে আত্মদর্শন করেন, তাহা বলা হইতেছে,—পরমাণু * প্রভৃতি অণু(সূক্ষ্ম) বস্তু অপেক্ষাও অণীয়ান্(অতিশয় সূক্ষ্ম) এবং আকাশাদি মহৎ পদার্থ অপেক্ষাও অতিশয় মহান্ আত্মা এই প্রাণিগণের হৃদয়-গুহায় নিহিত আছেন। নিষ্কাম ব্যক্তি শোকরহিত হইয়া মন প্রভৃতি ধাতুর(ইন্দ্রিয়ের) প্রসন্নতা লাভ করেন, তাহার ফলে আত্মার সেই মহিমা(নির্ব্বিকারত্বাদি ভাব) সাক্ষাৎ- কার করিয়া থাকেন ॥ ৪৯ ॥ ২০ ॥
কথং পুনরাত্মানং জানাতীত্যুচ্যতে, -অণোঃ সূক্ষ্মাৎ অণীয়ান্ শ্যামাকাদেরণু- তরঃ। মহতো মহৎপরিমাণাৎ মহীয়ান্ মহত্তরঃ পৃথিব্যাদেঃ, অণু মহদ্বা যদস্তি লোকে বস্তু, তৎ তেনৈবাত্মনা নিত্যেনাত্মবৎ সম্ভবতি; তদাত্মনা বিনিৰ্ম্ম ক্তমসৎ সম্পদ্যতে। তম্মাদসাবেবাত্মা অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ সর্ব্ব-নাম-রূপবস্তু- পাধিকত্বাৎ। স চাত্মা অন্য জন্তোঃ ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তস্য প্রাণিজাতস্য গুহায়াম্ হৃদয়ে নিহিতঃ আত্মভূতঃ স্থিত ইত্যর্থঃ। তম্ আত্মানং দর্শন-শ্রবণ-মননবিজ্ঞান- লিঙ্গং অক্রতুঃ অকামঃ দৃষ্টাদৃষ্টবাহ্যবিষয়েভ্য উপরতবুদ্ধিরিত্যর্থঃ। যদা চৈবং তদা মনআদীনি করণানি ধাতবঃ শরীরস্থ্য ধারণাৎ প্রসীদন্তীতি, এষাং ধাতুনাং প্রসাদাৎ আত্মনো মহিমানং কর্মনিমিত্তবৃদ্ধি-ক্ষয়রহিতং পশ্যতি বীতশোকঃ। ধাতুপ্রসাদা-
২য় বল্লী] প্রথমোহধ্যায়ঃ।: ৭৯ মুহিমানমাত্মনঃ ‘অয়মহমস্মি’ ইতি সাক্ষাৎ বিজানাতি; ততো বিগতশোকো ভবতি ॥৪৯৷৷২০॥
[পণ্ডিতগণ] আত্মাকে কি প্রকার দর্শন করেন, তাহা বলা হইতেছে,-শ্যামাক(শস্যবিশেষ) প্রভৃতি অণু বা সূক্ষম পদার্থ হইতেও অণীয়ান্ অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত সূক্ষম এবং পৃথিব্যাদি মহৎ পদার্থ হইতেও মহত্তর, অর্থাৎ অণু বা মহৎ যে কোন বস্তু আছে, তৎসমস্তই সেই নিত্য আত্মা দ্বারা আত্মবান্ অর্থাৎ সত্তাবান্ হয়; আর সেই আত্ম- বিরহিত হইলেই অসৎ হইয়া পড়ে। অতএব, এই আত্মাই সমস্ত নাম ও রূপময় উপাধি-সম্পন্ন হওয়ায়, অণু অপেক্ষাও অণু এবং মহৎ অপেক্ষাও মহৎ বলিয়া পরিচিত হন। * সেই আত্মাই জন্তুর অর্থাৎ ব্রহ্মাদি স্তম্ভপর্য্যন্ত প্রাণিগণের হৃদয়রূপ গুহায় নিহিত বা আত্মরূপে অবস্থিত আছেন। পুরুষ যখন অক্রতু-অকাম, অর্থাৎ ঐহিক ও, পারলৌকিক বাহ্য বিষয়ে বিরক্তচিত্ত হয়, তখন তাহার ধাতু অর্থাৎ শরীর-ধারক মনঃপ্রভৃতি করণবর্গ প্রসন্ন বা নির্মূল হয়; এই সকল ধাতুর প্রসন্নতানিবন্ধন কৰ্ম্মজনিত বৃদ্ধি-ক্ষয়রহিত আত্মমহিমা দর্শন করেন। অর্থাৎ ধাতুপ্রসন্নতা-বশতঃ ‘আমি এইরূপ’ ইত্যাকারে আত্মার মহিমা সাক্ষাৎকার করেন, তাহার পর বীতশোক অর্থাৎ শোক-দুঃখ-বিনির্মুক্ত হন ॥৪৯৷২০৷
আসীনো দূরং ব্রজতি শয়ানো যাতি সর্ব্বতঃ। কস্তং মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি ॥ ৫০ ॥ ২১ ॥
১১
[পুনশ্চ আত্মনো মহিমানমেবাহ, —আসীন ইতি]।[অয়ম্ আত্মা] আসীনঃ (অচল এব সন্) দূরং ব্রজতি(গচ্ছতি)।[তথা] শয়ানঃ(উপরতক্রিয়ঃ চ সন্) সর্ব্বতঃ যাতি। মদামদম্(মদো হর্ষঃ, অমদঃ হর্ষাভাবঃ, তদ্বিশিষ্টম্, এবং বিরুদ্ধধর্মবন্তম্) দেবম্(প্রকাশমানম্) তম্(আত্মানম্) মদন্যঃ(মাং বিনা) কঃ জ্ঞাতুম্(তত্ত্বতঃ অনুভবিতুম্) অর্হতি শক্নোতি ॥
উক্ত আত্মা একত্র অবস্থিত থাকিয়াও দূরগামী, এবং শয়ান অর্থাৎ ক্রিয়া- রহিত হইয়াও সর্ব্বত্রগামী; মদামদ অর্থাৎ হর্ষ ও তদভাববান্ সেই প্রকাশমান আত্মাকে আমি ভিন্ন আর কে জানিতে সমর্থ হয়? ॥৫০৷৷২১৷৷
অন্যথা দুর্বিজ্ঞেয়োহয়মাত্মা কামিভিঃ প্রাকৃতপুরুষৈঃ, যস্মাৎ আসীনঃ অবস্থি- তোহচল এব সন্ দূরং ব্রজতি; শয়ানো যাতি সর্ব্বতঃ; এবমসৌ আত্মা দেবো মদা- মদঃ সমদোহমদশ সহর্ষোহহর্ষশ্চ বিরুদ্ধধর্মবান্, অতোহশক্যত্বাজ জ্ঞাতুং কঃ তং ‘মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি। অস্মদাদেরেব সূক্ষ্মবুদ্ধেঃ পণ্ডিতস্য সুবিজ্ঞেয়ো- হয়মাত্মা স্থিতিগতিনিত্যানিত্যাদিবিরুদ্ধানেকবিধধর্মোপাধিকত্বাদ বিরুদ্ধধৰ্ম্মবত্ত্বাদ বিশ্বরূপইব চিন্তামণিবদবভাসতে। অতো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বং দর্শয়তি, কস্তং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতীতি। করণানামুপশমঃ শয়নম্, করণজনিতস্যৈকদেশবিজ্ঞানস্যোপশমঃ শয়ানস্য ভবতি। যদা চৈবং কেবলসামান্যবিজ্ঞানত্বাৎ সর্ব্বতো যাতীব, যদা বিশেষবিজ্ঞানস্থঃ স্বেন রূপেণ স্থিত এব সন্ মনআদিগতিষু তদুপাধিকত্বাদ দূরং ব্রজতীব। সচেহৈব বর্ত্ততে ॥৫০৷৷২১ ॥
যেহেতু এই আত্মা আসীন(অবস্থিত) অর্থাৎ নিশ্চল থাকিয়াও দূরে গমন করে, এবং শয়ান থাকিয়াও সর্বত্র গমন করে; প্রকাশ- মান এই আত্মা সমদ—সহর্ষও বটে এবং অমদ—অহর্ষও(হর্ষহীনও) বটে; এইরূপ বিরুদ্ধধর্ম্মসম্পন্ন; অতএব, তাহাকে জানিবার শক্তি নাই; সুতরাং সেই মদামদ দেবকে আমি ভিন্ন আর কে জানিতে সমর্থ হয়? ফলকথা, স্থিতি, গতি, নিত্যত্ব ও অনিত্যত্ব প্রভৃতি বহুবিধ
বিরুদ্ধ ধৰ্ম্ম উপস্থিত থাকায়-বিরুদ্ধ-ধৰ্ম্মবত্তা-নিবন্ধন ‘চিন্তামণির’, ন্যায় বহুরূপে প্রকাশমান’ আত্মা আমাদের ন্যায় সূক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন পণ্ডিতের পক্ষেই একমাত্র সুবিজ্ঞেয়-অন্যের পক্ষে নহে। অতএব ‘আমি ভিন্ন আর কে জানিতে পারে?’ এই কথায় সেই দুর্বিজ্ঞেয়- তাই প্রদর্শন করা হইয়াছে। শয়ন অর্থ-ইন্দ্রিয়গণের উপশম বা বৃত্তিরোধ; শয়ান ব্যক্তির ইন্দ্রিয়জাত একদেশ বিজ্ঞানের(‘আমি মনুষ্য’ ইত্যাদি পরিচ্ছিন্ন জ্ঞানের) উপশম বা নিবৃত্তি হইয়া থাকে। আত্মা যখন বিশেষ জ্ঞান হইতে উপরত হয়, তখন কেবলই সামান্য বিজ্ঞান সম্বন্ধ থাকায় যেন সর্বতোভাবে গমনই করে; আর যখন স্ব-স্বরূপে অবস্থিত থাকিয়াই বিশেষ-বিজ্ঞানস্থ হয়, তখন মনঃ প্রভৃতি করণের গতিতে তদুপাধিক আত্মাও যেন দূরেই গমন করে। বস্তুতঃ আত্মা এখানেই থাকে, কোথাও যায় না ॥৫০॥২১৷৷
অশরীরংশরীরেষু অনবস্থেষ্ববস্থিতম্।
মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি ॥ ৫১ ॥ ২২
[পুনস্তন্মহিমোক্তিপূর্ব্বকং তজ জ্ঞানফলমাহ—অশরীরমিতি]। অনবস্থেষু (নশ্বরেষু) শরীরেষু(প্রাণিদেহেষু) অবস্থিতম্[স্বয়ং তু] অশরীরম্(তচ্ছরীর- নিমিত্তক-বিকাররহিতম্) মহান্তম্(দেশতঃ কালতঃ গুণতশ্চ অপরিচ্ছিন্নম্) বিভুম্ (সর্ব্বব্যাপিনম্) আত্মানম্(দেহিনম্) মত্বা ধীরো ন শোচতি(মুক্তো ভবতি)।
অস্থির বা অনিত্য শরীরে অবস্থিত, অথচ স্বয়ং শরীর-রহিত, মহৎ ও বিভু আত্মাকে অবগত হইয়া ধীর ব্যক্তি শোক(দুঃখ) করে না ॥৫১৷২২৷৷
তদ্বিজ্ঞানাচ্চ শোকাত্যয় ইত্যপি দর্শয়তি-অশরীরং স্বেন রূপেণ আকাশকল্প আত্মা, তম্ অশরীরম্, শরীরেষু দেব-পিতৃ-মনুষ্যাদিশরীরেযু অনবস্থেযু অনিত্যেযু অবস্থিতিরহিতেষু অবস্থিতম্-নিত্যম্ অবিকৃতমিত্যেতৎ। মহান্তম্, মহত্বস্য আপেক্ষিকত্বশঙ্কায়ামাহ-বিভুৎ ব্যাপিনম্ আত্মানম্। আত্মসমর্পণং স্বতোহনন্যত্ব-
প্রদর্শনার্থম্; আত্মশব্দঃ প্রত্যগাত্মবিষয় এব মুখ্যঃ, তমীদৃশমাত্মানং মত্বা ‘অয়মহম্’ ইতি ধীরো ধীমান্ ন শোচতি। ন হ্যেবংবিধস্য আত্মবিদঃ শোকোপপত্তিঃ ॥৫১৷২২
সেই আত্মতত্ত্ব অবগত হইলে যে শোকের অবসান হয়, ইহাও প্রদর্শিত হইতেছে,—আত্মা স্বরূপতঃ আকাশের ন্যায়, অতএব অশরীর, অথচ অনবস্থিত অর্থাৎ স্থিরতা-রহিত ও অনিত্য—দেবগণ, পিতৃগণ ও মনুষ্যাদি দেহে অবস্থিত[স্বয়ং কিন্তু] নিত্য—অবিকৃত ও মহৎ, ঘটপটাদি পদার্থ অপেক্ষা মহত্ব-শঙ্কা-নিরাসার্থ বলিলেন— বিভু অর্থাৎ সর্বব্যাপী; সেই আত্মাকে অবগত হইয়া অর্থাৎ ‘আমি এইরূপই’, ইহা জানিয়া ধীর ব্যক্তি আর শোক করেন না; কেননা, এবংবিধ আত্মজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে শোক সম্ভব হয় না। ‘আত্মা’ শব্দের প্রত্যগাত্মা(জীব) অর্থই মুখ্য, অর্থাৎ প্রথম প্রতীতির বিষয়। জীব যে স্বভাবতঃই ব্রহ্ম হইতে অন্য বা পৃথক্ নহে, তাহা জ্ঞাপনার্থ এখানে ‘আত্মা’ শব্দের প্রয়োগ করা হইয়াছে ॥৫১৷২২৷
নায়মাত্মা। প্রবচনেন লভ্যো।
ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন।
যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্য- স্তস্যৈষ আজ্ঞা। বিবৃণুতে তনূংস্বাম্ ॥৫২॥২৩০
ব্যাখ্যা।
[ আত্মনো দুর্ব্বিজ্ঞেয়ত্বেহপি সুবিজ্ঞানোপায়মাহ, -নায়মিতি]। অয়ম্ আত্মা প্রবচনেন(শাস্ত্র-ব্যাখ্যানেন অধ্যয়নাদিনা বা) লভ্যঃ(দর্শনীয়ঃ) ন[ভবতি], মেধয়া(স্বকীয় প্রজ্ঞাবলেন) ন[লভ্যঃ], বহুনা শ্রুঞ্চেন(শাস্ত্র-শ্রবণেন বা) ন [লভ্যঃ]।[কিন্তু] এষঃ(মুমুক্ষুঃ) যম্ এব(স্বস্বরূপম্ আত্মানম) বৃণুতে(প্রাপ্যতয়া প্রার্থয়তে), তেন(আত্মনা) এব[সঃ মুমুক্ষুঃ] লভ্যঃ। অথবা এষঃ(ঈশ্বরঃ ভক্ত্যারাধিতঃ সন্) যম্ এব সেবকং বৃণুতে(আত্মদর্শনায় বরয়তি যস্মৈ প্রসীদতীতি যাবৎ) তেনৈব(বৃতেনৈব) লভ্যঃ(দর্শনীয়ঃ)। কথম্? এষ আত্মা স্বাম্
(স্বকীয়াং পারমার্থিকীম্) তনুম্(মূর্তিম্) তস্য(মাধকস্য সমীপে) বিবৃণুতে (প্রদর্শয়তি)।
আত্মা স্বভাবতঃ দুর্বিজ্ঞেয় হইলেও তাঁহাকে জানিবার উপায় আছে, সেই উপায় কথিত হইতেছে,—প্রবচন অর্থাৎ কেবল শাস্ত্রাধ্যয়ন বা শাস্ত্র ব্যাখা দ্বারা এই আত্মাকে লাভ করা যায় না, অর্থাৎ আত্ম-তত্ত্ব জানা যায় না; কেবল মেধা (ধারণাশক্তি) দ্বারা কিংবা বহুল শাস্ত্র শ্রবণেও আত্মাকে লাভ করা যায় না। পরন্তু, এই সাধক স্ব স্বরূপে যে আত্মাকে বরণ করেন, অর্থাৎ পাইবার নিমিত্ত প্রার্থনা করেন, সেই আত্মা কর্তৃক এই সাধক লভ্য হন; অথবা’ এই অংশের অর্থ এইরূপ,—এই ঈশ্বর ভক্তিভরে আরাধিত হইয়া যাঁহাকে বরণ করেন, অর্থাৎ আত্মদর্শনের উপযুক্ত পাত্র বলিয়া স্বীকার করেন, তিনিই তাঁহাকে লাভ করিতে পারেন; কারণ, তিনি(ঈশ্বর) তাঁহার নিকটস্থ স্বীয় প্রকৃত স্বরূপ বিবৃত বা প্রকটিত করেন ॥৫২৷২৩৷৷
যদ্যপি দুর্ব্বিজ্ঞেয়োহয়মাত্মা, তথাপ্যুপায়েন সুবিজ্ঞেয় এব, ইত্যাহ নায়মাত্মা প্রবচনেন অনেকবেদস্বীকরণেন লভ্যো জ্ঞেয়ঃ, নাপি মেধয়া গ্রন্থার্থধারণশক্ত্যা, ন বহুনা শ্রুতেন কেবলেন। কেন তর্হি লভ্যঃ? ইত্যুচ্যতে,-যমেব স্বমাত্মানম্ এষ সাধকো বৃণুতে প্রার্থয়তে, তেনৈবাত্মনা বরিত্রা স্বয়মাত্মা লভ্যো জ্ঞায়ত ইত্যেতৎ। নিষ্কামশ্চাত্মানমেব প্রার্থয়তে; আত্মনৈবাত্মা লভ্যত ইত্যর্থঃ। কথং লভ্যতে? ইত্যুচ্যতে,-অস্য আত্মকামস্য এষ আত্মা বিবৃণুতে প্রকাশয়তি পারমা- র্থিকীং স্বাং তনুং স্বকীয়ং যাথাত্ম্যমিত্যর্থঃ ॥৫২৷৷২৩৷৷
যদিও এই আত্মা[স্বভাবতঃ] দুর্বিজ্ঞেয়ই বটে, তথাপি উপায়- বিশেষে নিশ্চয়ই সুবিজ্ঞেয়; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন,-এই আত্মা প্রবচন অর্থাৎ বহুতর বেদ অধ্যয়ন দ্বারা লভ্য(বিজ্ঞেয়) হন না; মেধা-শাস্ত্রার্থ-ধারণাশক্তি দ্বারাও(লভ্য) হন না; কেবল বহু শাস্ত্রশ্রবণেও[লভ্য হন] না। তবে কি উপায়ে লভ্য? তদুত্তরে বলা হইতেছে,-এই সাধক স্বকীয় যে আত্মাকে বরণ করেন, অর্থাৎ
‘প্রার্থনা করেন, বরণকারী সেই আত্মাকর্তৃক আত্মাই অর্থাৎ নিজেই নিজের লভ্য—জ্ঞেয় হন। নিষ্কাম পুরুষ আত্মাকেই প্রার্থনা করেন; এবং আত্মাই(নিজেই) আত্মার(নিজের) লভ্য হয়। কি প্রকারে তাঁহাকে লাভ করা যায়? তাই বলিতেছেন,—স্বীয় আত্মাই যাহার [একমাত্র] কামনার বিষয় হয়, সেই আত্মকামের নিকট আত্মা আপনার পারমার্থিক তনু, অর্থাৎ যথার্থ স্বরূপ বিবৃত বা প্রকটিত করিয়া থাকেন ॥ ৫২৷৷২৩৷৷
নাবিরতো দুশ্চরিতান্নাশান্তো নাসমাহিতঃ। নাশান্তমানসো বাপি প্রজ্ঞানেনৈনমাপ্নুয়াৎ ॥৫৩॥২৪॥
[আত্মলাভস্য পরিপন্থিদোষং প্রদর্শয়ন্ তদুপায়ান্ আহ,—নাবিরত ইতি]। দুশ্চরিতাৎ(নিন্দিতাৎ শাস্ত্রনিষিদ্ধাৎ আচারাৎ) অবিরতঃ(অনিবৃত্তঃ দুরাচারীতি যাবৎ) ন, অশান্তঃ(শ্রবণ-মনন-ধ্যানৈ: অসম্পাদিতেন্দ্রিয়নিগ্রহঃ) ন, অসমাহিতঃ (একাগ্রতারহিতঃ, বিক্ষিপ্তচিত্তঃ) ন, অশান্তমানসঃ(বিষয়ভোগে অলংবুদ্ধিরহিতঃ বিষয়লম্পট ইতি যাবৎ) চ প্রজ্ঞানেন(ব্রহ্মবিজ্ঞানেন) এনম্(আত্মানম্) ন আপ্নুয়াৎ(ন প্রাপ্নোতি)।[অথবা প্রাগুক্তদোষ দূষিতঃ কোহপি এনং ন আপ্নুয়াৎ; পরন্তু কেবলং প্রজ্ঞানেন তত্ত্বজ্ঞানাধিগমেন এনম্ আত্মানম্ আপ্নয়াদিত্যর্থঃ]।
যে লোক দুশ্চরিত হইতে(শাস্ত্রনিষিদ্ধ ব্যবহার হইতে) বিরত নহে, সংযতে- ন্দ্রিয় নহে, সমাহিতচিত্ত নহে এবং ভোগস্পৃহারহিতও নহে, সে লোক ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা এই আত্মাকে জানিতে পারে না। অথবা, পূর্ব্বোক্ত কেহই আত্মাকে প্রাপ্ত হয় না, কেবল প্রজ্ঞান অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারাই আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৫৩ ॥ ২৪ ॥
কিঞ্চান্যৎ, ন দুশ্চরিতাৎ প্রতিষিদ্ধাৎ শ্রুতিস্মৃত্যবিহিতাৎ পাপকর্মণঃ অবিরতঃ অনুপরতঃ। নাপি ইন্দ্রিয়লৌল্যাৎ অশান্তঃ, অনুপরতঃ। নাপি অসমাহিতঃ’ অনেকা- গমনা বিক্ষিপ্তচিত্তঃ। সমাহিতচিত্তোহপি সন্ সমাধানফলার্থিত্বাৎ নাপি অশান্ত-
মানসো ব্যাপৃতচিত্তো বা আত্মানং প্রাপ্নুয়াৎ। কেন প্রাপ্নুয়াৎ? ইত্যুচ্যতে,- প্রজ্ঞানেন ব্রহ্মবিজ্ঞানেন এনং প্রকৃতমাত্মানম্ আপ্নুয়াৎ। যস্তু দুশ্চরিতাদবিরত ইন্দ্রিয়লৌল্যাচ্চ, সমাহিতচিত্তঃ সমাধানফলাদপি উপশান্তমানসশ্চ আচার্য্যবান্ প্রজ্ঞানেন এনং যথোক্তমাত্মানং প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ ॥ ৫৩ ॥ ২৪ ॥
আরও এক কথা,[যে লোক] দুশ্চরিত হইতে অর্থাৎ যাহা শ্রুতি- স্মৃতি-শাস্ত্রবিহিত নহে, এমন প্রতিষিদ্ধ পাপকৰ্ম্ম হইতে বিরত নহে, ইন্দ্রিয়-লৌল্য—অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের ঔৎসুক্য বশতঃ অশান্ত বা উপরত নহে, আর অসমাহিত অর্থাৎ একাগ্রতারহিত—বিক্ষিপ্ত বা চঞ্চলচিত্ত, এবং সমাহিতচিত্ত হইয়াও ফল কামনায় অশান্ত-মানস অর্থাৎ বিষয়াসক্তচিত্ত, সে লোক পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয় না। তবে কি উপায়ে প্রাপ্ত হয়? এই নিমিত্ত বলা হইতেছে,—প্রজ্ঞান অর্থাৎ ব্রহ্ম-বিজ্ঞান দ্বারা এই প্রস্তাবিত আত্মাকে প্রাপ্ত হয়। পরন্তু, যে লোক দুষ্ট ব্যবহার ও ইন্দ্রিয়-লালসা হইতে বিরত, সমাহিতচিত্ত ও সমাধি-ফল-লাভে বীতস্পৃহ, এবং উপযুক্ত আচার্য্যবান, সেই লোকই প্রজ্ঞানের দ্বারা উক্তপ্রকার আত্মাকে প্রাপ্ত হয় ॥৫৩৷২৪৷৷
যস্য ব্রহ্ম চ ক্ষত্রঞ্চ উভে ভবত ওদনঃ।
মৃত্যুর্যস্যোপসেচনং ক ইথা বেদ, যত্র সঃ ॥৫৪৷২৫ ইতি কাঠকোপনিষদি প্রথমাধ্যায়ে দ্বিতীয়া বল্লী ॥১॥২॥
[ যথোক্তসাধনশূন্যস্য দুর্ব্বিজ্ঞেয়ত্বং বক্তুমাহ-যস্যেতি]। যস্য(আত্মনঃ) ব্রহ্ম(ব্রাহ্মণত্বজাতিঃ) চ ক্ষত্রম্(ক্ষত্রিয়ত্বজাতিঃ) চ(ইতরেতরবস্তুসমুচ্চয়ে চ- দ্বয়ম্) উভে ওদনঃ(অন্নম্) ভবতঃ। মৃত্যুঃ(সর্ব্বপ্রাণিনাং মারকঃ) যস্য উপ- সেচনম্(উপকরণং শাকস্থানীয়ং ব্যঞ্জনরূপমিত্যর্থঃ), সঃ(এবং জগৎসহংর্তৃত্ব- গুণকঃ) যত্র[তিষ্ঠতি][তৎ] ইথা(ইথম্ এবংপ্রকারেণ) কো বেদ?(ন কোৎপীতি ভাবঃ) ॥
ইতি প্রথমোঽধ্যায় দ্বিতীয়-বর্গী-ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥ ১ ॥ ২ ॥
উক্ত সাধন-রহিত ব্যক্তির পক্ষে আত্মার দুর্বিজ্ঞেয়ত্ব জ্ঞাপনার্থ বলিতেছেন যে, —ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতি(অর্থাৎ জগতের সমস্ত বস্তুই) যাঁহার ওদন(অন্ন), অর্থাৎ অন্নের ন্যায় সংহার্য্য বস্তু, এবং সর্ব্বপ্রাণি-সংহারক মৃত্যুও যাঁহার উপসেচন(ব্যঞ্জন- স্থানীয়), তিনি যেখানে থাকেন, তাহা বিশেষরূপে কে জানে? ॥ ৫৪ ॥ ২৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।
যস্তনেবংভূতঃ, যস্য আত্মনঃ ব্রহ্ম চ ক্ষত্রঞ্চ—ব্রহ্মক্ষত্রে সর্ব্বধর্ম্মবিধারকে অপি সর্ব্ব- প্রাণভূতে উভে ওদনঃ অশনং ভবতঃ—স্যাতাম্। সর্ব্বহরোহপি মৃত্যুঃ যস্য উপসেচন- মেব ওদনস্য অশনত্বেহপ্যপর্য্যাপ্তঃ, তং প্রকৃতবুদ্ধির্যথোক্তসাধনরহিতঃ সন্ কঃ ইথা ইত্থমেবং যথোক্তসাধনবানিবেত্যর্থঃ। বেদবিজানাতি, যত্র সঃ আত্মেতি ॥৫৪॥২৫॥ ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যগোবিন্দভগবদ্পূজ্যপাদশিষ্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবৎ প্রণীতে কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমাধ্যায়ে
দ্বিতীয়বল্লীভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ২ ॥
ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়, অর্থাৎ সর্বধর্ম্মের পরিরক্ষক এবং সকলের প্রাণস্বরূপ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়, এই উভয় যাঁহার ওদন অর্থাৎ খাদ্য হয়, আর সর্বসংহারক মৃত্যুও যাঁহার উপসেচন(শাক বা ব্যঞ্জনস্থানীয়), অর্থাৎ ওদন ভক্ষণেও পর্যাপ্ত বা যথেষ্ট নহে; * পূর্ব্বোক্ত সদাচার প্রভৃতি সাধনশূন্য ও প্রাকৃত-বুদ্ধিসম্পন্ন কোন্ লোক উক্ত সাধন- সম্পন্নের ন্যায় তাহা জানিতে পারে?—যেখানে সেই আত্মা অবস্থিত আছেন ॥৫৪৷৷২৫৷৷
ইতি কঠোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদের প্রথমাধ্যায়ে দ্বিতীয় বল্লী সমাপ্ত।
খাতং পিবন্তৌ সুকৃতস্য লোকে
গুহাং প্রবিষ্টৌ পরমে পরার্দ্ধে। ছায়াতপৌ ব্রহ্মবিদো বদন্তি
পঞ্চায়য়ো যে চ ত্রিণাচিকেতাঃ ॥৫৫॥১
[ইদানীং প্রাপ্য-প্রাপকবিবেকার্থং পরমাত্ম-জীবাত্মনোঃ স্বরূপভেদমাহ,- ঋতমিতি]। লোকে(অস্মিন্ শরীরে) সুকৃতস্য[কর্মণঃ] ঋতম্(অবশ্যম্ভাবিত্বাৎ সত্যং ফলম্-সুখ-দুঃখাদিকম্) পিবন্তৌ ভুঞ্জানো),[সুকৃতস্য লোকে পুণ্যলব্ধ- স্বর্গাদিস্থানে বা]। গুহাম্(গুহায়াং বুদ্ধৌ) পরমে(বাহ্যাকাশাপেক্ষয়া উৎকৃষ্টে) পরার্দ্ধে(পরস্য ব্রহ্মণ; অর্দ্ধস্থানকল্পে হৃদয়াকাশে)[পরমত্যন্তং পরেভ্যঃ বা আ-সমন্তাৎ ঋদ্ধে অভিবৃদ্ধে মুখ্যপ্রাণে ইতি বা] প্রবিষ্টৌ,[পরমে পরার্দ্ধে গুহাম্(হৃদয়গহ্বরম্) প্রবিষ্টৌ ইতি বা]। ব্রহ্মবিদঃ[জীব-পরমাত্মানৌ] ছায়া- তপৌ(তমঃপ্রকাশৌ[ইব] বদন্তি(কথয়ন্তি)।[অপিচ] যে চ পঞ্চাগ্নয়ঃ (গার্হপত্যাহবনীয়দক্ষিণাগ্নিসত্যাবসথ্যাঃ পঞ্চ অগ্নয়ো যেষাং তে’; দ্যুপর্জন্যপৃথিবী পুরুষস্ত্রীরূপ-পঞ্চাগ্নিবিদ্যানিষ্ঠা বা গৃহস্থাঃ) ত্রিণাচিকেতাঃ(ত্রিঃকৃত্বঃ নাচিকেতো- হগ্নিশ্চিতো যৈঃ, তে ত্রিবারকৃতনাচিকেতাগ্নয়ঃ যে, তে চ বদন্তি)।[‘ব্রহ্মবিদঃ’ ইত্যনেন জ্ঞানিনাম্, ‘পঞ্চাগ্নয়ঃ’ ইত্যনেন উপাসকানাম্ ‘ত্রিণাচিকেতাঃ’ ইত্যনেন কর্মিণাং বা পৃথগেব উদ্দেশঃ কৃত ইতি বোদ্ধব্যম্ ইতি। অত্র জীবঃ সাক্ষাৎ পিবতি, পরমাত্মা তু স্বয়ম্ অপিবন্ অপি জীবং পায়য়তি, অতঃ চ পানপ্রয়োজক- স্যাপি তস্য কর্তৃত্বম্ উপযুজ্যতে ইত্যাশয়ঃ]॥
সম্প্রতি প্রাপ্য ও প্রাপকের পার্থক্য-জ্ঞাপনার্থ জীব ও পরমাত্মার স্বরূপগত ভেদ বলিতেছেন,—যাঁহারা ব্রহ্মবিৎ এবং যাঁহারা পঞ্চাগ্নিসম্পন্ন, অথবা পঞ্চাগ্নিবিদ্যানিষ্ঠ ও তিনবার নাচিকেত অগ্নির চয়ন বা আরাধনা করিয়াছেন, তাঁহারা বলিয়া থাকেন যে, সংসারে স্বানুষ্ঠিত কর্মফলের ভোক্তা এবং বুদ্ধিরূপ গুহায় উত্তম, ব্রহ্মবাসের যোগ্য হৃদয়াকাশে অবস্থিত বা অভিব্যক্ত[জীব. ও পরমাত্মা] ছায়া ও আতপের ন্যায় অর্থাৎ অন্ধকার ও আলোকের ন্যায়, পরস্পর বিভিন্নস্বভাবসম্পন্ন ॥ ৫৫ ॥ ১ ॥
১২
ঋতং পিবন্তৌ ইত্যস্যা বল্ল্যাঃ সম্বন্ধঃ-বিদ্যাবিদ্যে নানাবিরুদ্ধফলে ইত্যুপ- ন্যস্তে, ন তু সফরে তে যথাবৎ নির্ণীতে। তন্নির্ণয়ার্থা রথরূপক-কল্পনা; তথা চ প্রতিপত্তি-সৌকর্য্যম্। এবঞ্চ প্রাপ্ত প্রাপ্য-গন্তু-গন্তব্যবিবেকার্থং রথরূপকদ্বারা দ্বৌ আত্মানৌ উপন্যস্যেতে-‘ঋতমিতি। ঋতং সত্যম্ অবশ্যম্ভাবিত্বাৎ কৰ্ম্মফলং পিবন্তৌ; একস্তত্র কর্ম্মফলং পিবতি ভুঙক্তে নেতরঃ, তথাপি পাতৃসম্বন্ধাৎ পিবন্তৌ ইত্যুচ্যেতে ছত্রিন্যায়েন। সুকৃতস্য স্বয়ং কৃতস্য কর্মণ: ঋতমিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। লোকে অস্মিন্ শরীরে, গুহাং গুহায়াং বুদ্ধৌ প্রবিষ্টৌ। পরমে-বাহ্যপুরুষা- কাশসংস্থানাপেক্ষয়া পরমম্। পরার্দ্ধে, ‘পরস্য, ব্রহ্মণোহর্দ্ধং স্থানং পরার্দ্ধং হার্দাকাশম্, তস্মিন্ হি পরং ব্রহ্মোপলভ্যতে। ততঃ তস্মিন্ পরমে পরার্দ্ধে হার্দাকাশে প্রবিষ্টৌ ইত্যর্থঃ। তৌ চ ছায়াতপাবিব’ বিলক্ষণৌ সংসারিত্বা- সংসারিত্বেন, ব্রহ্মবিদো বদন্তি কথয়ন্তি। ন কেবলমকর্মিণ এব বদন্তি; পঞ্চাগ্নয়ো গৃহস্থাঃ; যে চ ত্রিণাচিকেতাঃ ত্রিঃকৃত্বো নাচিকেতোহগ্নিশ্চিতো যৈঃ, তে ত্রিণাচিকেতাঃ ॥৩৫॥ ১॥
“ঋতং পিবন্তৌ” ইত্যাদি তৃতীয় বল্লীর সহিত পূর্ববল্লীর সম্বন্ধ এইরূপ,-নানাপ্রকার বিরুদ্ধ ফলপ্রদ বিদ্যা ও অবিদ্যা বিষয় ইতঃ- পূর্ব্বে উল্লিখিতমাত্র হইয়াছে, কিন্তু ফলের সহিত যথাযথরূপে নিরূপিত হয় ‘নাই; তাহারই নিরূপণার্থ ‘রথ’-রূপকের কল্পনা; ঐরূপে নিরূপণ’ করিলেই বুঝিবার সুবিধা হয়। এইরূপ সুবিধা হয় বলিয়াই প্রথমতঃ প্রাপক ও প্রাপ্য এবং গন্তা(মুমুক্ষু) ও গন্তব্য (পরমাত্মা), এতদুভয়ের বিবেক বা পার্থক্য প্রদর্শনার্থ “ঋতম্” ইত্যাদি- মন্ত্রে[জীব ও পরম] উভয় আত্মাই উপন্যস্ত হইতেছে। ‘ঋত’ অর্থ -সত্য, কর্মের ফলও অবশ্যম্ভাবী বলিয়া সত্য,[এই কারণে এখানে ‘ঋত’ শব্দে কৰ্ম্মফল বুঝিতে হইবে]।[যদিও] এক জীবই কেবল কর্মফল পান করে-ভোগ করে, অপরে(পরমাত্মা) ভোগ করে না সত্য, তথাপি ‘ছত্রি’-ন্যায় অনুসারে পানকর্তা জীবের সহিত সম্বন্ধ
৩য় বল্লা। প্রথমোহধ্যায়ঃ। ৮৯ থাকায় উভয়কেই পানকর্তা(পিবন্তৌ) বলা হইয়াছে *। লোকে অর্থাৎ এই শরীরে স্বকৃত কর্ম্মের ফলভোক্তা, বুদ্ধিরূপ গুহাতে— পরম অর্থাৎ বহিঃস্থিত ভৌতিক আকাশ ও দেহস্থ অধ্যাত্মাকাশ অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট এবং পরব্রহ্মের অভিব্যক্তি বা উপলব্ধি হয় বলিয়া ব্রহ্মের অর্দ্ধস্থান-যোগ্য—পরার্দ্ধ যে হার্দাকাশ(হৃদয়াকাশ বা দহরা- কাশ), সেই পরম পরার্দ্ধ হাৰ্দাকাশে প্রবিষ্ট। উভয়ের মধ্যে একটি সংসারী—জন্ম-মরণাদি-দুঃখ-ভাগী, অপরটি তদ্বিপরীত। এজন্য সেই উভয়কে(জীব ও পরমাত্মাকে) ছায়া’ ও আতপের ন্যায়(অন্ধকার ও আলোকের ন্যায়) বিভিন্নস্বরূপ বসিয়া ব্রহ্মবিদ্গণ বর্ণনা করেন। কেবল যে, অকর্ম্মিগণই(জ্ঞানিগণই) বলিয়া থাকেন, তাহা নহে; পঞ্চাগ্নি অর্থাৎ পঞ্চপ্রকার অগ্নির ‘+’ সেবক গৃহস্থগণ এবং যাঁহারা তিন- বার করিয়া নাচিকেত-সংজ্ঞক অগ্নির চয়ন করিয়াছেন, সেই ত্রিণাচিকেতগণও[বলিয়া থাকেন] ॥ ৫৫ ॥ ১ ॥
যঃ সেতুরীজানানামক্ষরং ব্রহ্ম যৎ পরম্। অভয়ং তিতীর্ষতাং পারং নাচিকেতংশকেমহি॥৫৬॥২
[ইদানীমপি অগ্নিবিদ্যা ব্রহ্মবিদ্যা চ নাত্যন্তং দুর্লভা, ইত্যাহ,-যঃ সেতুরিতি]- ঈজানানাম্(যজনশীলানাং কর্ম্মিণাম্) যঃ(নাচিকেতঃ অগ্নিঃ) সেতুঃ(দুঃখোত্তর- ণার্থত্বাৎ সেতুরিষ),[তম্] নাচিকেতম্(অগ্নিম্) শকেমহি(চেতুং জ্ঞাতুং চ
(শঙ্কুমঃ)[বয়মিতি শেষঃ]। অভয়ম্(ভয়রহিতম্) পারম্[সংসারার্ণবস্যেতি শেষঃ] তিতীর্ষতাম্(তর্তুমিচ্ছতাং জ্ঞানিনাম্)[আশ্রয়ভূতঃ] যৎ অক্ষরম্(অবিকারি) পরং ব্রহ্ম;[তদপি জ্ঞাতুং শকেমহি]।[কর্ম-জ্ঞানগম্যে পরাপরে ব্রহ্মণী জ্ঞাতব্যে ইত্যাশয়ঃ]।
এখনও যে অগ্নিবিদ্যা ও ব্রহ্মবিদ্যা নিতান্ত দুর্লভ নহে, এই মন্ত্রে তাহাই প্রদর্শিত হইতেছে,—ঈজান অর্থাৎ যজ্ঞকারিগণের যাহা দুঃখপারের উপায়ীভূত সেতুস্বরূপ,[আমরা] সেই নাচিকেত অগ্নিকে জানিতে ও চয়ন করিতে সমর্থ। আর[সংসার-সাগরের] অভয় পার পাইতে ইচ্ছুক জ্ঞানিগণের পরম আশ্রয়স্বরূপ যে অক্ষর(নির্ব্বিকার) পরব্রহ্ম,[তাঁহাকেও, আমরা জানিতে সমর্থ]। অভিপ্রায় এই যে, কর্মদ্বারা অপর ব্রহ্মকে এবং জ্ঞানের দ্বারা পরব্রহ্মকে অবগত হওয়া আবশ্যক ॥ ৫৬ ॥ ২ ॥
যঃ সেতুঃ—সেতুরিব সেতুঃ, ঈজানানাং যজমানানাং কর্মিণাং দুঃখসন্তরণার্থ- ‘ত্বাৎ, নাচিকেতং নাচিকেতোহগ্নিঃ তম্, বয়ং জ্ঞাতুং চেতুঞ্চ শকেমহি শত্রুবন্তঃ। কিঞ্চ, যচ্চ অভয়ং ভয়শূন্যং সংসারস্য পারং তিতীর্ষতাং তর্তুমিচ্ছতাং ব্রহ্মবিদাং যৎ পরম্ আশ্রয়ম্ অক্ষরম্ আত্মাখ্যং ব্রহ্ম, তচ্চ জ্ঞাতুং শকেমহি শত্রুবন্তঃ। পরাপরে ব্রহ্মণী কর্মি-ব্রহ্মবিদাশ্রয়ে বেদিতব্যে ইতি বাক্যার্থঃ। এতয়োরেব হ্যপন্যাসঃ কৃতঃ “ঋতং পিবন্তৌ” ইতি ॥৫৬৷৷২৷৷
ঈজান অর্থাৎ যজ্ঞশীল কর্মিগণের সেতু(বাঁধ), অর্থাৎ দুঃখসাগর পার হইবার উপায় বলিয়া সেতুসদৃশ যে নাচিকেত অগ্নি, তাঁহাকে আমরা জানিতে এবং চয়ন করিতে সমর্থ হই। অপিচ, অভয়-অর্থাৎ ভয়-শূন্য, সংসার-সাগরের পার সমুত্তরণাভিলাষী ব্রহ্মবিদ্গণের পরম আশ্রয়স্বরূপ পরমাত্ম-নামক যে পরব্রহ্ম, তাঁহাকেও জানিতে সমর্থ হই। এই বাক্যের অভিপ্রায় এই যে, কর্মী ও ব্রহ্মবিদ্গণের আশ্রয় বা অবলম্বনীয় ‘পর ও অপর ব্রহ্মকে জানা আবশ্যক। পূর্ব্বে ‘ঋতং পিবন্তৌ’ বলিয়া এই পরাপর ব্রহ্মেরই উল্লেখ করা হইয়াছে ॥৫৬৷ ২॥
[বিদ্যাবিদ্যাবশাৎ সংসার-মোক্ষলাভসাধনং শরীরং রথরূপক-কল্পনয়া আহ— ‘আত্মানম্’ ইত্যাদিশ্লোকদ্বয়েন]। আত্মানম্(শরীরাধিষ্ঠাতারং জীবম্) রথিনম্(রথস্বামিনম্)[এব] বিদ্ধি(জানীহি)। শরীরম্(জীবদেহম্) তু(পুনঃ) রথম্ (ইন্দ্রিয়াশ্ব-পরিচালিতত্বাৎ রথস্থানীয়ম্) এব[বিদ্ধি]। বুদ্ধিম্(নিশ্চয়াত্মকম্ অন্তঃকরণম্) তু সারথিম্(শরীর-রথচালকম্) বিদ্ধি। মনঃ(সংকল্প-বিকল্পস্বভাবম্ অন্তঃকরণম্) চ(অপি) প্রগ্রহম্(.ইন্দ্রিয়াশ্বসংযমনরজ্জুম্),[বিদ্ধি] ॥
[ যাহা দ্বারা বিদ্যাফলে মোক্ষ ও অবিদ্যাবশে সংসার লাভ হয়, সেই শরীরকে রথরূপে কল্পনা করিয়া দুই শ্লোকে বর্ণনা করিতেছেন]—শরীরাধিষ্ঠাতা আত্মাকে ( জীবকে) রথী( রথের মালিক) বলিয়া জানিবে; জীবাধিষ্ঠিত শরীরকে রথ বলিয়া, বুদ্ধিকে সারথি বলিয়া এবং মনকে প্রগ্রহ( লাগাম) বলিয়া জানিবে ॥ ৫৭ ॥ ৩ ॥
তত্র য উপাধিকৃতঃ সংসারী বিদ্যাবিদ্যয়োরধিকৃতো মোক্ষগমনায় সংসারগমনায় চ, তস্য তদুভয়গমনে সাধনো রথঃ কল্প্যতে। তত্র আত্মানম্ ঋতপং সংসারিণং রথিনং রথস্বামিনং বিদ্ধি বিজানীহি। শরীরং রথম্ এব তু রথবদ্ধ-হয়স্থানীয়ৈঃ ইন্দ্রিয়ৈঃ আকৃষ্যমাণত্বাৎ শরীরস্য। বুদ্ধিং তু অধ্যবসায়লক্ষণাং সারথিং বিদ্ধি, বুদ্ধিনেতৃপ্রধানত্বাৎ শরীরস্য; সারথিনেতৃপ্রধান ইব রথঃ। সর্ব্বং হি দেহগতং কার্য্যৎ বুদ্ধিকর্তব্যমেব প্রায়েণ। মনঃ সঙ্কল্পবিকল্পাদিলক্ষণং প্রগ্রহমেব চ রশনাং বিদ্ধিণ মনসা হি প্রগৃহীতানি শ্রোত্রাদীনি করণানি প্রবর্তন্তে, রশনয়েব অশ্বাঃ ॥৫৭॥৩৷৷
পূর্ব্বোক্ত উভয়ের মধ্যে যিনি উপাধিকৃত সংসার লাভ করিয়া বিদ্যা ও অবিদ্যার বশে মোক্ষ ও সংসারলাভে অধিকারী হন, তাঁহার সেই উভয় স্থানে গমনোপযোগী রথের কল্পনা করা হইতেছে,—
পূর্ব্বোক্ত ঋতপানকারী সংসারী আত্মাকে রথী অর্থাৎ রথস্বামী বলিয়া জানিও; রথ-সংযোজিত অশ্বের ন্যায় ইন্দ্রিয়গণকর্তৃক আকৃষ্ট বা পরি- চালিত হয় বলিয়া শরীরকে নিশ্চয়ই রথ[বলিয়া জানিও]। রথ- পরিচালকের মধ্যে যেমন সারথিই প্রধান, তেমন শরীর-পরিচালকের মধ্যে বুদ্ধিই প্রধান; কেননা, দেহগত যত প্রকার কার্য্য আছে, তন্মধ্যে অধিকাংশই বুদ্ধিনিষ্পাদ্য; এই কারণে অধ্যবসায় বা নিশ্চয়- স্বভাব বুদ্ধিকে সারথি[বলিয়া] জানিও এবং শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়- নিচয় মনের দ্বারা পরিচালিত হইয়াই[স্ব স্ব বিষয়ে] প্রবৃত্ত হয়; এই কারণে সংকল্প-বিকল্প-স্বভাব(দর্শণাত্মক) মনকে প্রগ্রহ অর্থাৎ রশনা(লাগাম),[বলিয়া] নিশ্চয়[জানিও] ॥৫৭৷৷৩৷৷
ইন্দ্রিয়াণি হয়ানাহুর্বিষয়াংস্তেষু গোচরান্। আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাহুর্মণীষিণঃ॥৫৮॥৪
মনীষিণঃ(প্রাজ্ঞাঃ) ইন্দ্রিয়াণি(শ্রোত্রাদীনি) হয়ান্(শরীর-রথবাহান্ অশ্বান্) আহুঃ; বিষয়ান্(শব্দাদীন্) তেষু(তেষাং ইন্দ্রিয়াশ্বানাং) গোচরান্(বিষয়ভূতান্ সঞ্চরণদেশান্)[আহুরিত্যর্থঃ] আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তং(শরীরেন্দ্রিয়-মনোভিঃ সমন্বিতং)[আত্মানঞ্চ] ভোক্তা(সুখদুঃখানুভবকর্তা) ইতি আহুঃ[মনীষিণঃ ইতি শেষঃ] ॥
মনীষিগণ শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয়সমূহকে হয় অর্থাৎ শরীররূপ রথের চালক অশ্ব বলিয়া থাকেন; শব্দাদি বিষয়সমূহকে সেই ইন্দ্রিয়াশ্বগণের গোচর অর্থাৎ বিচরণস্থান বলিয়া থাকেন, এবং শরীর, ইন্দ্রিয় ও মনোযুক্ত আত্মাকে[‘সুখ- দুঃখাদির] ভোক্তা বা অনুভবিতা বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন ॥ ৫৮ ॥ ৪ ॥
ইন্দ্রিয়াণি চক্ষুরাদীনি হয়ানাহঃ রথকল্পনাকুশলাঃ, শরীররথাকর্ষণসামান্যাৎ। তেঘেব ইন্দ্রিয়েষু হয়ত্বেন পরিকল্পিতেষু গোচরান্ মার্গান্ রূপাদীন্ বিষয়ান্ বিদ্ধি। আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তং শরীরেন্দ্রিয়মনোভিঃ সহিতং সংযুক্তমাত্মানং ভোক্তেতি
সংসারীত্যাহুঃ মনীষিণো বিবেকিনঃ। ন হি কেবলস্যাত্মনো ভোক্তৃত্বমস্তি; বুদ্ধ্যাদ্যপাধিকৃতমেব তস্য ভোক্তৃত্বম্। তথা চ শ্রুত্যন্তরং কেবলস্যাভোক্তৃত্বমেব দর্শয়তি,-“ধ্যায়তীব লেলায়তীব” ইত্যাদি। এবঞ্চ সতি বক্ষ্যমাণ-রথ-কল্পনয়া বৈষ্ণবস্থ্য পদস্থ্য আত্মতয়া প্রতিপত্তিরুপপদ্যতে, নান্যথা, স্বভাবানতিক্রমাৎ ॥৫৮৷৷৪৷৷
রথ-কল্পনায় কুশল পণ্ডিতগণ শরীররূপ রথের আকর্ষণ-সাদৃশ্য থাকায় চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণকে অশ্ব বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন। রূপাদি বিষয়সমূহকে অশ্বরূপে পরিকল্পিত ইন্দ্রিয়গণের গোচর অর্থাৎ বিচরণ-পথ বলিয়া জানিও; মনীষী অর্থাৎ বিবেকিগণ শরীর, ইন্দ্রিয় ও মনঃসমন্বিত আত্মাকে ভোক্তা—সংসারী বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন; কেননা, বুদ্ধিপ্রভৃতি উপাধি-সহযোগেই আত্মার ভোক্তৃত্ব উপস্থিত হইয়া থাকে, কেবল অর্থাৎ উপাধিরহিত আত্মার কখনই ভোক্তৃত্ব নাই।[আত্মা] যেন ধ্যানই করে এবং যেন গমনাগমনই করে, ইত্যাদি অপর শ্রুতিও উপাধিরহিত—কেবল আত্মার অভোক্তৃত্বই প্রদর্শন করিতেছেন। এইরূপ হইলেই বক্ষ্যমাণ (পরে যাহা বলা হইবে, সেই) রথ-কল্পনা দ্বারা যে বিষ্ণুপদকে আত্ম- স্বরূপে লাভ, তাহাও সঙ্গত হইতে পারে; নচেৎ স্বভাব যখন বিনষ্ট হয় না,[তখন সংসারীর পক্ষে আত্মস্বরূপে বৈষ্ণব-পদপ্রাপ্তি কখনই সঙ্গত হইতে পারে না; অর্থাৎ সংসারী কখনই অসংসারীকে অভিন্ন বলিয়া গ্রহণ করিতে পারে না; কারণ, সংসারী আত্মার ভোক্তৃত্বাদি স্বভার কখনই বিনষ্ট হয় না] ॥ ৫৮॥ ৪ ॥
যস্ত্ববিজ্ঞানবানু ভবত্যযুক্তেন মনসা সদা। তস্যেন্দ্রিয়াণ্যবশ্যানি দুষ্টাশ্বা ইব সারথেঃ॥৫৯॥৫
[ইদানীং বুদ্ধ্যাদীনামসংযমে দোষমাহ-য ইত্যাদিনা]-যঃ(বুদ্ধিরূপ- সারথিঃ) তু(পুনঃ) অযুক্তেন(অনিগৃহীতেন) মনসা[যুক্তঃ সন্] সদা অবিজ্ঞান-
‘বান্(প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি-বিষয়ে বিবেকহীনঃ) ভবতি, সারথেঃ দুষ্টাশ্বা ইব তস্য(বুদ্ধি’ সারথেঃ) ইন্দ্রিয়াণি(চক্ষুরাদীনি) অবশ্যানি(উন্মার্গগামীনি)[ভবন্তি] ॥
কিন্তু, যে বুদ্ধিরূপ সারথি সর্ব্বদা অসংযত মনের সহিত সম্বদ্ধ, অপর সারথির দুষ্ট অশ্বের ন্যায় তাহার ইন্দ্রিয়গণও বশীভূত থাকে না, অর্থাৎ(বিপথ- গামী হয়) ॥ ৫৯ ॥ ৫ ॥
তত্রৈবং সতি যস্য বুদ্ধ্যাখ্যঃ সারথিঃ অবিজ্ঞানবান্ অনিপুণোহবিবেকী প্রবৃত্তৌ চ নিবৃত্তৌ চ ভবতি। যথেতরো রথচর্য্যায়াম্, অযুক্তেন অপ্রগৃহীতেন অসমাহিতেন মনসা প্রগ্রহস্থানীয়েন সদা যুক্তোভবতি, তস্য অকুশলস্য বুদ্ধিসারথেঃ ইন্দ্রিয়াণি অশ্বস্থানীয়ানি অবশ্যানি অশক্যনিবারণানি দুষ্টাশ্বা অদান্তাশ্বা ইব ইতরসারথের্ভবন্তি ॥ ৫৯ ॥ ৫ ॥
এই অবস্থায় কিন্তু যে বুদ্ধিনামক সারথি রথ-চালনা-যুক্ত অপরাপর সারথির ন্যায় অবিজ্ঞানবান্—নৈপুণ্যরহিত, অর্থাৎ প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির বিষয় অবধারণে বিবেকহীন হয়,[এবং] অযুক্ত অর্থাৎ অসংযত বা একাগ্রতাহীন[ইন্দ্রিয়াশ্বের] প্রগ্রহস্থানীয় মনের সহিত সর্বদা সংযুক্ত থাকে, লোকপ্রসিদ্ধ সারথির দুষ্ট বা অশিক্ষিত অশ্বের ন্যায় সেই কৌশলহীন বুদ্ধি-সারথির অশ্বস্থানীয় ইন্দ্রিয়গণ বশবর্ত্তী বা শক্তির আয়ত্ত থাকে না, অর্থাৎ নিবারণের অযোগ্য হইয়া পড়ে ॥ ৫৯ ॥ ৫ ॥
যস্তু বিজ্ঞানবান্ ভবতি যুক্তেন মনসা সদা। তস্যেন্দ্রিয়াণি বশ্যানি সদশ্বা ইব সারথেঃ ॥ ৬০ ॥ ৬ ॥
[ ইদানীং সংযম-ফলমাহ—যস্তু ইত্যাদিনা]—যঃ(বুদ্ধিসারথিঃ) তু(তু শব্দঃ পূর্ব্বপক্ষাৎ বিশেষজ্ঞাপনার্থঃ), সদা যুক্তেন(নিগৃহীতেন) মনসা বিজ্ঞানবান্ (হেয়োপাদেয়-বিবেকবান্) ভবতি, তস্য ইন্দ্রিয়াণি সারথেঃ সদশ্বাঃ(শিক্ষিতা অশ্বাঃ) ইব বশ্যানি[ভবন্তি]॥
[ এখন ইন্দ্রিয়-সংযমের গুণ বলিতেছেন]—কিন্তু, যিনি সর্ব্বদা সংযতমনে বিজ্ঞানবান্ হন, অর্থাৎ কোন্টি ত্যাজ্য আর কোন্টি গ্রাহ্য, ইহার প্রভেদ বুঝেন, সারথির সদশ্ব অর্থাৎ শিক্ষিত অশ্বগণের ন্যায় তাঁহার ইন্দ্রিয়গণ বশবর্তী থাকে ॥৬০॥৬৷৷
[ যস্তু পুনঃ পূর্ব্বোক্তবিপরীত-সারথির্ভবতি তস্য ফলমাহ]—যস্তু বিজ্ঞানবান্ নিপুণঃ বিবেকবান্ যুক্তেন মনসা প্রগৃহীতমনাঃ সমাহিতচিত্তঃ সদা, তস্য অশ্বস্থানীয়ানি ইন্দ্রিয়াণি প্রবর্ত্তয়িতুং নিবর্ত্তয়িতুং বা শক্যানি বশ্যানি দান্তাঃ সদশ্বা ইবেতরসারথেঃ ॥ ৬০ ॥ ৬ ॥
[কিন্তু যিনি পূর্ব্বোক্ত বিপরীতভাবাপন্ন সারথি, তাঁহার ফল বলিতেছেন]—কিন্তু যিনি যুক্ত অর্থাৎ সংযত মনের সাহায্যে বিজ্ঞান- বান্—হেয়োপাদেয়-বিবেকসম্পন্ন হন, অর্থাৎ যিনি সদা সংযতমনা, ও সমাহিতচিত্ত থাকেন, অপর সারথির সৎ(শিক্ষিত) অশ্বগণের ন্যায় তাঁহার অশ্বস্থানীয় ইন্দ্রিয়গণ বশ্য হয়, অর্থাৎ[ইচ্ছামত] নিবৃত্তি বা প্রবৃত্তি বিষয়ে যথেচ্ছরূপে পরিচালন-যোগ্য হয় ॥৬০॥৬৷৷
যস্ত্ববিজ্ঞানবান্ ভবত্যমনস্কঃ সদাশুচিঃ। ন স তৎপদমাপ্নোতি সংসারং চাধিগচ্ছতি॥৬১॥৭
[ ইদানীং সংযমাভারস্য দোষমাহ যস্তিত্যাদিনা মন্ত্রদ্বয়েন]—যঃ(বুদ্ধিসারথিঃ) তু(পুনঃ) অবিজ্ঞানবান্(বিবেকহীনঃ), অমনস্কঃ(অবশীকৃতমনাঃ; অসমা- হিতমনা বা)[অতএব] সদা অশুচিঃ(মলিনান্তঃকরণঃ) ভবতি সঃ তৎ (“সর্ব্বে বেদা যৎ” ইত্যুক্তলক্ষণম্) পদম্(ব্রহ্মস্বরূপম্) ন আপ্নোতি, সংসারং জন্ম-মরণরূপম্ অধিগচ্ছতি চ ॥
এখন সংববাভঙ্গের দোষ বলিতেছেন,—আবার যে সারথি পূর্ব্বোক্ত বিবেক-
১৩
হীন অসংযত-মনা এবং তজ্জন্য ফলে সর্ব্বদা অশুচি(অবিশুদ্ধচিত্ত)[সেই সারথি দ্বারা] রথী সেই পদ(ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হয় না, পরন্তু সংসার লাভ করে ॥৬১॥৭৷৷
তত্র পূর্ব্বোক্তস্য অবিজ্ঞানবতো বুদ্ধিসারথেরিদং ফলমাহ; যস্তু অবিজ্ঞানবান্ ভবতি, অমনস্কঃ অপ্রগৃহীতমনস্কঃ, সঃ তত এব অশুচিঃ সদৈব। ন সঃ রথী তৎ পূর্ব্বোক্তমক্ষরং যৎ পরং পদম্ আপ্নোতি যেন সারথিনা। ন কেবলং তৎ নাপ্নোতি—সংসারঞ্চ জন্মমরণলক্ষণম্ অধিগচ্ছতি ॥৬১॥৭॥
তন্মধ্যে এখন পূর্ব্বোক্ত অবিজ্ঞানবান্ বুদ্ধি-সারথির ফল কথিত হইতেছে,—যিনি অবিজ্ঞানবান্ বা পূর্ব্বোক্ত বিজ্ঞানহীন, অসংযত- মনা এবং সেই কারণেই সর্বদা অশুচি(অশুদ্ধান্তঃকরণ), সেই রথী সেই সারথি দ্বারা(বুদ্ধি দ্বারা) সেই পূর্ব্বকথিত ‘অক্ষর’-সংজ্ঞক পরম পদ(ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হন না। কেবল যে, সেই পদই প্রাপ্ত হন না, তাহা নহে—[ অধিকন্তু] জন্ম-মরণাদিরূপ সংসারকেও প্রাপ্ত হন * ॥ ৬১ ॥ ৭ ॥
যস্তু বিজ্ঞানবান্ ভবতি সমনস্কঃ সদা শুচিঃ। স তু তৎ পদমাপ্নোতি যস্মাদ্ভূয়ো ন জায়তে ॥৬২৷৷৮৷৷
যঃ(রথী) তু(পুনঃ) বিজ্ঞানবান্(বিবেকবদ্বুদ্ধিরূপসারথিযুক্তঃ), সমনস্কঃ (বশীকৃতমনস্কঃ),[তত এব] সদা শুচিশ্চ ভবতি যস্মাৎ(প্রাপ্তাৎ পদাৎ ব্রহ্মরূপাৎ) [ভ্রষ্টঃ সন্] ভূয়ঃ(পুনরপি)[সংসারে] ন জায়তে, সঃ তু তৎপদম্ আপ্নোতি(লভতে)।
পক্ষান্তরে, যে রথী বিজ্ঞান-সম্পন্ন-বুদ্ধিসারথিসমন্বিত, সংযতমনাঃ এবং সর্ব্বদা শুচি(বিশুদ্ধান্তঃকরণ), সেই রথীই সেই পদ প্রাপ্ত হন—যে পদ হইতে চ্যুত হইয়া আর পুনর্ব্বার জন্ম ধারণ করিতে না হয় ॥৬২॥৮৷৷
যস্ত দ্বিতীয়ো বিজ্ঞানবান্ ভবতি বিজ্ঞানবৎসারথ্যুপেতো রথী, বিদ্বানিত্যেতৎ। যুক্তমনাঃ সমনস্কঃ, সঃ তত’ এব সদা শুচিঃ; স তু তৎপদমাপ্নোতি। যম্মাদাপ্তাৎ পদাৎ অপ্রচ্যুতঃ সন্ ভূয়ঃ পুনঃ ন জায়তে সংসারে ॥ ৬২৷৷৮৷৷
কিন্তু দ্বিতীয়(অপর) যে রথী বিজ্ঞানসম্পন্ন-সারথিযুক্ত অর্থাৎ বিদ্বান, সমনস্ক অর্থাৎ সমাহিতচিত্ত এবং সেই কারণে সর্বদাই শুচি থাকেন, তিনি কিন্তু সেই পদ প্রাপ্ত হন—যে প্রাপ্ত পদ হইতে বিচ্যুত হইয়া পুনর্ব্বার আর সংসারে জন্মিতে না হয় ॥ ৬২ ॥৮॥
বিজ্ঞানসারথির্য্যস্ত মনঃপ্রগ্রহবান্ নরঃ।
সোহধ্বনঃ পারমাপ্নোতি তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদম্ ॥৬৩॥৯॥
[অথ পূর্ব্বোক্তং পদং প্রদর্শয়ন্ তৎপ্রাপকমপ্যাহ,—বিজ্ঞানেতি]। যঃ নরঃ বিজ্ঞানসারথিঃ(বিবেকসম্পন্না বুদ্ধিঃ সারণিঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ) মনঃপ্রগ্রহবান্ (মনএব প্রগ্রহঃ ইন্দ্রিয়াশ্বসংযমনরজুঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ, সমাহিতমনা ইত্যর্থঃ)। [চ ভবতি], সঃ অধ্বনঃ(সংসারগতেঃ) পারম্(অবসানম্) বিষ্ণোঃ(ব্যাপকস্য ব্রহ্মণঃ) তৎ(প্রসিদ্ধম্) পরমং পদম্(স্থানম্, ব্রহ্মত্বমিত্যর্থঃ),[অত্র ‘রাহোঃ শিরঃ’ ইত্যাদিবৎ অভেদে ষষ্ঠী] আপ্নোতি[সংসারাৎ মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ]॥
এখন পূর্ব্বোক্ত ‘পদ’ বস্তু নির্দেশপূর্ব্বক তৎপ্রাপক ব্যক্তির নির্দেশ করিতে- ছেন,—বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধি যাহার সারথি এবং মন যাহার ইন্দ্রিয়রূপ অশ্ব- সংবদনের রজ্জু, তিনি সংসার-গতির পরিসমাপ্তিরূপ সর্ব্বব্যাপী বিষ্ণুর সেই প্রসিদ্ধ পদ প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ বিষ্ণুস্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া সংসার হইতে বিমুক্ত হন ॥৬৩৷৯
কিং তৎপদম্ ইত্যাহ,-বিজ্ঞানসারথির্যন্ত যো বিবেকবুদ্ধিসারথিঃ পূর্ব্বোক্তঃ মনঃ-প্রগ্রহবান্ প্রগৃহীতমনাঃ সমাহিতচিত্তঃ সন্ শুচির্নরো বিদ্বান্; সঃ অধ্বনঃ সংসারগতেঃ পারং পরমেব অধিগন্তব্যমিত্যেতৎ, আপ্নোতি মুচ্যতে সর্ব্ব-সংসার- বন্ধনৈঃ। তৎ বিষ্ণোঃ ব্যাধনশীলস্য ব্রহ্মণঃ পরমাত্মনো বাসুদেবাখ্যস্য পরমং প্রকৃষ্টং পদং স্থানং সতত্ত্বমিত্যেতৎ। যৎ অসৌ আপ্নোতি বিদ্বান্ ॥৬৩৷৯৷৷
সেই পদ কি? তাহা বলিতেছেন,—কিন্তু যে বিদ্বান্ নর, অর্থাৎ বিজ্ঞান-সারথি, বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধি যাহার সারথি, এবস্তৃত এবং পূর্ব্বোক্ত মনোরূপ-প্রগ্রহসম্পন্ন অর্থাৎ বশীকৃতমনাঃ—সমাহিতচিত্ত ও শুচি হন, তিনি অধ্বের(পথের) অর্থাৎ সংসারগতির পরপার— যাহা অবশ্য প্রাপ্তব্য, তাহা প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ সমস্ত সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন। বিষ্ণুর অর্থাৎ ব্যাপনস্বভাব(সর্বব্যাপী) ব্রহ্ম- স্বরূপ বাসুদেব-সংজ্ঞক পরমাত্মার যাহা পরম অর্থাৎ উৎকৃষ্ট পদ— স্থান(সতত্ত্ব), এই বিদ্বান্ ব্যক্তি তাহা প্রাপ্ত হন ॥৬৩৷৷৯৷৷
ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যর্থী অর্থেভ্যশ্চ পরং মনঃ।
মনসস্তু পরা। বুদ্ধিবুদ্ধেরাত্মা। মহান্ পরঃ ॥ ৬৪॥১০॥
[ইদানীং পরমাত্মাখ্য-তৎপদস্য প্রত্যাগাত্মতয়া অধিগমার্থম্ ইন্দ্রিয়াদিভ্যঃ তদ্বিবেক প্রকার উচ্যতে,-ইন্দ্রিয়ের্য ইতি]। ইন্দিয়েভ্যঃ(শ্রোত্র-ত্বক্-চক্ষু-রসন- ঘ্রাণ-পাদ-পায়ুপস্থেভ্যঃ) অর্থাঃ(শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধাখ্যাঃ বিষয়াঃ স্থূলাঃ সূক্ষ্মাশ্চ) পরাঃ[স্থূলাঃ শব্দাদয় ইন্দ্রিয়াকর্ষকত্বাৎ, সূক্ষ্মাশ্চ তন্মাত্রাত্মকা ইন্দ্রিয়াণাং কারণত্বাৎ পরাঃ, ইত্যভিপ্রায়ঃ]। অর্থেভ্যঃ(শব্দাদিভ্যঃ) চ(অপি) মনঃ(সঙ্কল্প-বিকল্পাত্মকম্ অন্তঃকরণম্) পরম্।[বিষয়েন্দ্রিয়-ব্যবহারস্য মনোহধীনত্বাদিত্যভিপ্রায়ঃ]। মনসঃ (সংশয়াত্মকাৎ) তু বুদ্ধিঃ(নিশ্চয়াত্মিকা অন্তঃকরণবৃত্তিঃ) তু(পুনঃ) পরা। [বিষয়ভোগস্য নিশ্চয়পূর্ব্বকত্বাৎ]। বুদ্ধেঃ[অপি] মহান্(দেহেন্দ্রিয়ান্তঃকরণ- স্বামী) আত্মা(জীবঃ) পরঃ।[বুদ্ধিব্যাপারস্যাপি আত্মার্থত্বাদিত্যাশয়ঃ] ॥
[ এখন, পূর্ব্বোক্ত পরমাত্ম-রূপ ‘পদকে’ জীবাভিন্নরূপে পাইতে হইবে; এই কারণ ইন্দ্রিয় হইতে পৃথক্ করিয়া আত্মার উপদেশ দিতেছেন,]—শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় অপেক্ষা অর্থ(স্থূল ও সূক্ষ্ম শব্দাদি বিষয়সমূহ) শ্রেষ্ঠ; তন্মধ্যে স্থূল শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের আকর্ষক বলিয়া, আর সূক্ষ্ম শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের কারণ বা উৎপাদক বলিয়া শ্রেষ্ঠ; কারণ, ইন্দ্রিয়ের প্রয়োগ মনের অধীন। মন অপেক্ষা বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ; কারণ, বিষয়-ভোগ কার্য্যটি বুদ্ধিকৃত নিশ্চয়েরই অধীন। মহান্ ইন্দ্রিয়াদির অধীশ্বর আত্মা(জীব) বুদ্ধি অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ; কারণ, আত্মার জন্যই বুদ্ধির চেষ্টা হইয়া থাকে ॥ ৬৪ ॥ ১০ ॥
অধুনা যৎপদং গন্তব্যম্, তস্যেন্দ্রিয়াণি স্থূলানি আরভ্য, সূক্ষ্মতারতম্যক্রমেণ প্রত্যগাত্মতয়াহধিগমঃ কর্তব্য, ইত্যেবমর্থমিদমারভ্যতে। স্থূলানি তাবদিন্দ্রিয়াণি, তানি যৈঃ অর্থৈরাত্মপ্রকাশনায় আরন্ধানি, তেভ্য ইন্দ্রিয়েভ্যঃ স্বকার্য্যেভ্যঃ তে পরা হি অর্থাঃ সূক্ষ্মা মহান্তশ্চ প্রত্যগাত্মভূতাশ্চ। তেভ্যো হ্যর্থেভ্যশ্চ পরং সূক্ষ্মতরং মহৎ প্রত্যাগাত্মভূতঞ্চ মনঃ। মনঃশব্দবাচ্যং মনস আরম্ভকং ভূতসূক্ষ্মম্। সঙ্কল্পবিকল্পাদ্যা- রম্ভকত্বাৎ। মনসোঽপি পরা সূক্ষ্মতরা মহত্তরা প্রত্যগাত্মভূতা চ বুদ্ধিঃ। বুদ্ধিশব্দ- বাচ্যমধ্যবসায়াদ্যারম্ভকং ভূতসূক্ষ্মম্। বুদ্ধেরাত্মা সর্ব্বপ্রাণিবুদ্ধীনাং প্রত্যগাত্ম- ভূতত্বাদাত্মা মহান্ সর্ব্বমহত্ত্বাৎ অব্যক্তাৎ যৎ প্রথমং জাতং হৈরণ্যগর্ভং তত্ত্বং বোধা- বোধাত্মকম্, মহানাত্মা বুদ্ধেঃ পর ইত্যুচ্যতে ॥৬৪৷১০৷
[পূর্ব্বে যে পদকে ‘প্রাপ্তব্য’ বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে] সেই পদকেই প্রত্যগাত্মা জীবরূপে অধিগত হইতে হইবে; তাহাও আবার স্থূল ইন্দ্রিয় হইতে আরম্ভ করিয়া উত্তরোত্তর সূক্ষমত্বের তারতম্য ক্রমে(সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম ইত্যাদি রূপে) প্রত্য- গাত্ম-বিষয়ক বিবেক-জ্ঞান-সাপেক্ষ। এখন সেই বিবেক প্রদর্শনার্থ [এই শ্লোক] আরব্ধ হইতেছে,—ইন্দ্রিয়সমূহ[স্বভাবতঃই অর্থ অপেক্ষা] স্থূল; যে শব্দাদি অর্থসমূহ[ইন্দ্রিয়-সংযোগে] আপনা- দিগকে প্রকাশিত বা জ্ঞানগম্য, করিবার জন্য সেই ইন্দ্রিয়গণকে
উৎপাদন করিয়াছে, সেই অর্থসমূহ স্বোৎপাদিত ইন্দ্রিয়সমুদয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; অর্থাৎ সূক্ষ্ম, মহৎ(‘ব্যাপক) এবং প্রত্যগাত্ম- স্বরূপ। সেই অর্থ অপেক্ষাও মনঃ পর—সূক্ষমতর, মহৎ ও প্রত্যগাত্ম-স্বরূপ। এখানে ‘মনঃ’ শব্দে মনের উৎপাদক ভূত- সূক্ষম(তন্মাত্র) বুঝিতে হইবে। বুদ্ধিই সংকল্প-বিকল্পাদির আরম্ভক বা প্রবর্ত্তক; এই কারণে মন অপেক্ষাও বুদ্ধি পরা, অর্থাৎ তদপেক্ষা সূক্ষমতর, অতিশয় মহৎ এবং প্রত্যগাত্মস্বরূপ। ‘বুদ্ধি’ শব্দেও অধ্যবসায় প্রভৃতি বুদ্ধি-ধর্মের উৎপাদক সূক্ষমভূত বুঝিতে হইবে। সমস্ত প্রাণি-বুদ্ধির - আত্মস্বরূপ বলিয়া আত্মা, এবং সর্ব্বাপেক্ষা মহৎ, বলিয়া মহান্—অব্যক্ত(প্রকৃতি) হইতে প্রথম- জাত যে বোধাবোধ-স্বরূপ হিরণ্য-গর্ভতত্ত্ব, সেই মহান্ আত্মা বুদ্ধি অপেক্ষাও পর বলিয়া কথিত হন(৩) ॥৬৪৷১০৷৷
মহতঃ পরমব্যক্তমব্যক্তাৎ পুরুষঃ পরঃ। পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ, সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ ॥৬॥১১৷৷ ব্যাখ্যা।
[পুনরপ্যাহ-] মহতঃ(পূর্ব্বোক্তাৎ হিরণ্যগর্ভাৎ) অব্যক্তম্(সর্ব্বজগদ্- বীজভূতং প্রধানম্) পরম্। অব্যক্তাৎ(প্রকৃতেঃ) পুরুষঃ(পূর্ণঃ পরমাত্মা) পরঃ।
(৩) তাৎপর্য্য-সাধারণতঃ প্রাকৃতবুদ্ধি-সম্পন্ন জনসমাজ দেহকে আত্মা বলিয়া মনে না করিলেও নিজনিজ প্রতীতি অনুসারে ইন্দ্রিয় প্রভৃতি সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর ও সূক্ষ্মতম পদার্থে আত্মবুদ্ধি স্থাপন করিয়া নিশ্চিন্ত থাকে। প্রকৃত প্রত্যগাত্মা(জীব) পদার্থকে জানে না। অথচ পূর্ব্বোল্লিখিত ‘পরমপদ’ পাইতে হইলে প্রত্যগাত্মার যথার্থ স্বরূপটি জানা একান্ত আবশ্যক। তাই শ্রুতি নিজেই প্রাকৃত-বুদ্ধি লোকের কল্পিত প্রত্যগাত্মা হইতে পৃথক্ করিয়া ‘যথার্থ আত্মতত্ত্ব বুঝাইবার উদ্দেশ্যে ক্রমে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম অনাত্ম-পদার্থের আপেক্ষিক উৎকর্ষ প্রদর্শন করিতেছেন। প্রথমতঃ অব্যক্তসংজ্ঞক মায়া হইতে আকাশাদি পঞ্চভূত উৎপন্ন হইল। এই পঞ্চভূত অবিমিশ্র এবং অতিশয় সূক্ষ্ম, এই কারণে ইহাদিগকে ‘সূক্ষ্মভূত’, ‘তন্মাত্র’(শব্দতন্মাত্র, স্পর্শতন্মাত্র, রূপ- তন্মাত্র, রসতন্মাত্র ও গন্ধতন্মাত্র) ও ‘অপঞ্চীকৃত ভূত’ নামেও অভিহিত করা হয়। পরে ঐ পঞ্চভূতেরই পরস্পর সংমিশ্রণে যে অবস্থা ঘটে, তাহাকেই ‘স্থূলভূত’(ব্যবহারিক আকাশাদি) বলা হয়; সেই স্থূলভূতসমূহে আবার তৎকারণ শব্দাদিতন্মাত্রসমূহও স্থুলতাপ্রাপ্ত হইয়া ইন্দ্রিয়- গ্রাহ্য শব্দাদি সংজ্ঞা ধারণ করে; স্থূলই হউক, আর সূক্ষ্মই হউক-জগতে এই পাঁচটির অতি- রিক্ত কোন ‘অর্থ’-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নাই। ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণের অভাবে এই সকল অর্থ
৩য় বল্লী], প্রথমোহধ্যায়ঃ। ১০১.
পুরুষাৎ(পুরুষাপেক্ষয়া) পরং কিঞ্চিৎ ন[অস্তি]; সা(স পুরুষঃ) কাষ্ঠা(অবধিঃ), [ সূক্ষ্মত্ব-মহত্ত্ব-প্রত্যগাত্মভাবানাং পর্য্যবসানম্]।[ সেতি বিধেয়াপেক্ষয়া স্ত্রীলিঙ্গোক্তিঃ]। সা পরা গতিঃ(পরং বিশ্রামস্থানম্) ॥
সর্ব্বজগতের বীজভূত অব্যক্ত(প্রকৃতি) পূর্ব্বোক্ত মহৎ অপেক্ষা পর, অব্যক্ত হইতেও পুরুষ(পরমাত্মা) পর; কিন্তু পুরুষ অপেক্ষা আর কিছুই পর নাই; তিনিই কাষ্ঠা, অর্থাৎ সূক্ষ্মত্ব, মহত্ত্ব ও আত্মভাবের চরম সীমা এবং সেই পুরুষই [জীবের] পরা(সর্ব্বোত্তমা) গতি বা গন্তব্যস্থান ॥৬৫৷৷১১৷৷.
মহতোহপি পরং সূক্ষ্মতরং প্রত্যগাত্মভূতং সর্ব্বমহত্তরং, চ অব্যক্তং সর্ব্বস্থ্য জগতো বীজভূতম্ অব্যাকৃতনাম-রূপং সতত্ত্বং সর্ব্বকার্য্য-কারণ-শক্তি-সমাহার-রূপম্ অব্যক্তম্ অব্যাকৃতাকাশাদি-নামবাচ্যং পরমাত্মনি ওতপ্রোতভাবেন সমাশ্রিতং বটকণিকায়ামিব বটবৃক্ষশক্তিঃ। তস্মাৎ অব্যক্তাৎ পরঃ সূক্ষ্মতরঃ সর্ব্বকারণ- করণত্বাৎ প্রত্যগাত্মত্বাচ্চ, মহাংশ, অতএব পুরুষঃ সর্ব্বপূরণাৎ। ততোহন্যস্য পরস্য প্রসঙ্গং নিবারয়ন্নাহ—পুরুষাৎ ন পরং কিঞ্চিদিতি। যস্মাৎ নাস্তি পুরুষাৎ চিন্মাত্র-
, ঘনাৎ পরং কিঞ্চিদপি বস্তুন্তরম্; তস্মাৎ সূক্ষ্মত্ব-মহত্ত্ব-প্রত্যগাত্মস্বানাৎ সা কাষ্ঠা নিষ্ঠা পর্য্যবসানম্। অত্র হি ইন্দ্রিয়েভ্য আরভ্য সূক্ষ্মত্বাদি পরিসমাপ্তম্। অতএব চ গস্তৃণাং সর্ব্বগতিমতাং সংসারিণাং সা পরা প্রকৃষ্টা গতিঃ। “যদ্ গত্বা ন নিবর্ত্তন্তে” ইতি স্মতেঃ ॥৬৫৷৷১১৷৷
সমস্ত জগতের বীজস্বরূপ অনভিব্যক্ত-নাম-রূপাত্মক, সর্বপ্রকার কার্য্য-কারণশক্তির সমষ্টিস্বরূপ, অব্যক্ত, অব্যাকৃত(অস্ফুট) ও আকাশাদি শব্দ-বাচ্য এবং ক্ষুদ্র বটবীজে যেরূপ বটবৃক্ষোৎপাদিকা শক্তি নিহিত থাকে, সেইরূপ পরমাত্মাতে(ব্রহ্মেতে) ওত-প্রোতভাবে (সর্বতোভাবে) আশ্রিত আছে। ‘উক্ত’ অব্যক্ত(প্রকৃতি) পূর্ব্বোক্ত ‘মহৎ’ অপেক্ষাও পর—সূক্ষম, মহত্তর ও প্রত্যগাত্মস্বরূপ। সমস্ত কারণেরও কারণ এবং প্রত্যগাত্মস্বরূপ, এই নিমিত্ত আত্মা। সেই অব্যক্ত অপেক্ষাও সূক্ষ্মতম ও মহান্ এবং বস্তুর পূরণের কারণ বলিয়া ‘পুরুষ’-পদবাচ্য। তদ্ভিন্ন অপর ‘পর’ বস্তুর সম্ভাবনা-নিবারণার্থ বলিতেছেন,—পুরুষ অপেক্ষা আর কিছু ‘পর’ নাই। যেহেতু কেবলই চিন্ময়-স্বরূপ সেই পুরুষ অপেক্ষা ‘পর’ অন্য কোনও বস্তু নাই, সেই হেতু উহাই সূক্ষ্মত্ব, মহত্ত্ব ও প্রত্যগাত্মত্ব ধর্ম্মের একমাত্র কাষ্ঠা বা পর্যবসান-স্থান। কারণ, ইন্দ্রিয়সমূহ হইতে সূক্ষ্মত্বাদি পর্য্যন্ত ধর্ম্মের ইহাতেই পরিসমাপ্তি বা শেষ হইয়াছে; এই নিমিত্ত সর্বত্র গমনশীল সংসারিগণের সেই পুরুষই ‘পরা’ অর্থাৎ সর্বোত্তম গতি বা গন্তব্য স্থান। ভগবদগীতারূপ স্মৃতিশাস্ত্রেও উক্ত হইয়াছে যে,[জীব] যাহা প্রাপ্ত হইলে, আর ফিরিয়া আইসে না[‘তাহাই আমার ধাম’] ॥৬৫৷৷১১৷
এব সর্ব্বেষু ভূতেষু গূঢ়াত্মা ন প্রকাশতে।
দৃশ্যতে স্বধ্যা। বুদ্ধ্যা। সূক্ষ্ময়া। সূক্ষ্মদর্শিভিঃ ॥৬৬॥১২॥
ব্যাখ্যা।
[ পরমগতিবেদন ক্বচিৎ পুরুষস্য উপলব্ধি প্রকারমাহ,—এব ইতি]। সর্ব্বেষু
ভূতেষু(ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তেষু) গূঢ়ঃ(দর্শনস্পর্শনাদিবিষয়-বিজ্ঞানজনিতমোহাচ্ছন্নঃ), এষ আত্মা[ভূগর্ভনিহিত-রত্নরাশিবই] ন প্রকাশতে(স্বরূপতঃ ন বিভাতি)।[সর্ব্বেযু (পুরুষেষু) ন প্রকাশতে, অপিতু কস্যচিদেব সকাশে প্রকাশতে ইত্যর্থো বা]। [কৈঃ কেন উপায়েন দৃশ্যতে? ইত্যত আহ]-সূক্ষ্মদর্শিভিঃ(সূক্ষ্মত্বাদিবিশ্রাম- স্থানত্বেন যে আত্মানং পশ্যন্তি তৈঃ) অগ্রয়া(একাগ্রতা-সম্পন্নয়া) সূক্ষ্ময়া (যোগোপাসনাদি-সংস্কৃতয়া) বুদ্ধ্যা তু(নতু বহিরিন্দ্রিয়ৈঃ) এষ[আত্মা] দৃশ্যতে [যথাযথরূপং গৃহ্যতে] ॥
পূর্ব্ব শ্লোকে ‘পরা গতিঃ বলিয়া, যাহাকে বলা হইয়াছে, এখন তাহার প্রাপ্তির উপায় বলিতেছেন,—ইনি’ সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে গূঢ়ভাবে নিহিত থাকায় প্রকাশ পান না, অথবা সকলের নিকট প্রকাশ পান না। ‘[ কাহার নিকট কি উপায়ে প্রকাশ পান? তাহা বলিতেছেন]—পূর্ব্বকথিত প্রকারে পরম সূক্ষ্মত্বদর্শী পুরুষ একাগ্রতাযুক্ত ও সূক্ষ্ম বা যোগাদিসাধনে পরিশোধিত বুদ্ধি দ্বারা দেখিতে পান, অপর ইন্দ্রিয় দ্বারা নহে ॥৬৬৷৷১২৷৷
ননু গতিশ্চেদাগত্যাপি ভবিতব্যম্, কথম্ “যস্মাঙ্কুয়ো ন জায়তে” ইতি? নৈষ দোষঃ। সর্ব্বস্য প্রত্যগাত্মত্বাৎ অবগতিরেব গতিরিত্যুপচর্য্যতে। প্রত্যগাত্মত্বঞ্চ দর্শিতম ইন্দ্রিয়-মনোবুদ্ধিপরত্বেন। যো হি গন্তা, সোহয়ম্ অপ্রত্যগ রূপং পুরুষং গচ্ছতি অনাত্মভূতম্, ন বিন্দতি স্বরূপেণ। তথা চ শ্রুতিঃ,-“অনধ্বগা অধ্বসু পারয়িষ্ণবঃ” ইত্যাদ্যা। তথাচ দর্শয়তি প্রত্যগাত্মত্বং সর্ব্বস্য,-এষ পুরুষঃ সর্ব্বেযু ব্রহ্মাদিস্তম্ব-পর্য্যন্তেষু ভূতেষু গূঢ়ঃ সংবৃতো দর্শনশ্রবণাদিকৰ্মা অবিদ্যা-মায়াচ্ছন্নঃ, অতএব আত্মা ন প্রকাশতে আত্মত্বেন কন্যচিৎ। অহো ‘অতিগম্ভীরা দুরবগাহ্যা বিচিত্রা মায়া চেয়ম্; যদয়ং সর্ব্বো জন্তুঃ পরমার্থতঃ পরমার্থসতত্ত্বোহপ্যেবং বোধ্য- মানোহহং পরমাত্মেতি ন’গৃহ্লাতি, অনাত্মানং দেহেন্দ্রিয়াদিসঙ্ঘাতম্ আত্মনো দৃশ্যমানমপি ঘটাদিবদাত্মত্বেন ‘অহমমুয্য পুত্রঃ’ ইত্যনুচ্যমানোহপি গৃহ্লাতি। নূনং পরস্যৈব মায়য়া মোমুহ্যমান: সর্ব্বো লোকোহয়ং বংভ্রমীতি। তথাচ স্মরণম,- “নাহং প্রকাশঃ সর্ব্বস্থ যোগমায়াসমাবৃতঃ” ইত্যাদি।
নমঃ বিষ্ণুবিষ্ণুচক্রং,—“যথা ধীরো ন শোচতি”, “ন প্রকাশতে” ইতি।
১৪
চ+--নৈতদেবম্। অসংস্কৃতবুদ্ধেরবিজ্ঞেয়ত্বাৎ ন প্রকাশত ইত্যুক্তম্। দৃশ্যতে তু সংস্কৃতয়া অগ্রয়া অগ্রমিবাগ্র্যা তয়া, একাগ্রভয়া উপযতয়া ইত্যেতৎ, সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্মবস্তু-নিরূপণপরয়া। কৈঃ?-সূক্ষ্মদর্শিভিঃ “ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যর্থাঃ” ইত্যাদি- প্রকারেণ সূক্ষ্মতাপারম্পর্য্যদর্শনেন পরং সূক্ষ্মং দ্রষ্টুং শীলং যেযাম্, তে সূক্ষ্মদর্শিনঃ, তৈঃ সূক্ষ্মদর্শিভিঃ-পণ্ডিতৈরিত্যেতৎ ॥৬৬৷৷১২৷৷
এখন প্রশ্ন হইতেছে, যদি গতি হয়, তবে আগতি বা প্রত্যাগমনও অবশ্যই হইবে; তবে ‘যাহা হইতে পুনর্ব্বার আর জন্ম হয় না’, বলা হয় কিরূপে? না-ইহাতে দোষ হয় না; সর্বভূতের প্রত্যগাত্ম-রূপে যে অবগতি(জ্ঞান), তাহাকেই এখানে ‘গতি’-বলিয়া উপচার বা গৌণ-প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি অপেক্ষা পরত্ব- নিবন্ধন যে প্রত্যগাত্মত্ব, তাহা পূর্ব্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে। যে লোক গমন করে, সে অপ্রাপ্ত অপ্রত্যরূপী-অনাত্মভূত পদার্থকেই প্রাপ্ত হয়, ইহার বিপর্যয় হয় না, অর্থাৎ পূর্ব্বে যাহাকে ‘আত্মা’ বলিয়া জানিত না, তাহাকে ‘আত্মা’ বলিয়া জানিতে পারে। বাস্তবিক পক্ষে ‘যাহারা ব্যবহারিক পথগামী না হইয়াও পথের পার পায়, অর্থাৎ সংসারের পর পারে যায়,’ ইত্যাদি শ্রুতিও এই কথাই বলিতেছেন। এই কারণ এই শ্রুতিও সর্ববস্তুর প্রত্যগাত্মভাব প্রদর্শন করিতেছে,-ব্রহ্মাদি স্তম্বপর্য্যন্ত সর্বভূতে গূঢ়-আবৃত অর্থাৎ দর্শন-শ্রবণাদি ব্যাপারও অবিদ্যা বা অজ্ঞানাত্মক মায়া দ্বারা সমাচ্ছন্ন, এই পুরুষসংজ্ঞক আত্মা ‘আত্মা’ রূপে কাহারো নিকট প্রকাশ প্রায় না। অতএব,[বুঝিতে হইবে] “বিচিত্ররূপা এই মায়া অতি গভীর ও দুরবগাহ্য, অর্থাৎ বুদ্ধির অগম্য; যেহেতু এই প্রাণিসমূহ পরমার্থতঃ পরমাত্মস্বরূপ হইয়াও এবং ‘তুমি পরমাত্মস্বরূপ’ এইরূপ উপদেশ প্রাপ্ত হইয়াও ‘আমি পরমাত্মা’ ইহা বুঝিতে পারে না; অথচ, অনাত্মা দেহেন্দ্রিয়াদি-সমষ্টি ঘটাদির ন্যায় আত্ম-দৃশ্য হইলেও অর্থাৎ আত্মা
হইতে ভিন্ন হইলেও এবং[‘তুমি অমুকের পুত্র’] এইরূপ উপদেশ না, পাইয়াও ‘আমি অমুকের পুত্র’ এইরূপে ‘আত্মা’ বলিয়া গ্রহণ করিয়া থাকে। “আমি(ভগবান্) যোগমায়া সম্যরূপে আবৃত হইয়া সকলের নিকট প্রকাশ পাই না” ইত্যাদি স্মৃতিবাক্য(ভগবদগীতা) উক্তার্থের অনুরূপ।
ভাল, “ধীরব্যক্তি তাঁহাকে মনন করিয়া শোকমুক্ত হন।” আবার “তিনি প্রকাশ পান না।” এইরূপ বিরুদ্ধ কথা বলা হইতেছে কেন? না—ইহা এরূপ(বিরুদ্ধ) নহে; কারণ, অসংস্কৃত বা অবিশুদ্ধবুদ্ধির অজ্ঞেয় বলিয়াই “ন প্রকাশতে” বলা হইয়াছে। পরন্তু, সংস্কৃত, অগ্র্য—যেন অগ্রবর্তী(শ্রেষ্ঠ), অর্থাৎ একাগ্রতাযুক্ত, এবং সূক্ষম অর্থাৎ সূক্ষ্ম-বস্তু গ্রহণে তৎপরা বুদ্ধি দ্বারা দৃষ্ট হয়। কাহারা দেখেন?—সূক্ষমদর্শী অর্থাৎ “ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যথাঃ” ইত্যাদি শ্রুতি- কথিত নিয়মানুসারে সূক্ষ্মতার তর-তমভাব ক্রমে পরম সূক্ষ্ম তত্ত্ব দর্শন করিতে যাহাদের স্বভাব, তাঁহারা সূক্ষ্মদর্শী, সেই সূক্ষ্মদশী পণ্ডিতগণ কর্তৃক[দৃষ্ট হয়] ॥৬৬৷৷১২৷৷
যচ্ছেদ্বাত্মনসী প্রাজ্ঞস্তদ্ যচ্ছেজ্ জ্ঞান আত্মনি। জ্ঞানমাত্মনি মহতি তদ্যচ্ছেচ্ছান্ত আত্মনি ॥ ৬৭॥১৩॥ *
[পুনস্তৎপ্রাপ্ত্যুপায়মাহ, —যচ্ছেদিতি]। প্রাজ্ঞঃ(বিবেকী’ জনঃ) বাক্(বাচম্) মনসী(মনসি)[ছান্দসং দীর্ঘত্বং] যচ্ছেৎ(নিষচ্ছেৎ, মনসোহধীনাং কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ)। [বাক্-শব্দোহত্র সর্ব্বেষামিন্দ্রিয়াণামুপলক্ষণার্থঃ; তেন সর্ব্বাণীন্দ্রিয়াণি নিষচ্ছেদি- ত্যর্থ:]। তৎ(মনঃ) জ্ঞানে(প্রকাশস্বরূপে) আত্মনি(বুদ্ধৌ) যচ্ছেৎ। জ্ঞানম্ (বুদ্ধিম্) মহতি আত্মনি(মহত্তত্ত্বাখ্যায়াৎ হিরণ্যগর্ভবুদ্ধৌ জীবাত্মনি বা.) যচ্ছেৎ। তৎ(জ্ঞানং চ) শান্তে(সর্ব্ববিকাররহিতে) আত্মনি(পরমাত্মনি) যচ্ছেৎ।
[পুনশ্চ আত্মলাভের উপায় বলিতেছেন],—প্রাজ্ঞ(বিবেকশালী) লোক বাগিন্দ্রিয়কে মনে সংযত করিবেন; এখানে ‘বাক্’ শব্দটি উপলক্ষণমাত্র, অর্থাৎ সমস্ত ইন্দ্রিয়কে মনের অধীন করিবেন; সেই মনকে ‘জ্ঞান’-শব্দ-বাচ্য বুদ্ধিরূপ আত্মাতে সংযত করিবেন; সেই বুদ্ধিকেও আবার হিরণ্যগর্ভের উপাধিস্বরূপ মহত্তত্বে নিয়মিত রাখিবেন, এবং তাহাকেও আবার শান্ত(নিষ্ক্রিয়) আত্মাতে (পরমাত্মাতে) নিয়মিত করিবেন ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥]
তৎপ্রতিপত্যুপায়মাহ,-যচ্ছেন্নিয়চ্ছেদুপসংহরেৎ প্রাজ্ঞো বিবেকী। কিম্? বাক্-বাচম্; বাগত্রোপলক্ষণার্থা সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাম্। ক? মনসী মনসি। ছান্দসং দৈর্ঘ্যম্। তচ্চ মনো যচ্ছেৎ জ্ঞানে প্রকাশস্বরূপে বুদ্ধাবাত্মনি। বুদ্ধিহি মন আদিকরণানি আপ্নোতি, ইত্যাত্মা, প্রত্যক্ তেষাম্। জ্ঞানং বুদ্ধিমাত্মনি মহতি প্রথমজে নিষচ্ছেৎ। প্রথমজবৎ স্বচ্ছস্বভাবমাত্মনো বিজ্ঞানমাপাদয়েদিত্যর্থঃ। তঞ্চ মহান্তমাত্মানং যচ্ছেৎ শান্তে সর্ব্ববিশেষ-প্রত্যস্তমিতরূপেহবিক্রিয়ে সর্ব্বান্তরে সর্ব্ব- বুদ্ধিপ্রত্যয়সাক্ষিণি মুখ্যে আত্মনি ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥
এক্ষণে পূর্ব্বোক্ত আত্মজ্ঞানের উপায় বলিতেছেন,—প্রাজ্ঞ অর্থাৎ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি বাক্ অর্থাৎ বাগিন্দ্রিয়কে সংযমিত করিবেন, অর্থাৎ অন্য বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া স্থাপন করিবেন। কোথায়? না—মনে। এখানে ‘বাক্’ শব্দটি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের উপলক্ষণার্থক অর্থাৎ সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বোধক[সুতরাং সমস্ত ইন্দ্রিয়েরই মনে সংযমন করা বুঝাইতেছে]। ‘মনসী’ এখানে ছন্দের অনুরোধে বা বৈদিক নিয়মানুসারে দীর্ঘ হইয়াছে[কিন্তু ‘মনসি’ বুঝিতে হইবে]। সেই মনকেও জ্ঞান, অর্থাৎ প্রকাশস্বভাব[বুদ্ধি সাত্ত্বিক বলিয়া বিষয় প্রকাশ করাই উহার স্বভাব, সেই] বুদ্ধিরূপ আত্মাতে নিয়মিত করিবেন। বুদ্ধিই মন প্রভৃতি করণবর্গকে[বিষয়-গ্রহণোদ্দেশ্যে]
প্রাপ্ত হয়, এই কারণে বুদ্ধি ইন্দ্রিয়গণের প্রত্যগাত্ম-স্বরূপ। * সেই, জ্ঞানপদবাচ্য বুদ্ধিকে প্রথমজাত মহৎ(মহত্তত্বরূপ) আত্মাতে নিয়োজিত করিবেন; অর্থাৎ স্বীয় বুদ্ধি-বিজ্ঞানকে প্রথমজাত (হিরণ্যগর্ভের উপাধিভূত) বুদ্ধির ন্যায় স্বচ্ছ—নির্ম্মল করিবেন; সেই মহৎ আত্মাকেও আবার সর্ব্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্ম-রহিত, বিকার- শূন্য, সর্ব্বান্তরবর্তী ও সর্ব্বপ্রকার বুদ্ধি বিজ্ঞানের সাক্ষিস্বরূপ মুখ্য আত্মাতে(চৈতন্যময়ে) নিয়োজিত করিবেন ॥৬৭৷৷১৩
উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত। ক্ষুরস্য ধারা নিশিলা দুর্বত্যয়া দুর্গং পথস্তৎ
কবয়ো বদন্তি ॥ ৬৮॥১৪॥
[একাত্মদর্শনোপায়ং নিৰ্দ্দিশ্য মুমুক্ষুন্ প্রত্যুপদিশতি, -উত্তিষ্ঠতেতি]।[হে মুমুক্ষবঃ! যুয়ম্] উত্তিষ্ঠত(নানাবিধবিষয়চিন্তাং হিত্বা আত্মজ্ঞানোন্মুখা ভবত)৭. জাগ্রত(জাগৃত, অজ্ঞান মোহ-নিদ্রাৎ মুঞ্চত)। বরান্(শ্রেষ্ঠান্ আর্য্যান্) প্রাপ্য (আচার্য্যসমীপৎ গত্বা) নিবোধত(নিতরাং বুধ্যধ্বম্)।[তত্র সাবধানেন ভবিতব্যমিত্যত আহ,-ক্ষুরস্যেতি]। নিশিতা(তীক্ষ্ণীক্বতা) দুরত্যয়া(দুঃখেন অত্যেতুম্ অতিক্রমিতুৎ শক্যা, দৃঢ়তর-সাধনং বিনা অত্যেত্যুমশক্যা ইত্যর্থঃ)। ক্ষুরস্য(কেশনিকৃন্তনসাধনস্য) ধারা(ধারামিব প্রান্তভাগমিব) দুর্গং(দুঃখেন গন্তং শক্যৎ দুর্গমমিতি যাবৎ)। তৎ(তম্) পথঃ(পন্থানং তত্ত্বজ্ঞান-লক্ষণম্), কবয়ঃ(ক্রান্তদর্শিনঃ, বিবেকিন, ইতি যাবৎ) বদন্তি(কথয়ন্তি)। অত উত্তিষ্ঠত-জাগ্রতেত্যাহ্যক্তিযুক্তেতি ॥
श्री
[এইরূপে আত্মদর্শনের উপায় নির্দেশের পর মুমুক্ষুগণকে উপদেশ দিতেছেন যে, হে মুমুক্ষুগণ! তোমরা] উত্থিত হও অর্থাৎ বিবিধ বিষয় চিন্তা ত্যাগ করিয়া আত্মজ্ঞান লাভে উদ্যোগী হও;[মোহনিদ্রা ত্যাগ করিয়া] জাগ্রত হও; এবং শ্রেষ্ঠ আচার্য্য-সমীপে উপস্থিত হইয়া সম্যক্ জ্ঞান লাভ কর; বিবেকিগণ সেই আত্মজ্ঞানরূপ পথকে দুরতিক্রমণীয় তীক্ষ্ণ ক্ষুরধারার ন্যায় দুর্গম বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন ॥৬৮৷৷১৪৷৷
এবং পুরুষে আত্মনি সর্ব্বং প্রবিলাপ্য নাম-রূপ-কর্মময়ং যৎ মিথ্যাজ্ঞানবিজৃম্ভিতং ক্রিয়া-কারক-ফললক্ষণং স্বাত্মযাথাত্ম্যজ্ঞানেন, মরীচ্যুদক-রজ্জুসর্প-গগনমলানীব মরীচিরজ্জু-গগনরূপদর্শনেনৈব স্বস্থঃ প্রশান্তঃ কৃতকৃত্যো ভবতি যতঃ, অত- স্তদ্দর্শনার্থমনাদ্যবিদ্যাপ্রসুপ্তা উত্তিষ্ঠত হে জন্তবঃ! আত্মজ্ঞানাভিমুখা ভবত; জাগ্রত অজ্ঞাননিদ্রায়া ঘোররূপায়াঃ সর্ব্বানর্থবীজভূতায়াঃ ক্ষয়ং কুরুত। কথম্? প্রাপ্য উপগম্য বরান্—প্রকৃষ্টান্ আচার্য্যান্ তদ্বিদঃ তদুপদিষ্টং সর্ব্বান্তরমাত্মানম্ “অহমস্মি” ইতি নিবোধত অবগচ্ছত। ন হ্যপেক্ষিতব্যমিতি। শ্রুতিরনুকম্পয়াহ— মাতৃবৎ, অতিসূক্ষ্মবুদ্ধিবিষয়ত্বাবিজ্ঞেয়স্য। কিমিব সূক্ষ্মবুদ্ধিরিতি, উচ্যতে—ক্ষুরন্ত ধারা অগ্রং, নিশিতা তীক্ষ্ণীকৃতা দুরত্যয়া দুঃখেন অত্যয়ো যস্যাঃ, সা দুরত্যয়া, যথা সা পন্ড্যাং দুর্গমনীয়া, তথা দুর্গং দুঃসম্পাদ্যমিত্যেতৎ, পথঃ পন্থানং তত্ত্বজ্ঞানলক্ষণং মার্গং কবয়ো মেধাবিনো বদস্তি, জ্ঞেয়স্যাতিসূক্ষ্মত্বাৎ তদ্বিষয়স্য জ্ঞানমার্গস্য দুঃসম্পা- দ্যত্বং বদন্তীত্যভিপ্রায়ঃ ॥৬৮৷১৪৷
সূর্যকিরণ, রজ্জু ও গগনের প্রকৃত স্বরূপ-জ্ঞানে সূর্যকিরণে উদক, রজ্জুতে সর্প, এবং গগনে মালিন্য ভ্রম দূরীকরণের ন্যায় যেহেতু [জ্ঞানী] পুরুষ, অজ্ঞান-সমুৎপাদিত এবং ক্রিয়া-কারক-ফলাত্মক, নাম(সংজ্ঞা), রূপ(আকৃতি) ও কৰ্ম্ম(ক্রিয়া), এই তিনকে আত্ম- যাথার্থ্য জ্ঞানের দ্বারা আত্মাতে বিলীন করিয়া প্রকৃতিস্থ, প্রশান্ত (অনুদ্বিগ্ন) ও কৃতকৃত্য হন; অতএব হে অনাদি-অবিদ্যা-নিদ্রায় প্রসুপ্ত জীবগণ(প্রাণিগণ)! সেই আত্মতত্ত্ব দর্শনার্থ উত্থিত হও, অর্থাৎ আত্ম-
জ্ঞানে অভিমুখী হও, এবং জাগ্রৎ হও, অর্থাৎ সমস্ত অনর্থের বীজভূতি, ভয়ঙ্কর অজ্ঞান-নিদ্রার ক্ষয় কর। কি উপায়ে?—আত্মতত্ত্বজ্ঞ উত্তম আচার্য্যগণের সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের উপদেশ-লব্ধ, সর্বান্তরস্থ আত্মাকে ‘অহম্ অস্মি’(আমিই এই আত্মা) এইরূপে অবগত হও। ইহা উপেক্ষা করা উচিত নহে, এই কথা শ্রুতি মাতার ন্যায় দয়াপূর্বক বলিতেছেন,—কারণ, এই বেদিতব্য বিষয়টি(আত্ম- তত্ত্ব) অতিসূক্ষ্ম বা পরিমার্জিত-বুদ্ধিগম্য; এই কারণে শ্রুতি নিজেই মাতার ন্যায় দয়াপরবশ হইয়া বলিতেছেন যে, এ বিষয়ে উপেক্ষা করা উচিত নহে। কাহার ন্যায় সূক্ষ্মবুদ্ধি? তাই বলিতেছেন,— নিশিত—তীক্ষ্ণীকৃত, দুরত্যয় অর্থাৎ দুঃখে যাহাকে অতিক্রম করা যায়; সেই ক্ষুরধারা যেমন পাদদ্বয় দ্বারা দুর্গমনীয়, কবিগণ—মেধা বা ধারণাবতী বুদ্ধিযুক্ত পণ্ডিতগণ তেমনি সেই তত্ত্বজ্ঞানরূপ পথকে দুর্গ অর্থাৎ দুঃসম্পাদ্য(দুর্লভ) বলিয়া বর্ণনা করেন। অভিপ্রায় এই যে, বিজ্ঞেয় পদার্থটি অতিসূক্ষ্ম বলিয়াই তদ্বিষয়ে জ্ঞান সম্পাদনকে দুর্লভ বলিয়া বর্ণনা করেন ॥৬৮৷৷১৪৷৷
অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ং
তথায়সং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ।
অনাদ্যনন্তং মহতঃ পরং ধ্রুবং
নিচায্য তং মৃত্যুমুখাৎ প্রমুচ্যতে ॥৬৯॥১৫॥ ব্যাখ্যা।
[ইদানীম্ আত্মনোদুজ্ঞেয়ত্বে হেতুমুপন্যস্যতি অশব্দমিতি]—যদ্(ব্রহ্ম) অশব্দং(শব্দগুণহীনম্, ইথামিতি শব্দাবেদ্যঞ্চ), অস্পর্শং(স্পর্শগুণহীনম্; অতএব ন ত্বগ্বিষয়ঃ); অরূপম্(অতএব ন চক্ষুর্গোচরম্), অব্যয়ং(নির্বিকারং); তথা জরসং(রসগুণবর্জিতম্; অতএব রসনেন্দ্রিয়াবিষয়ঃ); নিত্যম্(জন্ম-নাশ- রহিতম্), অগন্ধবৎ(অতএব ঘ্রাণেন্দ্রিয়াবিষয়শ্চ) ভবতি।[তজ জ্ঞানং কেন মার্গেণ ভবতীত্যত আহ]—অনাঙ্গীতি। অনানন্তন্তম্(আত্মন্ত-বর্জিতম্)।
মহতঃ(মহত্তত্ত্বাতিমানিনঃ ‘হিরণ্যগর্ভাৎ) পরং ধ্রুবং(শশ্বদেকপ্রকারৎ) তং (প্রাগুক্তম্ আত্মানং) নিচায্য(বিচার্য্য শ্রবণাদিভির্নিশ্চিত্য তৎপরোক্ষজ্ঞান- দ্বারা) মৃত্যুমুখাৎ(সংসৃতিবন্ধাৎ) প্রমুচ্যতে(প্রকর্ষেণ মুচ্যতে)।[শব্দান্ত- বেদ্যোহপি সন্ আচার্য্যসহায়লব্ধশ্রবণমননধ্যানাবৃত্ত্যা প্রসন্নঃ স্বাপরোক্ষ্যং সম্পাদ্য বন্ধান্মোচয়তীতি ভাবঃ ॥
[ এখন আত্মার দুর্ব্বিজ্ঞেয়ত্বের কারণ প্রদর্শন করিতেছেন],—যিনি শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধবর্জিত এবং নিত্য(জন্ম-মরণরহিত), আদি-অন্তহীন ও মহত্তত্ব বা হিরণ্যগর্ভের উপাধি হইতেও পর(উৎকৃষ্ট)। সেই ধ্রুব(চিরদিন একরূপ) আত্মাকে চিন্তা করিয়া অর্থাৎ তদ্বিষয়ে বিচার করিয়া(তজ্জনিত সাক্ষাৎকারের ফলে)[মুমুক্ষু ব্যক্তি মৃত্যুর মুখস্বরূপ সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন] ॥ ৬৯ ॥ ১৫ ॥
তৎকথমতিসূক্ষ্মত্বং জ্ঞেয়স্যেতি উচ্যতে,-স্থূলা তাবদিয়ং মেদিনী শব্দস্পর্শরূপ- রসগন্ধোপচিতা সর্ব্বেন্দ্রিয়বিষয়ভূতা; তথা শরীরম্। তত্র একৈকগুণাপকর্ষেণ গন্ধাদীনাং সূক্ষ্মত্ব-মহত্ত্ব-বিশুদ্ধত্ব-নিত্যত্বাদিতারতম্যং দৃষ্টমবাদিযু যাবদাকাশম্, ইতি তে গন্ধাদয়ঃ সর্ব্ব এব স্থূলত্বাদ্বিকারাঃ শব্দান্তা যত্র ন সন্তি, কিমু তন্য সূক্ষ্মত্বাদিনিরতিশয়ত্বং বক্তব্যম্, ইত্যেতদ্দর্শয়তি শ্রুতিঃ,-অশব্দমস্পৃশমরূপমব্যয়ং তথাহরসং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ।
এতদ্ব্যাখ্যাতং ব্রহ্ম অব্যয়ং; যদ্ধি শব্দাদিমৎ, তৎ ব্যেতি; ইদন্ত অশব্দাদিমত্ত্বাৎ অব্যয়ং-ন ব্যেতি ন ক্ষীয়তে, অতএব চ নিত্যং; যদি ব্যেতি তদনিত্যম্; ইদন্ত ন ব্যেতি, অতো নিত্যম্। ইতৃশ্চ নিত্যম্-অনাদি অবিমোন আদিঃ কারণমস্য, তদিদমনাদি। যচ্চ আদিমৎ, তৎ কার্য্যত্বাদনিত্যৎ কারণে প্রলীয়তে,-যথা পৃথিব্যাদি। ইদন্ত সর্ব্বকারণত্বাদকার্য্যম্; অকার্য্যত্বান্নিত্যং, ন তন্য কারণমস্তি যস্মিন্ লীয়েত। তথা অনন্তম্-অবিদ্যমানোহন্তঃ কার্য্যং যন্য, তদনন্তম্। যথা কদল্যাদে: ফলাদিকার্য্যোৎপাদনেনাপ্যনিত্যত্বং দৃষ্টম্; ন চ তথাপ্যন্তবত্বং ব্রহ্মণঃ; অতোহপি নিত্যম্। মহতো মহত্তত্বাদ বুদ্ধ্যাখ্যাৎ পরং বিলক্ষণং নিত্যবিজ্ঞপ্তি- স্বরূপত্বাৎ; সর্ব্বসাক্ষি হি সর্বভূতাত্মত্বাদ ব্রহ্ম। উক্তং হি “এব সর্ব্বেধু ভূতেষু”
ইত্যাদি। ধ্রুবঞ্চ কূটস্থং নিত্যং, ন পৃথিব্যাদিবদাপেক্ষিকং নিত্যত্বম্। তদেবস্তুতং ব্রহ্ম আত্মানং নিচায্য অবগম্য তম্’ আত্মানং, মৃত্যুমুখাৎ মৃত্যুগোচরাৎ অবিদ্যা- কামকর্মলক্ষণাৎ প্রমুচ্যতে বিযুজ্যতে ॥ ৬৯ ॥ ১৫ ॥
সেই জ্ঞেয় ব্রহ্ম পদার্থের অতি সূক্ষমতা কেন?[ইহার উত্তরে] বলা হইতেছে যে,—শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধগুণে পরিপুষ্ট এই স্থূল পৃথিবী সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়(গ্রহণ-যোগ্য); শরীরও ঠিক সেইরূপ। জল হইতে আকাশ পর্য্যন্ত ভূতচতুষ্টয়ে গন্ধাদি গুণের এক একটির অভাবে সূক্ষমত্ব, মহত্ত্ব, বিশুদ্ধত্ব ও নিত্যত্ব প্রভৃতি ধর্ম্মের তারতম্য পরিদৃষ্ট হয়। অতএব স্থূলতানিবন্ধন বিকারাত্মক গন্ধাদি শব্দ পর্য্যন্ত গুণসমুদয় যাহাতে বিদ্যমান নাই, তাহার যে সর্বাধিক সূক্ষমত্বাদি থাকিবে, তাহাও কি আর বলিতে হয়? “অশব্দম্, অস্পর্শম, অরূপম, অব্যয়ং, তথারসং নিত্যম্ অগন্ধবচ্চ য়ুৎ” এই শ্রুতি ঐ অর্থই প্রতিপাদন করিতেছেন,—
এই ব্যাখ্যাত ব্রহ্ম অব্যয়; কারণ, যাহা শব্দাদি-গুণবিশিষ্ট, তাহাই বিশেষ রূপ(অর্থাৎ বিকার) প্রাপ্ত হয়; কিন্তু এই ব্রহ্ম শব্দাদি-গুণহীন বলিয়া অব্যয়, অর্থাৎ ক্ষয়প্রাপ্ত হন না। এই কারণে নিত্যও বটে; কারণ, যাহা বিকার প্রাপ্ত হয়, তাহাই অনিত্য হয়, কিন্তু আত্মা যেহেতু বিকারপ্রাপ্ত হয় না, অতএব নিত্য। আর এই কারণেও নিত্য,-তিনি অনাদি; যাহার আদি--কারণ নাই, তিনি অনাদি; যাহা আদিমান, তাহাই কার্য্য(উৎপন্ন), কার্য্যত্ব হেতুই অনিত্য, অনিত্য বস্তুমাত্রই কারণে বিলীন হইয়া থাকে; যেমন [অনিত্য] পৃথিবী প্রভৃতি। কিন্তু, এই ব্রহ্ম সমস্ত বস্তুরই কারণ; সুতরাং অকার্য্য; অকার্য্যত্ব হেতুই নিত্য-তাঁহার এমন কোনও কারণ নাই, যাহাঁতে বিলীন হইতে পারেন। সেইরূপ[তিনি] অনন্ত; যাহার অন্ত বা বিনাশ নাই, তাহা অনন্ত; কদলী প্রভৃতি বৃক্ষের
১৫
যেরূপ ফলোৎপাদনের পরে(বিনাশ হওয়ায়) অনিত্যত্ব দৃষ্ট হয়, ব্রহ্মের সেরূপও অন্ত(বিনাশও) নাই, এই কারণেও তিনি নিত্য। মহৎ অর্থাৎ মহত্তত্ত্ব অপেক্ষাও পর অর্থাৎ ভিন্নপ্রকার; কারণ তিনি নিত্য জ্ঞান স্বরূপ। বিশেষতঃ ব্রহ্ম সর্ব্বভূতের আত্মা, এই কারণে সর্ব্বসাক্ষী বা সর্ব্বান্তর্যামী। ‘সর্ব্বভূতে গূঢ় বা অন্তর্নিহিত এই আত্মা’, ইত্যাদি বাক্যেও ইহা উক্ত হইয়াছে। ধ্রুব অর্থাৎ কূটস্থ নিত্য, পৃথিব্যাদির ন্যায় তাঁহার নিত্যত্ব আপেক্ষিক নহে। এবস্তৃত সেই ব্রহ্মস্বরূপ আত্মাকে অবগত হইয়া মৃত্যুমুখ অর্থাৎ মৃত্যুর অধিকারস্থ অবিদ্যা, কামনা ও কর্ম্ম হইতে প্রমুক্ত হয়, অর্থাৎ বিযুক্ত হয় ॥৬৯৷১৫৷৷
নাচিকেতমুপাখ্যানং মৃত্যুপ্রোক্তং সনাতনম্।
উক্তা শ্রুত্বা চ মেধাবী ব্রহ্মলোকে মহীয়তে ॥৭০॥১৬॥
[ এবং বেদপুরুষঃ যম-নচিকেতঃসংবাদমনুদ্য সাধুশিক্ষায়ৈ এতদ্বিদ্যাপ্রবচন- শ্রবণয়োঃ ফলোক্তিপূর্ব্বকমুপসংহরতি, -নাচিকেতমিতি]। মেধাবী(পণ্ডিতঃ) মৃত্যুপ্রোক্তং(যমেন কথিতং)[বস্তুতস্ত] সনাতনম্(অনাদিকালপ্রবৃত্তং, বেদস্য অনাদিত্বাদিত্যাশয়ঃ) নাচিকেতম্(নচিকেতঃসম্বন্ধি, যম-নচিকেতঃসংবাদরূপম্) উপাখ্যানম্(চরিতম্) উক্তা(জিজ্ঞাসবে ব্যাখ্যায়),[স্বয়ং] চ শ্রুত্বা ব্রহ্মলোকে(ব্রহ্ম এব লোকঃ-ব্রহ্মলোকঃ, তস্মিন্) মহীয়তে(উপাস্যতে)।
মেধাবী(বিবেকী) ব্যক্তি মৃত্যু—যম কর্তৃক কথিত, সনাতন(অনাদি) এই ‘নাচিকেত’ উপাখ্যান(চরিত্র) অপরের নিকট ব্যাখ্যা করিয়া এবং নিজেও শ্রবণ করিয়া ব্রহ্মলোকে(ব্রহ্মবৎ) পূজিত হন ॥ ৭০৷৷ ১৬॥
প্রস্তুতবিজ্ঞানস্তুত্যর্থমাহ শ্রুতিঃ-নাচিকেতং নচিকেতসা প্রাপ্তং নাচিকেতৎ, মৃত্যুনা প্রোক্তং মৃত্যুপ্রোক্তম্ ইদমুপাখ্যানমাখ্যানং বল্লীত্রয়লক্ষণং সনাতনং চিরন্তনং বৈদিকত্বাৎ, উক্ত্বা ব্রাহ্মণেভ্যঃ। শ্রুত্বা চ আচার্য্যেভ্যঃ মেধাবী,
ব্রহ্মৈব লোকো ব্রহ্মলোকস্তস্মিন্ ব্রহ্মলোকে মহীয়তে আত্মভূত উপাস্যো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ৭০ ॥ ১৬ ॥
বর্ণিত বিজ্ঞান-প্রশংসার্থ শ্রুতি বলিতেছেন,—নাচিকেত অর্থাৎ নচিকেতা কর্তৃক প্রাপ্ত—‘নাচিকেত’ এবং মৃত্যু কর্তৃক যাহা উক্ত সেই মৃত্যুপ্রোক্ত এই বল্লীত্রয়রূপ উপাখ্যানটি সনাতন, অর্থাৎ বেদোক্ত বলিয়া চিরন্তন(অনাদি); ইহা ব্রাহ্মণগণের উদ্দেশে বলিয়া এবং আচার্য্যগণের নিকট শ্রবণ করিয়া মেধাবী(বিবেকী) ব্যক্তি ব্রহ্মস্বরূপ যে লোক ব্রহ্মলোক, তাহাতে মহিত হন অর্থাৎ আত্মস্বরূপ হইয়া[সকলের] উপাস্য হন ॥৭০॥১৬৷৷
য ইমং * পরমং গুহ্যং শ্রাবয়েদ্ ব্রহ্মসংসদি।
প্রযতঃ শ্রাদ্ধকালে বা তদানন্ত্যায় কল্পতে ॥
তদানন্ত্যায় কল্পত ইতি ॥৭১॥১৭৷৷ ইতি কাঠকোপনিষদি তৃতীয়া বল্লী সমাপ্তা ॥১॥৩৷৷ ইতি প্রথমোহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥
ব্যাখ্যা।
[পুনশ্চ ফলান্তরকথনেন অধ্যায়মুপসংহরতি]—যঃ(জনঃ) প্র (সংযতচিত্তঃ সন্) পরমং(নিরতিশয়ং) গুহ্যম্(যস্মৈ কস্মৈচিৎ অবাচ্যম্) ইমম্(উপাখ্যানরূপং গ্রন্থং) ব্রহ্মসংসদি(ব্রাহ্মণ-সভায়াং) শ্রাদ্ধকালে বা শ্রাবয়েৎ(গ্রন্থং তদর্থং চ বোধয়েৎ), তৎ(শ্রাবণং) আনন্ত্যায়(অনন্তফলোৎ- পত্তয়ে) কল্পতে(সমর্থং ভবতি) ॥
অনুবাদ।
যিনি সংযতচিত্তে পরম গুহ্য(গোপনীয়) এই উপাখ্যান ব্রাহ্মণ-সভায় কিংবা শ্রাদ্ধকালে শ্রবণ করান, অর্থাৎ এই উপাখ্যান পাঠ করেন, কিংবা ইহার অর্থ বুঝাইয়া দেন, তাহা[তাঁহার] অনন্ত ফলোৎপাদনে সমর্থ হয় ॥ ৭১ ॥ ১৭ ॥ ইতি কাঠকোপনিষদি প্রথমাধ্যায়স্য তৃতীয়বল্লী-ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥১॥৩॥
যঃ কশ্চিদিমং গ্রন্থং পরমং প্রকৃষ্টং, গুহ্যং গোপ্যং শ্রাবয়েৎ গ্রন্থতোহর্থতশ্চ, ব্রাহ্মণানাং সংসদি ব্রহ্মসংসদি, প্রযতঃ শুচিভূত্বা, শ্রাদ্ধকালে বা শ্রাবয়েৎ, ভুঞ্জানান্ তৎ শ্রাদ্ধম্ অস্য অনন্ত্যায় অনন্তফলায় কল্পতে সম্পদ্যতে। দ্বির্বচন- মধ্যায়পরিসমাপ্যর্থম্ ॥ ৭১ ॥ ১৭ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-গোবিন্দ-ভগবৎ-পূজ্যপাদ-শিষ্য- শ্রীমচ্ছঙ্করাচার্য্য-বিরচিত-কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে
প্রথমোহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥
যে কোন লোক প্রযত অর্থাৎ শুচি হইয়া পরম অর্থাৎ উৎকৃষ্ট ও গুহ্য অর্থাৎ গোপনীয় এই গ্রন্থ ও গ্রন্থার্থ ব্রাহ্মণের সভায় কিংবা শ্রাদ্ধকালে ভোক্তাদিগকে শ্রবণ করান, ইহার সেই শ্রাদ্ধ অনন্ত ফলের নিমিত্ত সম্পন্ন হয়। শ্রুতিতে “তদানন্ত্যায় কল্পতে” বাক্যটীর দ্বিরুক্তি অধ্যায় সমাপ্তি-সূচক ॥৭১৷১৭৷৷
ইতি কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদের প্রথমাধ্যায়ে তৃতীয়বল্লী সমাপ্ত ॥
প্রথমা বল্লী।
পরাঞ্চি খানি, ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভূ- স্তস্মাৎ পরাঙ্ পশ্যতি নান্তরাত্মন্। কশ্চিদ্ধীরঃ প্রত্যগাত্মানমৈক্ষ- দাবৃত্তচক্ষুরমৃতত্বমিচ্ছন্ ॥৭২॥১৷৷
[আত্মনো দুরধিগমত্ব-কারণং বক্ত মুপক্রমতে,-পরাঞ্চীতি]। স্বয়ম্ভূঃ (স্বয়মেব ভবতীতি স্বতন্ত্রঃ পরমেশ্বরঃ), খানি(ইন্দ্রিয়াণি) পরাঞ্চি(পরাণি বাহ্য-বস্তুনি অঞ্চন্তি গচ্ছন্তি ইতি,-পরাম্মুখানি)[অতএব] ব্যতৃণৎ (কুৎসিতান্যকরোৎ,-হিংসিতবানিত্যর্থো বা)। তস্মাৎ(কারণাৎ)[জীবঃ] পরাঙ্(বাহ্যান্ বিষয়ান্) পশ্যতি। অন্তরাত্মন্(অন্তরাত্মানম্) ন[পশ্যতি]। কশ্চিৎ(কশ্চিদেব) ধীরঃ(জ্ঞানী) অমৃতত্বং(মুক্তিম্) ইচ্ছন্ আবৃত্তচক্ষুঃ (চক্ষুরিত্যুপলক্ষণং তেন বিষয়েভ্যঃ প্রত্যাহৃত-সর্ব্বেন্দ্রিয়ঃ সন্) প্রত্যগাত্মানম্ (ব্রহ্মস্বরূপম্ আত্মানমু) ঐক্ষৎ(ঐক্ষত-সাক্ষাৎ পশ্যতীত্যর্থঃ) ॥
আত্মার দুজ্ঞেয়ত্বের কারণ বলা হইতেছে—স্বয়ম্ভু অর্থাৎ স্বাধীন পরমেশ্বর ইন্দ্রিয়গণকে বাহ্যপদার্থদর্শী করিয়া নির্মাণ করিয়াছেন; সেই কারণে জীব বাহ্য বস্তুই দর্শন করে, অন্তরাত্মাকে দর্শন করে না। অল্পমাত্র ধীর ব্যক্তিই মুক্তি- লাভের ইচ্ছায় ইন্দ্রিয়গণকে বাহ্য বিষয় হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া পরমাত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন ॥ ৭২ ॥ ১ ॥
“এষ সর্ব্বেষু ভূতেষু গূঢ়াত্মা ন প্রকাশতে। দৃশ্যতে ত্বগ্র্যয়া বুদ্ধ্যা” ইত্যুক্তম্। কঃ পুনঃ প্রতিবন্ধোহগ্র্যায়া বুদ্ধেঃ, যেন তদভাবাদাত্মা ন দৃশ্যতে? ইতি তদ্দর্শনকারণপ্রদর্শনার্থা বল্লী আরভ্যতে। বিজ্ঞাতে হি শ্রেয়ঃপ্রতিবন্ধ- কারণে তদপনয়নায় যত্ন আরব্ধং শক্যতে নান্যথেতি।
পরাঞ্চি পরাক্ অঞ্চন্তি গচ্ছন্তীতি খানি তদুপলক্ষিতানি শ্রোত্রাদীনি ইন্দ্রিয়াণি খানি ইত্যুচ্যন্তে। তানি পরাঞ্চ্যেব শব্দাদিবিষয়-প্রকাশনায় প্রবর্তন্তে। যম্মাদেবং- স্বভাবকানি তানি ব্যতৃণৎ হিংসিতবান্ হননং কৃতবানিত্যর্থঃ। কোহসৌ? স্বয়ভূঃ যঃ পরমেশ্বরঃ-স্বয়মেব স্বতন্ত্রো ভবতি, সর্ব্বদা, ন পরতন্ত্র ইতি। তস্মাৎ পরাঙ্ প্রত্যগ্রপান অনাত্মভূতান্ শব্দাদীন্ পশ্যতি উপলব্ধতে উপলব্ধা, ন অন্ত- রাত্মন্-ন অন্তরাত্মানমিত্যর্থঃ। এবংস্বভাবেহপি সতি লোকস্য, * কশ্চিৎ নদ্যাঃ প্রতিস্রোতঃপ্রবর্তনমিব ধীরো ধীমান্ বিবেকী প্রত্যগাত্মানং প্রত্যক্ চাসা- বাত্মা চেতি প্রত্যগাত্মা, প্রতীচ্যেবাত্মশব্দো রূঢ়ো লোকে নান্যস্মিন্; ব্যুৎপত্তিপক্ষে- হপি তত্রৈবাত্মশব্দো. বর্ত্ততে,-“যচ্চাপ্নোতি যদাদত্তে যচ্চাত্তি বিষয়ানিহ। যচ্চাস্য সন্ততো ভাবস্তস্মাদাত্মেতি কীর্ত্যত” ইতি আত্মশব্দব্যুৎপত্তিস্মরণাৎ। তং প্রত্যগাত্মানং স্বস্বভাবমৈক্ষৎ অপশ্যৎ পশ্যতীত্যর্থঃ, ছন্দসি কালানিয়মাৎ। কথং পশ্যতি? ইত্যুচ্যতে,-আবৃত্তচক্ষুঃ। আবৃত্তং ব্যাবৃত্তং চক্ষুঃ শোত্রাদিকমিন্দ্রিয়জাতম্ অশেষবিষয়াদ যস্য, স আবৃত্তচক্ষুঃ, স এবং সংস্কৃতঃ প্রত্যগাত্মানং পশ্যতি, ন হি বাহ্যবিষয়ালোচনপরত্বং প্রত্যগাত্মেক্ষণঞ্চৈকস্য সম্ভবতীতি। কিমিচ্ছন্ পুনরিখং মহতা প্রয়াসেন স্বভাবপ্রবৃত্তিনিরোধং কৃত্বা ধীরঃ প্রত্যগাত্মানং পশ্যতীতি? উচ্যতে,-অমৃতত্বম্ অমরণধৰ্ম্মত্বং নিত্যস্বভাবতামিচ্ছন্ আত্মন ইত্যর্থঃ ॥৭২৷১৷
পূর্ব্ববল্লীতে কথিত হইয়াছে যে, ‘এই আজ্ঞা সর্ব্বভূতে নিগূঢ়
আছেন,[এই কারণে সকলের নিকট] ‘প্রকাশ পান না; কিন্তু একাগ্রতা-সম্পন্ন, সূক্ষম বুদ্ধি দ্বারা দৃষ্ট হন।’ এখন জিজ্ঞাস্য হইতেছে যে, সেই একাগ্রতাসম্পন্ন বুদ্ধি লাভের প্রতিবন্ধক বা বাধক কি আছে? যাহাতে তাহার অভাবে আত্মা দৃষ্ট হইতেছে না। এই হেতু সেই অদর্শনের কারণ-প্রদর্শনার্থ এই বল্লী আরব্ধ হইতেছে। কারণ, শ্রেয়োলাভের প্রতিবন্ধক’ কারণটি জানিতে পারিলেই তাহার অপসারণের জন্য যত্ন আরম্ভ করা যাইতে পারে, না জানিলে পারা যায় না।
বাহ্য বিষয়ে গমন করে বলিয়া ইন্দ্রিয়গণকে ‘পরাঞ্চি’(পরাক্) বলা হইয়াছে। এখানে ‘খানি’ কথাটি শ্রোত্রাদি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের উপলক্ষক; এই কারণে ‘খানি’ পদে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়গণ উক্ত হইল। সেই ইন্দ্রিয়গণ শব্দাদি বিষয়ের প্রকাশার্থ বহির্মুখ হইয়াই প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; যেহেতু,[পরমেশ্বর] এবংবিধ স্বভাবসম্পন্ন করিয়া ইন্দ্রিয়-সমূহকে হিংসা বা হনন করিয়াছেন। ইনি(হিংসাকারী) কে? —স্বয়ম্ভু—পরমেশ্বর; যিনি স্বয়ংই সর্বদা স্বতন্ত্রভাবে(স্বাধীনভাবে) থাকেন, কখনও পরতন্ত্র বা পরাধীন হন না। সেই হেতুই(জীব) পরাক্ অর্থাৎ বাহ্য—অনাত্মভূত শব্দাদি-বিষয়-সমূহই দর্শন করে— অর্থাৎ উপলব্ধি করিয়া থাকে; অন্তরাত্মন্ অর্থাৎ অন্তরাত্মাকে দর্শন করিতে পারে না। সাধারণ জীবলোকের এইরূপ স্বভাব হইলেও সকলে যেমন নদীর স্রোতকে বিপরীতগামী করিতে পারে না, [অতি অল্প লোকেই পারে], তেমন কোনও ধীর অর্থাৎ বিবেকশালী পুরুষই প্রত্যস্বরূপ আত্মাকে অর্থাৎ স্বীয় প্রকৃত স্বরূপ দর্শন করিয়াছেন; বেদেতে কালের নিয়ম না থাকায় এখানে দর্শন করিয়া থাকেন, এইরূপই অর্থ করিতে হইবে। কিরূপে দর্শন করেন? তদুত্তরে বলিতেছেন—‘আবৃত্তচক্ষুঃ’। যাঁহার চক্ষুঃ অর্থাৎ শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়সমূহ সর্ব্ববিষয় হইতে আবৃত্ত—প্রত্যাহৃত হইয়াছে, তিনিই
‘আবৃত্তচক্ষুঃ’; তিনি এইরূপে সংস্কারসম্পন্ন হইয়া প্রত্যগাত্মাকে দর্শন করেন। কারণ, একই ব্যক্তির পক্ষে বাহ্য বিষয়ের আলোচনা ও পরমাত্ম-সন্দর্শন সম্ভবপর হয় না। ভাল, ধীরব্যক্তি কি কারণে এরূপ মহাপ্রযত্নে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির নিরোধ সম্পাদন করিয়া প্রত্যগাত্মাকে দর্শন করেন? এই আশঙ্কায় বলা হইতেছে যে, অমৃতত্ব—মরণ-রাহিত্য অর্থাৎ নিজের নিত্যসিদ্ধ স্বভাব বা স্বরূপ পাইবার ইচ্ছায়। লোকব্যবহারে ‘আত্ম’-শব্দটি প্রত্যক্ অর্থেই (ব্যাপক চৈতন্য অর্থেই) প্রসিদ্ধ; তদ্ভিন্ন(দেহাদি) অর্থে প্রসিদ্ধ নহে। এই কারণে “প্রত্যগাত্মানম্” কথায় প্রত্যক্স্বরূপ ‘আত্মা’ অর্থই বুঝিতে হইবে। আর যৌগিকার্থানুসারেও ‘আত্ম’ শব্দে সেই ‘প্রত্যক্’ অর্থই প্রতিপাদন করে। কারণ, স্মৃতিতে আছে— “যেহেতু ব্যাপিয়া থাকে, যেহেতু আদান বা গ্রহণ করে, যেহেতু জগতে বিষয় ভোগ করে এবং যেহেতু ইহার ভাব বা সত্তা চিরদিন ‘সন্তত বা অবিচ্ছিন্ন ভাবে থাকে, সেই হেতু ‘আত্মা’ বলিয়া কথিত হয়।” স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত এই ব্যুৎপত্তি অনুসারেও আত্মশব্দে দেহাদি অর্থ না বুঝিয়া ব্যাপক চৈতন্য অর্থ বুঝিতে হইবে ॥৭২॥১৷৷
পরাচঃ কামাননুযন্তি বালা- স্তে মৃত্যোর্যন্তি বিততস্য পাশম্। অথ ধীরা অমৃতত্বং বিদিত্বা ধ্রুবমধ্রুবেম্বিহ ন প্রার্থয়ন্তে ॥, ৭৩ ॥ ২
ব্যাখ্যা।
[মুমুক্ষুঃ সর্ব্বথা অপ্রমাদী স্যাদিত্যাহ, পরাচ ইতি]। যে বালাঃ(বালবৎ অবিবেকিনঃ) পরাচ:(বাহ্যান্) কামান্(স্রক্-চন্দন-বনিতাদিবিষয়ান্) অনুযন্তি (অনুসরন্তি) তে বিততস্য(বহুকালব্যাপিনঃ) মৃত্যোঃ(অবিদ্যাকামকৰ্ম্মাদেঃ) পাশম্(বন্ধম্—তৎকৃত-জনন-মরণাদিক্লেশম্) যন্তি(প্রাপ্নুবন্তি)। অথ(তস্মাৎ) ইহ(লোকে) ধীরাঃ(বিবেকিনঃ) ধ্রুবম্(কুটস্থম্) অমৃতত্বম্(মোক্ষম্) বিদিত্বা
(জ্ঞাত্বা) অধ্রবেষু(বিত্তাদিষু বিষয়েষু) ন প্রার্থয়ন্তে[কিঞ্চিৎ ইতি শেষঃ] চ যদ্বা, অধ্রবেষু(অনিত্যেষু পদার্থেয়ু) ধ্রুবম্(‘নিত্যম্-স্থিরবিদম্, ইতি মত্বা) ন প্রার্থয়ন্তে ইত্যর্থঃ ॥
মুমুক্ষু ব্যক্তির যে সর্ব্বতোভাবে সাবধান থাকা আবশ্যক, তাহা বলিতেছেন— বালকগণ অর্থাৎ বালকের ন্যায় অবিবেকসম্পন্ন যে সকল লোক বাহ্য শব্দাদি বিষয়ের অনুসরণ করিয়া থাকে, তাহারা অতি মহৎ(বহুকালব্যাপী) অবিদ্যা- বাসনাদিরূপ মৃত্যুর পাশ অর্থাৎ জন্ম-মরণাদি ক্লেশ প্রাপ্ত হয়। এই কারণে ধীরগণ ধ্রুব অর্থাৎ প্রকৃত সত্য মোক্ষের স্বরূপ অবগত হইয়া এই জগতে অধ্রুব বা মিথ্যা বস্তু বিষয়ে কিছুই প্রার্থনা বা পাইতে ইচ্ছা করেন না ॥ ৭৩ ॥ ২ ॥
যৎ তাবৎ স্বাভাবিকং পরাগেবানাত্মদর্শনম্, তদাত্মদর্শনস্য প্রতিবন্ধকারণ- মবিদ্যা, তৎপ্রতিকূলত্বাৎ যা চ পরাক্ষু এবাবিদ্যোপপ্রদর্শিতেষু দৃষ্টাদৃষ্টেয় ভোগেষু তৃষ্ণা, তাভ্যামবিদ্যা-তৃষ্ণাভ্যাং প্রতিবন্ধাত্মদর্শনাঃ পরাচো বহির্গতানেব কামান্ কাম্যান্ বিষয়ান্ অনুযন্তি অনুগচ্ছন্তি, বালা অল্প প্রজ্ঞাঃ। তে তেন কারণেন মৃত্যো- রবিদ্যাকামকৰ্ম্মসমুদায়স্য যন্তি গচ্ছন্তি বিততস্থ্য বিস্তীর্ণস্থ্য সর্ব্বতো ব্যাপ্তস্য পাশম্— পাশ্যতে বধ্যতে যেন, তং পাশম্—দেহেন্দ্রিয়াদিসংযোগ-বিয়োগলক্ষণম্ অনবরতং জন্ম-মরণ-জরা-রোগাদ্যনেকানর্থব্রাতং প্রতিপদ্যন্ত ইত্যর্থঃ। যত এবম্, অথ তস্মাৎ ধীরা বিবেকিনঃ প্রত্যগাত্মস্বরূপাবস্থানলক্ষণম্ অমৃতত্বং ধ্রুবং বিদিত্বা। দেবাদ্যমৃতত্বং হ্যাধ্রবম্, ইদন্তু প্রত্যগাত্মস্বরূপাবস্থানলক্ষণম্ ধ্রুবম্, “ন কৰ্ম্মণা বর্দ্ধতে, নো কনীয়ান্” ইতি শ্রুতেঃ। তদেবস্তুতং কূটস্থম্ অবিচাল্যম্ অমৃতত্বং বিদিত্বা অক্রবেষু সর্ব্বপদার্থেযু অনিত্যেষু নির্দ্ধার্য্য ব্রাহ্মণা ইহ সংসারেহুনর্থপ্রায়ে ন প্রার্থয়ন্তে কিঞ্চিদপি; প্রত্য- গাত্মদর্শন প্রতিকূলত্বাৎ। পুত্র-বিত্ত-লোকৈষণাভ্যো ব্যুতিষ্ঠন্ত্যেবেত্যভিপ্রায়ঃ ॥৭৩৷২
লোকের স্বভাবসিদ্ধ যে বাহ্য অনাত্ম-পদার্থ-দর্শন, আত্মদর্শনের প্রতিকূল বলিয়া তাহাই অবিদ্যা-পদবাচ্য, সেই অবিদ্যা এবং আত্ম- দর্শনের প্রতিকুলাত্মক অবিদ্যা-সম্পাদিত যে ঐহিক ও পারলৌকিক বাহ্য-বিষয়ে ভোগ-তৃষ্ণা, এতদুভয়ের দ্বারা যে সকল বালক বা অল্প-
১৬
বুদ্ধি লোক আত্মদৃষ্টি-রহিত হইয়া পরাক্ অর্থাৎ কেবল অনাত্ম-বাহ্য বিষয়সমূহের অনুগমন বা অনুসরণ করে, তাহারা সেই কারণেই বিতত অর্থাৎ বিস্তীর্ণ—সর্ব্বতোভাবে পরিব্যাপ্ত অবিদ্যা কামনা ও কৰ্ম্ম, এতৎসমুদয়াত্মক মৃত্যুর—যাহা দ্বারা[জীবগণ] আবদ্ধ হয়, সেই দেহেন্দ্রিয়াদির সংযোগ-বিয়োগাত্মক, পাশ অর্থাৎ নিরন্তর জন্ম, মরণ, জরা ও রোগ প্রভৃতি বহুবিধ অনর্থরাশি প্রাপ্ত হয়। যেহেতু [অবিবেকে] এইরূপ হয়, সেই হেতুই ধীর অর্থাৎ বিবেকিগণ, ব্রহ্মাত্মভাবে অবস্থানরূপ অমৃতত্বকে(মোক্ষকে) ‘ধ্রুব’ জানিয়া, (অর্থাৎ দেবাদিভাবরূপ যে অমৃতত্ব, উহা ‘অধ্রুব(চিরস্থায়ী নহে), কিন্তু এই ব্রহ্মাত্মস্বরূপে অবস্থিতিরূপ অমৃতত্বই ধ্রুব, কারণ, শ্রুতি বলিয়াছেন—‘ইহা কৰ্ম্ম দ্বারা বৃদ্ধিও পায় না, হ্রাসও পায় না’। এইরূপ কূটস্থ(যাহা চিরকাল একরূপে থাকে, এমন) এবং কোন কর্মের স্বরূপ ফল নহে; ইহা জানিয়া ব্রাহ্মণগণ এই অনর্থবহুল ‘সংসারে অনিত্য সর্ব্বপদার্থমধ্যে কিছুই প্রার্থনা করেন না। কারণ, তৎসমস্তই পরমাত্ম-দর্শনের প্রতিকূল; এইজন্য তাঁহারা পুত্র, বিত্ত ও লোকবিষয়ক কামনা হইতে ব্যুত্থান করেন; অর্থাৎ সেই সমুদয়ের কামনা পরিত্যাগ করেন ॥ ৭৩॥২॥
যেন রূপং রসং গন্ধং শব্দান্ স্পর্শাংশ মৈথুনান্। এতেনৈব বিজানাতি কিমত্র পরিশিষ্যতে এতদ্বৈ তৎ ॥৭৪৷৷৩৷৷
[ যদধিগমে অন্যত্র প্রার্থনানিবৃত্তির্ভবতি, তংস্বরূপ-বিবক্ষয়া আহ,- যেনেতি]। যেন এতেনৈব(জ্ঞানস্বরূপেণ আত্মনা প্রেরিতো জীবঃ) রূপম্, রসম্, গন্ধম্, শব্দান্, মৈথুনান্(পরস্পর-সংযোগজান্) স্পর্শান্ চ বিজানাতি; অত্র(আত্মনি, আত্মস্বরূপাবস্থিতিরূপে মোক্ষে ইত্যর্থঃ),[জ্ঞাতব্যতয়া] কিং পরিশিষ্যতে?[ন কিঞ্চিদপীত্যর্থঃ। স সর্ব্বজ্ঞো ভবতীত্যভিপ্রায়ঃ]। এতৎ বৈ(এতদেব নচিকেতসা পৃষ্টম্) তৎ(বিষ্ণোঃ পরমং পদমিত্যর্থঃ)।
যাহার লাভে অন্য সর্ব্ববিষয়ে তৃষ্ণার নিবৃত্তি হইয়া যায়, তাহার স্বরূপ নির্দেশের অভিপ্রায়ে বলিতেছেন,[জীব] এই যে জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মার [প্রেরণায় প্রেরিত হইয়া] রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও পরস্পরের সংযোগ-জাত স্পর্শ অবগত হয়, ইহাতে অর্থাৎ সেই আত্মাধিগমাত্মক মোক্ষে আর কি[জ্ঞাতব্য] অবশিষ্ট থাকে? অর্থাৎ সে অবস্থায় কিছুই আর জ্ঞাতব্য থাকে না, তখন আত্মা সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করে ॥৭৪॥৩৷৷
যদ্বিজ্ঞানাৎ ন কিঞ্চিদন্যৎ প্রার্থয়ন্তে ব্রাহ্মণাঃ, কথং তদুধিগম ইতি? উচ্যতে- যেন বিজ্ঞানস্বভাবেন আত্মনা রূপং রসং গন্ধং শব্দান্ স্পর্শান্ চ মৈথুনান্ মৈথুন- নিমিত্তান্ সুখপ্রত্যয়ান’ বিজানাতি বিস্পষ্টং জানাতি সর্ব্বো লোকঃ। ননু নৈবং প্রসিদ্ধির্লোকস্য ‘আত্মনা দেহাদিবিলক্ষণেনাহং জানামি’ ইতি; ‘দেহাদিসঙ্ঘা- তোহহং জানামি,’ ইতি তু সর্ব্বো লোকোহবগচ্ছতি। নমু দেহাদিসঙ্ঘাতস্যাপি শব্দাদিস্বরূপত্বাবিশেষাবিজ্ঞেয়ত্বাবিশেষাচ্চ ন যুক্তং বিজ্ঞাতৃত্বম্। যদি হি দেহাদি- সঙ্ঘাতো রূপাদ্যাত্মকঃ সন্ রূপাদীন্ বিজানীয়াৎ, তর্হি বাহ্যা অশি রূপাদয়োহন্যোন্তং স্বং স্বং রূপঞ্চ বিজানীয়ুঃ; ন চৈতদস্তি। তস্মাৎ দেহাদিলক্ষণাংশ রূপাদীন্ এতেনৈব দেহাদিব্যতিরিক্তেনৈব বিজ্ঞানস্বভাবেন আত্মনা বিজানাতি লোকঃ। যথা, যেন লৌহো দহতি, সোহগ্নিরিতি তদ্বৎ। আত্মনোহবিজ্ঞেয়ং কিমত্র অস্মিন্ লোকে পরিশিষ্যতে, ন কিঞ্চিৎ পরিশিষ্যতে, সর্ব্বমেব ত্বাত্মনা বিজ্ঞেয়ম্। যস্যাত্মনো- হবিজ্ঞেয়ং ন কিঞ্চিৎ পরিশিষ্যতে, স আত্মা সর্ব্বজ্ঞঃ। এতদ্বৈ তৎ। কিং তৎ? যৎ নচিকেতসা পৃষ্টম্, দেবাদিভিরপি বিচিকিৎসিতম্, ধর্ম্মাদিভ্যোহন্যৎ বিষ্ণোঃ পরমং পদম্, যস্মাৎ পরং নাস্তি, তদ্বৈ এতদধিগতমিত্যর্থঃ ॥ ৭৪ ॥ ৩॥
যাহাকে জানিলে পর’ ব্রাহ্মণগণ অন্য কিছুই প্রার্থনা করেন না, তাহাকে জানা যায় কি উপায়ে? তাহা বলিতেছেন,—সমস্ত লোক যেই বিজ্ঞানস্বরূপ আত্মা দ্বারা রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ ও মৈথুন অর্থাৎ সংযোগ-জাত সুখানুভূতি বিস্পষ্টরূপে জানিতে পারে। ভাল, আমরা যে দেহাদি-ব্যতিরিক্ত বা দেহাদি জড় পদার্থ হইতে
সম্পূর্ণ পৃথক্-স্বভাব আত্মা দ্বারা সমস্ত বিষয় জানিতেছি, এ-রূপ ত লোকপ্রসিদ্ধি নাই; অর্থাৎ কেহই ঐরূপ মনে করে না; ‘পরন্তু ‘দেহেন্দ্রিয়াদির সংঘাতরূপী আমি জানিতেছি,’ এইরূপই সকলে মনে করিয়া থাকে।[বেশ কথা,] জিজ্ঞাসা করি,[অচেতন] দেহাদি- সমষ্টির, যখন শব্দাদি ‘বিষয় হইতে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য নাই, এবং জ্ঞেয়ত্ব অংশেও যখন উভয়ের মধ্যে কিছুমাত্র বিশেষ নাই, অর্থাৎ শব্দাদি বিষয়ের ন্যায় দেহাদি-সংঘাতও যখন অচেতন এবং জ্ঞেয় পদার্থ, তখন দেহাদি-সংঘাতেরও জ্ঞাতৃত্ব সঙ্গত হইতে পারে না। আর দেহাদি-সংঘাত যদি রূপাদির ‘স্বরূপ বা অনুরূপ হইয়াও রূপাদি বিষয়সমূহকে জানিতে পারে, তাহা হইলে স্বয়ং দৃশ্যরূপাদি বিষয়- সমূহও পরস্পরে পরস্পরকে জানিতে পারিত; অথচ তাহা কখনই হয় না। অতএব লোকে দেহেন্দ্রিয়াদিগত শব্দাদি বিষয়সমূহকেও দেহাদি হইতে পৃথক্—এই বিজ্ঞান-স্বরূপ আত্মার সাহায্যেই অবগত হইয়া থাকে। যেমন লৌহ যাহার সাহায্যে দাহ হয়, তাহার নাম অগ্নি; এখানেও তেমনি ভাব বুঝিতে হয়। এই জগতে আত্মার অবিজ্ঞেয় কি পদার্থ আছে? কিছুই নাই; সমস্ত বস্তুই আত্মার বিজ্ঞেয়। যে আত্মার অবিজ্ঞেয় কিছুই অবশিষ্ট নাই, অর্থাৎ যে আত্মার কিছুই জানিতে বাকি নাই, সেই আত্মাই সর্ব্বজ্ঞ। ইহাই সেই বস্তু; সেইটি কি, ‘না—যাহা নচিকেতার জিজ্ঞাসিত, দেবতা প্রভৃতিরও সংশয়স্থল ও ধর্ম্মাদি হইতে পৃথক বিষ্ণুর পরম পদ এবং যাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কিছু নাই; তাহাই এই পরিজ্ঞাত বস্তু ॥ ৭৪ ॥ ৩ ॥
বশস্তুং জাগরিতান্তং চোভৌ যেনানুপশ্যতি।
মহান্তং বিষ্ণুমাধবং মঘা ধীরো ন শোচতি ॥ ৭৫ ॥ ৪ ॥
ব্যাখ্যা।
[পুনরপি তমেবার্থং ব্যক্তীকরোতি স্বপ্নান্তমিত্যাদিনা]—স্বপ্নান্তম্(সুযুপ্তিম্) জাগরিতান্তম্(স্বপ্নম্), যদ্বা, স্বপ্নান্তম্(স্বপ্নদৃশ্যম্) জাগরিতান্তম্(জাম্রদণ্ডম্)
১মা বল্লী], দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ।
১২৩
চ, উতৌ(সুযুপ্তি-স্বপ্নৌ) যেন(চৈতন্যাত্মনা)[প্রেরিতো জীবঃ] অনুপশ্যতি। [তম্] মহান্তং বিভুম্ আত্মানং মত্ত্বা(বিদিত্বা) ধীরঃ(বিবেকী) ন শোচতি [স মুচ্যতে ইতি ভাবঃ] ॥
জীব, স্বপ্নান্ত অর্থাৎ স্বপ্নকালীন দৃশ্য ও জাগরিতান্ত অর্থাৎ জাগ্রদবস্থায় দৃশ্য বস্তু, এই উভয়প্রকার দৃশ্য বস্তু যাহা দ্বারা দর্শন করে, ধীর ব্যক্তি সেই মহান্ বিভু আত্মাকে মনন করার পর আর দুঃখ বোধ করেন না ॥ ৭৫ ॥ ৪ ॥
অতি সূক্ষ্মত্বাৎ দুর্বিজ্ঞেয়মিতি মন্ত্রা এতমেবার্থং পুনঃ পুনরাহ-স্বপ্নান্তং স্বপ্ন- মধ্যং স্বপ্নবিজ্ঞেয়মিত্যর্থঃ। তথা জীররিতান্তং জাগরিতমধ্যং জাগরিতবিজ্ঞেয়ং চ, উভৌ স্বপ্ন-জাগরিতান্তৌ যেনাত্মনা অনুপশ্যতি লোক ইতি ‘সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ। তং মহান্তং বিভুম্ আত্মানং মত্ত্বা অবগম্য আত্মভাবেন সাক্ষাৎ ‘অহমস্মি পরমাত্মা’ ইতি, ধীরো ন শোচতি ॥ ৭৫ ॥ ৪ ॥
[পরমাত্মার] অতিসূক্ষমতাই দুর্বিজ্ঞেয়তার কারণ; ইহা মনে করিয়া এই একই বিষয়কে বারংবার বলিতেছেন,-স্বপ্নান্ত অর্থ- স্বপ্নমধ্য অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থায় দৃশ্য; সেইরূপ, জাগরিতান্ত অর্থ-জাগরিত- মধ্য অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায় যাহা বিজ্ঞেয়। লোকে যে আত্মার সাহায্যে এই উভয়বিধ স্বপ্নান্ত ও জাগরিতান্ত বস্তুনিচয় দর্শন করে। অন্যান্য কথা সমস্তই পূর্ববৎ। ধীর ব্যক্তি সেই মহান্ বিভু(ব্যাপক) আত্মাকে মনন করিয়া-অর্থাৎ আমিই পরমাত্মস্বরূপ, এইরূপে আত্ম- সাক্ষাৎকার করিয়া আর শোক করেন না ॥ ৭৫ ॥ ৪ ॥
য ইষং মধ্বদং বেদ আখ্যানং জীবমন্তিকাৎ।
ঈশানং ভূত-ভব্যশ্য ন ততো বিজুগুপ্সতে ॥ এতদ্বৈ তৎ ॥৭৬॥৫॥
ঘঃ(অধিজ্ঞারী) ইজং মধ্বদম্(মধু-কর্মফলম্ অতীতি-মধ্বলঃ, তং সংলা- রিণমিতি যাবৎ) জীবম্(প্রাণাদিধারকম্) আত্মানং ভূত-ভব্যস্ত(দ্বন্দৈকসম্ভাবঃ,
ভূত-ভাবিনোঃ) ঈশানম্(প্রেরকম্) অন্তিকাৎ(স্বসমীপে অস্মিন্নেব দেহে) বেদ (জানাতি)।[সঃ] ততঃ[অদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্মৈকত্ববিজ্ঞানাৎ] ন বিজুগুপ্সতে [আত্মৈকত্ব-দর্শিন: ভেদজ্ঞানাভাবাৎ অন্যতো ভয়েন আত্মানং রক্ষিতুং নেচ্ছতীতি ভাবঃ]। এতদ্বৈ তৎ, যৎ ত্বরা পৃষ্টম্। যদ্বা, ততঃ(তস্মাৎ ব্রহ্মাত্মৈকত্বদর্শিনঃ সকাশাৎ অন্যঃ কশ্চিৎ ভয়েন আত্মানং গোপায়িতুং নেচ্ছতীতি ভাবঃ)। অন্যৎ সমানম্ ॥
যে অধিকারী পুরুষ কৰ্ম্মফলভোক্তা ও প্রাণধারক এই আত্মাকে এই দেহেই অতীত ও অনাগত বিষয়ের ঈশান অর্থাৎ প্রেরক বলিয়া জানেন, তিনি সেই জ্ঞানবশতঃ[ভয়ে] আত্মাকে গোপন ‘করিয়া রাখেন না। অর্থাৎ সর্ব্বত্র এক ব্রহ্মসত্তা দর্শন করায় তাঁহার ভয় থাকে না; সুতরাং আত্ম-গোপনের প্রয়োজন হয় না। অথবা তাঁহার নিকটও কেহ আত্মগোপন করা আবশ্যক মনে করে না ॥৭৬৷৷৫৷৷
কিঞ্চ, যঃ কশ্চিৎ ইমং মধ্বদং কৰ্ম্মফলভুজং জীবং প্রাণাদিকলাপস্য ধারয়ি- তারম্ আত্মানং বেদ বিজানাতি, অন্তিকাৎ অন্তিকে সমীপে ঈশানম্ ঈশিতারং ভূতভব্যস্য কালত্রয়স্য, ততঃ তদ্বিজ্ঞানাৎ ঊর্দ্ধমাত্মানং ন বিজুগুপ্সতে-ন গোপা- রিতুমিচ্ছতি অভয়প্রাপ্তত্বাৎ। যাবৎ হি ভয়মধ্যস্থোহনিত্যম্ আত্মানং মন্যতে, তাবৎ গোপায়িতুমিচ্ছতি আত্মানম্। যদা তু নিত্যম্ অদ্বৈতম্ আত্মানং বিজানাতি, তদা কিং কঃ কুতো বা গোপায়িতুমিচ্ছেৎ। এতদ্বৈ তদিতি পূর্ব্ববৎ ॥৭৬৷৷৫৷৷
আরও এক কথা,—যে কোন লোক মধ্বদ অর্থাৎ কৰ্ম্ম-ফল-ভোক্তা ও প্রাণাদিসমুদায়ের ধারক—জীব আত্মাকে স্বসমীপে ভূত-ভব্যের অর্থাৎ ত্রিকালের ঈশান বা ঈশ্বর বলিয়া জানেন,[তিনি] সেই বিজ্ঞানের পর আত্মাকে গোপন করিতে ইচ্ছা করেন না; কারণ, তিনি অভয়(ভয়রহিত ব্রহ্মভাব) প্রাপ্ত হইয়াছেন। জীব যে পর্য্যন্ত ভয়মধ্যবর্তী থাকিয়া আত্মাকে অনিত্য মনে করে, সেই পর্য্যন্তই আত্মাকে গোপন করিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু, যখন অদ্বৈত আত্ম-তত্ত্ব জানিতে পারে, তখন কে-কাহার নিকট হইতে কেন বা কি
১মা বল্লী] দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ। ১২৫- গোপন করিবে? ‘ইহাই সেই জিজ্ঞাসিত বিষয়’; ইহার ব্যাখ্যা। পূর্ব্ববৎ ॥ ৭৬ ॥ ৫ ॥
যঃ পূর্ব্বং তপসো জাতমদ্ভ্যঃ পূর্ব্বমজায়ত। গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তং যো ভূতেভির্যপশ্যত। এতদ্বৈ তৎ ॥৭৭৷৷৬৷৷
যঃ(পরমপুরুষঃ) পূর্ব্বম্(প্রথমম্) তপসঃ(জ্ঞানময়াৎ ব্রহ্মণঃ) জাতম্ (উৎপন্নং সৎ) অন্ত্যঃ[অত্র অপশব্দঃ পঞ্চভূতোপলক্ষকঃ, ততশ্চ-পঞ্চ- ভূতেভ্যঃ] পূর্ব্বম্(অগ্রে) অজায়ত ৭ গুহাম্(সর্ব্ব-প্রাণি হৃদয়ম্) প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তম্ (তত্র স্থিত্বা শব্দাদি-বিষয়ান্ উপভুঞ্জানম্) ভূতেভিঃ(ভূতৈঃ-ভূতকার্য্যৈঃ দেহেন্দ্রিয়াদিভিঃ উপলক্ষিতম্)[তম্] যঃ(মুমুক্ষুঃ) ব্যপশ্যত(বিশেষেণ পশ্যতি ইত্যর্থঃ)। “এতৎ বৈ তৎ” ইত্যেতৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ ॥
তপঃ অর্থাৎ তপোময়(জ্ঞানময় ব্রহ্ম) হইতে প্রথমজাত যে পুরুষ(হিরণ্যগর্ভ) জলের(বস্তুতঃ সমস্ত ভূতের) পূর্ব্বে জন্মলাভ করিয়াছেন, প্রাণিগণের হৃদয়রূপ
* তাৎপর্য্য, -অভিপ্রায় এই যে, জীব যতকাল দ্বৈতজ্ঞানের অধীন থাকে-‘আমি পৃথক্, অমুক পৃথক্’, এইরূপে ভেদদর্শন করে, ততকালই ভয় অনুভব করিয়া থাকে;-‘অমুকে আমার অনিষ্ট করিবে, অমুকে আমায় বধ করিবে’ ইত্যাদি চিন্তায় ভীত হইয়া থাকে; কিন্তু যখন সেই দ্বৈত জ্ঞান বিলুপ্ত হইয়া যায়-সর্ব্বত্র একত্ব দর্শন করে, তখন কে কাহার নিকট ভয় পাইবে?-শ্রীমদ্ভাগবতে কথিত আছে-“ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাৎ ॥” অর্থাৎ- দ্বিতীয়ত্ব বোধ হইতেই ভয় উপস্থিত হইয়া থাকে। বৃহদারণ্যকোপনিষদের প্রথম অধ্যায়ে চতুর্থ ব্রাহ্মণে এই কথাটি আরও বিশদভাবে বর্ণিত আছে। সেখানে আছে-সৃষ্টির প্রথমে একটি পুরুষ উৎপন্ন হইলেন, তিনি এত বড় বিশ্বরাজ্যের মধ্যে একাকী থাকিয়া প্রথমে ভীত হইলেন; অপর একটি সহায় পাইতে ইচ্ছা করিলেন। পরেই তাঁহার প্রবোধ জন্মিল,-তিনি মনে করিতে লাগিলেন, “যৎ মদন্যৎ নাস্তি, কুতো নু বিভেমি?” ‘যখন আমি ভিন্ন আর কিছু নাই, তখন কি কারণে আমি ভয় করিতেছি?‘- “তত এবাস্থ্য ভয়ং বীয়ায়,” ‘ইহার পরই তাঁহার ভয় অপগত হইল।’ “কস্মাৎ ব্যভেষ্যৎ? দ্বিতীয়াৎ বৈ ভয়ং ভবতি।” অর্থাৎ ‘কেন ভীত হইবে?-- দ্বিতীয় ব্যক্তি, হইতেই ভয় হইয়া থাকে।’ অভিপ্রায় এই যে,-সেই সময় দ্বিতীয় যখন কেহই ছিল না, তখন আর অনিষ্টেরও সম্ভাবনা ছিল না, সুতরাং প্রথমজাত পুরুষের মনে আর’ ভয় স্থান পায় নাই। সেইরূপ পরবর্তী লোকদিগের মধ্যেও যাহার ভেদবুদ্ধি বিলুপ্ত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তাহার ভয়বুদ্ধিও বিলুপ্ত হইয়া যায়-অভয় মোক্ষপদে অবস্থান হয়। তখন আর আত্ম- গোপনের প্রয়োজন বা ইচ্ছা হয় না।
গুহায় প্রবিষ্ট এবং পঞ্চভূতের পরিণাম দেহেন্দ্রিয়াদি-সমন্বিত সেই পুরুষকে যে মুমুক্ষু ব্যক্তি দর্শন করেন, বস্তুতঃ তিনিই সেই আত্মাকে দর্শন করেন। ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই আত্মতত্ত্ব ॥ ৭৭ ॥ ৬॥
যঃ প্রত্যগাত্মা ঈশ্বরভাবেন নির্দিষ্টঃ, স সর্ব্বাত্মা, ইত্যেতৎ দর্শয়তি,-যঃ কশ্চিৎ মুমুক্ষুঃ পূর্ব্বং প্রথমং তপসো জ্ঞানাদিলক্ষণাৎ ব্রহ্মণ ইত্যেতৎ, জাতমুৎপন্নং হিরণ্যগর্ভম্। কিমপেক্ষ্য পূর্ব্বম্? ইত্যাহ-অদ্যঃ পূর্ব্বম্, অপ্সহিতেভ্যঃ পঞ্চভূতেভ্যঃ, ন কেবলাভ্যোহস্ত্য ইত্যভিপ্রায়ঃ। অজায়ত, উৎপন্নো যঃ, তং প্রথমজম্, দেবাদিশরীরাণি উৎপাদ্য. সর্ব্বপ্রাণিগুহাং হৃদয়াকাশং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তং শব্দাদীন্ উপলভমানূম্, ভূতেভির্ভূতৈঃ কার্য্য-কারণলক্ষণৈঃ সহ তিষ্ঠন্তং যো ব্যপশ্যতঃ -যঃ পশ্যতীত্যর্থঃ। যঃ এবং পশ্যতি, স এতদেব পশ্যতি-যৎ তৎ প্রকৃতং ব্রহ্ম ॥ ৭৭ ॥ ৬ ॥
পূর্ব্বে যাহাকে প্রত্যগাত্মা পরমেশ্বর বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে, তিনিই যে সকলের আত্মস্বরূপ, এখন তাহা প্রদর্শন করিতেছেন,-প্রথমে তপঃ অর্থাৎ জ্ঞানাদিময় ব্রহ্ম হইতে জাত- হিরণ্যগর্ভকে-, কাহার পূর্ব্বে জাত? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিলেন- জলের পূর্ব্বে; অভিপ্রায় এই যে, কেবল জলেরই পূর্ব্বে নহে-জল ও অপর চারি ভূত, এই পঞ্চভূতেরই পূর্ব্বে যিনি জন্মধারণ করিয়া- ছেন এবং দেবতা প্রভৃতির শরীর সমুৎপাদন-পূর্ব্বক সমস্ত প্রাণীর গুহা বা হৃদয়াকাশে প্রবিষ্ট হইয়া অবস্থান ‘করিতেছেন, অর্থাৎ শব্দাদি বিষয়সমূহ ভোগ করিতেছেন; ‘ভূত’ অর্থ কার্য্য-কারণময় দেহেন্দ্রিয়াদিসমষ্টি; তৎসহযোগে বর্তমান সেই প্রথমজাত হিরণ্য- গর্ভকে যে মুমুক্ষু পুরুষ দর্শন করেন;-যিনি উক্তপ্রকার আত্মভার দর্শন করেন, তিনি বস্তুতঃ পূর্ব্বকথিত সেই ব্রহ্মকেই দর্শন করেন ॥ ৭৭ ॥ ৬॥
[পুনরপি হিরণ্যগর্ভমেব, বিশিষ্যাহ,-যা ইতি।] যা দেবতাময়ী(সর্ব্বদেবতা- ত্মিকা)[তত্র প্রাধান্যাৎ দেবতোল্লেখঃ] অদিতিঃ(অদনাৎ-সর্ব্বজগদ্ভোক্তৃত্বাৎ ‘অদিতি’-শব্দ-বাচ্যা দেবতা) প্রাণেন(হিরণ্যগর্ভরূপেণ) সংভবতি(অভিব্যজ্যতে)। যা[চ] ভূতেভিঃ(ভূতৈঃ সহিতা) ব্যজায়ত(উৎপন্না)। গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তীম্[তাং যঃ পশ্যতি সঃশ] এতৎ ‘এব[পশ্যতি; যৎ তৎ নর্চিকেতসা পৃষ্টম্ ইত্যাদি সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ]।
সর্ব্বদেবতাময়ী যে অদিতি(সর্ব্বজগদ্ভোক্ত্রী) প্রাণরূপে অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভরূপে সম্ভূত হইয়াছিলেন এবং যিনি সর্ব্বভূত-সমন্বিত হইয়া প্রকাশ পাইয়াছিলেন, গুহাবস্থিত তাঁহাকে যিনি দর্শন করেন, তিনিই প্রকৃতপক্ষে নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই আত্মস্বরূপ দর্শন করেন ॥ ৭৮ ॥ ৭ ॥
কিঞ্চ, যা সর্ব্বদেবতাময়ী সর্ব্বদেবাত্মিকা প্রাণেন হিরণ্যগর্ভরূপেণ পরস্মাদব্রহ্মণঃ সম্ভবতি, শব্দাদীনাম্ অদনাৎ অদিতিঃ, তাং পূর্ব্ববদ্ গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তীম্ অদিতিম্। তামেব বিশিনিষ্টি,—যা ভূতেভিঃ ভূতৈঃ সমন্বিতা ব্যজায়ত— উৎপন্নেত্যেতৎ ॥ ৭৮ ॥ ৭ ॥
‘সর্বদেবাত্মিকা যে অদিতি প্রাণ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভরূপে পরব্রহ্ম হইতে সম্ভূত হন, শব্দাদি বিষয়সমূহ ভোগ করেন বলিয়া তাঁহাকে অদিতি বলা হয়। পূর্বোক্ত গুহায় প্রবিষ্ট হইয়া অবস্থিত সেই অদিতিকে[যিনি জানেন,] সেই অদিতিকেই বিশেষ করিয়া বলিতে- ছেন যে, যেই অদিতি ভূতবর্গসমন্বিত হইয়া উৎপন্ন হইয়াছেন। [অন্যান্য অংশ পূর্ব্বোক্ত শ্লোকের ব্যাখ্যারই অনুরূপ] ॥ ৭৮॥ ৭॥
১৭
অরণ্যোনিহিতো জাতবেদা- গর্ভ ইব সুভূতো গর্ভিণীভিঃ। দিবে দিব ঈড্যো জাগৃবদ্ভি- র্হবিস্মত্তির্মনুয্যেভিরগ্নিঃ ॥ এতদ্বৈ তৎ ॥৭৯৷৷৮৷৷
গর্ভিণীভিঃ(গর্ভবতীভিঃ) সুভৃতঃ(সুপথ্যভোজনাদিনা পরিপোষিতঃ) গর্ভ ইব অরণ্যোঃ(উত্তরাধরারণ্যোঃ, তৎসদৃশে যজ্ঞে হৃদয়ে চ) নিহিতঃ(স্থিতঃ)[যঃ] জাতবেদাঃ(অগ্নিঃ, জাতং সর্ব্বং বেত্তীতি জাতবেদাঃ-সর্ব্বজ্ঞঃ বিরাট্ পুরুষশ্চ) মনুষ্যেভিঃ জাগৃবদ্ভিঃ(জাগরণশীলৈঃ, প্রমাদরহিতৈঃ যোগিভিঃ) হবিষ্মদ্ভিঃ(হবন- কর্তৃভিশ্চ কর্মিভিঃ চ সস্তিঃ ইত্যর্থঃ) দিবে দিবে(প্রত্যহম্) ঈড্যঃ(যজ্ঞে স্তবনীয়ঃ, হৃদয়ে চ ধ্যাতঃ)[ভবতি]; এতৎ বৈ তৎ ইতি পূর্ব্ববৎ ॥
গর্ভিণীগণ গর্ভস্থ শিশুকে যেরূপ উপযুক্ত অন্নপানাদি দ্বারা পরিপুষ্ট করিয়া থাকেন, সেইরূপ জাগৃবান্ অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানবিষয়ে প্রমাদরহিত ও হবিস্মৎ (যাঁহারা যজ্ঞে হোম করেন) মনুষ্যগণ দ্বিবিধ অরণীতে(উত্তরারণী ও অধরারণীতে, অর্থাৎ হৃদয়ে ও যজ্ঞে) নিহিত বা অবস্থিত যে জাতবেদাকে— অগ্নিকে(ভৌতিক অগ্নি ও বিরাট্ পুরুষ, এই উভয়কে)[উপযুক্ত ক্রিয়া ও সদাচার দ্বারা] পরিপুষ্ট করেন, এবং প্রত্যহ[হৃদয়ে] ধ্যান ও[যজ্ঞে] স্তব করেন, তিনি সেই বস্তু ॥ ৭৯॥৮
কিঞ্চ, যোহধিযজ্ঞে উত্তরাধরারণ্যোনিহিতঃ স্থিতো জাতবেদা অগ্নিঃ; পুনঃ সর্ব্বহবিষাৎ ভোক্তা, অধ্যাত্মঞ্চ যোগিভির্গর্ভ ইব গর্ভিণীভিরন্তর্ব্বত্নীভিঃ অগর্হিতান্ন- পানভোজনাদিনা যথা গর্ভঃ সুভৃতঃ সুষ্ঠু সম্যগ্ ভূতো লোক ইব, ইখমেব ঋত্বিগ্ভির্যোগিভিশ্চ সুভৃত ইত্যেতৎ।
কিঞ্চ, দিবে দিবে অহন্যহনি ঈড্যঃ স্তুত্যো বন্দ্যশ্চ কর্মিভির্যোগিভিশ্চ-অধ্বরে হৃদয়ে চ, জাগৃবভির্জাগরণশীলৈঃ অপ্রমত্তৈরিত্যেতৎ; হবিষ্মত্তিঃ আজ্যাদিমস্তিঃ ধ্যানভাবনাবস্তিশ, মনুষ্যেভির্মনুয্যেরগ্নিঃ। এতদ্বৈ তৎ-তদেব প্রকৃতং ব্রহ্ম ॥৭৯৷৷৮॥
আরও এক কথা,—অধিযজ্ঞে অর্থাৎ অগ্নিসাধ্য যজ্ঞে উত্তর ও অধর অরণীতে * স্থিত অগ্নি সমস্ত হবিঃ(যজ্ঞে প্রদেয় বস্তুকে ‘হবিঃ’ বলা হয়) ভোগ করেন, এবং অধ্যাত্ম বিষয়ে—গর্ভিণীগণ কর্তৃক গর্ভ(গর্ভস্থ সন্তান) যেরূপ অদূষিত অন্নপানাদি দ্বারা যথোপযুক্তরূপে পরিপোষিত হয়, সেইরূপ যোগিগণ কর্তৃক সম্যরূপে পরিপোষিত হন অর্থাৎ ঋত্বিক্(যাজ্ঞিক) ও যোগিগণ কর্তৃক সুভূত হন।
আরও এক কথা, এই অগ্নি জাগ্বান্—জাগরণশীল অর্থাৎ প্রমাদ- শূন্য যোগিগণকর্তৃক হৃদয়ে ‘বন্দনীয় এবং হবিষ্মৎ অর্থাৎ আজ্যাদি যজ্ঞোপকরণ-সম্পন্নগণকর্তৃক যজ্ঞে অর্চ্চনীয়।[অভিপ্রায় এই যে,] তিনি যাজ্ঞিক ও ধ্যানী, উভয়প্রকার মনুষ্যেরই সেবনীয়। এই বিরাডৃূপী অগ্নিই সেই প্রস্তাবিত ব্রহ্মস্বরূপ ॥ ৭৯ ॥ ৮ ॥
, যতশ্চোদেতি সূর্য্য অস্তং যত্র চ গচ্ছতি।
তং দেবাঃ সর্ব্বে অর্পিতাস্তদু নাত্যেতি কশ্চন। এতদ্বৈ তৎ ॥৮০॥৯॥
[পুনশ্চ মহিমোক্তিপূর্ব্বকং তৎ পৃষ্টং বিশিষ্যাহ, যতশ্চোদেতীতি]—সূর্য্যঃ [প্রত্যহম্] যতঃ(যস্মাৎ ‘প্রাণাৎ উদেতি’),[প্রলয়কালেচ] যত্র(যস্মিন্ চ) অন্তম্(অদর্শনম্) গচ্ছতি। সর্ব্বে দেবাঃ(প্রকাশন-স্বভাবানি ইন্দ্রিয়াণি) তম্ (প্রাণম্) অর্পিতাঃ(তমাশ্রিত্য স্থিতা ইত্যর্থঃ)। তৎ(তং সর্ব্বদেবাশ্রয়ম্) কশ্চন (কোহপি)[গুণতঃ ‘স্বরূপতো বা] ন উ(নৈব) অত্যেতি(অতিক্রামতি)। এতদ্বৈ তৎ, যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্ ॥
[পুনশ্চ মহিমপ্রদর্শন-পূর্ব্বক নচিকেতার জিজ্ঞাসিত বিষয়ের স্বরূপ নির্দেশ করিতেছেন]—সূর্য্যদেব সৃষ্টিকালে যাহা হইতে উদিত হন এবং প্রলয়কালেও যাঁহাতে অস্তমিত হন, সমস্ত দেবতাগণ অর্থাৎ প্রকাশশীল ইন্দ্রিয়গণ সেই প্রাণকে আশ্রয় করিয়া রহিয়াছে। কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না, অর্থাৎ কেহই তৎস্বরূপাতিরিক্ত নহে। ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই বস্তু ॥ ৮০ ॥ ৯ ॥
কিঞ্চ, যতশ্চ যস্মাৎ প্রাণাৎ উদেতি উত্তিষ্ঠতি সূর্য্যঃ, অস্তং নিমায়নং তিরোধানং যত্র যস্মিন্নেব ঢ প্রাণে অহন্যহনি ‘গচ্ছতি; তং প্রাণমাত্মানং দেবাঃ সর্ব্বেৎগ্যাদয়ঃ অধিদৈবম্, বাগাদয়শ্চাধ্যাত্মম্, সর্ব্বে বিশ্বে অরা ইব রথনাভৌ অর্পিতাঃ সম্প্রবেশিতাঃ স্থিতিকালে; সোহপি ব্রহ্মৈব; তদেতৎ সর্ব্বাত্মকং ব্রহ্ম। তৎ উ নাত্যেতি নাতীত্য তদাত্মকতাং তদন্যত্বং গচ্ছতি কশ্চন কশ্চিদপি। এতদ্বৈ তৎ ॥ ৮০ ॥ ৯ ॥
আরও এক কথা,—সূর্য্য প্রতিদিন যে প্রাণ হইতে উদয় লাভ করেন এবং যে প্রাণে অস্তমিত অর্থাৎ অদর্শন প্রাপ্ত হন, সমস্ত দেবগণ অর্থাৎ দেবাধিকারে অগ্নি প্রভৃতি দেবগণ, আর দেহাধিকারে বাগাদি ইন্দ্রিয়গণ সেই প্রাণরূপী আত্মাতে অর্পিত আছে, অর্থাৎ অব- স্থিতিকালে তাঁহারই মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট রহিয়াছে। উল্লিখিত প্রাণও নিশ্চয়ই ব্রহ্মস্বরূপ; সেই ব্রহ্মই সর্বাত্মক বা সর্ব্বময়;[অতএব] কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না, অর্থাৎ তদাত্মকতা ত্যাগ করিয়া তদ্ভিন্নত্ব প্রাপ্ত হয় না। ইহাই সেই—॥ ৮০ ॥‘৯ ॥
যদেবেহ তদমূত্র যদমুত্র তদন্বিহ।
মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাশ্নোতি য ইহ নানের পশ্যতি ॥৮১॥১০॥
[ইদানীম্ আত্মনঃ সার্ব্বকালিকমেকত্বং দর্শয়িতুমাহ, যদিতি]। ইহ(অস্মিন্ লোকে) যৎ(আত্মবস্তু), অমুত্র(পরকালেহপি) তৎ(তদেব, ন তু
ততঃ পৃথকিত্যর্থঃ)।[তথ’] অমুত্র(পরলোকে) যৎ(আত্মবস্তু), ইহ’ (অস্মিন্ লোকেহপি) তৎ অনু(অনুগতম্, ন ততঃ ভিন্নমিত্যর্থঃ)। অথবা,— ইহ(প্রত্যক্ষপরিদৃশ্যে কার্য্যোপাধৌ দেহে) যৎ(চৈতন্যম্), অমুত্র(অদৃশ্যে কারণোপাধৌ মায়ায়াম্ অপি) তদেব(ন ততোহন্যদিত্যর্থঃ)।[তথা] অমুত্র (কারণোপাধৌ যৎ(চৈতন্যম্), ইহ(কার্য্যোপাধৌ অপি) তৎ(তদেব চৈতন্যম্) অনু(অনুগতম্)। যুঃ(জনঃ) ইহ(আত্ম-চৈতন্যয়োঃ) নানা ইব (উপাধিভেদাৎ ভেদমিব) পশ্যতি, সঃ(ভেদদর্শী) মৃত্যোঃ মৃত্যুম্(মরণাৎ পরমপি মরণম্, ভূয়োভূয়ো মরণমনুভবতীত্যর্থঃ) ॥
এখন আত্মচৈতন্যের সার্ব্বকালিক একত্ব প্রদর্শন করিতেছেন, ইহলোকে যে আত্মা, স্বর্গাদি পরলোকেও সেই আত্মাই, এবং পরলোকে যে আত্মা, ইহলোকেও সেই আত্মাই অনুগত থাকে। অথবা, এই কার্য্যোপাধি দেহে যে চৈতন্য, অদৃশ্য কারণোপাধি(ঈশ্বরোপাধি) মায়াতেও সেই চৈতন্যই; আর সেই কারণোপাধিতে যে চৈতন্য, এই কার্য্যোপাধি দেহেও সেই একই চৈতন্য অনুস্যুত রহিয়াছেন। যে লোক এই চৈতন্যে নানাভাবের ন্যায় দর্শন করে, সে লোক মৃত্যুর পর মৃত্যু প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ বারংবার জন্ম-মরণ-প্রবাহ লাভ করে ॥ ৮১ ॥ ১০ ॥
যদ্ ব্রহ্মাদি-স্থাবরান্তেষু বর্ত্তমানং তত্তদুপাধিত্বাদ্ব্রহ্মবদবভাসমানং সংসার্য্যন্যৎ পরম্যাব্রহ্মণ ইতি মাভূৎ কস্যচিদাশঙ্কা, ইতীদমাহ—
যদেবেহ কার্য্যকারণোপাধিসমন্বিতং সংসারধৰ্ম্মবৎ অবভাসমানম্ অবিবেকিনাম্, তদেব স্বাত্মস্থম্ অমুত্র, নিত্যবিজ্ঞানঘনস্বভাবং সর্ব্বসংসারধর্মবর্জিতং ব্রহ্ম। যচ্চ অমুত্র অমুস্মিন্ আত্মনি স্থিতম্, তদন্বিহ-তদেবেহ নাম-রূপ-কার্য্য-কারণো- পাধিমনু বিভাব্যমানং নান্যৎ তত্রেবং সতি উপাধিস্বভাব-ভেদদৃষ্টিলক্ষণয়াহবিদ্যয়া ‘মোহিতঃ সন্ য ইহ ব্রহ্মণি অনানাভূতে ‘পরম্মাদন্যোহহং, মত্তোহন্যৎ পরং ব্রহ্ম’ ইতি নানেব ভিন্নমিব পশ্যতি উপলভতে; স মৃত্যোঃ মরণাৎ মৃত্যুৎ মরণং পুনঃ পুনর্জন্ম-মরণভাবম্ আপ্নোতি প্রতিপদ্যতে। তস্মাৎ তথা ন পশ্যেৎ। বিজ্ঞানৈকরসং নৈরন্তর্য্যেণ আকাশবৎ পরিপূর্ণং ব্রহ্মৈবাহমম্মীতি পশ্যেদেতি বাক্যার্থঃ ॥৮১৷১০৷৷
ব্রহ্মাদি স্তম্ব পর্য্যন্ত সর্ব্ব বস্তুতে অবস্থিত এবং বিভিন্ন উপাধি- যোগে অব্রহ্মভাবে প্রতীয়মান যে সংসারী বা জীব-চৈতন্য, সেই সংসারী চৈতন্য পরব্রহ্ম হইতে পৃথক্; এইরূপ কাহারও আশঙ্কা হইতে পারে, সেই আশঙ্কা-নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে এই কথা বলিতেছেন—
এখানে দেহেন্দ্রিয়াদিরূপ কার্য্য-কারণোপাধিসমন্বিত থাকায়(১) বিবেকহীন জনগণের নিকট যে চৈতন্য[জন্ম-মরণাদিরূপ] সংসার- ধৰ্ম্মবিশিষ্ট বলিয়া প্রতীত হন; স্বহৃদয়াভিব্যক্ত সেই চৈতন্যই পশ্চাৎ নিত্য বিজ্ঞানময় ও সর্ববিধ সংসার-ধর্মরহিত ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন। পক্ষান্তরে, সেই কারণোপাধিতে(অমুত্র) যে চৈতন্য অবস্থিত, সেই চৈতন্যই আবার এই নাম-রূপ ও কার্যকারণাত্মক উপাধিতে অনুগতভাবে প্রতীত হন, কিন্তু[তাহা হইতে] অন্য নহে। জীব ও ঈশ্বরোপাধিতে যখন চৈতন্যের একত্বই নির্দ্ধারিত হইল, তখন যে ব্যক্তি উলাধিসম্বন্ধ ও ভেদজ্ঞানের কারণীভূত অবিদ্যা দ্বারা বিমোহিত হইয়া অভিন্নস্বরূপ এই ব্রহ্মে ‘আমি পরব্রহ্ম হইতে অন্য, এবং পরব্রহ্মও আমা হইতে পৃথক্’ এইভাবে যেন নানাত্বই দর্শন করে, অর্থাৎ ভেদবৎ উপলব্ধি করে, সে ব্যক্তি মৃত্যুর পর মৃত্যু—মরণ অর্থাৎ পুনঃপুনঃ জন্ম-মরণভাব প্রাপ্ত হয়। অতএব, ঐরূপ ভেদদর্শন
করিবে না; পরন্তু, ‘আমি আকাশবৎ পরিপূর্ণ ব্রহ্মস্বরূপই বটে এইরূপে দর্শন করিবে ॥৮১৷১০৷৷
মনসৈবেদমাপ্তব্যং নেহ নানাস্তি কিঞ্চন। মৃত্যোঃ স মৃত্যুং গচ্ছতি য ইহ, নানেব পশ্যতি। এতদ্বৈ তৎ ॥৮২॥১১৷৷
[ ইদানীং চৈতন্যৈকত্বদর্শনোপায়ং বিবক্ষন্ ভেদদর্শনম্ অপবদতি,— মনসৈবেতি]। মনসা(শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশসংশোধিতেন অন্তঃকরণেন) এব ইদম্ (ব্রহ্মৈকত্বম্) আপ্তব্যম্(উপলভ্যম্)[নান্যেন কেনচিৎ, ইত্যভিপ্রায়ঃ]। ইহ (ব্রহ্মণি) কিঞ্চন(কিঞ্চিদপি অত্যল্পমপি ইত্যর্থঃ) নানা’(ভেদঃ) নাস্তি, [ইত্যেতৎ ব্রহ্মাবগতৌ বুধ্যতে, ইতি বাক্যশেষঃ]। য ইহ নানা ইব[নতু নানাত্বমস্তি] পশ্যতি, স মৃত্যোঃ[পরম্] মৃত্যুং গচ্ছতি।[অন্য-ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥
একমাত্র মনের দ্বারাই এই ব্রহ্মৈকত্ব(ব্রহ্মের একত্ব) প্রাপ্ত বা অবগত হইতে হইবে। এই ব্রহ্মে কিছুমাত্র ভেদ বা নানাত্ব নাই। শেষাংশের অর্থ পূর্ব্ববৎ ॥ ৮২॥ ১১ ॥
প্রাগেকত্ববিজ্ঞানাৎ আচার্য্যাগম-সংস্কৃতেন মনসৈব ইদং ব্রহ্ম একরসমাপ্তব্যম্— ‘আত্মৈব নান্যদন্তি’ ইতি। আপ্তে চ নানাত্বপ্রত্যুপস্থাপিকায়া অবিদ্যায়া নিবৃত্তত্বাৎ ইহ ব্রহ্মণি নানা নাস্তি কিঞ্চন—অণুমাত্রমপি। যস্তু পুনরবিদ্যা-তিমিরদৃষ্টিং ন মুঞ্চতি—ইহ ব্রহ্মণি নানেব পশ্যতি; স মৃত্যোমৃত্যুৎ গচ্ছত্যেব—স্বল্পমপি ভেদমধ্যারোপয়ন্নিত্যর্থঃ ॥ ৮২ ॥ ১১ ॥
ব্রহ্মৈকত্ব জ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বে আচার্য্য ও শাস্ত্রের উপদেশ মনের সংস্কার বা নির্মলতা সম্পাদন করিয়া সেই সংস্কৃত মনের দ্বারাই এক- রস(এক—অখণ্ড) ব্রহ্মকে পাইতে হইবে, অর্থাৎ একমাত্র আত্মাই (ব্রহ্মই) সৎ, তদ্ভিন্ন আর সমস্তই অসৎ,[ইহা বুঝিতে হইবে]।
এই ব্রহ্মৈকত্ব বিজ্ঞাত হইলে নানাত্ব বা ভেদবুদ্ধি-সমুৎপাদক অবিদ্যা নিবৃত্ত হইয়া যায়; সুতরাং তখন এই ব্রহ্মে কোনরূপ অর্থাৎ অত্যল্প- মাত্রও নানা(ভেদ) থাকে না বা প্রতীতির বিষয় হয় না! কিন্তু, যে লোক অবিদ্যা-তিমিরদৃষ্টি(অবিদ্যাময় মোহদর্শন) ত্যাগ করে না, এই ব্রহ্মে যেন নানাভাবই দর্শন করে, সে লোক সেই অত্যল্পমাত্র ভেদ আরোপণের ফলেও নিশ্চয়ই মৃত্যুর পর মৃত্যু প্রাপ্ত হয় ॥৮২৷৷১১৷৷
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।
ঈশানো ভূতভব্যস্য ন ততো বিজুগুপ্সতে। *
এতদ্বৈ তৎ ॥৮৩॥১২॥
[আত্মনঃ দুজ্ঞেয়ত্বাৎ পুনরপি তৎস্বরূপমেবাহ, —অঙ্গুষ্ঠমাত্র ইতি]। অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ (অঙ্গুষ্ঠপরিমাণঃ; উপাধিভূতান্তঃকরণস্য অঙ্গুষ্ঠপরিমিতত্বাৎ তৎপরিমাণ ইত্যর্থঃ)। পুরুষঃ(আত্মা) মধ্যে আত্মনি(শরীরমধ্যে) তিষ্ঠতি;[স এব চ] ভূত-ভব্যস্য (অতীতস্য অনাগতস্য)[বর্তমানস্য চ] ঈশানঃ(প্রভুঃ শাসকঃ)। ততঃ (তৎস্বরূপবিজ্ঞানাৎ পরম্) ন বিজুগুপ্সতে(সর্ব্বভয়-বিরহিতব্রহ্মস্বরূপলাভাৎ আত্মানং ন কুতশ্চিৎ গোপায়িতুমিচ্ছতীত্যর্থঃ)। অন্যৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ ॥
অঙ্গুষ্ঠপরিমিত অন্তঃকরণে অভিব্যক্ত হওয়ায় অঙ্গুষ্ঠমাত্র’ অর্থাৎ অঙ্গুষ্ঠপরিমিত পুরুষ(আত্মা) আত্ম-মধ্যে অর্থাৎ দেহাভ্যন্তরে অবস্থান করেন; অথচ সেই পুরুষই ভূত, ভবিষ্যৎ[ও বর্তমান, এই কালত্রয়ের] ঈশ্বর(শাসক)। তাঁহাকে জানিলে [কেহই আর] আত্মাকে গোপন করিতে ইচ্ছা করে না। ইহাই সেই বস্তু ॥৮৩৷৷১২
পুনরপি তদেব প্রকৃতং ব্রহ্মাহ—অঙ্গুষ্ঠমাত্রোহলুষ্ঠপরিমাণঃ। অঙ্গুষ্ঠপরিমাণং হৃদয়পুণ্ডরীকম্, তচ্ছিদ্রবর্ত্যন্তঃকরণোপাধিরঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ—অঙ্গুষ্ঠমাত্র-বংশপর্বমধ্যবর্ত্য- স্বরবৎ। পুরুষঃ—পূর্ণমনেন সর্ব্বমিতি। মধ্যে আত্মনি শরীরে তিষ্ঠতি যঃ তমাত্মান- মীশানং ভূত-ভব্যস্য বিদিত্বা ন তত ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৮৩ ॥ ১২ ॥
পুনশ্চ সেই প্রস্তাবিত ব্রহ্মের বিষয়ই বলিতেছেন,—অঙ্গুষ্ঠমাত্র অর্থ—অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত; সাধারণতঃ হৃৎপদ্মের পরিমাণ এক অঙ্গুষ্ঠ; সুতরাং সেই হৃৎপদ্মের ছিদ্রস্থিত অন্তঃকরণরূপ জীবোপাধিটিও অঙ্গুষ্ঠ- পরিমিত; অতএব অঙ্গুষ্ঠপরিমিত বংশ-পর্ব্বের মধ্যবর্তী আকাশের যেরূপ ‘অঙ্গুষ্ঠমাত্রত্ব ব্যবহার হয়, সেইরূপ অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত অন্তঃকরণে প্রতিফলিত আত্ম-চৈতন্যকেও ‘অঙ্গুষ্ঠমাত্র’ বা অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত বলা হইয়া থাকে। ইহাদ্বারা সমস্ত জগৎ পূর্ণতা লাভ’ করে, সেই ‘পুরুষ’ পদবাচ্য যে চৈতন্য আত্ম-মধ্যে—শরীরে অবস্থান করেন; ভূত (অতীত) ও ভব্য(যাহা হইবে), এতদুভয়ের ঈশানকে(শাসন- কর্ত্তাকে) জানিয়া—“ন ততঃ” ইত্যাদি অংশের ব্যাখ্যা পূর্ববৎ॥ ৮৩॥ ১২॥
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো জ্যোতিরিবাধূমকঃ।
ঈশানো ভূতভব্যস্য স এবাদ্য স উ শ্বঃ। এতদ্বৈ তৎ ॥ ৮৪ ॥ ১৩ ॥
[পুনরপি তদেবাহ,—অঙ্গুষ্ঠেতি]। অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ(পূর্ব্ববৎ অঙ্গুষ্ঠপরিমিতঃ) পুরুষঃ(আত্মা) অধূমকঃ(অধূমকং ধূমরহিতম্) জ্যোতিঃ(.তেজঃ) ইব, ভূত- ভব্যস্য ঈশানঃ[চ]। স এব(পুরুষঃ) অদ্য[বর্ত্ততে]; শ্বঃ উ(শোহপি ভবিষ্যৎকালেহপি) সঃ[এব পুরুষঃ][বর্ত্তিষ্যতে]। অন্যৎ পূর্ব্ববৎ ॥
অঙ্গুষ্ঠপরিমিত সেই পুরুষই নির্ধূম জ্যোতির ন্যায়(উজ্জ্বল) এবং ভূত ও ভব্যের ঈশান। সেই পুরুষই অদ্য[বর্তমান আছেন] এবং কল্যও সেই পুরুষই [বর্তমান থাকিবেন], অর্থাৎ ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকালে একই অবিকৃত আত্মা থাকে; পৃথক্ নহে ॥ ৮৪॥ ১৩॥
কিঞ্চ, অসূর্য্যযুগঃ পুরুষো জ্যোতির্বিধামুকঃ, অধূমকমিতি যুক্তং জ্যোতিঃ-
১৮
‘পরত্বাৎ। যত্ত্বেবং লক্ষিতো যোগিভিহৃদয় ঈশানো ভূত-ভব্যস্য, স এব নিত্যঃ কূটস্থোহদ্যেদানীং প্রাণিষু বর্তমানঃ, শ্ব উ শ্মোহপি বর্ত্তিষ্যতে, নান্যস্তৎসমোহন্যশ্চ জনিষ্যত ইত্যর্থঃ। অনেন “নায়মস্তীতি চৈকে” ইত্যয়ং পক্ষো ন্যায়তো- হপ্রাপ্তোহপি স্ববচনেন শ্রুত্যা প্রত্যুক্তঃ; তথা ক্ষণভঙ্গবাদশ্চ ॥ ৮৪ ॥ ১৩
অপি চ, সেই অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত পুরুষ অধূমক(ধূমহীন) জ্যোতির ন্যায়। শ্রুতিতে ‘অধূমকঃ’ শব্দটি পুংলিঙ্গ থাকিলেও ক্লীবলিঙ্গ জ্যোতির বিশেষণ হওয়ায় ‘অধূমকম্’ বুঝিতে হইবে। যোগিগণ স্বহৃদয়ে অর্থাৎ সমাহিতচিত্তও যাঁহাকে এইরূপ ভূত-ভূব্যের ঈশান বলিয়া নিরূপণ করিয়াছেন, সেই নিত্য কূটস্থ পুরুষই অদ্য অর্থাৎ এখনও সমস্ত প্রাণীতে বর্তমান আছেন, এবং কল্যও বর্তমান থাকিবেন। অভিপ্রায় এই যে, তাঁহার সমান বা তাঁহা হইতে পৃথক্ কেহ জন্মিবে না। কেহ কেহ বলেন, ‘পরলোকগামী আত্মা নাই’ পূর্ব্বোক্ত এই পক্ষটী যুক্তি- বিরুদ্ধ; সুতরাং অসম্ভব হইলেও শ্রুতি নিজবাক্যে তাহার প্রত্যাখ্যান করিলেন, ইহা দ্বারা ক্ষণভঙ্গবাদও(১) প্রত্যাখ্যাত হইল ॥৮৪৷১৩৷৷
যথোদকং দুর্গে বৃষ্টং পর্ব্বতেষু বিধাবতি।
এবং ধর্ম্মান্ পৃথক্ পশ্যংস্তানেবানুবিধাবতি ॥ ৮৫ ॥ ১৪ ॥
[ভেদদর্শনফলম্ অনর্থ-লাভং স্পষ্টয়তি, —যথেতি]। পর্ব্বতেষু দুর্গে(দুর্গমে ঊর্দ্ধ- ভাগে) বৃষ্টম্ উদকং যথা বিধাবতি(বিবিধতয়া অধোভাগে ধাবতি গচ্ছতি); এবম্ [আত্মনঃ] ধর্মান্ পৃথক্(আত্মনো ভিন্নান্) পশ্যন্(জানন্, জনঃ) তানেব(শরীর- ভেদান্) অনু(তদ্দর্শনানন্তরমেব) বিধাবতি(প্রাপ্নোতি),[ন মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ] ॥
(১) তাৎপর্য্য—ক্ষণভঙ্গবাদ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি মত। সেই মত এইরূপ—ক্ষণভঙ্গ- বাদীরা বলেন যে, জগতে যে কোন পদার্থ আছে, সমস্তই ক্ষণিক—ক্ষণমাত্রস্থায়ী; প্রত্যেক স্বস্তই প্রতিক্ষণে উৎপন্ন হইতেছে এবং পরক্ষণেই বিনষ্ট হইতেছে। আত্মাও ক্ষণিক; বুদ্ধিই আত্মা; বুদ্ধির অতিরিক্ত নিত্য স্থির কোন আত্মা নাই; সুতরাং আত্মার পরলোক-সম্বন্ধও নাই; বুদ্ধি ক্ষণিক হইলেও তাহার প্রবাহ বা ধারাটি চিরস্থায়ী; যেমন স্রোতের জল স্থির না থাকিলেও স্রোতটি স্থির থাকে, ক্ষণনাস্য বুদ্ধিঃ অবস্থাও সেইরূপ। এখানে একই আত্মার পূর্ব্বাপর কালসম্বন্ধ উল্লেখ থাকায় সেই ক্ষণভঙ্গবাদের প্রতিবাদ করা হইল, বুঝিতে হইবে।
ভেদদর্শনের অনর্থময় ফল প্রদর্শন করিতেছেন,—যেমন পর্ব্বতে দুর্গমপ্রদেশে পতিত মেঘোদক নিম্নপ্রদেশে নানাভাবে ধাবিত হয়, ঠিক তেমনি আত্মার বিবিধ ভেদদর্শনকারী ব্যক্তি সেই ভেদদর্শনের পরই নানাবিধ শরীর-প্রভেদ প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৮৫ ॥ ১৪
পুনরপি ভেদদর্শনাপবাদং ব্রহ্মণ আহ,—যথা উদকং দুর্গে দুর্গমে দেশে উচ্ছ্রিতে বৃষ্টং সিক্তং পর্ব্বতেষু পর্ব্বতবৎসু নিম্নপ্রদেশেযু বিধাবতি বিকীর্ণং সদ্ বিনশ্যতি এবং ধর্মান্ আত্মনো ভিন্নান্ পৃথক্ পশ্যন্ পৃথগেব প্রতিশরীরং পশ্যন্ তানেব শরীরভেদানুবর্তিনঃ অনুবিধাবতি—শরীরভেদমেব পৃথক্ পুনঃ পুনঃ প্রতিপদ্যত ইত্যর্থঃ ॥ ৮৫ ॥ ১৪
পুনশ্চ ব্রহ্ম সম্বন্ধে ভেদদর্শনের নিন্দা করিতেছেন,—দুর্গ অর্থাৎ দুর্গম উন্নতপ্রদেশে বৃষ্ট অর্থাৎ মেঘনিৰ্ম্মুক্ত উদক যেমন পর্বতে অর্থাৎ পর্বতবিশিষ্ট নিম্নপ্রদেশসমূহে বিশেষরূপে ধাবমান হয়—ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইয়া বিনাশপ্রাপ্ত হয়, এইরূপ যে লোক আত্মধৰ্ম্মসমূহ প্রত্যেক শরীরে পৃথক্ পৃথক্ দর্শন করে, সেই লোক বিভিন্ন শরীরগত সেই সকল ভেদাভিমুখে ধাবিত হয়; অর্থাৎ পুনঃপুনঃ বিভিন্ন শরীর প্রাপ্ত হয়;[কখনও আর মুক্ত হইতে পারে না] ॥ ৮৫ ॥ ১৪ ॥ যশোদকং শব্দে শব্দমাসিকং তাদগের ভবতি। যথোদকং শুদ্ধে শুদ্ধমাসিক্তং তাদৃগেব ভবতি।
‘এবং মুনের্বিজানত আত্মা ভবতি গৌতম ॥ ৮৬ ॥ ১৫ ॥ ইতি কঠোপনিষদি দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথমা বল্লী সমাপ্তা ॥ ২॥ ১ ॥ ব্যাখ্যা।
[ব্রহ্মৈকত্বদর্শিনস্ত নৈবমিত্যাহ, -যথেতি]। হে গৌতম! যথা শুদ্ধম্ উদকং শুদ্ধে[উদকে] সিক্তম্(নিক্ষিপ্তং সং) তাদৃগেব(শুদ্ধমেব) ভবতি,[ন তু পৃথক্ তিষ্ঠতি] বিজানতঃ(একত্বং পশ্যতঃ) মুনেঃ(মননশীলস্য) আত্মা(অদ্বিতীয়- ব্রহ্মস্বরূপম্) এব ভবতি,[ব্রহ্মভাবপ্রাপ্ত্যা বিমুচ্যতে ইতি ভাবঃ]। গৌতমেতি নচিকেতসঃ সম্বোধনম্ ॥
হে গৌতম নচিকেতঃ! শুদ্ধ বা নির্মল জল নির্মল জলে নিক্ষিপ্ত হইয়া যেমন তাদৃশই(নির্মলই) হইয়া যায়, তেমনি বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ ব্রহ্মৈকত্বাভিজ্ঞ মুনির আত্মাও ব্রহ্মই হয় ॥ ৮৬ ॥ ১৫ ॥
অস্য পুনর্বিদ্যাবতো বিধ্বস্তোপাধিকৃতভেদদর্শনস্য বিশুদ্ধবিজ্ঞানঘনৈকরসম্ অদ্বয়ম্ আত্মানং পশ্যতো বিজানতো মুনের্মননশীলস্য আত্মস্বরূপং কথং সম্ভবতীতি উচ্যতে, যথা উদকং শুদ্ধে প্রসন্নে শুদ্ধং প্রসন্নম্ আসিক্তং প্রক্ষিপ্তম্ একরসমেব নান্যথা তাদৃগেব ভবতি আত্মাপ্যেবমেব ভবতি, একত্বং বিজানতো মুনেঃ মনন- শীলস্য; হে গৌতম! তস্মাৎ কুতার্কিকঃভেদদৃষ্টিং নাস্তিককুদৃষ্টিঞ্চ উথিমিত্বা মাতাপিতৃ- সহস্রেভ্যোহপি হিতৈষিণা বেদেনোপদিষ্টম্ আত্মৈকত্বদর্শনং শান্তদর্পৈ- রাদরণীয়মিত্যর্থঃ ॥ ৮৬ ॥ ১৫
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য-গোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য- শ্রীমদাচার্য্য-শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথমবল্লীভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ২॥ ১॥
যে বিদ্বানের উপাধিকৃত ভেদদর্শন বা ভেদজ্ঞান বিদূরিত হইয়া গিয়াছে, বিশুদ্ধ অর্থাৎ উপাধিভূত পরিচ্ছেদরহিত, বিজ্ঞানঘন, একরস অদ্বিতীয় আত্মদর্শী সেই মুনির আত্মা কি প্রকার হয়? এতদুত্তরে বলিতেছেন যে, শুদ্ধ অর্থাৎ প্রসন্ন বা নিৰ্ম্মল জল অপর শুদ্ধ জলে নিক্ষিপ্ত হইলে, একাকার অর্থাৎ তদ্রূপই হইয়া যায়, ইহার অন্যথা হয় না, হে গৌতম(নচিকেতঃ)! বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ আত্মৈকত্বদর্শী মুনির (মননশীলের) আত্মাও ঠিক সেইরূপই হইয়া যায়। অতএব, কুতার্কিকগণের ভেদোপদেশ ও নাস্তিকগণের অসদ্বুদ্ধি পরিত্যাগ- পূর্ব্বক সহস্র সহস্র মাতাপিতা অপেক্ষাও হিতৈষিণী শ্রুতির উপদেশে অভিমান ত্যাগ করিয়া আদর করা উচিত ॥৮৬॥ ১৫ ॥
ইতি কঠোপনিষদে দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথমবলীর ভাষ্যানুবাদ
সমাপ্ত ॥ ২ ॥ ১ ॥
পুরমেকাদশদ্বারমজস্থাবক্রচেতনঃ।
অনুষ্ঠায় ন শোচতি বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে। , এতদ্বৈ তৎ ॥ ৮৭ ॥ ১ ॥
[ পুরমিতি]। একাদশদ্বারম্(শীর্ষণ্যানি সপ্ত, নাভিরেকা, পায়ুপস্থে দ্বে, শিরসি একম্, ইতি একাদশ দ্বারাণি যস্য, তৎ একাদশদ্বারম্) পুবম্(দেহম্), অবক্রচেতসঃ (অবক্রম্ অকুটিলম্ আদিত্যপ্রকাশবৎ নিত্যমেবাবস্থিতমেকরূপং চেতো বিজ্ঞান- মস্যেতি, নিত্যপ্রকাশরূপস্য) অজস্য(জন্মরহিতস্য) ব্রহ্মণঃ,[অধীনমিতি] অনুষ্ঠায়(তদধীনতয়া নিশ্চিত্য)[মমতাত্যাগাৎ বিবেকী জনঃ] ন শোচতি। [দেহত্যাগাৎ প্রাগেব অবিদ্যাক্ষয়াৎ] বিমুক্তঃ(অহঙ্কারাদিবন্ধরহিতঃ সন্) [দেহপাতাৎ পরম্] বিমুচ্যতে(কৈবল্যং প্রাপ্তো ভবতি)[ন পুনর্জায়তে ইত্যভিপ্রায়ঃ]। এতং বৈ তৎ ইতি প্রাগেব ব্যাখ্যাতম্ ॥
মস্তকে—চক্ষুদ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসিকাদ্বয়, মুখ, এই সপ্ত এবং ব্রহ্মরন্ধ্র এক, অধোদেশে নাভি এক, ও মল-মুত্রদ্বার দুই, এই একাদশ দ্বার-বিশিষ্ট পুর অর্থাৎ নগরস্বরূপ এই দেহটি অপরিবর্তনশীল চৈতন্যময় অজ—জন্মরহিত ব্রহ্মের অধীন; বিবেকী জন এইরূপ অবধারণ করিয়া[আমি, আমার ইত্যাদি বুদ্ধি পরিত্যাগ করতঃ] শোক বা দুঃখ ভোগ করে না; এবং[অবিদ্যাক্ষয় হওয়ায়] এই দেহেই বিমুক্ত হইয়া পশ্চাৎ দেহপাতের পর বিশেষভাবে বিমুক্ত হয়, অর্থাৎ কৈবল্য প্রাপ্ত হয়; সে লোক আর জন্মধারণ করে না] ॥৮৭॥১॥
পুনরপি প্রকারান্তরেণ ব্রহ্মতত্ত্বনির্ধারণার্থোহয়মারম্ভঃ-দুর্বিজ্ঞেয়ত্বাদব্রহ্মণঃ। পুরং পুরমিব পুরম্, দ্বারপালাধিষ্ঠাত্রাদ্যনেকপুরোপকরণসম্পত্তিদর্শনাৎ শরীরং পুরম্। পুরঞ্চ সোপকরণং স্বাত্মনা অসংহতস্বতন্ত্রস্বাম্যর্থং দৃষ্টম্, তথেদং পুর- সামান্যাৎ অনেকোপকরণসংহতং শরীরং স্বাত্মনা অসংহতরাজস্থানীয়স্বাম্যর্থং ভবিতুমর্হতি। তচ্চেদং শরীরাখ্যং পুরম্ একাদশদ্বারম্; একাদশ দ্বারাণ্যস্য-সপ্ত
५
শীর্ষ-্যানি, নাভ্যা সহার্ব্বাঞ্চি ত্রীণি, শিরস্যেকম্, তৈরেকাদশদ্বারং পুরম্। কস্য? —অজস্য জন্মাদিবিক্রিয়ারহিতস্য আত্মনো রাজস্থানীয়স্য পুরধৰ্ম্মবিলক্ষণস্থ্য। অবক্রচেতসঃ, অবক্রম্ অকুটিসম্ আদিত্যপ্রকাশবৎ নিত্যমেবাবস্থিতম্ একরূপং চেতো বিজ্ঞানমস্যেতি অবক্রচেতাঃ, তস্য অবক্রচেতসো রাজস্থানীয়স্য ব্রহ্মণঃ। যস্যেদং পুরম্, তং পরমেশ্বরং পুরস্বামিনম্ অনুষ্ঠানে ধ্যাত্বা; ধ্যানং হি তস্যানুষ্ঠানং সম্যগ্বিজ্ঞানপূর্ব্বকম্। তং সর্ব্বৈষণাবিনিমুক্তঃ সন্ সমং সর্ব্বভূতস্থং ধ্যাত্বা ন শোচতি। তদ্বিজ্ঞানাদভয়প্রাপ্তেঃ শোকাবসরাভাবাৎ কুতো ভয়েক্ষা। ইহৈবা- বিদ্যাকৃতকামকৰ্ম্মবন্ধনৈর্বিমুক্তো ভবতি। বিমুক্তশ্চ সন্ বিমুচ্যতে—পুনঃ শরীরং ন গৃহ্লাতীত্যর্থঃ ॥ ৮৭ ॥ ১ ॥
ব্রহ্ম অত্যন্ত দুর্বিজ্ঞেয়; এই কারণে পুনঃ প্রকারান্তরে ব্রহ্মতত্ত্ব নিরূপণের উদ্দেশ্যে এই বল্লী আরব্ধ হইতেছে,-‘পুর’ অর্থ-পুর- সদৃশ, প্রসিদ্ধ পুরে(নগরে) যেমন দ্বারপাল, পুরস্বামী ও পুরোপযোগী অন্যান্য বস্তু থাকে, এই শরীরেও সেই সমস্ত বিদ্যমান থাকায় এই শরীর ‘পুর’ বলিয়া কথিত হয়। দেখা যায়-পুর ও পুরোপকরণ বস্তুগুলি, পুরের সহিত যিনি সংহত নহেন, অর্থাৎ পুরের ক্ষয়-বৃদ্ধিতে যাঁহার স্বরূপতঃ ক্ষয় বা বৃদ্ধি হয় না, এমন একজন স্বাধীন স্বামীর (পুরাধিপতির) অধীন থাকে; পুরসাদৃশ্য থাকায় অনেকপ্রকার উপকরণ(দ্বারপালাদিস্থানীয় ইন্দ্রিয়াদি-) সমন্বিত এই শরীরও সেইরূপ শরীরের সহিত অসংহত(শরীরের হ্রাসবৃদ্ধিতে যাঁহার হ্রাস- বৃদ্ধি নাই, এমন) একজন রাজস্থানীয় স্বামীর অধীন থাকা আবশ্যক। সেই এই শরীরসংজ্ঞক পুরটি একাদশ দ্বারযুক্ত; তন্মধ্যে মস্তকে সপ্ত(চক্ষুর্ব্বয়, শ্রোত্রদ্বয়, নাসাবয় ও মুখ), নাভিসহ অধোবর্তী তিন (নাভি, পায়ু ও উপস্থ), ব্রহ্মরন্ধ্র এক; এই একাদশটি দ্বার থাকায় শরীররূপ পুরটিও একাদশ দ্বারযুক্ত*। এই পুরটি কাহার?
[উত্তর—] যিনি অজ অর্থাৎ জন্মাদিবিকার-রহিত, পুর হইতে বিভিন্ন প্রকার ও স্বাধীন রাজস্থানীয় আত্মা, এবং যিনি অবক্রচেতা অর্থাৎ যাঁহার চৈতন্য—বিজ্ঞান কখনও বক্র বা কুটিল নহে, পরন্তু সূর্য্যের ন্যায় নিত্যপ্রকাশমান ও কূটস্থ বা চিরস্থিত, সেই আত্ম- স্বরূপ ব্রহ্মের[পুর বা অভিব্যক্তি-স্থান]। যাঁহার এই পুর, সেই পুরস্বামী পরমেশ্বরকে অনুষ্ঠান করিয়া অর্থাৎ ধ্যান করিয়া লোকে আর শোকপ্রাপ্ত হয় না। তাঁহার যথার্থস্বরূপ বিজ্ঞানপূর্ব্বক যে ধ্যান, তাহাই তাঁহার অনুষ্ঠান, অর্থাৎ ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ জ্ঞান- পূর্ব্বক যে ধ্যান, তাঁহার পক্ষে তদ্ভিন্ন আর কোনরূপ অনুষ্ঠান সম্ভব- পর হয় না।[বিবেকী পুরুষ] সর্বপ্রকার কামনা-রহিত হইয়া সর্বভূতে সমভাবে অবস্থিত সেই পুরস্বামী আত্মাকে ধ্যান করিলে
‘আর কখনও শোক করেন না; কারণ, আত্মজ্ঞানে অভয়প্রাপ্তি হয়; তৎকালে শোকের অবসরই থাকে না; সুতরাং ভয়দর্শন হইবে কোথা হইতে?[অধিকন্তু] সেই ব্যক্তি এই দেহেই অবিদ্যা ও তৎকৃত কামকর্মাদি বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন, বিমুক্ত থাকিয়াও [দেহপাতের পর] আবার বিমুক্ত হন—পুনর্বার আর শরীর গ্রহণ করেন না, অর্থাৎ তাঁহার আর জন্ম হয় না ॥৮৭॥ ১॥
হংসঃ শুচিষদসুরন্তরিক্ষসদ্- হোতা বেদিষদতিথিদুর্রোণসং।
নৃষধরসদ্ভূতসদ্যোম- দব্জা গোজা খাতজা অদ্রিজা খাতং বৃহৎ ॥৮৮॥২॥
[ইদানীং তস্যৈবাত্মনঃ সর্ব্বপুরসম্বন্ধিত্বমাহ-হংস ইতি।] হংসঃ(হন্তি গচ্ছতি সর্ব্বং ব্যাপ্নোতীতি হুংসঃ-পরমাত্মা সূর্য্যশ্চ)। শুচিষৎ(শুচৌ দিবি সীদতি বসতি ইতি শুচিষৎ)। বসুঃ(বাসয়তি সর্ব্বমিতি বসুঃ-সর্ব্বলোকস্থিতিহেতুঃ)। অন্তরিক্ষসৎ(বায়ুরূপেণ অন্তরিক্ষে সীদতীতি অন্তরীক্ষগ ইত্যর্থঃ)। হোতা (অগ্নিঃ),[যদ্বা জুহোতি শব্দাদিবিষয়ান্ অত্তি অনুভবতীতি-ইন্দ্রিয়াদিস্থঃ)। বেদিষৎ(বেদ্যাৎ পূজ্যতয়াস্তীতি বেদিষৎ), অতিথিঃ(সোমঃ সন্) দুরোণসৎ (দুরোণে সোমরসপাত্রে-কলসে সীদতীতি দুরোণসৎ)। নৃষৎ(নৃষু মনুষ্যেযু সীদতীতি নৃষৎ)। বরসৎ(বরেষু ব্রহ্মাদিদেবেষু সীদতি অস্তীতি বরসৎ)। ঋতসৎ(ঋতে যজ্ঞে সত্যস্বরূপে বেদে বা সীদতীতি ঋতসৎ)। ব্যোমসৎ (ব্যোম্নি আকাশে সীদতীতি ব্যোমসং),[যদ্বা ব্যোতমস্যাৎ জগদিতি জগৎ-প্রসুঃ প্রকৃতিঃ ব্যোমেত্যুচ্যতে; প্রকৃতিস্থ ইত্যর্থঃ]। অবজাঃ(অপ্সু শঙ্খ-মৎস্যাদি- রূপেণ জায়তে ইত্যজাঃ)। গোজাঃ(গবি পৃথিব্যাং জায়ত ইতি গোজাঃ)। ঋতজাঃ(সত্যফলযজ্ঞাদিরূপেণ জায়ত ইতি ঋতজাঃ)। অদ্রিজাঃ(অদ্রিভ্যো জায়ত ইতি অদ্রিজাঃ)। ঋতম্(সত্যম্),[যদ্বা ঋতং মুখ্যতো বেদ প্রতি- পাদ্যম্]। বৃহৎ(সর্ব্বকারণত্বাৎ মহৎ), এতদ্বৈ তদিতি।[অত্র পরমাত্ম- পক্ষে সূর্য্যপক্ষে চ সর্ব্বাণি বিশেষণানি যথাসম্ভবং যোজ্যানি]॥
পূর্ব্বোক্ত আত্মার যে সর্ব্বশরীরে তুল্যরূপ সম্বন্ধ আছে, এখানে তাহাই কথিত হইতেছে,-সমস্ত বস্তুর সহিত সম্বদ্ধ বলিয়া পরমাত্মা ও সূর্য্য, উভয়ই ‘হংস’-পদবাচ্য। সেই হংসই আবার স্বর্গরূপ শুচি প্রদেশে অবস্থিতি করেন বলিয়া ‘শুচিষৎ’; সর্ব্বলোকের স্থিতিসাধক বলিয়া ‘বসু’; বায়ুরূপে অন্তরিক্ষে বিচরণ করেন বলিয়া ‘অন্তরিক্ষসৎ’; স্বয়ংই অগ্নিস্বরূপ বলিয়া কিংবা শব্দাদি বিষয়সমূহ ভোগ করেন বলিয়া ‘হোতা’; পৃথিবীরূপ বেদিতে[পূর্ব্বোক্ত হোতার আশ্রয়ে] বাস করেন বলিয়া ‘বেদিষৎ’; অতিথিরূপে অর্থাৎ সোমরস- রূপে দুরুোণে(কলসে) বাস করেন বলিয়া ‘অতিথি’ ও ‘দুরোণসৎ’; নৃত্রে (মনুষ্যে) অবস্থান করায় ‘নৃষৎ’; সমস্ত শ্রেষ্ঠ পদার্থে অবস্থিতি করেন বলিয়া ‘বরসৎ’; শঙ্খ ও মৎস্যাদিরূপে জলে জন্ম ধারণ করেন বলিয়া ‘অবজা’, গোরূপা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন বলিয়া গোজা, ঋত অর্থ সত্য-অবশ্যম্ভাবী কৰ্ম্ম- ফল, তাহাতে প্রকটিত হন বলিয়া ‘ঋতজা’; এবং পর্ব্বতে প্রকাশ পান বলিয়া ‘অদ্রিজা’[শব্দে অভিহিত হন]। আর তিনি স্বয়ং সত্যস্বরূপ এবং মহৎ; ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই বস্তু ॥ ৮৮ ॥ ২॥
স তু নৈকপুরবর্ত্যেবাত্মা, কিন্তুর্হি?—সর্ব্বপুরবর্তী। কথম্? হংসঃ—হন্তি গচ্ছ- তীতি, শুচিষৎ শুচৌ দিবি আদিত্যাত্মনা সীদতীতি। বসুঃ বাসয়তি সর্ব্বানিতি। বায়াত্মনা অন্তরিক্ষে সীদতীত্যন্তরিক্ষসৎ। হোতা অগ্নিঃ, “অগ্নির্বৈ হোতা” ইতি শ্রুতেঃ। বেদ্যাং পৃথিব্যাং সীদতীতি বেদিবৎ। “ইয়ং বেদি; পরোহন্তঃ পৃথিব্যাঃ” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ *। অতিথিঃ সোমঃ সন্ দুরোণে কলসে সীদতীতি দুরোণসৎ। ব্রাহ্মণোহতিথিরূপেণ বা দুরোণেষু গৃহেষু সীদতীতি দুরোণষৎ। নৃষৎ—নৃষু মনুষ্যেষু সীদতীতি নৃষৎ। বরসৎ—বরেষু দেবেষু সীদতীতি বরসৎ। ঋতসৎ—ঋতং সত্যং যজ্ঞো বা, তস্মিন্ সীদতীতি ঋতসৎ। ব্যোমসৎ—ব্যোম্নি আকাশে সীদতীতি ব্যোমসৎ। অব্জা অপ্সু শঙ্খ-শুক্তি-মকরাদিরূপেণ জায়ত ইতি অব্জাঃ। গোজাঃ —গবি পৃথিব্যাং ব্রীহিষবাদিরূপেণ জায়ত ইতি গোজাঃ। ঋতজাঃ—যজ্ঞাঙ্গরূপেণ
১৯
জায়ত ইতি ঋতজাঃ। অদ্রিজাঃ-পর্ব্বতেভ্যো নদ্যাদিরূপেণ জায়ত ইতি অদ্রিজাঃ। সর্ব্বাত্মাপি সন্ ঋতম্ অবিতথস্বভাব এব। বৃহৎ-মহান সর্ব্বকারণত্বাৎ। যদাপ্যাদিত্য এব মন্ত্রেণোচ্যতে, তদাপ্যস্যাত্ম-স্বরূপত্বমাদিত্যস্যাঙ্গীকৃতমিতি ব্রাহ্মণব্যাখ্যানেহপ্য- বিরোধঃ। সর্ব্বথাপ্যেক এবাত্মা জগতো নাত্মভেদ ইতি মন্ত্রার্থঃ ॥ ৮৮ ॥ ২॥
কিন্তু সেই আত্মা যে একটিমাত্র শরীররূপ পুরে বাস করেন, তাহা নহে; তবে কি?—তিনি সমস্ত শরীরপুরে বাস করেন। কি প্রকারে?—তিনি হনন অর্থাৎ(সর্বত্র) গমন করেন বলিয়া ‘হংস’- পদ-বাচ্য, এবং শুচি অর্থাৎ দ্যুলোকে “সূর্য্যরূপে অবস্থান করেন বলিয়া শুচিষৎ; সমস্ত বস্তুতে অবস্থিতি করেন, এই কারণে ‘বসু’, অন্তরিক্ষে(আকাশে) বায়ুরূপে অবস্থান করেন বলিয়া ‘অন্তরিক্ষসৎ’, শ্রুতিতে যে অগ্নিকে ‘হোতা’ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, তিনি সেই অগ্নিরূপ হোতা; এবং পৃথিবীরূপ বেদিতে অবস্থান করেন বলিয়া ‘বেদিষৎ’। শ্রুতি বলিয়াছেন—‘এই যে যজ্ঞ-প্রসিদ্ধ বেদী, ইহা পৃথিবীরই স্বরূপ, তদতিরিক্ত নহে।’ তিনিই আবার সোমরূপী অতিথি হইয়া দুরোণে(কলসে) অবস্থান করেন বলিয়া, অথবা ব্রাহ্মণ অতিথিরূপে গৃহে(দুরোণে) উপস্থিত হন বলিয়া ‘অতিথি ও দুরোণ- সৎ’; নৃসমুহে—মনুষ্য-সমুহে অবস্থান করেন বলিয়া নৃষৎ, দেবাদি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিতে প্রকাশ পান বলিয়া ‘বরসৎ’; ‘ঋত’ অর্থ সত্য অথবা যজ্ঞ, তাহাতে থাকেন বলিয়া ‘ঋতসৎ’; আকাশে অবস্থিতি হেতু ‘ব্যোমসৎ’। শঙ্খ, শুক্তি(ঝিনুক) ও মকরাদিরূপে জলে জন্মধারণ করেন বলিয়া ‘অবজা’, পৃথিবীতে ধান্য-যবাদিরূপে উৎপন্ন হন বলিয়া ‘গোজা’, যজ্ঞাঙ্গদ্রব্যরূপে জন্ম লাভ করেন বলিয়া ‘ঋতজা’, পর্বত হইতে নদী প্রভৃতিরূপে জন্মলাভ হেতু ‘অদ্রিজা’। কিন্তু, তিনি সর্বাত্মক বা সর্বময় হইয়াও স্বয়ং ঋতই অর্থাৎ সত্যস্বরূপই থাকেন(বিকৃত হন না), এবং তিনি সর্ব্ব জগতের কারণ, এই জন্য
বৃহৎ—মহৎ। কঠ-ব্রাহ্মণোক্ত ব্যাখ্যানুসারে উল্লিখিত মন্ত্রে যদি সূর্য্যকেই অভিধেয় বা বর্ণনীয় বলিয়া গ্রহণ করা যায়, * তাহা হইলেও সূর্য্যকেই আত্মস্বরূপ বলিয়া স্বীকার করায় ব্রহ্মপক্ষে ব্যাখ্যায়ও কোন বিরোধ হইতে পারে না। ফলকথা, যে কোন রকমেই হউক, সর্ব্ব- প্রকারেই জগতে একই আত্মা, আত্মভেদ নাই[ইহা প্রমাণিত হইল] ॥ ৮৮॥ ২॥
ঊর্দ্ধং প্রাণমুন্নয়ত্যপানং প্রত্যগস্যতি।
ঊর্দ্ধমিতি।[, যত্তচ্ছব্দাবত্র গ্রাহ্যৌ। অঙ্গুষ্ঠমাত্রত্বাদিনা প্রাগুক্তঃ যঃ] প্রাণম্(প্রাণবায়ুম্) ঊর্দ্ধম্ উন্নয়তি(ঊর্দ্ধগতিমত্তয়া প্রেরয়তি), অপানঞ্চ[বায়ুম্] প্রত্যক্(অধঃ)[বিমুত্রাদিনিষ্কাশনহেতুতয়া] অস্ত্যতি(ক্ষিপতি প্রেরয়তি), মধ্যে(হৃদি) আসীনম্(অবস্থিতম্)[তম্] বামনং(মুমুক্ষুভিঃ ভজনীয়ম্), বিশ্বে (সর্ব্বে) দেবাঃ(চক্ষুরাদয়ঃ) উপাসত ইতি। বিশ্বদেবা ইতি পাঠান্তরম্। [এতেন প্রাণাপানপ্রেরকত্বলিঙ্গেন প্রাগুক্তেশানো মুখ্যঃ ‘প্রাণঃ’ ইত্যপি শঙ্কা নিরস্তা, নিরবকাশবামনশ্রুত্যাদেঃ]॥
, যিনি প্রাণকে অর্থাৎ প্রাণবায়ুর ব্যাপারকে ঊর্দ্ধগামী করেন এবং অপান বায়ুর বৃত্তিকে অধোগামী করেন, হৃদয়মধ্যে অবস্থিত, মুমুক্ষুর উপাস্য সেই বামনকে
(আত্মাকে) সমস্ত দেবগণ অর্থাৎ চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ উপাসনা করেন, অর্থাৎ তাঁহার উদ্দেশে, বা তাঁহারই প্রেরণায় নিজ নিজ কার্য্য করিয়া থাকে ॥৮৯৷৷৩৷৷
আত্মনঃ স্বরূপাধিগমে লিঙ্গমুচ্যতে,-ঊর্দ্ধং হৃদয়াৎ প্রাণং প্রাণবৃত্তিং বায়ু- মুন্নয়তি উর্দ্ধং গময়তি। তথাপানং প্রত্যক্-অধোহস্যতি ক্ষিপতি। য ইতি বাক্যশেষঃ। তং মধ্যে হৃদয়পুণ্ডরীকাকাশে আসীনং বুদ্ধাবভিব্যক্তং বিজ্ঞান- প্রকাশনম্, বামনং বর্ণনীয়ং সম্ভজনীয়ম্, বিশ্বে সর্ব্বে দেবাঃ চক্ষুরাদয়ঃ প্রাণা রূপাদি- বিজ্ঞানং বলিমুপাহরন্তো বিশ ইব রাজানমুপাসতে, তাদর্থ্যেনানুপরতব্যাপারা ভবন্তীত্যর্থঃ। যদর্থা যৎপ্রযুক্তাশ সর্ব্বে, বায়ুকরণব্যাপারা; সোহন্যঃ সিদ্ধ ইতি বাক্যার্থঃ ॥ ৮৯ ॥ ৩ ॥
আত্মার স্বরূপ-পরিজ্ঞানের উপায় কথিত হইতেছে;—[ যিনি] প্রাণকে অর্থাৎ প্রাণ বায়ুর ব্যাপারকে হৃদয়-প্রদেশ হইতে উর্দ্ধে লইয়া যান, এবং অপান বায়ুকেও অধোদিকে প্রেরণ করেন, শ্রুতিতে ‘যঃ’ এই কর্তৃপক্ষটি অনুক্ত রহিয়াছে[ তাহা বুঝিয়া লইতে হইবে]। হৃৎপদ্ম-মধ্যবর্তী আকাশে(হৃদয়াকাশে) অবস্থিত, অর্থাৎ বুদ্ধিতে যাহার জ্ঞান প্রকাশ, অভিব্যক্ত বা প্রকটিত হয়, মুমুক্ষুগণের সম্যক্ ভজনীয়(উপাস্য) সেই বামনকে ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর—প্রেরক [ আত্মাকে] চক্ষুঃ প্রভৃতি সমস্ত প্রাণ বা ইন্দ্রিয়বর্গ, প্রজাগণ যেরূপ রাজার উপহার প্রদান করতঃ উপাসনা করে, সেইরূপ রূপরসাদি বিষয়ে জ্ঞান(অনুভূতি) সমুৎপাদন করিয়া উপাসনা করিয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, হৃৎ-পদ্ম-মধ্যস্থ সেই আত্মার উদ্দেশ্যেই ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব ব্যাপার হইতে বিরত হয় না। প্রাণাদি করণবর্গের ব্যাপার- নিচয় যাঁহার উদ্দেশে এবং যাঁহার প্রেরণায় সম্পাদিত হয়, তিনি এই করণবর্গ হইতে পৃথক্—স্বতন্ত্র পদার্থ। ইহাই উক্ত বাক্যের তাৎপর্য্য- লভ্য অর্থ ॥৮৯৷৩
অস্যেতি। শরীরস্থস্য অন্য দেহিনঃ(দেহবতো জীবস্য) বিস্রংসসমানস্য(স্থূলং দেহং ত্যজতঃ) দেহাৎ বিমুচ্যমানস্য[সতঃ] অত্র(প্রাণাদিসমন্বিতে দেহে) কিং পরিশিষ্যতে?[ন কিঞ্চিদপি ইত্যর্থঃ]। এতদ্বৈ তদিতি[যস্য অপগমে অত্র ন কিঞ্চিদপি তিষ্ঠতি], এতৎ বৈ(এব) তৎ, যৎ[ত্বয়া পৃষ্টম্]॥
এই শরীরস্থ দেহী(দেহাভিমানী জীব) বিস্রংসমান হইলে—দেহ হইতে বহির্গত হইলে, এই দেহে কি অবশিষ্ট থাকে? অর্থাৎ প্রাণাদি করণনিচয় কিছুই থাকে না।[যাহার অপগমে প্রাণাদি করণবর্গ পলায়ন করে], তাহাই তোমার জিজ্ঞাসিত সেই আত্মবস্তু ॥ ৯০ ॥ ৪ ॥
কিঞ্চ,—অস্য শরীরস্থস্য আত্মনো বিস্রংসমানস্য অবস্রংসমানস্য ভ্রংশমানস্য দেহিনো দেহবতঃ। বিস্রংসনশব্দার্থমাহ—দেহাদ্ বিমুচ্যমানস্যেতি। কিমত্র পরিশিষ্যতে প্রাণাদিকলাপে, ন কিঞ্চন পরিশিষ্যতে; অত্র দেহে, পুরস্বামি- বিদ্রবণ ইব পুরবাসিনাম্। যস্য আত্মনঃ অপগমে ক্ষণমাত্রাৎ কার্য্যকারণ- কলাপরূপং সর্ব্বমিদং হতবলং বিধ্বস্তং ভবতি বিনষ্টং ভবতি; সোহন্যঃ সিদ্ধ আত্মা ॥ ৯০ ॥ ৪
আরও এক কথা, ‘এই শরীরস্থ দেহী অর্থাৎ দেহাভিমানী আত্মা (জীব) বিস্রংসমান বা ভ্রংশমান হইলে—(নিজেই বিস্রংসন শব্দের অর্থ বলিতেছেন)—দেহ হইতে বিমুক্ত অর্থাৎ বহির্গত হইলে প্রাণাদি সমষ্টিময় এই দেহে কি অবশিষ্ট থাকে? অর্থাৎ কিছুই থাকে না। পুরাধিপতির’ অপগমে যেরূপ পুরবাসিগণ বিধ্বস্ত বা পলায়িত হয়, সেইরূপ যে আত্মার অপগমে কার্য্যকারণাত্মক এই প্রাণাদি সমষ্টি
তৎক্ষণাৎ বলহীন—বিধ্বস্ত—বিনষ্ট হইয়া যায়, সেই আত্মা প্রাণাদি হইতে পৃথক ইহা সিদ্ধ বা প্রমাণিত হইল(*) ॥৯০॥৪॥
কশ্চন(কশ্চিদপি) মর্ত্যঃ(মরণধৰ্ম্মা মনুষ্যঃ) প্রাণেন ন জীবতি, অপানেন (বায়ুনা চ) ন[জীবতি]। তু(পুনঃ) ইতরেণ(তদ্বিলক্ষণেন) জীবন্তি (প্রাণান্ ধারয়ন্তি),[ইতরেণ কেন? ইত্যাহ]—যস্মিন্(পরাত্মনি) এতৌ (প্রাণাপানো) উপাশ্রিতো(অধীনতয়া বর্ত্তেতে) ॥
মরণশীল মনুষ্য প্রাণ বা অপানের দ্বারা জীবিত থাকে না; পরন্তু এই উভয়ই(প্রাণ ও অপান) যাহাতে আশ্রিত আছে, প্রাণাপানবিলক্ষণ সেই পরমাত্মার সাহায্যেই জীবিত থাকে ॥ ৯১ ॥ ৫ ॥
স্যান্মতম্-প্রাণাপানাদ্যপগমাদেবেদং বিধ্বস্তং ভবতি, ন তু ব্যতিরিক্তাত্মাপগমাৎ প্রাণাদিভিরেবেহ মর্ত্যো জীবতীতি। নৈতদস্তি,-ন প্রাণেন, ন অপানেন চক্ষুরাদিনা বা মর্ত্যঃ মনুষ্যে দেহবান্ কশ্চন জীবতি। ন কোহপি জীবতি। ন হোষাং পরার্থানাং সংহত্যকারিত্বাৎ জীবনহেতুত্বম্ উপপদ্যতে। স্বার্থেনাসংহতেন পরেণ কেনচিদপ্রযুক্তং সংহতানামবস্থানং ন দৃষ্টম্; যথা গৃহাদীনাং লোকে, তথা প্রাণাদীনামপি সংহতত্বাদ্ভবিতুমর্হতি। অত ইতরেণ তু ইতরেণৈব সংহতপ্রাণাদি- বিলক্ষণেন তু সর্ব্বে সংহতাঃ সন্তো জীবন্তি প্রাণান্ ধারয়ন্তি। যস্মিন্ সংহত- বিলক্ষণে আত্মনি সতি পরস্মিন্ এতৌ প্রাণাপানো চক্ষুরাদিভিঃ সংহতৌ উপা-
শ্রিতৌ; যস্য অসংহতস্যার্থে প্রাণাপানাদিঃ সর্ব্বং স্বব্যাপারং কুর্ব্বন্ বর্ত্ততে সংহতঃ সন্; স ততোহন্যঃ সিদ্ধ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৯১ ॥ ৫
শঙ্কা হইতে পারে যে, প্রাণাদি বায়ুর অপগমেই এই দেহ বিধ্বস্ত বা বিনষ্ট হইয়া থাকে, কিন্তু প্রাণাদির অতিরিক্ত আত্মার অপগমে বিধ্বস্ত হয় না; কারণ, এ জগতে মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল প্রাণিগণ প্রাণাদি দ্বারাই জীবন ধারণ করিয়া থাকে। না, এরূপ হইতে পারে না; কারণ, মর্ত্য-মনুষ্য অর্থাৎ দেহধারী কেহই প্রাণের দ্বারা কিংবা অপানের দ্বারা অথবা চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়দ্বারা জীবন ধারণ করে না; কেননা, ইহারা সকলেই সংহত্যকারী অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে কার্য্যসম্পাদক, সুতরাং পরার্থ(অপরের প্রয়োজনসাধনার্থ উৎপন্ন); পরার্থ বলিয়া ইহারা জীবনধারণের কারণ হইতে পারে না। জগতে স্বার্থ বা পরোদ্দেশ্যশূন্য-অসংহত অপর কাহারও দ্বারা পরিচালিত না হইয়া যেমন গৃহাদি কোন সংহত(সাবয়ব) বস্তুকেই অবস্থান করিতে দেখা যায় না, প্রাণাদি করণনিচয়ও যখন সংহত, তখন তাহাদের সম্বন্ধেও তেমনি ব্যবস্থা হওয়া উচিত। অতএব নিশ্চয়ই প্রাণপ্রভৃতি সংহত পদার্থ হইতে বিভিন্নরূপ(অসংহত) অপরের দ্বারা সমস্ত বস্তু সংহত(সম্মিলিত বা সাবয়ব) হইয়া জীবিত থাকে। সংহতবিলক্ষণ যে-পরমাত্মা বিদ্যমান থাকিলে এই প্রাণ ও অপান চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সহিত সংহতভাবে বর্তমান থাকে।[অভিপ্রায় এই যে,] প্রাণ ও অপানাদি করণনিচয় সংহত হইয়া যে অসংহত আত্মার উদ্দেশ্যে নিজ নিজ কার্য্য করতঃ অবস্থান করে, সেই অসংহত পদার্থটি যে প্রাণাদি হইতে পৃথক্, ইহা দ্বারা তাহা প্রমাণিত হইল * ॥৯১॥৫৷৷
হন্ত ত ইদং প্রবক্ষ্যামি গুহ্যং ব্রহ্ম সনাতনম্। যথা চ মরণং প্রাপ্য আত্মা ভবতি গৌতম ॥৯২৷৷৬৷৷
[“যেয়ং প্রেতে” ইত্যাদিনা নচিকেতসা যঃ পরলোকাস্তিত্বে সন্দেহঃ কৃতঃ, ইদানীং তন্নিবৃত্ত্যর্থং বিশিষ্যাহ—হন্ত ত ইতি]। হে গৌতম, হন্ত ইদানীং তে (তুভ্যম্) ইদং গুহ্যং সনাতনং ব্রহ্ম প্রবক্ষ্যামি।[যদবিজ্ঞানাৎ] আত্মা মরণং প্রাপ্য চ যথা ভবতি;[তচ্চ তুভ্যং প্রবক্ষ্যামি] ॥
হে গৌতম![তোমার সংশয় নিবৃত্তির জন্য] এই গুহ্য(গোপনীয়) সনাতন (নিত্য) ব্রহ্মস্বরূপ তোমাকে বলিতেছি, এবং আত্মা(জীব)[ব্রহ্মকে না জানিয়া] মরণ প্রাপ্ত হইয়া(মৃত্যুর পর) যেরূপে সংসার লাভ করে, তাহাও তোমাকে বলিতেছি ॥ ৯২ ॥ ৬ ॥
হন্ত ইদানীং পুনরপি তে তুভ্যমিদং গুহ্যং গোপ্যং ব্রহ্ম সনাতনং চিরন্তনং প্রবক্ষ্যামি। যদ্বিজ্ঞানাৎ সর্ব্বসংসারোপরমো ভবতি অবিজ্ঞানাচ্চ যস্য মরণং প্রাপ্য যথা চাত্মা ভবতি—যথা সংসরতি, তথা শৃণু, হে গৌতম ॥ ৯২ ॥ ৬ ॥
‘হন্ত’ কথাটি আহলাদসূচক; হে গৌতম(নচিকেতঃ)! এখন পুনশ্চ তোমার উদ্দেশে এই গুহ্য অর্থাৎ গোপনীয়(যে-সে লোকের নিকট অপ্রকাশ্য), সনাতন অর্থাৎ চিরন্তন বা চিরস্থির ব্রহ্মতত্ত্ব বলিব; যাঁহার(ব্রহ্মের) জ্ঞানে সংসারের উপরম বা নিবৃত্তি(মুক্তি)
হয়, আর যাঁহার অবিজ্ঞানে অর্থাৎ যে ব্রহ্মকে না জানার ফলে, আত্মা (দেহী) মরণ প্রাপ্ত হইয়া(মৃত্যুর পর) যে প্রকার হয়, অর্থাৎ যে প্রকারে সংসার লাভ করে, তাহা শ্রবণ কর ॥ ৯২ ॥ ৬ ॥
[পূর্ব্বোক্তম্ “যথা চ মরণং প্রাপ্য আত্মা ভবতি” ইতি বিবৃথন্ আহ— যোনিমিতি]। অন্যে(কেচন) দেহিনো(দেহধারণযোগ্যাঃ জীবাঃ) যথাকৰ্ম্ম যথাশ্রুতম্(স্বস্বকৰ্ম্ম-বিদ্যানুসারেণ) শরীরত্বায় শরীরগ্রহণার্থং যোনিং প্রপদ্যন্তে (জরায়ুজা ভবন্তি)। অন্যে(দেহিনঃ)[যথাকৰ্ম্ম যথাশ্রুতম্] স্থাণুম্(স্থাবরদেহম্) সংযন্তি(প্রাপ্নবন্তি) ॥
নিজ নিজ কৰ্ম্ম ও জ্ঞান অনুসারে কোন কোন দেহী শরীর গ্রহণার্থ যোনিদ্বার প্রাপ্ত হয়(শুক্র-শোণিত-সংযোগে উৎপন্ন হয়)। অপর কোন কোন দেহী স্থাণু অর্থাৎ বৃক্ষ-পাষাণাদি স্থাবর দেহ লাভ করে ॥ ৯৩॥ ৭ ॥
যোনিং যোনিদ্বারং শুক্র-বীজসমন্বিতাঃ সন্তোহন্যে কেচিদবিদ্যাবন্তো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে, শরীরত্বায় শরীরগ্রহণার্থং দেহিনো দেহবন্তঃ, যোনিং প্রবিশন্তীত্যর্থঃ। স্থাণুং বৃক্ষাদিস্থাবরভাবম্, অন্যে অত্যন্তাধমা মরণং প্রাপ্য অনুসংযন্তি অনুগচ্ছন্তি। যথাকৰ্ম্ম—যদ্ যস্য কৰ্ম্ম—তদ্ যথাকৰ্ম্ম, যৈর্যাদৃশং কৰ্ম্ম ‘ইহ জন্মনি কৃতম্, তদ্বশেন ইত্যেতৎ। তথা যথাশ্রুতং—যাদৃশঞ্চ বিজ্ঞানমুপার্জিতম্, তদনুরূপমেব শরীরং প্রতিপদ্যন্ত ইত্যর্থঃ; “যথা প্রজ্ঞং হি সম্ভবাঃ” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ ॥৯৩৷৭৷৷
কতকগুলি অবিদ্যাশালী দেহী—দেহধারী মূঢ় ব্যক্তি শরীর গ্রহণের নিমিত্ত শুক্র-বীজ সমন্বিত হইয়া যোনিদ্বার প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ জননেন্দ্রিয় প্রবেশ করিয়া থাকে; অপর অতিশয় অধম ব্যক্তিরা মরণ প্রাপ্ত হইয়া অর্থাৎ মৃত্যুর পর স্থাণু অর্থাৎ বৃক্ষাদি স্থাবরভাব প্রাপ্ত
২০
‘হয়।[বুঝিতে হইবে] যাহাদের যেরূপ কৰ্ম্ম, অর্থাৎ ইহ জন্মে যাহারা যেরূপ কৰ্ম্ম করিয়াছে, তদনুসারে—এবং যাহারা যেরূপ জ্ঞান উপার্জন করিয়াছে, তদনুসারে শরীর প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কারণ, অপর শ্রুতিতে আছে,—[যাহার] যেরূপ প্রজ্ঞা বা জ্ঞান সঞ্চিত আছে,[তাহার] তদনুসারেই জন্ম হইয়া থাকে’ * ॥ ৯৩॥ ৭॥
য এষ সুপ্তেষু জাগত্তি কামং কামং পুরুষো নিৰ্ম্মিমাণঃ। তদেব শুক্রং তদ্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে। তস্মিল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্ব্বে তদু সাত্যেতি কশ্চন।
এতদ্বৈ তৎ ॥১৪॥৮॥
[পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাতং গুহ্যং ব্রহ্মস্বরূপমাহ-য এষ ইতি]। য এষ পুরুষঃ সুপ্তেষু(প্রাণাদিষু নির্ব্যাপারেষু সৎসু) কামম্(কাম্যমানম্ ভোগ্যবিষয়ম্) কামং (স্বেচ্ছানুসারেণ) নিৰ্ম্মিমাণঃ(সম্পাদয়ন্ সন্) জাগত্তি(অনুপহতস্বভাব এব তিষ্ঠতীত্যর্থঃ)। তৎ(স পুরুষঃ)[তদেবেতি বিধেয়াপেক্ষয়া নপুংসকত্বম্], এব শুক্রম্(শুদ্ধম্ উজ্জ্বলম্), তৎ[এব] ব্রহ্ম, তৎ এব অমৃতম্(অনশ্বরম্) উচ্যতে[প্রাজ্ঞৈরিতি শেষঃ]।[তস্যৈব মহিমাস্তরমাহ]-সর্ব্বে লোকাঃ (পৃথিব্যাদয়ঃ) তস্মিন্(পরমকারণে ব্রহ্মণি) শ্রিতাঃ(আশ্রিতাঃ)। কশ্চন উ(কশ্চিদপি) তৎ(ব্রহ্ম) ন অত্যেতি(অতিক্রম্য ন বর্ত্ততে ইত্যর্থঃ)। এতৎ বৈ(এতদেব) তৎ,[যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্ আত্মতত্ত্বম্]॥
এখন পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাত ব্রহ্মস্বরূপ অভিহিত হইতেছে—প্রাণাদি করণবর্গ সুপ্ত অর্থাৎ নির্ব্যাপার হইলে পর এই যে পুরুষ(আত্মা) ইচ্ছামত বা প্রচুরপরিমাণে কাম্য(অভীষ্টভোগ্য) বিষয়সমূহ নির্মাণ করতঃ জাগ্রৎ থাকেন, অর্থাৎ স্বীয় স্বপ্রকাশভাব পরিত্যাগ করেন না, তিনিই শুদ্ধ(প্রকাশময়) তিনিই ব্রহ্ম এবং তিনিই অমৃত অর্থাৎ অবিনাশী বলিয়া কথিত হন; পৃথিবী প্রভৃতি সমস্ত লোকই তাঁহাতে আশ্রিত; কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না ॥ ৯৪৷৷৮৷৷
যৎ প্রতিজ্ঞাতং গুহ্যং ব্রহ্ম প্ররক্ষ্যামীতি তদাহ-য এষ সুপ্তেষু প্রাণাদিযু জাগর্তি-ন স্বপিতি। কথম্? -কামং কামং তং তমভিপ্রেতং স্ব্যান্ডর্থম্ অবিদ্যয়া নিৰ্ম্মিমাণো নিষ্পাদয়ন্ জাগত্তি পুরুষো যঃ, তদেব শুক্রং শুভ্রং শুদ্ধম্, তদ্ ব্রহ্ম, নান্যগুহ্যং ব্রহ্মাস্তি। তদেব অমৃতম্ অবিনাশি উচ্যতে সর্ব্বশাস্ত্রেষু। কিং চ, পৃথিব্যাদয়ো লোকান্তস্মিন্নেব সর্ব্বে ব্রহ্মণি শ্রিতাঃ আশ্রিতাঃ সর্ব্বলোককারণত্বাৎ তস্য। তদু নাত্যেতি কশ্চনেত্যাদি পূর্ব্ববদেব ॥ ৯৪ ॥৮॥
ইতঃপূর্ব্বে ‘গুহ্য ব্রহ্মস্বরূপ বলিব’ বলিয়া যাহা প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে, তাহা বলিতেছেন,—
এই যে পুরুষ প্রাণ প্রভৃতি সুপ্ত হইলেও জাগ্রৎ থাকেন—সুপ্ত হন না। কি প্রকারে[জাগ্রত থাকেন]? কাম্যমান স্ত্রী প্রভৃতি অবিদ্যা-বলে তত্তৎ ভোগ্য পদার্থ নির্মাণকরতঃ—সম্পাদনকরতঃ যে পুরুষ জাগ্রৎ থাকেন, * তিনিই শুক্র—শুভ্র বা নির্দোষ, তিনিই ব্রহ্ম; তদতিরিক্ত আর কোনও গুহ্য ব্রহ্ম নাই, এবং সমস্ত শাস্ত্রে তিনিই অমৃত অর্থাৎ বিনাশরহিত বলিয়া কথিত হন। আরও এক
কথা,—পৃথিবী প্রভৃতি’ সমস্ত লোকই সেই ব্রহ্মেই আশ্রিত আছে, কারণ তিনিই সমস্ত লোকের কারণ[কার্য্য মাত্রই কারণে আশ্রিত থাকে]। কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না, ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্বেরই মত ॥ ৯৪ ॥ ৮ ॥
অগ্নির্ঘ্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্টো।
রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব
একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা।
রূপং রূপং প্রতিরূপো বহিশ্চ ॥৯৫॥৯৷৷ ব্যাখ্যা।
[ইদানীং দেহভেদেহপি আত্মন একত্বং প্রতিপাদয়িতুং সদৃষ্টান্তমাহ-অগ্নিরি- ত্যাদি মন্ত্রদ্বয়ম্]। যথা এক[এব] অগ্নিঃ ভুবনম্(ইমং লোকম্) প্রবিষ্টঃ [সন্] রূপং রূপম্ প্রতি(কাষ্ঠাদি-দাহ্যভেদানুসারেণ) প্রতিরূপঃ(তত্তদুপাধি- সদৃশপ্রকাশঃ) বভূব, তথা সর্ব্বভূতান্তরাত্মা(সর্ব্বেষাং ভূতানাম্ অভ্যন্তরস্থ আত্মা) একঃ[এক সন্] রূপং রূপম্(প্রতিদেহম্) প্রতিরূপঃ(তত্তদ্-দেহো- পাধ্যনুরূপঃ)[ভবন্ অপি] বহিঃ চ(সর্ব্বভূতেভ্যঃ পৃথক্ এব, স্বয়মবিকৃত এব তিষ্ঠতীত্যাশয়ঃ)। যদ্বা, তথা এক[এব] আত্মা সর্ব্বভূতানাম্ অন্তঃ(অভ্যন্তরে) বহিশ্চ(বহিরপি) রূপং রূপং প্রতিরূপঃ ভবতীত্যর্থঃ ॥
দেহভেদেও যে আত্মার ভেদ হয় না, পরবর্তী মন্ত্রদ্বয়ে তাহাই কথিত হইতেছে, —একই অগ্নি যেরূপ’ জগতে প্রবেশপূর্ব্বক বিভিন্ন দাহ্য পদার্থানুসারে তদনুরূপ প্রতীয়মান হইয়া থাকে, সেইরূপ সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরস্থ আত্মা এক হইয়াও ভিন্ন ভিন্ন দেহরূপ উপাধি অনুসারে সেই সকল উপাধির অনুরূপ হইয়াও বহিঃ অর্থাৎ সমস্ত উপাধি হইতে পৃথক্—অবিকৃতভাবেই থাকেন। অথবা একই আত্মা সর্ব্ব- ভূতের অন্তরে ও বাহিরে ভিন্ন ভিন্ন উপাধির অনুরূপ বলিয়া প্রতীয়মান হন ॥৯৫৷৯
অনেক-কুতার্কিক-পাষণ্ড-কুবুদ্ধি-বিচালিতান্তঃকরণানাং প্রমাণোপপন্নমপি আত্মৈকত্ববিজ্ঞানম্ অসকৃৎ উচ্যমানমপি অনুজবুদ্ধীনাং ব্রাহ্মণানাং চেতসি নাথীয়তে ইতি তৎপ্রতিপাদনে আদরবতী পুনঃপুনরাহ শ্রুতিঃ-অগ্নিরথা এক এব প্রকাশাত্মা সন্ ভুবনং-ভবন্ত্যস্মিন্ ভূতানীতি ভুবনম্-অয়ং লোকঃ, তমিমং প্রবিষ্টোহনুপ্রবিষ্টঃ, রূপং রূপং প্রতি-দার্ব্বাদিদাহ্যভেদং প্রতীত্যর্থঃ, প্রতিরূপ- স্তত্র তত্র প্রতিরূপবান্-দাহ্যভেদেন বহুবিধো বভূব। এক এব তথা সর্ব্বভূতা- ন্তরাত্মা রূপং রূপং সর্ব্বেষাং ভূতানামভ্যন্তর আত্মা অতিসূক্ষ্মত্বাৎ দার্ব্বাদিম্বিব সর্ব্ব- দেহং প্রতি প্রবিষ্টত্বাৎ প্রতিরূপো, বভূব, বহিশ্চ স্বেনাবিকৃতেন রূপেণ আকাশবৎ ॥ ৯৫ ॥ ৯ ॥
বহুতর কুতার্কিক ও পাষণ্ডগণের অসদ্বুদ্ধি দ্বারা যাহাদের অন্তঃ- করণ বিচালিত বা বিকৃত হইয়াছে, সেই সকল কুটিলমতি ব্রাহ্মণগণের হৃদয়ে এই আত্মৈকত্ব-বিজ্ঞান প্রমাণ-সমর্থিত হইলেও এবং পুনঃ পুনঃ উপদিষ্ট হইলেও স্থান পায় না; এই কারণে শ্রুতি সেই আত্মৈকত্ব প্রতিপাদনে আগ্রহান্বিত হইয়া পুনঃ পুনঃ[তাহাই] প্রতিপাদন করিতেছেন *—একই অগ্নি যেরূপ প্রকাশস্বভাব হইলেও ভুবনে অর্থাৎ সমস্ত ভূত্ব যেখানে উৎপন্ন হয়, সেই ‘ভুবন’ পদবাচ্য এই লোকে(জগতে) অনুপ্রবিষ্ট হইয়া প্রত্যেক রূপ অর্থাৎ কাষ্ঠ প্রভৃতি
প্রত্যেক দাহ্য ভেদানুসারে প্রতিরূপ হয়; অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন দাহ্য পদার্থানুসারে বহুবিধ হইয়াছে(হইয়া থাকে); সেইরূপ কাষ্ঠাদির মধ্যগত অগ্নির ন্যায় সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে স্থিত—অন্তরাত্মা এক হইয়াও অতি সূক্ষ্মতাহেতু সর্বদেহে প্রবেশ বশতঃ[সেই সকলের] প্রতিরূপ(সদৃশ) হইয়াছে; তথাপি[তিনি] বহিঃ অর্থাৎ আকাশের ন্যায় স্বরূপতঃ নির্বিকার ॥৯৫॥৯৷৷
[পুনরপ্যাহ]—এক[এব] বায়ুঃ যথা ভুবনং প্রবিষ্টঃ সন্ রূপং রূপং প্রতি- ‘রূপঃ বস্তুব; তথা এক এব সর্ব্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপম্(প্রতিদেহম্) প্রতিরূপঃ [ভবন্ অপি] বহিঃ চ[স্বরূপেণ অবিকৃত এব তিষ্ঠতীত্যর্থঃ] ॥
একই বায়ু যেরূপ জগতে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া প্রত্যেক বস্তুর অনুরূপ ভাব প্রাপ্ত হইয়াছে, সেইরূপ সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা এক হইয়াও প্রত্যেক দেহানুসারে তদনুরূপ হইয়া প্রকাশ পাইয়াছেন; তথাপি তিনি স্বরূপতঃ অবিকৃতই আছেন ॥৯৬৷১০৷৷
তথা অন্যো দৃষ্টান্তঃ—বায়ুর্যথৈক ইত্যাদি। প্রাণাত্মনা দেহেষু অনুপ্রবিষ্টঃ। রূপং রূপং প্রতিরূপো বস্তূবেতি সমানম্ ॥ ৯৬ ॥ ১০ ॥’
সেইরূপ অপর একটি দৃষ্টান্ত এই যে,—‘বায়ু যেমন এক হইয়াও’ ইত্যাদি।[একই বায়ু] প্রাণরূপে দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া’ প্রত্যেক দেহানুসারে তদনুরূপ হইয়াছেন। অপর সমস্তই “পূর্ব্বের ন্যায় ॥ ৯৬॥ ১০ ॥
[ক্লিশ্যমানজগদন্তঃ প্রবিষ্টস্য আত্মনোহপি তদ্বদেব ক্লেশঃ স্যাৎ, ইতি শঙ্কাং পরিহরন্ সদৃষ্টান্তমাহ] সূর্য্যো যথেতি। যথা সূর্য্যঃ সর্ব্বলোকস্য চক্ষুঃ (চক্ষুর্নিয়ন্ত তয়া চক্ষুরন্তস্থঃ সন্নপি) চাক্ষুষৈঃ বাহ্যদোষৈঃ(চক্ষুঃসম্বন্ধিভিঃ বাহ্যৈঃ দোষৈঃ) ন লিপ্যতে। তথা সর্ব্বভূতান্তরাত্মা একঃ[সন্ অপি] লোক-দুঃখেন ন লিপ্যতে(ন সংস্পৃশ্যতে)।[যতঃ] বাহ্যঃ(অসঙ্গ-স্বভাবঃ)।
যেমন একই সূর্য্য সর্ব্বলোকের চক্ষু অর্থাৎ নিয়ন্তরূপে চক্ষুর অভ্যন্তরস্থ হইয়াও চক্ষুঃসম্বন্ধী বাহ্যপদার্থগত দোষে লিপ্ত হন না, তেমনি সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা এক হইয়াও লোকদুঃখে লিপ্ত বা সম্বন্ধ হন না;[কারণ, তিনি চক্ষুর অধিষ্ঠাতা হইয়াও] বাহ্য অর্থাৎ সর্ব্বতোভাবে অসঙ্গ ॥ ৯৭॥ ১১ ॥
একস্য সর্ব্বাত্মত্বে সংসারদুঃখিত্বং পরস্যৈব স্যাৎ, ইতি প্রাপ্তম্; অত ইদমুচ্যতে, -সূর্য্যো যথা চক্ষুষ আলোকেন উপকারং কুর্ব্বন্ মূত্রপুরীষাদ্যশুচিপ্রকাশনেন তদ্দর্শিনঃ সর্ব্বলোকস্য চক্ষুরপি সন্ ন লিপ্যতে চাক্ষুষৈঃ অশুচ্যাদিদর্শননিমিত্তৈঃ আধ্যাত্মিকৈঃ পাপ-দোষৈঃ, বাহ্যৈশ্চ অশুচ্যাদিসংসর্গদোষৈঃ। একঃ সন্ তথা সর্বভূতান্তরাত্মা ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন বাহ্যঃ। লোকো হ্যবিদ্যয়া স্বাত্মনি অধ্যস্তয়া কামকর্ম্মোন্তবং দুঃখমনুভবতি, ন তু সা পরমার্থতঃ স্বাত্মনি। যথা রজ্জু শুক্তিকোষরগগনেষু সর্প-রজতোদক-মলানি ন রজ্জাদীনাং স্বতো দোষরূপাণি সন্তি, সংসর্গিনি বিপরীতবুদ্ধ্যধ্যাসনিমিত্তাত্তু তদ্দোষবদ্ বিভাবান্তে। ন তদ্দোষৈস্তেষাৎ লেপঃ, বিপরীতবুদ্ধ্যধ্যাসবাহ্যা হি তে। তথা আত্মনি সর্ব্বো লোকঃ ক্রিয়া-কারক-ফলাত্মকং বিজ্ঞানং সর্পাদিস্থানীয়ং বিপরীতমধ্যস্থ তন্নিমিত্তং জন্ম- জরা-ঘরণাদি-দুঃখমনুভবতি, নত্বাত্মা সর্ব্বলোকাত্মাপি সন্ বিপরীতাধ্যারোপ-
নিমিত্তেন লিপ্যতে লোকদুঃখেন। কুতঃ?—বাহো রজ্জাদিবদেব বিপরীতবুদ্ধ্যধ্যাস- বাহো হি সঃ ॥৯৭॥১১
এক পরমাত্মাই সর্বাত্মক হইলে সংসার-দুঃখও তাঁহারই হইতে পারে? এই শঙ্কায় কথিত হইতেছে,-আলোক দ্বারা চক্ষুর উপ- কারক সূর্য্য যেরূপ মল-মূত্রাদি অপবিত্র বস্তুর প্রকাশন দ্বারা সেই সকল অপবিত্রদর্শী লোকের চক্ষুঃস্বরূপ হইয়াও চাক্ষুষ পাপদোষে এবং বাহ্যদোষে লিপ্ত হন না; অপবিত্র বস্তু দর্শনে মনের মধ্যে যে পাপোদয়, হয়, তাহাই এখানে ‘আধ্যাত্মিক ‘চাক্ষুষ’ দোষ; আর অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শ-জনিত যে দোষ হয়, তাহাই এখানে ‘বাহ্যদোষ’ নামে অভিহিত হইয়াছে; সেইরূপ সর্বভূতের অন্তরাত্মা এক হইয়াও লোক-দুঃখে লিপ্ত হন না; কারণ, তিনি বাহ্য(ভ্রমের অতীত)। [সাধারণতঃ] সমস্ত লোকই আপনাতে অধ্যস্ত বা আরোপিত অবিদ্যা-বশতঃই কামনা ও তদনুযায়ী ক্রিয়া-সমুৎপন্ন দুঃখ অনুভব করিয়া থাকে; কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আত্মাতে সেই অবিদ্যা নাই; স্বভাবতঃই রজ্জু প্রভৃতির দোষরূপী অর্থাৎ রজ্জু প্রভৃতির ভ্রান্তি বা অজ্ঞান-কল্পিত সর্প, রজত, জল ও মালিন্য(নীল আভা) পদার্থ যেরূপ [যথাক্রমে] রজ্জু, শুক্তিকা(ঝিনুক), ঊষরভূমি ও আকাশে [দৃশ্যমান হইলেও বস্তুতঃ] থাকে না; কেবল বিপরীত বুদ্ধির অধ্যাস বা আরোপ-বশতঃই সেগুলি ঐ সকল বস্তুর ন্যায় প্রকাশ পায় মাত্র। কিন্তু সেই সমস্ত আরোপিত বস্তুর দোষ সেই রজ্জু প্রভৃতি পদার্থের কিছুমাত্র লেপ বা সংস্পর্শ হয় না; কারণ, সেই সকল পদার্থ বিপরীত বুদ্ধি বা ভ্রান্তি-অধ্যাসের অতীত। সেইরূপ সমস্ত লোকে আত্মাতেও সর্পাদির ন্যায় ক্রিয়া, কারক ও ক্রিয়াফলাত্মক বিপরীত বিজ্ঞানের অধ্যাস করিয়া সেই অধ্যাস-জনিত জন্ম-মরণাদি দুঃখ অনুভব করিয়া থাকে। কিন্তু আত্মা সর্বলোকের আত্মস্বরূপ হইয়াও বিপরীত বুদ্ধির
(আমি স্থূল, কৃশ, সুখী, দুঃখী ইত্যাদি জ্ঞানের) অধ্যাস বশতঃ লোক- দুঃখে অর্থাৎ সাধারণ লোকের অনুভূত দুঃখে লিপ্ত হয় না; কারণ, সেই আত্মা বাহ্য অর্থাৎ রজ্জু প্রভৃতিরই ন্যায় বিপরীতবুদ্ধ্যাত্মক (ভ্রান্তিময়) অধ্যাসের অতীত ॥ ৯৭ ॥ ১১ ॥
একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি। তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা- স্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম্ ॥ ৯৮ ॥ ১২.॥
[তস্যৈব মহিমান্তর-প্রদর্শন-পূর্ব্বকমুপাসনফলমাহ—এক ইতি]। বশী(সর্ব্ব- নিয়ন্তা) যঃ সর্ব্বভূতান্তরাত্মা একঃ(এক এব সন্) একম্[এব] রূপম্ (অদ্বিতীয়মাত্মানমেব) বহুধা(দেবতির্য্যমনুষ্যাদি-ভেদেন অনেকপ্রকারম্)। করোতি। আত্মস্থম্(স্বহৃদয়ে প্রকাশমানম্) তম্(আত্মানম্) যে ধীরাঃ (বিবেকশালিনঃ) অনুপশ্যন্তি(সাক্ষাৎ অনুভবন্তি)। তেষাম্[এব] শাশ্বতম্ (নিত্যম্) সুখম্[ভবতি], ইতরেষাম্(অনাত্মদর্শিনাম্) ন[অবিদ্যাবৃত-চিত্তত্বা- দিতি ভাবঃ] ॥৯৮৷৷১২৷৷
[তাঁহারই অপর মহিমা কথনপূর্ব্বক উপাসনাফল বলিতেছেন],—বশী(সর্ব্ব- নিয়ন্তা) ও সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মস্বরূপ যিনি এক হইয়াও স্বীয় একটি রূপকে (আপনাকে) দেব, তির্য্যক্ ও মনুষ্যাদিভেদে বহুপ্রকার করিয়া থাকেন; নিজ নিজ বুদ্ধিতে প্রকাশমান সেই আত্মাকে যে সকল ধীরগণ(বিবেকিগণ) সাক্ষাৎ অনুভব করেন, তাঁহাদেরই নিত্য সুখ লাভ হয়, অপরের হয় না ॥৯৮॥১২’
কিঞ্চ, স হি পরমেশ্বরঃ সর্ব্বগতঃ স্বতন্ত্রঃ একঃ ন তৎসমোহভ্যধিকো বা অন্যোহস্তি। বশী সর্ব্বং হস্য জগদ্ বশে বর্ত্ততে। কুতঃ?—সর্ব্বভূতান্তরাত্মা। যত একমেব সদৈকরসমাত্মানং বিশুদ্ধবিজ্ঞানঘনরূপং নামরূপাদ্যশুদ্ধোপাধিভেদবশেন বহুধা অনেকপ্রকারেণ যঃ করোতি, আত্মসত্তামাত্রেণ অচিন্ত্যশক্তিত্বাৎ। তম্
২১
আত্মস্থং স্বশরীর হৃদয়াকাশে বুদ্ধৌ চৈতন্যাকারেণ অভিব্যক্তমিত্যেতৎ। নহি শরীরস্য আধারত্বমাত্মনঃ; আকাশবদমূর্ত্তত্বাৎ; আদর্শস্থং মুখমিতি যদ্বৎ। তমৈতমীশ্বরম্ আত্মানং যে নিবৃত্তবাহ্যবৃত্তয়ঃ অনুপশ্যন্তি আচার্য্যাগমোপদেশম্ অনু সাক্ষাদনুভবন্তি ধীরাঃ বিবেকিনঃ। তেষাং পরমেশ্বরভূতানাং শাশ্বতং নিত্যং সুখম্ আত্মানন্দলক্ষণং ভবতি, নেতরেষাং বাহ্যাসক্তবুদ্ধীনাম্ অবিবেকিনাং স্বাত্মভূতমপি অবিদ্যাব্যবধানাৎ ॥ ৯৮ ॥ ১২ ॥
আরও এক কথা,—সেই পরমেশ্বরই সর্ব্বগত ও স্বতন্ত্র(স্বাধীন) এবং তাঁহার সমান বা অধিক ‘আর’ কেহই নাই।[তিনি] বশী, অর্থাৎ সমস্ত জগৎ তাঁহার বশবর্তী হইয়া আছে; কারণ—তিনি সর্বভূতের অন্তরাত্মা; যেহেতু, যিনি এক হইয়াও একরস(একই- প্রকার) বিশুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ আত্মাকে(আপনাকে) অশুদ্ধ(সদোষ) নাম-রূপাদি উপাধিভেদ অনুসারে বহুধা অর্থাৎ অনেক প্রকার করিয়া থাকেন; কারণ, তিনি স্বরূপতঃই অচিন্ত্যশক্তি-সম্পন্ন। আত্মস্থ অর্থাৎ স্বশরীরস্থিত হৃদয়াকাশে—বুদ্ধিতে চৈতন্যরূপে প্রকাশমান; আকাশের ন্যায় অমূর্ত্ত(পরিচ্ছেদশূন্য) আত্মার পক্ষে এই শরীর কখনই আধার বা আশ্রয় হইতে পারে না;[এই কারণেই ‘আত্মস্থ’ শব্দের ঐরূপ অর্থ করা হইল], আদর্শে প্রতিবিম্বিত মুখকে যেমন আদর্শস্থ বলা হয়, তদ্রূপ বুদ্ধিতে প্রতিবিম্বিত সেই ঈশ্বররূপী আত্মাকে যে সকল বাহ্যবিষয়াসক্তি-রহিত ধীর অর্থাৎ বিবেকশালী লোক আচার্য্য ও আগমোপদেশানুসারে সাক্ষাৎ অনুভব করেন, তাঁহারা পরমেশ্বর-ভাব-প্রাপ্ত হন। পরমেশ্বর-ভাবাপন্ন সেই সকল ধীর ব্যক্তিরই শাশ্বত(নিত্য) আত্মানন্দস্বরূপ সুখ লাভ হয়, কিন্তু তদ্ভিন্ন যাহারা বাহ্যবিষয়ে আসক্তচিত্ত—অবিবেকী, স্বস্বরূপ হইলেও অবিদ্যা দ্বারা আবৃত থাকায় তাহাদের পক্ষে উক্ত সুখ প্রকাশ পায় না॥ ৯৮ ॥ ১২ ॥
নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানা-* মেকো বহুনাং যো বিদধাতি কামান্। তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা- স্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্ ॥ ৯৯ ॥ ১৩ ॥
[অপিচ]—অনিত্যানাম্(বিনাশশীলানাম্) নিত্যঃ(অবিনাশী কারণশক্তি- রূপঃ), চেতনানাম্(বুদ্ধিমতাম্—ব্রহ্মাদীনামপি) চেতনঃ(বোধসম্পাদকঃ), যঃ একঃ[সন্] বহুনাম্(সংসারিণাম্) কামান্(অভিলষিতার্থান্—কর্মফলানি) বিদধাতি(প্রদদাতি); আত্মস্থম্(বুদ্ধিস্থম্) তম্(আত্মানম্) যে ধীরাঃ অনুপশ্যন্তি, তেষাম্[এব] শাশ্বতী(নিত্যা) শান্তিঃ[ভবতি], ইতরেষাং ন॥
[আরও এক কথা,]—সমস্ত অনিত্য পদার্থের নিত্য(অবিনাশী কারণস্বরূপ), এবং ব্রহ্মাদি সমস্ত চেতনের চৈতন্যপ্রদ যিনি এক হইয়াও বহুর(সংসারীর)। কাম অর্থাৎ কর্মফল প্রদান করেন, আত্মস্থ সেই আত্মাকে যে সকল ধীর ব্যক্তি সাক্ষাৎ দর্শন করেন, তাঁহাদেরই নিত্য শান্তি লাভ হয়, অপর সকলের হয় না ॥ ৯৯ ॥ ১৩ ॥
কিঞ্চ, নিত্যঃ অবিনাশী, অনিত্যানাং বিনাশিনাম্। চেতনঃ, চেতনানাং চেতয়িতৃণাং ব্রহ্মাদীনাং প্রাণিনাম্। অগ্নিনিমিত্তমিব দাহকত্বম্ অনগ্নীনাম্ উদকাদীনাম্ আত্মচৈতন্যনিমিত্তমেব চেতয়িতৃত্বমন্যেষাম্।
কিঞ্চ, স সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্বেশ্বরঃ কামিনাং সংসারিণাং কর্ম্মানুরূপং কামান্ কৰ্ম্ম- ফলানি স্বানুগ্রহনিমিত্তাংশ কামান্ য একো বহুনাম্ অনেকেষাম্ অনায়াসেন, বিদধাতি প্রযচ্ছতীত্যেতৎ।, তম্ আত্মস্থং যে অনুপশ্যন্তি ধীরাঃ, তেষাং শান্তিঃ উপরতিঃ শাশ্বতী নিত্যা স্বাত্মভূতৈব স্যাৎ, ন ইতরেষাম্ অনেবংবিধানাম্ ॥৯৯৷৷১৩৷৷
আরও এক কথা,—অনিত্য অর্থাৎ বিনাশশীল পদার্থ-নিচয়ের
‘নিত্য—অবিনাশী শক্তি-স্বরূপ * এবং চেতন অর্থাৎ বুদ্ধিমান্ ব্রহ্মা প্রভৃতিরও চেতন অর্থাৎ বোধ-সম্পাদক,—অর্থাৎ অগ্নিসম্পর্কবশতঃ জলাদি পদার্থের যেমন দাহকতা উৎপন্ন হয়, তেমনি অপর সমস্ত প্রাণীর চেতয়িতৃত্ব বা চৈতন্যও আত্মচৈতন্য-সম্পর্কাধীন।
আরও এক কথা, ‘সকলের ঈশ্বর ও সর্বজ্ঞ যিনি এক হইয়াও কামনাশালী সংসারিগণের কর্ম্মানুরূপ কৰ্ম্মফল এবং স্বীয় অনুগ্রহ প্রদত্ত ও বহু কাম্য বিষয় অনায়াসে বিধান করেন—প্রদান করেন, আত্মস্থ(বুদ্ধিতে প্রকাশমান) সেই আত্মাকে যে সকল ধীর ব্যক্তি সাক্ষাৎ দর্শন করেন, তাঁহাদেরই ‘নিত্য স্বাত্মস্বরূপ শান্তি অর্থাৎ উপশম হইয়া থাকে; কিন্তু অপর সকলের—যাহারা উক্তপ্রকার নহে, তাহাদিগের হয় না ॥ ৯৯ ॥ ১৩ ॥
তদেতদিতি মন্যন্তেহনির্দ্দেশ্যং পরমং সুখম্।
কথং নু তদ্বিজানৌয়াং কিমু ভাতি বিভাতি বা ॥১০০॥১৪
[যৎ পূর্ব্বোক্তম্] অনির্দেশ্যম্(ইয়ত্তয়া নির্দ্দিষ্টমশক্যম্) পরমং সুখম্ (আত্মানন্দলক্ষণম্) ‘তৎ এতৎ’(প্রত্যক্ষযোগ্যম্) ইতি মন্যন্তে। নু(বিতর্কে) কথম্ (কেন প্রকারেণ) তৎ(পরমং সুখম্) বিজানীয়াম্(আত্মবুদ্ধিগম্যং কুৰ্য্যাম্)?[তৎ- স্বপ্রকাশভাবম্ আত্মসুখম্] ভাতি কিমু?(প্রকাশতে কিং)?[যতঃ তৎ] বিভাতি বা? ‘অস্মৎ’-প্রতীতি-বিষয়তয়া বিস্পষ্টং দৃশ্যতে বা নবা? ‘অহং’প্রতীতি- বিষয়তয়া কথঞ্চিৎ প্রতীয়মানত্বেন তদ্বিজ্ঞানে সমাশ্বাসো জায়তে ইতি ভাবঃ ॥
পূর্ব্বোক্ত অনির্দ্দেশ্য(বিশেষরূপে নির্দ্দেশের অযোগ্য) যে পরম-সুখকে
(আত্মানন্দকে)[যতিগণ] ‘তদেতৎ’ অর্থাৎ প্রত্যক্ষযোগ্য বলিয়া মনে করেন, তাহা কি প্রকারে অনুভব করিব? উহা প্রকাশ পায় কি? যেহেতু, ‘আমি’ এই আত্মবুদ্ধির বিষয়রূপে উহা কথঞ্চিৎ প্রকাশ পায় কি না পায়? ॥ ১০০ ॥ ১৪ ॥
যত্তদাত্মবিজ্ঞানসুখম্ অনিৰ্দ্দেশ্যং নিৰ্দ্দিষ্টমশক্যং পরমং প্রকৃষ্টং প্রাকৃতপুরুষ- বাত্মনসয়োঃ অগোচরমপি সং নিবৃত্তৈষণা যে ব্রাহ্মণাঃ, তে তদেতৎ প্রত্যক্ষমেবেতি মন্যন্তে‘। কথং নু কেন প্রকারেণ তৎ সুখমহং বিজানীয়াম্—ইদমিত্যাত্মবুদ্ধিবিষয়ম্ আপাদয়েয়ম্, যথা নিবৃত্তবিষয়ৈষণা যতয়ঃ। কিমু তদ্ভাতি দীপ্যতে প্রকাশাত্মকং তৎ? যতোহস্মদ্বুদ্ধিগোচরত্বেন বিভাতি বিস্পষ্টং দৃশ্যতে কিংবা-নেতি ॥ ১০০৷৷১৪৷৷
সেই যে আত্মানুভূতিরূপ সুখ, উহা অনির্দেশ্য অর্থাৎ নির্দেশের (বিশেষরূপে জ্ঞাপনের) অযোগ্য, এবং পরম বা উৎকৃষ্ট অর্থাৎ অসংস্কৃত বুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষগণের বাক্য ও মনের অগোচর হইলেও যাঁহারা বীতস্পৃহ ব্রাহ্মণ(ব্রহ্মনিষ্ঠ), তাঁহারা উহাকে “তৎ এতৎ” অর্থাৎ ‘ইহা সেই সুখ’ এইরূপে প্রত্যক্ষযোগ্য বলিয়াই মনে করেন। আমি কি প্রকারে সেই সুখ বিশেষরূপে অবগত হইতে পারি, অর্থাৎ সেই বীতস্পৃহ যতিগণের ন্যায় ‘ইহা’ এইরূপে স্ববুদ্ধির বিষয় করিতে পারি? সেই প্রকাশস্বভাব সুখ কি প্রকাশিত হয়? যেহেতু, ‘আমি’ এইরূপে ‘অস্মৎ’-বুদ্ধির বিষয় হইয়া উহা সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পায় অর্থাৎ অনুভূত হয় কি না হয়? ॥ ১০০ ॥ ১৪॥
ন তত্র সূর্য্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্ব্বং
তস্য ভাসা সর্ব্বমিদং বিভাতি ॥ ১০১ ॥ ১৫ ॥ ইতি কাঠকোপনিষদি দ্বিতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয়া বল্লী ॥ ২॥ ২॥
[ প্রোক্তশ্লোকোত্তরং বক্রং তস্য অ-পরপ্রকাশত্বমাহ—ন তত্রোতি]। তত্র
(কস্মিন্ স্বপ্রকাশানন্দ-স্বরূপে আত্মনি) সূর্য্যঃ ন ভাতি(ন তং প্রকাশয়তীত্যর্থঃ)। চন্দ্রতারকম্(চন্দ্রঃ তারকাসঙ্ঘ) ন[ভাতি]। ইমাঃ(দৃশ্যমানাঃ) বিদ্যুতঃ ন ভান্তি; অয়ম্ অগ্নিঃ কুতঃ(কারণবিশেষাৎ)[ভায়াৎ]?[কিং বহুনা-] ভান্তম্(প্রকাশমানম্) তম্(আত্মানম্) এব অনু(অনুসৃত্য) সর্ব্বম্(সূর্য্যাদিকং জ্যোতিঃ) ভাতি(প্রকাশং লভতে); ইদং সর্ব্বম্(জগৎ) তস্য(আত্মজ্যোতিষঃ) ভাসা(দীপ্ত্যা) বিভাতি(প্রকাশতে)।[অতঃ তৎ ব্রহ্ম সূর্য্যাদিজ্যোতিঃ- স্বরূপেণ ভাতি চ বিভাতি চ, ইত্যাশয়ঃ] ॥
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়স্য দ্বিতীয়। বল্লী ব্যাখ্যাতা ॥ ২ ॥ ২ ॥
[পূর্ব্ব-শ্লোকোক্ত ‘কিমু ভাতি বিভাতি বাঁ’ এই প্রশ্নের উত্তর-প্রদানার্থ আত্মার স্বপ্রকাশত্ব বলিতেছেন—] সেই স্বপ্রকাশ আনন্দময় আত্মাকে সূর্য্য, চন্দ্র ও তারকাসমূহও প্রকাশ করিতে পারে না, বিদ্যুৎসমূহও প্রকাশ করিতে পারে না; এই লোক-লোচনগোচর অগ্নি আর প্রকাশ করিবে কি প্রকারে? অধিক কি? সূর্য্য, চন্দ্র প্রভৃতি সমস্ত জ্যোতিঃপদার্থ প্রকাশমান সেই আত্মারই অনুগত ভাবে প্রকাশ পাইয়া থাকে; এই সমস্ত জগৎই তাঁহার দীপ্তিতে দীপ্তিমান্ হইয়া থাকে ॥ ১০১ ॥ ১৫ ॥
তত্রোত্তরমিদং—ভাতি চ বিভাতি চেতি। কথ্নম্—ন তত্র তস্মিন্ স্বাত্মভূতে ব্রহ্মণি সর্ব্বাবভাসকোহপি সূর্য্যো ভাতি, তদ্ ব্রহ্ম ন প্রকাশয়তীত্যর্থঃ। তথা ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি, কুতোহয়ম্ অস্মদ ষ্টিগোচরোহগ্নিঃ। কিং বহুনা যদিদমাদিত্যাদিকং সর্ব্বং ভাতি, তত্তমেব পরমেশ্বরং ভান্তং দীপ্যমানম্ অনুভাতি অনুদীপ্যতে। যথা জলোলুমুকাদি অগ্নিসংযোগাদগ্নিং দহন্তমনুদহতি, ন স্বতঃ, তদ্বৎ তস্যৈব ভাসা দীপ্ত্যা সর্ব্বমিদং সূর্যাদি বিভাতি। যত এবং তদেব ব্রহ্ম ভাতি চ বিভাতি চ। কার্য্যগতেন বিবিধেন ভাসা তস্য ব্রহ্মণো ভারূপত্বং স্বতোহবগম্যতে। ন হি স্বতো বিদ্যমানং ভাসনমন্যস্য কর্ত্তুং শক্যম্। ঘটাদীনাম্ অন্যাবভাসকত্বা- দর্শনাৎ, ভাসনরূপাণাঞ্চ আদিত্যাদীনাং তদ্দর্শনাৎ ॥ ১০১ ॥ ১৫ ॥
, ইতি শ্রীমৎপরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-গোবিন্দ-ভগবৎ-পূজ্যপাদ-শিষ্য- শ্রীমচ্ছঙ্কর-ভগবতঃ কৃতৌ কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়াধ্যায়ে
ভাষ্যানুবাদ।
পূর্ব্ব-শ্লোকোক্ত প্রশ্নের উত্তর এই—তিনি সামান্য ও বিশেষা- কারে প্রকাশ পান; কি প্রকার?—সূর্য্য সর্ববস্তু-প্রকাশক হইয়াও সর্বাত্মভূত সেই ব্রহ্মে প্রকাশ পান না; অর্থাৎ সেই ব্রহ্মকে প্রকাশিত করিতে পারেন না; চন্দ্র এবং তারকাও সেইরূপ; এই বিদ্যুৎসমূহও প্রকাশ পায় না। আমাদের প্রত্যক্ষগোচর এই অগ্নি আর পারিবে কোথা হইতে? অধিকের প্রয়োজন কি? এই যে সূর্য্য প্রভৃতি সমস্ত [জ্যোতিঃ] পদার্থ প্রকাশ পাইতেছে, তাহা সেই পরমেশ্বরে প্রকাশমান বলিয়াই তাঁহার অনুগত ভাবে প্রকাশ পাইতেছে। জল, উল্মুক(জলৎকাষ্ঠখণ্ড) প্রভৃতি পদার্থ যেমন অগ্নিসংযোগ বশতঃ দাহকারী অগ্নির অনুগত ভাবে দাহ করে, কিন্তু স্বভাবতঃ নহে, তেমনি এই সূৰ্য্যাদি পদার্থসমূহও তাঁহার দীপ্তিতেই বিভাত হয়। যেহেতু, এই প্রকারে সেই ব্রহ্মই ভাত ও বিভাত হন এবং কার্য্যগত বিবিধ দীপ্তিতে সেই ব্রহ্মের দীপ্তি-রূপতা স্বতঃই অবগত হয়। কেননা, যাহার স্বভাবসিদ্ধ দীপ্তি নাই, সে কখনই অন্যের দীপ্তি সম্পাদন করিতে পারে না। দেখিতে পাওয়া যায়,—দীপ্তি- হীন ঘটাদি পদার্থসমূহ অন্যের অবভাসক হয় না, অথচ প্রকাশস্বরূপ আদিত্যাদি অন্যপ্রকাশক হইয়া থাকে ॥ ১০১ ॥ ১৫॥ ইতি কঠোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদের দ্বিতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয় বল্লী সমাপ্ত ॥২॥২
ঊর্দ্ধমূলোহবাক্শাখ এষোহশ্বত্থঃ সনাতনঃ। তদেব শুক্রং তদ্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে। তস্মিল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্ব্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন।’ এতদ্বৈ তৎ ॥ ১১০ ॥ ১॥
[ ইদানীং সংসারমূলত্বেন ব্রহ্ম প্রস্তৌতি-উর্দ্ধমূল ইত্যাদিনা]। এষঃ(সংসার- রূপঃ) অশ্বত্থ:(শ্বঃ-আগামিনি দিবসেহপি ন স্থাতা, ‘ইতি অশ্বত্থঃ, তদাখ্যঃ বৃক্ষশ্চ), ঊর্দ্ধম্(সর্ব্বোচ্চতমং ব্রহ্ম) মূলম্(আদিকারণম্) যস্য সঃ উর্দ্ধমূলঃ, অবাচ্যঃ(অধোবর্তিন্যঃ) শাখাঃ(দেবাসুর-মনুষ্যাদিরূপঃ বিস্তারঃ) যস্য সঃ- অবাক্শাখঃ, সনাতনঃ(অনাদিপ্রবাহরূপঃ)[চ প্রবৃত্তঃ]। “তদেব শুক্রম্” ইত্যাদ্যংশঃ পূর্ব্বমেব’(২।২।৮ শ্লোকে) ব্যাখ্যাতঃ ॥
[ এখন সংসারবৃক্ষের মূলরূপে ব্রহ্মের স্বরূপ নিরূপণ করিতেছেন]—এই যে সংসাররূপ বৃক্ষ, ইহা অশ্বত্থ অর্থাৎ আগামী দিবসেও থাকিবে কি না, বলা যায় না; ঊর্দ্ধ অর্থাৎ সর্ব্বোচ্চতম ব্রহ্ম ইহার মূল বা আদি কারণ, ইহার শাখা অর্থাৎ দেবাসুরাদি বিস্তার অধঃ—নিম্নদেশে বিস্তৃত, এবং ইহা সনাতন বা অনাদিকাল হইতে প্রবৃত্ত ॥ ১১০ ॥ ১ ॥
‘তুলাবধারণেনৈব মূলাবধারণং বৃক্ষস্য ক্রিয়তে লোকে যথা, এবং সংসারকার্য্য- বৃক্ষাবধারণেন তমূলস্য ব্রহ্মণঃ স্বরূপাবদিধারয়িষয়া ইয়ং তৃতীয়া বল্লী আরভ্যতে- উর্দ্ধমূল:-ঊর্দ্ধং মূলং-যৎ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদমস্যেতি সোহয়ম্ অব্যক্তাদিস্থাবরান্তঃ সংসারবৃক্ষ উর্দ্ধমূলঃ। বৃক্ষশ্চ ব্রশ্চনাৎ, বিনশ্বরত্বাৎ। অবিচ্ছিন্ন-জন্ম-জরা-মরণ- শোকাদ্যনেকানর্থাত্মকঃ প্রতিক্ষণমন্যথাস্বভাবো মায়ামরীচ্যুদক-গন্ধর্ব্ব-নগরাদিবৎ দৃষ্টনষ্টস্বরূপত্বাদবসানে চ বৃক্ষবদভাবাত্মকঃ, কদলী-স্তম্ভবৎ নিঃসারঃ অনেকশত- পাষণ্ডবুদ্ধিবিকল্পাস্পদঃ, তত্ত্ববিজিজ্ঞাসুভিরনির্ধারিতেদংতত্ত্বো বেদান্ত-নির্দ্ধারিত-
পরব্রহ্মমূলসারঃ, অবিদ্যা-কাম-কর্মাব্যক্তবীজ-প্রভব: ‘অপরব্রহ্ম-বিজ্ঞান-ক্রিয়াশক্তি-’ দ্বয়াত্মক-হিরণ্যগর্ভাঙ্কুরঃ, সর্ব্বপ্রাণিলিঙ্গভেদস্কন্ধঃ, তত্ততৃষ্ণাজলাসেকোদ্ভূতদর্পঃ বুদ্ধীন্দ্রিয়বিষয়-প্রবালাঙ্কুরঃ, শ্রুতিস্মৃতিন্যায়বিদ্যোপদেশপলাশঃ, যজ্ঞ-দান-তপ- আদ্যনেকক্রিয়াসুপুষ্পঃ, সুখদুঃখ-বেদনানেকরসঃ, প্রাণ্যুপজীব্যানন্তফলঃ তত্ত্বষ্ণা- সলিলাবসেক প্ররূঢ়জটিলীকৃতদৃঢ়বদ্ধমূলঃ, সত্যনামাদিসপ্তলোক-ব্রহ্মাদিভূতপক্ষি- কৃতনীড়ঃ, প্রাণিসুখদুঃখোদ্ভুত-হর্ষ-শোক-জাত-নৃত্যগীতবাদিত্রক্ষে লিতা-স্ফোটিত- হসিতাক্রুষ্টরুদিত-হাহা-মুঞ্চমুঞ্চেত্যাদ্যনেকশব্দকৃততুমুলীভূতমহারবঃ, বেদান্তবিহিত- ব্রহ্মাত্ম-দর্শনাসঙ্গ-শস্ত্র-কৃতোচ্ছেদঃ এষ সংসারবৃক্ষঃ অশ্বত্থঃ-অশ্বত্থবৎ কামকর্ম- বাতেরিতনিত্যপ্রচলিতস্বভাবঃ, স্বর্গনরকীর্ত্তির্যপ্রেতাদিভিঃ শাখাভিরবাক্শাখঃ, (অবাঞ্চঃ শাখা যস্য সঃ)। সনাতনঃ অনাদিত্বাচ্চিরপ্রবৃত্তঃ। যদস্য ‘সংসার-বৃক্ষস্য মূলম্, তদেব শুক্রং শুভ্র? শুদ্ধং জ্যোতিষ্মৎ চৈতন্যাত্ম-জ্যোতিঃস্বভাবম্, তদেব ব্রহ্ম সর্ব্বমহত্ত্বাৎ, তদেবামৃতম্ অবিনাশস্বভাবম্ উচ্যতে কথ্যতে, সত্যত্বাৎ। ‘বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্,’ অনুতমন্যদতো মর্ত্যম্। তস্মিন্ পরমার্থসত্যে ব্রহ্মণি লোকা গন্ধর্ব্বনগরমরীচ্যুদক-মায়াসমাঃ পরমার্থদর্শনাভাবাবগম্যমানাঃ, শ্রিতা আশ্রিতাঃ, সর্ব্বে সমস্তা উৎপত্তিস্থিতিলয়েষু। তদু তদ্বহ্ন নাত্যেতি নাতিবর্ততে, মৃদাদিক- মিব ঘটাদিকাৰ্য্যং কশ্চন কশ্চিদপি বিকারঃ। এতদ্বৈ তৎ ॥ ১১০ ॥ ১॥
জগতে[শিমূল প্রভৃতি] বৃক্ষের তুলা দর্শনেই যেমন তাহার মূলেরও অস্তিত্ব, অবধারণ করা হইয়া থাকে, তেমনি কার্য্যভূত এই সংসাররূপ বৃক্ষের অবধারণে অর্থাৎ অস্তিত্ব দর্শনেই তম্মলীভূত ব্রহ্মেরও অবধারণ হইতে পারে(১) এই কারণে ব্রহ্মস্বরূপধারণার্থ এই[তৃতীয়] বল্লী আরব্ধ হইতেছে,—
‘ঊর্দ্ধমূল’ অর্থ—ঊর্দ্ধ(উৎকৃষ্ট) যে বিষ্ণুর পরম পদ, তাহাই
২২
‘যাহার মূল,(আদি কারণ); অব্যক্ত(প্রকৃতি) হইতে আরম্ভ করিয়া স্থাবর(স্থিতিশীল বৃক্ষাদি) পর্যন্ত যে এই সেই সংসার-বৃক্ষ, ইহাই ‘ঊর্দ্ধমূল’ এবং ব্রশ্চন-বশতঃ(ছেদ্যত্ব নিবন্ধন) ‘বৃক্ষ’ পদবাচ্য। জন্ম, জরা, মরণ, শোক প্রভৃতি বহুবিধ অনর্থাত্মক(দুঃখময়), প্রতিক্ষণে বিকারস্বভাব মায়া(ভেল্কী), মরীচিজল(মরীচিকা) ও গন্ধর্ব্ব- নগর প্রভৃতির ন্যায় দৃষ্ট-নষ্টস্বভাব অর্থাৎ দেখিতে দেখিতে নষ্ট হওয়া যাহার স্বভাব, পরিণামেও বৃক্ষের ন্যায় অভাবাত্মক(অভাবে পর্যবসিত হয়), কদলীস্তম্ভের ন্যায় অসার, শত শত পাষণ্ডগণের নানাবিধ কল্পনার বিষয়, অথচ তত্ত্বজিজ্ঞাসুগণ যাহার ‘ইদংতত্ত্ব’ অর্থাৎ প্রকৃত তত্ত্ব নির্দ্ধারণ করিতে অক্ষম, বেদান্তশাস্ত্রে নির্দ্ধারিত পরব্রহ্মই যাহার সারভূত মূল, অবিদ্যা(অজ্ঞান), কাম(বাসনা), কৰ্ম্ম ও অব্যক্তরূপ(প্রকৃতি—মায়ারূপ) বীজ হইতে সমুৎপন্ন, অপরব্রহ্মের (মায়োপহিত ঈশ্বরের) জ্ঞান-শক্তি ও ক্রিয়া-শক্তিসমন্বিত হিরণ্যগর্ভ (সূক্ষম শরীরসমষ্টিগত চৈতন্য) যাহার অঙ্কুর, সমস্ত প্রাণিগণের সূক্ষ্মদেহের(২) বিভাগাবস্থা(যাহার স্কন্ধ, ভোগতৃষ্ণারূপ জলসেকে যাহার বৃদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয়ের(চক্ষুঃকর্ণাদির) বিষয়(রূপ-রস-শব্দাদি) যাহার নবপল্লবের অঙ্কুর, শ্রুতি, স্মৃতি ও ন্যায়বিদ্যার উপদেশ যাহার পত্র; যজ্ঞ, দান, তপস্যা প্রভৃতি ক্রিয়ানিচয় যাহার উৎকৃষ্ট পুষ্প, সুখদুঃখানুভব যাহার বিবিধ রস, প্রাণিগণের উপভোগ্য স্বর্গাদি ফলই যাহার ফল, ফলতৃষ্ণারূপ সালিলসেকে সমুৎপন্ন ও যাহার দৃঢ়বন্ধন(অবান্তর মূলসমূহ),[ সাত্ত্বিক-রাজস ও তামসভাব] মিশ্রিত
সত্যাদিনামক(ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ ও সত্য) এই সপ্তলোক ব্রহ্মাদি ভূতসমূহরূপ পক্ষিগণ যাহাতে নীড়(পক্ষীর বাসা) নির্মিত করিয়াছে; প্রাণিগণের সুখজাত হর্ষে ও দুঃখজাত শোকে সমুদ্ভুত নৃত্য, গীত, বাদ্য, ক্রীড়া, আস্ফোটন(গর্বপ্রকাশ), হাস্য, রোদন, আকর্ষণ, ‘হায় হায়’! ছাড় ছাড়! ইত্যাদি বহুবিধ শব্দই যাহাতে তুমুল, মহাকোলাহল; ‘বেদান্তশাস্ত্রোপদিষ্ট ব্রহ্মাত্মদর্শনরূপ অসঙ্গ (অনাসক্তিময়) শস্ত্র দ্বারা যাহার ছেদন হয়; এবস্তৃত এই সংসারই অশ্বত্থ বৃক্ষ, অর্থাৎ অশ্বত্থবৃক্ষের ন্যায় কামনা ও তদনুগত কৰ্ম্মরূপ বায়ু দ্বারা সতত চঞ্চলস্বভাব; ‘স্বর্গ, নরক, ‘তির্যক্ ও প্রেতাদি দেহপ্রাপ্তিরূপ শাখাসমূহ দ্বারা অবাকশাখ অর্থাৎ ইহার শাখাসমূহ অবাক-অধোগামী, সনাতন অর্থাৎ অনাদি বলিয়াই চিরন্তন। এই সংসার-বৃক্ষের যিনি মূল, তিনিই শুক্র-শুভ্র বা শুদ্ধ-জ্যোতিৰ্ম্ময় অর্থাৎ চৈতন্যাত্মক আত্মজ্যোতিঃস্বভাবাত্মক; সর্বাপেক্ষা মহত্ত্বনিবন্ধন তিনিই ব্রহ্ম, সত্যস্বভাব বলিয়া তিনিই অমৃত-অবিনাশ বলিয়া কথিত হন।[কারণ, অন্যত্র শ্রুতি বলিয়াছেন যে,][ঘটপটাদি] ‘বিকার আর কিছুই নহে, কেবল বাক্যারব্ধ নাম মাত্র।’ ‘অন্য (ব্রহ্মভিন্ন) সমস্তই অনৃত(মিথ্যা) অতএব মর্ত্য(মরণশীল)।’ গন্ধর্ব্বনগরী, মরীচিকা-জল ও মায়ার সদৃশ ও তত্ত্বদৃষ্টিতে মিথ্যা বলিয়া প্রতীয়মান সমস্ত লোক(জগৎ) সৃষ্টি, স্থিতি, ও বিনাশাবস্থায় পরমার্থ, সত্য সেই ব্রহ্মেই আশ্রিত থাকে। ঘটাদি কার্য্যসমূহ যেরূপ মৃত্তিকা অতিক্রম করিয়া থাকে না, সেইরূপ কেহই-কোন বিকারই সেই ব্রহ্মকে অতিক্রম করিয়া অবস্থান করে না বা করিতে পারে না। ইহাই সেই বস্তু[নচিকেতা যাহা জানিতে চাহিয়া- ছিলেম] ॥১১০৷৷১॥
যদিদং কিঞ্চ জগৎ সর্ব্বং প্রাণ এজতি নিঃসৃতম্। মহদ্ভয়ং বজ্রমুদ্যতং য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥১১১৷২৷৷
[যদিদমিতি] যদিদং কিঞ্চ সর্ব্বং জগৎ(সর্ব্বমেব জগদিত্যর্থঃ) প্রাণে (প্রাণাখ্যে ব্রহ্মণি)[স্থিতম্, ততএব চ] নিঃসৃতম্(উৎপন্নং সৎ) এজতি(যৎ- প্রেরণয়া চেষ্টতে)। এতৎ(প্রাণাখ্যং ব্রহ্ম) মহৎ ভয়ম্(ভয়ানকম্) উদ্যতম্ (উদ্ধৃতম্) বজ্রম্(বজ্রমিব) যে বিদুঃ, তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি ॥
এই যে কিছু জগৎ(জাগতিক পদার্থ) সমস্তই প্রাণ(ব্রহ্ম) হইতে নিঃসৃত (উৎপন্ন) এবং প্রাণসত্তায় স্পন্দমান হইয়া থাকে। যাঁহারা এই প্রাণ ব্রহ্মকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সমুদ্যত বজ্রের ন্যায় মনে করেন, অর্থাৎ তাঁহার সমস্ত শাসন মানিয়া চলেন, তাঁহারা অমৃত(মুক্ত) হন ॥ ১১১ ॥ ২ ॥
যদ্বিজ্ঞানাদমৃতা ভবন্তীত্যুচ্যতে, জগতো মূলং তদেব নাস্তি ব্রহ্ম, অসত এবেদং নিঃসৃতমিতি।
তন্ন; যদিদং কিঞ্চ যৎ কিঞ্চ ইদং জগৎ সর্ব্বং প্রাণে পরস্মিন্ ব্রহ্মণি সতি এজতি কম্পতে। তত এব নিঃসৃতং নির্গতং সৎ প্রচলতি নিয়মেন চেষ্টতে। যদেবং জগদুৎপত্যাদিকারণং ব্রহ্ম, তৎ মহদ্ভয়ম্, মহচ্চ তৎ ভয়ঞ্চ—বিভেত্যম্মাদিতি মহদ্ভয়ম্। বজ্রমুদ্যতম্ উদ্যতমিব বজ্রম্, যথা বজ্রোদ্যতকরং স্বামিনম্ অভিমুখীভূতং দৃষ্টা ভৃত্যা নিয়মেন তচ্ছাসনে প্রবর্তন্তে, তথেদং চন্দ্রাদিত্যগ্রহনক্ষত্রতারকাদি- লক্ষণং জগৎ সেশ্বরং নিয়মেন ক্ষণমপ্যবিশ্রান্তং বর্ত্তত ইত্যুক্তং ভবতি। যে এতৎ বিদুঃ স্বাত্মপ্রবৃত্তি-সাক্ষিভূতমেকং ব্রহ্ম, অমৃতা অমরণধর্মাণস্তে ভবন্তি ॥ ১১১ ॥ ২॥
ভাল, যাঁহার বিজ্ঞানে লোকসমূহ অমৃত হয় বলা হইতেছে, জগ- তের মূল কারণ সেই ব্রহ্মেরই ত অস্তিত্ব নাই? কারণ, এই জগৎ অসৎ হইতেই নিঃসৃত বা সমুৎপন্ন হইয়াছে;[সুতরাং ইহার মূলীভূত কোন সৎপদার্থই থাকিতে পারে না]। না—এ আপত্তি হইতে পারে না;[কারণ,] যাহা এই কিছু অর্থাৎ এই যে কিছু জগৎ, বা জাগতিক পদার্থ, তৎসমস্তই প্রাণের অর্থাৎ পরব্রহ্মের সত্তায়ই স্পন্দ-
মান হইতেছে,—সেই পরব্রহ্ম হইতেই নিঃসৃত হইয়া তাঁহার নিয়মানুসারে কার্য্য করিতেছে। যিনি এবস্তুত—জগতের উৎপত্তি প্রভৃতির কারণস্বরূপ—ব্রহ্ম, তিনি মহৎ ভয়; তিনি মহৎও বটে এবং ভয়ও বটে,—অর্থাৎ সকলে তাঁহা হইতে ভয় পাইয়া থাকে। ‘বজ্র উদ্যত’ অর্থ যেন উদ্যত(উত্থাপিত) বজ্রইণ এই কথা উক্ত হইল যে, প্রভুকে, উদ্যত বজ্রহস্তে সম্মুখাগত দর্শন করিয়া, ভৃত্যগণ যেরূপ নিয়মিতভাবে তাঁহার শাসনে থাকে, সেইরূপ, চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকাদি ঈশ্বর পর্য্যন্ত সমস্ত জগৎ ক্ষণকালও বিশ্রাম না করিয়া, তাঁহার নিয়মাধীন হইয়া থাকে। আত্মকর্ম্মের সাক্ষিভূত এই এক ব্রহ্মকে যাঁহারা জানেন, তাঁহারা অমৃত অর্থাৎ মৃত্যুরহিত হন ॥ ১১১ ॥ ২ ॥
ভয়াদস্যাগ্নিস্তপতি ভয়াৎ তপতি সূর্য্যঃ। ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুধাবতি পঞ্চমঃ॥১১২২৷৷৩৷৷ ব্যাখ্যা।
পূর্ব্বোক্তমেবার্থং প্রপঞ্চয়তি—ভয়াদিতি। অগ্নিঃ অস্য(জগৎকারণস্য ব্রহ্মণঃ) ভয়াৎ তপতি, সূর্য্যঃ[অস্য] ভয়াৎ তপতি।[অস্য] ভয়াৎ ইন্দ্রশ্চ, বায়ুশ্চ, পঞ্চমঃ মৃত্যুঃ(যমশ্চ) ধাবতি(নিয়মেন স্বস্বব্যাপারান্ সম্পাদয়তি ইত্যর্থঃ)।[অন্যথা মহেশ্বরাণাং তেষাং স্বস্ব-কৰ্ম্মসু ঔদাসীন্যমপি সম্ভাব্যেত ইত্যাশয়ঃ]॥
পূর্ব্বোক্ত অর্থেরই প্রকাশার্থ বলিতেছেন,—অগ্নি ইঁহার ভয়ে তাপ দিতেছেন, ইঁহারই ভয়ে সূর্য্য তাপ দিতেছেন, এবং ইঁহারই ভয়ে ইন্দ্র, বায়ু এবং [পূর্ব্বাপেক্ষায়] পঞ্চম মৃত্যুও(যমও) ধাবিত হন, অর্থাৎ যথানিয়মে নিজ নিজ কর্ত্তব্য সম্পাদন করিতেছেন ॥ ১১২ ॥ ৩ ॥
কথং তদ্ভয়াৎ জগবর্ত্ততে?—ইত্যাহ, ভয়াৎ ভীত্যা। অন্য পরমেশ্বরস্য অগ্নিস্তপতি, ভয়াৎ তপতি সূর্য্যঃ, ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ। ন হি ঈশ্বরাণাং
বৃলোকপালানাং সমর্থানাং সতাং নিয়ন্তা চেৎ বজ্রোদ্যতকরবৎ ন স্যাৎ, স্বামিভয়- ভীতানামিব ভৃত্যানাং নিয়তা প্রবৃত্তিরুপপদ্যতে ॥ ১১২ ॥ ৩ ॥
ইঁহারই ভয়ে জগৎ স্ব স্ব কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতেছে; কি প্রকারে? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন,—এই পরমেশ্বরের ভয়ে অগ্নি তাপ দিতেছেন, সূর্য্য ভয়ে তাপ দিতেছেন, ইন্দ্র, বায়ু, এবং পঞ্চম, মৃত্যুও (যমও)[নিজ নিজ কার্য্যে] ধাবিত(সত্বর অগ্রসর) হইতেছেন। কারণ, যাঁহারা স্বয়ং ঈশ্বর অর্থাৎ শাসনক্ষমতাপ্রাপ্ত, লোকপাল(ভিন্ন ভিন্ন স্থানের অধিপতি) এবং সমর্থ বা শক্তিশালী, তাঁহাদের যদি বজ্রোদ্যত করের ন্যায়[ভয়ানক একজন] নিয়ন্তা বা পরিচালক না থাকিত, তাহা হইলে কখনই প্রভুভয়ে ভীত ভৃত্যের ন্যায় তাঁহাদেরও সুনিয়মিত ভাবে কার্য্যসম্পাদন সম্ভবপর হইত না ॥১১২৷৩৷৷
ইহ চেদশকদ্বোদ্ধুং প্রাক্ শরীরস্য বিস্রসঃ। ততঃ সর্গেষু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে ॥১১৩॥৪॥
[ তৎস্বরূপাধিগমফলমাহ—ইহেতি]। ইহ(অস্মিন্ এব দেহে) চেৎ(যদি) বোদ্ধুম্(ব্রহ্ম অবগন্তুম্) অশকৎ(শক্তো ভবেৎ),[তদা] শরীরস্য বিস্রসঃ (বিস্রংসনাৎ—পতনাৎ) প্রাক্(পূর্ব্বমেব)[বন্ধনাৎ মুচ্যতে, জীবন্মুক্তো ভবতীত্যর্থঃ]।[বোদ্ধুম্ অশক্তঃ চেৎ, তদা] ততঃ(অনববোধাদেব) সর্গেযু (ভোগস্থানেষু স্বর্গাদিষু) শরীরত্বায়(দেহলাভায়) কল্পতে(সমর্থো ভবতি, ন মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ)। অথবা, ইহ(লোকে) শরীরস্য বিস্রসঃ(পতনাৎ) প্রাক্ চেৎ(যদি)[ব্রহ্ম] বোদ্ধুম্ অশকৎ(অশকৎ ইতি ছেদঃ, অশকুবন্—অসমর্থঃ ভবেৎ), ততঃ(অসামর্থ্যাৎ) সর্গেযু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে,(লোকবিশেষে শরীরবিশেষং লভতে ইত্যর্থঃ)॥
পূর্ব্বোক্ত ভয়ানক অবগতির ফল বলিতেছেন—এই দেহেই যদি কেহ সেই ব্রহ্মকে জানিতে সমর্থ হন এবং জানেন, শরীর-পাতের পূর্ব্বেই সেই লোক
সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন। আর যে লোক বুঝিতে অশক্ত হয়, সে তাহার ফলেই স্বর্গাদি ভোগস্থানে শরীর-লাভের অধিকারী হয় ॥
অথবা—ইহলোকে শরীর-পাতের পূর্ব্বে যদি ব্রহ্মকে বুঝিতে শক্ত না হয়, তাহা হইলে নানাবিধ লোকে শরীর লাভ করে;[ পক্ষান্তরে তাঁহাকে জানিতে পারিলে আর শরীর লাভ করিতে হয় না—মুক্তি হয়] ॥ ১১৩॥ ৪ ॥
তচ্চেহ জীবন্নেব চেৎ যদি অশকৎ-শক্তঃ সন্ জানাতি ইত্যেতৎ ভয়- কারণং ব্রহ্ম বোদ্ধ মবগন্তং-প্রাক্ পূর্ব্বং শরীরস্য বিস্রসোহবসংসনাৎ পতনাৎ সংসারবন্ধনাৎ বিমুচ্যতে। ন চেদশকদ্বোদ্ধং ততোহনবরোধাৎ সর্গেযু-সৃজ্যন্তে যেষু স্রষ্টব্যাঃ প্রাণিন ইতি সর্গাঃ-পৃথিব্যাদয়ো লোকাঃ, তেষু সর্গেযু লোকেযু শরীরত্বায় শরীরভাবায়’ কল্পতে সমর্থো ভবতি-শরীরং গৃহ্নাতীত্যর্থঃ। তস্মা- চ্ছরীরবিস্রংসনাৎ প্রাগাত্মাববোধায় যত্ন আস্থেয়ঃ ॥ ১১৩॥ ৪॥
এই দেহে অর্থাৎ জীবদবস্থায়ই যদি ভয়কারণ সেই ব্রহ্মকে বুঝিতে—অবগত হইতে শক্ত হন এবং শক্ত হইয়া জানিতে পারেন, সেই লোক শরীরবিস্রংসন অর্থাৎ দেহপাতের পূর্ব্বেই সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন। আর যদি অবগত হইতে শক্ত না হয়, তাহা হইলে সেই অবগতির অভাবেই স্রষ্টব্য প্রাণিগণ যে সকল লোকে সৃষ্ট হয়, সেই সকল পৃথিবী প্রভৃতি লোকে শরীরত্ব(শরীরিত্ব) অর্থাৎ শরীরলাভে সমর্থ হয়, উপযুক্ত শরীর গ্রহণ করে। অতএব শরীর- পাতের পূর্ব্বেই আত্মজ্ঞানের জন্য যত্ন করা আবশ্যক ॥১১৩৷৪॥
যথাদর্শে তথাল্মনি যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলোকে। যথাপ্সু পরীব দদৃশে তথা গন্ধর্ব্বলোকে চ্ছায়াতপয়োরিব ব্রহ্মলোকে ॥১১৪॥৫॥ ব্যাখ্যা।
[আখনে দর্শনপ্রকারবাহ—যথেকি]। আদর্শে(দর্পণে)[মুখম্] যথা।
[ প্রতিবিম্বভূতঃ দৃশ্যতে]; ‘আত্মনি(বুদ্ধৌ)[পরমাত্মা] তথা পরিদদৃশে (পরিদৃশ্যতে)[জ্ঞানিভিরিতি শেষঃ]। স্বপ্নে যথা[অস্পষ্টরূপম্] পিতৃলোকে তথা। অপ্সু(জলে) যথা, গন্ধর্ব্বলোকে তথা পরিদদৃশে ইব(পরিদৃশ্যতে ইব) [পরমাত্মা ইতি শেষঃ]।[কেবলম্] ব্রহ্মলোকে ছায়াতপয়োঃ(আলোকান্ধ- কারয়োঃ) ইব(অত্যন্তবৈলক্ষণ্যেন আত্মানাত্মনোঃ দর্শনং ভবতি, ইতি ভাবঃ] ॥
এখন আত্মদর্শনের প্রকারভেদ বলা হইতেছে,—দর্পণে মুখের প্রতিবিম্ব যেরূপ, বুদ্ধিতে আত্মপ্রতিবিম্ব সেইরূপ ও স্বপ্নে যেরূপ, পিতৃলোকেও সেইরূপ, এবং জলে যেরূপ, গন্ধর্ব্বলোকেও সেইরূপই জ্ঞানিগণ পরমাত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন। কেবল একমাত্র ব্রহ্মলোকেই আলোক ও অন্ধকারের ন্যায় অত্যন্ত বিলক্ষণভাবে আত্মা ও অনাত্ম-পদার্থ দর্শন করিয়া থাকেন॥১১৪॥৫॥
যম্মাদিহৈবাত্মনো দর্শনম্ আদর্শস্থস্যেব মুখস্য স্পষ্টমুপপদ্যতে, ন লোকান্তরেষু ব্রহ্ম লোকাদন্যত্র। স চ দুষ্প্রাপঃ। কথম্? ইত্যুচ্যতে-যথা আদর্শে প্রতিবিম্বভূতম্ আত্মানং পশ্যতি লোকঃ অত্যন্তবিবিক্রম্; তথা ইহ আত্মনি স্ববুদ্ধাবাদর্শবন্নিৰ্ম্মলী- ভূতায়াং বিবিক্তমাত্মনো দর্শনং ভবতীত্যর্থঃ। যথা স্বপ্নে অবিবিকৎ জাগ্রদাসনো- ভূতম্, তথা পিতৃলোকে অবিবিকমেব দর্শনম্ আত্মনঃ কৰ্ম্মফলোপভোগাসক্তত্বাৎ। যথা চ অপ্সু অবিবিকাবয়বমাত্মস্বরূপং পরীব দদৃশে পরিদৃশ্যত ইব, তথা গন্ধর্ব্বলোকে অবিবিকমেব দর্শনমাত্মনঃ। এবঞ্চ লোকান্তরেঘপি শাস্ত্রপ্রামাণ্যাদ- বগম্যতে। ছায়াতপয়োরিব অত্যন্তবিবিক্তং ব্রহ্মলোক এবৈকস্মিন্। স চ দুষ্প্রাপঃ অত্যন্তবিশিষ্টকৰ্ম্মজ্ঞানসাধ্যত্বাৎ। তস্মাদাত্মদর্শনায় ইহৈব যত্নঃ কর্তব্য ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥১১৪॥৫৷৷
যেহেতু, এই দেহেই আদর্শস্থ মুখের ন্যায় আত্মার সুস্পষ্ট দর্শন সম্ভবপর হয়, পরন্তু ব্রহ্মলোক ভিন্ন অন্য কোন লোকেই সেরূপ দর্শন হইতে পারে না। অথচ সেই ব্রহ্মলোকও অতিদুর্লভ; কেন, দুর্লভ? তাহাই বলা হইতেছে,—
মানুষ আদর্শে প্রতিবিম্বিত আত্মাকে যেরূপ অত্যন্ত পরিষ্কাররূপে
দর্শন করে, আদর্শের ন্যায় অতি নিৰ্ম্মলীভূত আত্মাতে—স্বীয় বুদ্ধিতেও সেইরূপ অতি পরিষ্কারভাবে আত্মদর্শন হইয়া থাকে। স্বপ্নে যেরূপ অবিবিক্ত অর্থাৎ জাগ্রৎকালীন সংস্কারসহকৃত, পিতৃলোকেও সেইরূপ অবিবিক্তরূপে(সম্মিশ্রিতভাবে) আত্মার দর্শন হইয়া থাকে; কারণ, (আত্মা তৎকালেও) কর্মফল-ভোগে আসক্ত থাকে। জলে যেরূপ অবয়ব-বিভাগহীন অবস্থায়ই যেন আত্মা পরিদৃষ্ট হয়, গন্ধর্ব্বলোকেও সেইরূপ অবিবিক্তাবস্থায় আত্মার দর্শন হয়, অর্থাৎ সেই অবস্থায় আত্মার বিশেষভাব প্রতীত হয় না। শাস্ত্রের প্রামাণ্যানুসারে অন্যান্য লোকেও এইভাবে প্রতীতির তারতম্য জানা যায়। একমাত্র ব্রহ্মলোকেই ছায়া ও আতপের ন্যায় অর্থাৎ অন্ধকার ও আলোকের ন্যায় অত্যন্ত বিবিক্ত বা পরিস্ফুটরূপে[দর্শন হয়], সেই ব্রহ্মলোকও অতিশয় দুর্লভ; কারণ, ঐ লোকটি অতিশয় বিশিষ্ট কৰ্ম্ম (অশ্বমেধাদি) ও জ্ঞান বা উপাসনাদ্বারা লভ্য। অভিপ্রায় এই যে, অতএব, আত্মদর্শনের জন্য ইহ জন্মেই যত্ন করা আবশ্যক ॥১১৪॥৫৷৷
ইন্দ্রয়াণাং পৃথগ্ ভাবমুদয়াস্তময়ৌ চ যৎ। পৃথগুৎপদ্যমানানাং মত্বা ধীরো ন শোচতি ॥১১৫॥৬৷৷
[ আত্মবোধে প্রকারান্তরমাহ—ইন্দ্রিয়াণামিতি]। পৃথক্(আকাশাদিভ্য একৈকশঃ) উৎপদ্যমানানাম্ ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগ্ভাবম্(আত্মনো ভিন্নত্বম্), উদয়াস্তময়ৌ(জাগ্রৎ-স্বপ্নাবস্থয়োঃ উৎপত্তি-প্রলয়ৌ) চ যৎ; ধীরঃ(জনঃ) এতৎ মত্বা(বিবেকেন জ্ঞাত্বা) ন শোচতি(দুঃখভাক্ ন ভবতি, মুচ্যতে ইতি ভাবঃ) ॥
আত্মজ্ঞান সম্বন্ধে প্রকারান্তর কথিত হইতেছে,—আকাশাদি পঞ্চভূত হইতে পৃথক্পৃথক্ ভাবে উৎপন্ন ইন্দ্রিয়সমূহের যে, চেতন আত্মা হইতে পার্থক্য, এবং উদয় ও অস্তময় অর্থাৎ জাগ্রৎ অবস্থায় বৃত্তিলাভ আর স্বপ্নাবস্থায় প্রলয় বা বৃত্তিহীনতা, ধীর ব্যক্তি ইহা জানিয়া আর দুঃখ ভোগ করেন না, অর্থাৎ মুক্তিলাভ করেন ॥১১৫৷৬
২৩
কথমসৌ বোদ্ধব্যঃ? কিংবা তদববোধে প্রয়োজনম্? ইত্যুচ্যতে-ইন্দ্রিয়াণাং শ্রোত্রাদীনাং স্বস্ববিষয়গ্রহণপ্রয়োজনেন স্বকারণেভ্য আকাশাদিভ্য: পৃথগুৎপদ্য- মানানাম্ অত্যন্তবিশুদ্ধাৎ কেবলাচ্চিন্মাত্রাৎ আত্মস্বরূপাৎ পৃথগভাবং স্বভাব- বিলক্ষণাত্মকতাম্, তথ তেষামেবেন্দ্রিয়াণাম্ উদয়াস্তময়ৌ চ যৎ পৃথগুৎপদ্যমানানাম্ উৎপত্তি প্রলয়ৌ চ জাগ্রৎস্বাপাবস্থা প্রতিপত্ত্যা নাত্মন ইতি মত্বা জ্ঞাত্বা বিবেকতঃ, ধীরো ধীমান্ ন শোচতি। আত্মনো নিত্যৈকস্বভাবত্বাব্যভিচারাচ্ছোকাদি- কারণত্বানুপপত্তেঃ। তথা চ শ্রুত্যন্তরম্-“তরতি শোকমাত্মবিৎ” ইতি ॥১১৫৷৷৬৷৷
কি প্রকারে ইঁহাকে(আত্মাকে) বুঝিতে হইবে? এবং তাঁহাকে জানিবার প্রয়োজনই বা কি? এই নিমিত্ত বলিতেছেন,-নিজ নিজ বিষয়(শব্দাদি) গ্রহণের উদ্দেশ্যে স্বকারণ আকাশাদি পঞ্চভূত হইতে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে উৎপন্ন * শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়-সমূহের যে অতিশয় বিশুদ্ধ কেবলই, চিন্ময় আত্মা হইতে পৃথগভাব অর্থাৎ স্বভাব- বৈলক্ষণ্য, এবং পৃথগভাবে উৎপন্ন সেই ইন্দ্রিয়গণের যে উদয় ও অস্তময় অর্থাৎ জাগ্রৎ অবস্থায় উৎপত্তি ও স্বপ্নাবস্থায় প্রলয়(বৃত্তির অভিব্যক্তি ও অনভিব্যক্তি), ইহাও সেই ইন্দ্রিয়গণেরই-আত্মার নহে; ধীর অর্থাৎ মোক্ষোপযোগী বুদ্ধিশালী ব্যক্তি বিবেকপূর্ব্বক ইহা অবগত হইয়া শোক করেন না; কারণ, আত্মা স্বভাবতঃই নিত্য ও এক, কখনই তাঁহার সে স্বভাবের ব্যত্যয় হয় না; সুতরাং তন্নিমিত্ত শোক-দুঃখাদির কিছুমাত্র কারণও থাকিতে পারে না।
৩য়া বল্লী] দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ। ১৭৭ এতদনুরূপ শ্রুতিও আছে—‘আত্মবিৎ ব্যক্তি শোক অতীত হইয়া থাকেন’ ॥ ১১৫ ॥ ৬॥
ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনো মনসঃ সত্ত্বমুত্তমম্।
সত্ত্বাদধি মহানাত্মা মহতোহব্যক্তমুত্তমম্ ॥ ১১৬ ॥ ৭ ॥
[ সর্ব্বাবশেষত্বেন আত্মা অধিগন্তব্যঃ, ইতি তৎক্রমমাহ—“ইন্দ্রিয়েভ্যঃ” ইত্যাদিনা শ্লোকদ্বয়েন]। ইন্দ্রিয়েভ্যঃ মনঃ পরম্, মনসঃ[অপি] সত্ত্বম্(বুদ্ধিঃ) উত্তমম্। মহান্ আত্মা(হিরণ্যগর্ভোপাধিভূতা বুদ্ধিসমষ্টিঃ) সত্ত্বাৎ অধি (অধিকঃ), অব্যক্তম্(প্রকৃতিঃ মায়া) মহতঃ উত্তমম্ ॥’
বাহ্য সর্ব্ব-পদার্থের পরিশেষরূপে আত্মাকে জানিতে হইবে; এই নিমিত্ত তাহার ক্রম বলা হইতেছে,—ইন্দ্রিয়সমূহ অপেক্ষা মন শ্রেষ্ঠ, মন অপেক্ষা সত্ত্ব (বুদ্ধি) শ্রেষ্ঠ, সত্ত্ব অপেক্ষা হিরণ্যগর্ভের উপাধি মহত্তত্ত্ব-সমষ্টি শ্রেষ্ঠ, মহৎ অপেক্ষাও অব্যক্ত(প্রকৃতি বা মায়া) শ্রেষ্ঠ ॥ ১১৬ ॥ ৭ ॥
যম্মাদাত্মন ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগভাব উক্তঃ, নাসৌ বহিরধিগন্তব্যঃ; যস্মাৎ প্রত্যগাত্মা স সর্ব্বস্য। তৎকথমিত্যুচ্যতে,—ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মন ইত্যাদি। অর্থানামিহেন্দ্রিয়সমানজাতীয়ত্বাৎ ইন্দ্রিয়গ্রহণেনৈব গ্রহণম্। পূর্ব্ববদন্যৎ। সত্ত্বশব্দাদবুদ্ধিরিহোচ্যতে ॥ ১১৬ ॥ ৭ ॥
যে আত্মা হইতে ইন্দ্রিয়সমূহের পৃথগভাব(পার্থক্যের উপদেশ) উক্ত হইয়াছে, সেই আত্মা বাহিরে জ্ঞাতব্য নহে; যেহেতু, সেই আত্মা সকলেরই প্রত্যক্-স্বরূপ। তবে তাঁহাকে কিরূপে[জানিতে হইবে,] তাহা কথিত হইতেছে—ইন্দ্রিয়-সমূহ অপেক্ষাও মন শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি। ইন্দ্রিয়—অর্থ ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য শব্দাদি বিষয়-সমূহ ও ইন্দ্রিয়ের সমানজাতীয়(অচেতন জড় পদার্থ); এই কারণে ইন্দ্রিয়-গ্রহণেই সেই বিষয়সমূহের গ্রহণ করা হইয়াছে। অপর সমস্তই প্রথম
অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীর, দশম শ্লোকের ব্যাখ্যার অনুরূপ। এখানে ‘সত্ত্ব’ শব্দে বুদ্ধিতত্ত্ব উক্ত হইয়াছে ॥ ১১৬॥ ৭॥
অব্যক্তাত্তু পরঃ পুরুষো ব্যাপকোহলিঙ্গ এব চ। তং জ্ঞাত্বা * মুচ্যতে জন্তুরমৃতত্বঞ্চ গচ্ছতি ॥ ১১৭ ॥ ৮ ॥
ব্যাপকঃ(সর্ব্বব্যাপী),[ন বিদ্যতে লিঙ্গং ‘যস্য, সঃ] অলিঙ্গঃ(সর্ব্বধৰ্ম্ম- বিবর্জিতঃ) এব পুরুষঃ(পূর্ণঃ পরমাত্মা) তু(পুনঃ) অব্যক্তাৎ চ(অপি) পরঃ(নাতঃ পরমপি কিঞ্চিদস্তীতি ভাবঃ)। জন্তুঃ(প্রাণী) তম্(পুরুষম্) জ্ঞাত্বা(বিবেকতঃ অধিগম্য) মুচ্যতে[সংসার-বন্ধনৈরিতি শেষঃ।] অমৃতত্বং চ(অপি) গচ্ছতি ॥
সর্ব্বব্যাপী, অলিঙ্গ(সর্ব্বপ্রকার চিহ্নবর্জিত) পুরুষ(পরমাত্মা) অব্যক্ত অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ; তাঁহাকে জানিয়া লোকে সংসার-বন্ধন হইতে বিমুগ্ধ হয়, এবং অমৃতত্ব(মোক্ষ) লাভ করে ॥ ১১৭ ॥৮॥
অব্যক্তাতু পরঃ পুরুষো ব্যাপকঃ ব্যাপকস্যাপ্যাকাশাদেঃ সর্ব্বস্য কারণত্বাৎ। অলিঙ্গঃ—লিঙ্গ্যতে গম্যতে যেন তল্লিঙ্গম্—বুদ্ধ্যাদি, তদবিদ্যমানং যস্যেতি সোহয়ম্ অলিঙ্গ এব চ। সর্ব্বসংসারধর্মবর্জিত ইত্যেতৎ। তং জ্ঞাত্বা আচার্য্যতঃ শাস্ত্রতশ্চ, মুচ্যতে জন্তুঃ অবিদ্যাদিহৃদয়গ্রন্থিভির্জীবন্নেব; পতিতেহপি শরীরেহমৃতত্বঞ্চ গচ্ছতি। সোহলিঙ্গঃ পরোহব্যক্তাৎ পুরুষ ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ ॥ ১১৭ ॥৮॥
ব্যাপক আকাশাদি সর্ব্ব পদার্থেরও কারণ বলিয়া সর্বব্যাপী এবং অলিঙ্গ—যদ্দ্বারা লিঙ্গন অর্থাৎ অবগতি হয়, তাহার নাম লিঙ্গ—বুদ্ধি প্রভৃতি চিহ্ন; সেই লিঙ্গ যাঁহার নাই, তিনিই অলিঙ্গ, অর্থাৎ নিশ্চয়ই তাঁহার কোনরূপ ‘লিঙ্গ’ নাই—তিনি সর্ব্ববিধ সংসার-ধর্ম্মরহিত। জন্তু(পুরুষ) আচার্য্য ও শাস্ত্র হইতে তাঁহাকে জানিয়া জীবদরস্থায়ই
অবিদ্যাপ্রভৃতি হৃদয়-গ্রন্থি হইতে বিমুক্ত হয়। শরীরপাতের পরও অমৃতত্ব(মুক্তি) লাভ করে। সেই অলিঙ্গ পুরুষ অব্যক্ত অপেক্ষাও পর; এইরূপে পূর্ব্বোক্ত বাক্যের সহিত ইহার সম্বন্ধ করিতে হইবে ॥ ১১৭ ॥ ৮ ॥
ন সংদৃশে তিষ্ঠতে রূপমস্য, ন চক্ষুষা পশ্যতি কশ্চিদেনম্। * হৃদা মনীষা মনসাভিকুপ্তো য এনং বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ণ ॥ ১১৮ ॥ ৯ ॥ য এবং বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ক ॥ ১১৮ ॥ ৯ ॥ ব্যাখ্যা।
[তস্য অলিঙ্গস্য দর্শনং যথা ভবতি, তদাহ—নেতি]। অন্য(পূর্ব্বোক্তস্য অলিঙ্গস্য) রূপম্(স্বরূপম্) সংদৃশে(প্রত্যক্ষবিষয়ে) ন তিষ্ঠতে(তিষ্ঠতি);[অতঃ] কশ্চিৎ(কোহপি) এনম্(পুরুষম্) চক্ষুষা(কেনচিদপি ইন্দ্রিয়েণ) ন পশ্যতি (ন অবগচ্ছতি),[পরন্তু] মনীষা(বিকল্পহীনয়া) হৃদা(হৃদয়স্থয়া বুদ্ধ্যা করণেন), মনসা(মননেন)[পুরুষঃ] অভিকৃপ্তঃ(অভিব্যক্তঃ বিজ্ঞাতঃ ভবর্তীত্যর্থঃ)। যে(জনাঃ) এনম্(পুরুষম্) বিদুঃ(জানন্তি), তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি॥
যে উপায়ে সেই অলিঙ্গ পুরুষের দর্শন হইতে পারে, তাহা বলা হইতেছে— ইহার প্রকৃত স্বরূপটি প্রত্যক্ষবিষয়ে থাকে না; সুতরাং কেহই চক্ষুদ্বারা অর্থাৎ কোন ইন্দ্রিয় দ্বারাই তাঁহাকে দর্শন করিতে পায় না।[পরন্তু] বিকল্পহীন, হৃদয়স্থ বুদ্ধি দ্বারা মনের(মননের) সাহায্যে সেই পুরুষ অভিব্যক্ত হন; যাঁহারা তাঁহাকে জানেন, তাঁহারা অমৃত বা বিমুক্ত হন ॥ ১১৮ ॥ ৯ ॥
কথং তর্হি তস্য অলিঙ্গস্থ্য দর্শনমুপপদ্যতে? ইত্যুচ্যতে,-ন সন্দশে দর্শন- বিষয়ে ন তিষ্ঠতি প্রত্যগাত্মনোহস্য রূপম্। অতো ন চক্ষুষা সর্ব্বেন্দ্রিয়েরণ; চক্ষু- গ্রহণস্যোপলক্ষণার্থত্বাৎ। পশ্যতি নোপলভতে কশ্চন কশ্চিদপ্যেনং প্রকৃত-
স্থিরাৎ নিশ্চলাম্) ইন্দ্রিয়ধারণাম্(ইন্দ্রিয়াণাং বিষয়েভ্যঃ প্রত্যাহৃত্য আত্মনি স্থাপনম্) ‘যোগম্’ ইতি মন্যন্তে[যোগিন ইতি শেষঃ]।[যদা খলু যোগসাধনে প্রবৃত্তো ভবতি], তদা[এব] অপ্রমত্তঃ(প্রমাদরহিতো) ভবতি,[যোগী ইতি শেষঃ]। হি(যস্মাৎ) যোগঃ প্রভবাপ্যয়ৌ(হিতসাধকঃ অহিতসাধকশ্চ ভবতি),[যোগারম্ভে প্রমাদাৎ অহিতম্, অপ্রমাদাচ্চ হিতং ভবতি, তস্মাৎ অহিত- পরিহারায় প্রমাদঃ পরিবর্জনীয় ইতি ভাবঃ]॥
পূর্ব্বোক্ত অবস্থাকেই যোগ বলিয়া নির্দেশ করিতেছেন,—সেই পূর্ব্বকথিত স্থিরতর ইন্দ্রিয়ধারণা অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহের ‘স্থিরীকরণকেই[যোগিগণ] যোগ বলিয়া মনে করেন। সেই যোগারম্ভকালে সাধক প্রমাদ-(অনবধানতা-) রহিত হইবে। কারণ, যোগই প্রভব(সিদ্ধি) ও অপ্যয়ের(বিনাশের) কারণ হইয়া থাকে অর্থাৎ প্রমাদে অপায়, আর অপ্রমাদে সিদ্ধি হইয়া থাকে। অতএব প্রমাদ পরিত্যাগে যত্ন-পর হইবে ॥ ১২০ ॥ ১১ ॥
তামীদৃশীং তদবস্থাং যোগমিতি মন্যন্তে বিয়োগমেব সন্তম্। সর্ব্বানর্থসংযোগ- বিয়োগলক্ষণা হি ইয়মবস্থা যোগিনঃ। এতস্যাং হ্যবস্থায়াম্ অবিদ্যাধ্যারোপণবর্জিত- স্বরূপ-প্রতিষ্ঠ আত্মা। স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্—স্থিরামচলাম্ ইন্দ্রিয়ধারণাং বাহ্যান্থঃ- করণানাং ধারণামিত্যর্থঃ। অপ্রমত্তঃ প্রমাদবর্জিতঃ সমাধানং প্রতি নিত্যং প্রযত্নবান, তদা তস্মিন্ কালে, যদৈব প্রবৃত্তযোগো ভবতীতি সামর্থ্যাদবগম্যতে। ন হি বুদ্ধ্যাদিচেষ্টাভাবে প্রমাদসম্ভবোহস্তি। তস্মাৎ প্রাগেব বুদ্ধ্যাদিচেষ্টোপরমাৎ অপ্রমাদো বিধীয়তে। অথবা, যদৈবেন্দ্রিয়াণাং স্থিরা ধারণা, তদানীমেব, নিরঙ্কুশ- মপ্রমত্তত্বম্, ইত্যতোহভিধীয়তে অপ্রমত্তস্তদা ভবতীতি। কুতঃ? যোগো হি যস্মাৎ প্রভবাপ্যয়ৌ উপজনাপায়ধৰ্ম্মকঃ ইত্যর্থঃ॥ অতঃ অপায়পরিহারায় অন্নমাদঃ কর্তব্য ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১২০ ॥ ১১ ॥
প্রকৃত পক্ষে বিয়োগাত্মক(ভোগত্যাগ-স্বরূপ) হইলেও যোগিগণ ঈদৃশ সেই অবস্থাকে ‘যোগ’ বলিয়া মনে করেন। কারণ, এই অবস্থাটি যোগীর সর্বপ্রকার অনর্থ সম্বন্ধের বিয়োগাত্মক। এই অব-
স্থায়ই আত্মা অবিদ্যার আরোপ-রহিত হইয়া স্বরূপে অবস্থিত হয়, স্থির অর্থ—চাঞ্চল্য-রহিত, ইন্দ্রিয়-ধারণা অর্থ—বাহ্য ও অন্তঃকরণ- সমূহের ধারণা(আত্মাভিমুখীকরণ)।[সাধক ব্যক্তি] যখনই যোগে প্রবৃত্ত হইবেন, তখনই সমাধির প্রতি অপ্রমত্ত অর্থাৎ প্রমাদ বর্জ্জিত হইবেন। মূলে ‘যখনই’ ইত্যাদি অংশ না থাকিলেও “তদা” শব্দ থাকায় কল্পনা করিয়া লইতে হয়। কারণ, বুদ্ধি প্রভৃতি করণসমূহের চেষ্টার অভাব হইলে, কখনই প্রমাদের সম্ভাবনা হয় না। অতএব, বুদ্ধি প্রভৃতির ক্রিয়া-বিরামের পূর্ব্বেই প্রমাদত্যাগ বিহিত হইতেছে। অথবা, যখনই ইন্দ্রিয়সমূহের স্থিরতর-ধারণা হয়, তখনই অব্যাহত ভাবে অপ্রমাদ সম্পন্ন হইয়া থাকে; এই কারণে তখন ‘অপ্রমত্ত হইবার’ বিধান করা হইতেছে। ইহার কারণ,—যেহেতু যোগই প্রভব ও অপ্যয়-স্বরূপ, অর্থাৎ হিত ও অপায়ের(অহিতের) কারণ হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, অতএব, অপায় বা অহিত পরি- হারার্থ অপ্রমাদ বা অনবধানতা ত্যাগ করা আবশ্যক ॥১২০॥১১৷৷
নৈব বাচা ন মনসা প্রাপ্তুং শক্যো ন চক্ষুষা।
অস্তীতি কবতোহন্যত্র কথং তদুপলভ্যতে ॥ ১২১ ॥ ১২ ॥
আত্মনো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বেন গুরূপদেশমাত্রগম্যত্বমাহ নৈবেতি। বাচা(বাক্যেন) ন এব, মনসা(অন্তঃকরণেন) ন এব, চক্ষুষা(চক্ষুরিত্যুপলক্ষণং সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাং, ততশ্চ কেনাপি ইন্দ্রিয়েণ) ন এব প্রাপ্তুং(জ্ঞাতুং) শক্যঃ(বিজ্ঞেয়ঃ)[পরমাত্মা ইতি শেষঃ]।[তস্মাৎ][আত্মা] ‘অস্তি’ ইতি ক্রবতঃ(আত্মাস্তিত্ববাদিনঃ আচার্য্যাৎ) অন্যত্র(নাস্তিকাদৌ) তৎ(আত্মস্বরূপং) কথম্ উপলব্ধ্যতে? [ন কথমপি, ইতি ভাবঃ] ॥
দুর্বিজ্ঞেয় আত্মাকে কেবল গুরুর উপদেশ সাহায্যেই জানা যাইতে পারে, ইহা প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন যে,—আত্মা নিশ্চয়ই বাক্য দ্বারা নহে, মনের দ্বারা নহে,
২৪
এবং চক্ষুঃ দ্বারাও(কোন ইন্দ্রিয় দ্বারাও) প্রাপ্তির যোগ্য নহে। অতএব আত্মার অস্তিত্ববাদী গুরু ভিন্ন, অন্যত্র(নাস্তিকাদির নিকট) কিরূপে তাঁহাকে জানা যাইতে পারে? ॥ ১২১ ॥ ১২॥
বুদ্ধ্যাদিচেষ্টাবিষয়ং চেদ্ ব্রহ্ম, ‘ইদং তৎ’ ইতি বিশেষতো গৃহ্যেত, বুদ্ধ্যাদ্য- পরমে চ গ্রহণকারণাভাবাদনুপলভ্যমানং নাস্ত্যের ব্রহ্ম। যদ্ধি করণগোচরং তৎ ‘অস্তি’ ইতি প্রসিদ্ধং লোকে; বিপরীতঞ্চাসদিতি। অতশ্চানর্থকো যোগোহনুপ- লভ্যমানত্বাদ্ বা ‘নাস্তীতি’ উপলব্ধব্যং ব্রহ্ম ইত্যেবং প্রাপ্তে ইদমুচ্যতে। সত্যম্—
নৈব বাচা, ন মনসা, ন চক্ষুষা-মান্যৈরপীন্দ্রিয়ৈঃ প্রাপ্তং শক্যতে ইত্যর্থঃ। তথাপি সর্ব্ববিশেষরহিতোহপি জগতো মূলমিত্যবগতত্বাদস্যেব; কার্য্যপ্রবিলাপ- নস্যাস্তিত্বনিষ্ঠত্বাৎ! তথা ইদং কাৰ্য্যং সৌক্ষ্ম্যতারতম্যপারম্পর্য্যেণ অনুগম্যমানং সদ্বুদ্ধিনিষ্ঠামেবাবগময়তি। যদাপি বিষয়প্রবিলাপনেন প্রবিলাপ্যমানা বুদ্ধিঃ, তদাপি সা সৎপ্রত্যয়গর্ভৈব বিলীয়তে। বুদ্ধির্হি নঃ প্রমাণং সদসতোর্যাথাত্ম্যাব- র্গমে। মূলং চেজ্জগতো ন স্যাৎ, অসদন্বিতমেবেদং কার্য্যমসদিত্যের গৃহ্যেত, ন ত্বেতদন্তি-সৎ-সদিত্যের তু গৃহ্যতে। যথা মৃদাদিকাৰ্য্যঘটাদি মৃদাদ্যন্বিতম্। তস্মাজ্জগতো মূলমাত্মা অস্তীত্যেবোপলব্ধব্যঃ।
তস্মাদস্তীতি ব্রুবতোহস্তিত্ববাদিন আগমার্থানুসারিণঃ শ্রদ্দধানাদন্যত্র নাস্তিক- বাদিনি নাস্তি জগতো মূলমাত্মা, নিরন্বয়মেবেদং কার্য্যমভাবান্তং প্রবিলীয়ত ইতি মন্যমানে বিপরীতদর্শিনি কথং তৎ ব্রহ্ম তত্ত্বত উপলভ্যতে, ন কথঞ্চনোপ- লভ্যত ইত্যর্থঃ ॥ ১২৫ ॥ ১২ ॥
ব্রহ্ম যদি বুদ্ধি প্রভৃতি জ্ঞানসাধনের বিষয়ীভূত হইতেন, তাহা হইলে ‘ইহা সেই ব্রহ্ম,’ ইত্যাকার বিশেষভাবে অবশ্যই তাঁহাকে গ্রহণ করা যাইতে পারিত; কিন্তু বুদ্ধি প্রভৃতির উপরম অর্থাৎ ব্যাপারের অবিষয়তা নিবন্ধন জানিবার উপায় না থাকায় উপলব্ধির বিষয় না হওয়ায় নিশ্চয়ই ব্রহ্ম নাই বা অসৎ। কারণ, জগতে যাহা করণ- গোচর(জ্ঞানসাধনের বিষয়), তাহাই ‘সৎ’, আর তদ্বিপরীতমাত্রই
‘অসৎ’ বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই কারণে যোগ-সাধন অনর্থক(বিফল), অথবা, যখন উপলব্ধি হয় না, তখন নিশ্চয়ই ব্রহ্ম নাই; এইরূপ সম্ভা- বনায় এইকথা বলিতেছেন যে, সত্য বটে, বাক্য দ্বারা নহে, মনের দ্বারা নহে, চক্ষুঃ দ্বারা নহে কিংবা অপরাপর ইন্দ্রিয় দ্বারাও পাইবার যোগ্য নহে; তথাপি কার্য্যের বিলয়ন বা বিনাশ যখন সৎ বস্তুকে (কারণকে) অবলম্বন না করিয়া হইতেই পারে না, তখন ব্রহ্ম সর্বপ্রকার বিশেষ গুণ-রহিত হইলেও জগতের মূল কারণ-রূপে নিশ্চয়ই তাঁহার প্রতীতি আছে। সেইরূপ ‘দেখাও যায়, [ধ্বংসোন্মুখ] কোন একটি কার্য্য বা জন্য বস্তু উত্তরোত্তর সূক্ষমতা- প্রাপ্ত হইতে হইতে পরিশেষে উহা যে সৎরূপেই অবস্থান করে, এইরূপই প্রতীতি(সদবুদ্ধি) সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। * যখন বুদ্ধির বিষয়ের(সূক্ষ্মভাগের) বিলয়ন বা বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে তদ্বিষয়ক বুদ্ধিও বিলীন(বিনষ্ট) হইয়া যায়, তখনও সেই বুদ্ধি যেন ‘সৎ’ প্রতীতি সমুৎপাদন করিয়াই বিনষ্ট হইয়া যায়। কোন্টি যথার্থ সৎ, আর কোন্টি যথার্থ অসৎ, এই তত্ত্ব নির্ণয়ে বুদ্ধিই আমাদের একমাত্র প্রমাণ। জগতের মূল কারণ যদি অসৎই হইত, তাহা হইলে মৃত্তিকা প্রভৃতি কারণ সমুৎপাদিত ঘটাদি কার্য্য যেরূপ মৃত্তিকা-সংবলিত-রূপে গৃহীত(প্রতীত) হয়, সেইরূপ অসৎকারণান্বিত কার্য্য—জগৎও
‘অসৎ’ বলিয়াই প্রতীত’ হইত; কিন্তু সেরূপ ত হয় না, বরং ‘সৎ‘- বলিয়াই পরিগৃহীত হয়। অতএব, জগতের মূলকারণ আত্মা যে আছেন, ইহা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিতে হইবে, অর্থাৎ বুঝিতে হইবে। অতএব, ‘[আত্মা] আছে’ ইহা যিনি বলেন, সেই আত্মাস্তিত্ববাদী, শাস্ত্রার্থানুসারী শ্রদ্ধাবান্ ভিন্ন অন্যত্র নাস্তিকবাদী অর্থাৎ যিনি মনে করেন যে, জগতের মূল কারণ আত্মা বলিয়া কোন পদার্থ নাই; এই জগৎকার্য্যটি নিরন্বয় অর্থাৎ ‘কারণের সহিত সম্বন্ধ-বৃহিতভাবেই অভাবে পর্যবসিত হইবে,’ এই প্রকার বিপরীতদর্শী নাস্তিকের নিকট’ সেই ব্রহ্ম কিরূপে যথাযথরূপে উপলব্ধি বা প্রতীতির বিষয় হইবেন? কোন প্রকারেই উপলব্ধ হইতে পারেননা ॥১২১৷৷১২৷৷
অস্তীত্যেবোপলব্ধব্যস্তত্ত্বভাবেন চোভয়োঃ। অস্তীত্যেবোপলব্ধস্য তত্ত্বভাবঃ প্রসীদতি ॥১২২॥১৩৷৷
আত্মোপলব্ধিপ্রকারমাহ—অস্তীত্যাদি। উভয়োঃ(সোপাধিক-নিরুপাধি- কয়োমধ্যে)[নিরুপাধিক আত্মা] তত্ত্বভাবেন(অপরিণামি-সত্যরূপেণ) ‘অস্তি’ (সৎ) ইত্যেব উপলব্ধব্যঃ(বোদ্ধব্যঃ)। ‘অস্তি’ ইতি(এবম্) উপলব্ধস্য(উপলব্ধঃ —জ্ঞাতুঃ সকাশে) তত্ত্বভাবঃ(নিরুপাধিকস্বভাবঃ) প্রসীদতি(নিঃসংশয়ং প্রতীতিবিষয়ো ভবতি, ইত্যর্থঃ) ॥
পুনশ্চ আত্মোপলব্ধির প্রণালী বলিতেছেন—উপাধিযুক্ত ও তদ্বিযুক্ত, এতদুভয় প্রকারের মধ্যে নিরুপাধিক আত্মাকেই তত্ত্বভাবে অর্থাৎ প্রকৃত সত্যরূপে ‘অস্তি’ অর্থাৎ ‘সৎ’ বলিয়া বুঝিতে হইবে। যে লোক ‘অস্তি’ বলিয়া উক্তি করে, তাহার নিকট পূর্ব্বোক্ত তত্ত্বভাব আত্মার কূটস্থ সত্যরূপ প্রসন্ন হয়, অর্থাৎ নিঃসংশয়রূপে প্রকাশ পায় ॥ ১২২ ॥ ১৩ ॥
তস্মাদপোহাসাদিপক্ষমাসুরম্ পশীতোঽপি। উপবদ্যঃ সকর্ম্মণীয়ং।
দ্যুপাধিভিঃ। যদা তু তদ্রহিতোহবিক্রিয় আত্মা, কার্য্যঞ্চ কারণব্যতিরেকেন নাস্তি, “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্” ইতি শ্রুতেঃ। তদা তস্য নিরুপাধিকস্ত, অলিঙ্গস্থ্য সদসদাদিপ্রত্যয়বিষয়ত্ববর্জিতস্য আত্মনঃ তত্ত্বভাবো ভবতি। তেন চ রূপেণাত্মোপলব্ধব্য ইত্যনুবর্ততে। তত্রাপ্যুভয়োঃ সোপাধিক- নিরুপাধিকয়োরস্তিত্বতত্ত্বভাবয়োঃ নির্দ্ধারণার্থা ষষ্ঠী। পূর্ব্বম্ অস্তীত্যেবোপলব্ধস্য আত্মনঃ সৎকার্য্যোপাধিকৃতাস্তিত্ব-প্রত্যয়েনোপলব্ধস্যেত্যর্থঃ। পশ্চাৎ প্রত্যস্তমিত- সর্ব্বোপাধিরূপ আত্মনঃ তত্ত্বভাবঃ বিদিতাবিদিতাভ্যামন্যোহদ্বয়স্বভাবো “নেতি নেতি” “অস্থূলমনহস্বম্” “অদৃশ্যেহনাত্ম্যে নিরুক্তেহনিলয়নে”, ইত্যাদিশ্রুতি- নির্দিষ্টঃ প্রসীদতি অভিমুখীভবতি আত্মনঃ প্রকাশনায় পূর্ব্বমস্তীত্যুপলব্ধবত ইত্যেতৎ ॥ ১২২ ৷৷ ১৩৷৷
অতএব, অসুরসম্মত অসদ্বাদীদিগের মত পরিত্যাগ পূর্ব্বক সৎ- কার্য্য(সদ্ব্রহ্মসম্ভূত) বুদ্ধ্যাদি উপাধি-সমন্বিত আত্মাকে ‘অস্তি’(সৎ) বলিয়াই বুঝিতে হইবে। যখন বিকারহীন আত্মা পূর্ব্বোক্ত উপাধি- রহিত হয় এবং বিকার(ঘটাদি কার্য্য) কেবল ‘বাক্যারব্ধ নাম মাত্র, মৃত্তিকাই সত্য।’ এই শ্রুতি অনুসারে যখন জানা যায় যে, কারণের অতিরিক্তও কার্য্যের সত্তা নাই; তখন সেই উপাধিরহিত, অলিঙ্গ এবং সদসদাত্মক(কার্য্য-কারণভাবময়) বুদ্ধির অবিষয় আত্মার ‘তত্ত্বভাব’ প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায়; সেইরূপেই আত্মার উপলব্ধি করা উচিত। তন্মধ্যেও সোপাধিক ও নিরুপাধিক অর্থাৎ অস্তিত্ব ও তত্ত্বভাব এতদুভয়ের মধ্যে প্রথমে ‘অস্তি’ রূপেই উপলব্ধ হয়, অর্থাৎ প্রথমে বুদ্ধি প্রভৃতি কার্য্য সম্বন্ধ বশতঃ যে আত্মা ‘সৎ’ প্রতীতির বিষয় হয়, পশ্চাৎ আত্মারই সর্ব্বাপাধি-রহিত ‘তত্ত্বভাব’, যাহা বিদিত ও অবিচ্ছিন্ন হইতে পৃথক, স্বভাবতঃ অদ্বিতীয় এবং যাহা ‘ইহা ব্রহ্ম নহে ইহা নহে’, ‘মূল, অণু ও হ্রস্ব নহে’, এবং ‘অদৃশ্য, অনাত্ম্য(দেহাদি- রহিত) ও বিলয়-রহিত’ ইত্যাদি শ্রুতিতে নির্দিষ্ট হইয়াছে, সেই তত্ত্বভাব প্রসন্ন হয় অর্থাৎ তাহার সম্মুখীন হয়।[কাহার? না—]
‘আত্মপ্রকাশের উদ্দেশে যে লোক তৎপূর্ব্বে ‘অস্তি’ বলিয়া আত্মার উপলব্ধি করিয়াছে, তাহার—॥ ১২২ ॥ ১৩ ॥
যদা সর্ব্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেহস্য হৃদি শিতাঃ। অথ মর্ত্যোহমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে ॥১২৩৷১৪৷
মুমুক্ষোঃ তাদৃশপ্রসাদসাধ্যং ফলমাহ,—যদেতি। অন্য হৃদি শ্রিতাঃ(অন্তঃকরণ- গতাঃ) সর্ব্বে কামাঃ(বাসনাঃ) যদা প্রমুচ্যন্তে,[কর্মকর্ত্তরি প্রয়োগঃ, মুক্তা ভবন্তি, অপগচ্ছন্তীতি যাবৎ]। অথ(অনন্তরং) মর্ত্যঃ(মরণশীলো মনুষ্যঃ) অমৃতঃ(মরণভয়রহিতঃ) ভবতি। অত্র(অস্মিন্ এব দেহে) ব্রহ্ম সমশ্নুতে (ব্রহ্মৈব ভবর্তীত্যর্থঃ)।॥
এই মুমুক্ষুর হৃদয়স্থিত সমস্ত কামনা যখন বিমুক্ত হইয়া যায়(আপনিই বিনষ্ট হইয়া যায়), তাহার পর সেই মর্ত্য(মরণশীল মনুষ্য) অমৃত হন; এবং এই দেহেই ব্রহ্মভাব উপলব্ধি করেন ॥ ১২৩ ॥ ১৪ ॥
এবং পরমার্থদর্শিনো যদা যস্মিন্ কালে সর্ব্বে কামাঃ কাময়িতব্যস্যান্যস্যাভাবাৎ প্রমুচ্যন্তে বিশীর্যন্তে—যেহস্য প্রাক্ প্রতিবোধাদবিদুষো হৃদি বুদ্ধৌ শ্রিতাঃ আশ্রিতাঃ। বুদ্ধির্হি কামানামাশ্রয়ঃ, নাত্মা, “কামঃ সঙ্কল্প” ইত্যাদিশ্রুত্যন্তরাচ্চ। অথ তদা মর্ত্যঃ প্রাক্ প্রবোধাদাসীৎ, স প্রবোধোত্তরকালমবিদ্যাকামকৰ্ম্মলক্ষণস্য মৃত্যোঃ বিনাশাৎ অমৃতো ভবতি গমনপ্রযোজকস্য বা মৃত্যোর্বিনাশাদগমনানু- পপত্তেঃ। অত্র ইহৈব প্রদীপনির্ব্বাণবৎ সর্ব্ববন্ধনোপশুদ্ধ ব্রহ্ম সমশ্নুতে ব্রহ্মৈব ভবতীত্যর্থঃ ॥ ১২৩ ॥ ১৪ ॥
এইপ্রকার পরমার্থতত্ত্বদর্শী পুরুষের প্রতিরোধ অর্থাৎ সর্ব্বত্র ব্রহ্মদৃষ্টি সমুদিত হইবার পূর্ব্বে যে সমস্ত কামনা(বিষয়-তৃষ্ণা) হৃদয়কে আশ্রয় করিয়াছিল, আর কিছু কাময়িতব্য(প্রার্থনীয়) না থাকায় যখন সেই সকল কামনা প্রযুক্ত অর্থাৎ বিশীর্ণ(অসার) হইয়া যায়।
বুদ্ধিই কামনার আশ্রয়, আত্মা নহে; ইহা যুক্তিতে এবং ‘কামনা- সংকল্প[প্রভৃতি ধর্ম্ম সকল মনেরই], ইত্যাদি অপর শ্রুতি অনুসারেও [জানা যায়]। তখন, আত্মজ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বে যিনি মর্ত্য(মরণশীল) ছিলেন, জ্ঞানোদয়ের পর অদ্বিতীয়া, কামনা ও তদনুরূপ চেষ্টাত্মক মৃত্যুর বিনাশ হওয়ায় সেই মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল জীবই অমৃত হন। অথবা, জীবের লোকান্তরে গমনসাধক যে মৃত্যু, তাদৃশ মৃত্যুর অভাব বশতঃ অমৃত হন; কারণ, মৃত্যুর পর জ্ঞানীর আত্মার অন্যত্র গমন সম্ভবপর হয় না; পরন্তু প্রদীপনির্ব্বাণের ন্যায় সমস্ত বন্ধনের একে- বারে উপশম হওয়ায় এই দেহেই তিনি ব্রহ্ম ভোগ করেন, অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপই হইয়া যান ॥ ১২৩ ॥ ১৪ ॥
যদা সর্ব্বে প্রতিদ্যন্তে হৃদয়স্যেহ গ্রন্থয়ঃ। অথ মর্ত্যোহমৃতো ভবতি এতাবদনুশাসনম্ ॥১২৪॥১৫॥
কদা পুনঃ সর্ব্বকামানাং সম্যক্ সমুচ্ছেদো ভবেৎ? ইত্যাহ-যদেতি। ইহ (মানুষদেহে) হৃদয়স্য সর্ব্বে গ্রন্থয়ঃ(গ্রন্থিবৎ অবিদ্যাবন্ধনানি) যদা প্রতিদ্যন্তে (অপযান্তি)। অপ(তদা) মর্ত্যঃ[সর্ব্বকাম-প্রহানেন] অমৃতঃ(মুক্তঃ) ভবতি। এতাবৎ(এতাবদেব) অনুশাসনম্(নিষ্কামকর্ম-শ্রবণ-মনন-ধ্যান-কর্তব্যোক্তিপরঃ বেদান্ত-শাস্ত্রস্যোপদেশ ইত্যর্থঃ) ॥
সমস্ত কামনার সমুচ্ছেদ কখন? তাই বলিতেছেন যে,—এই মানুষ- দেহেই যে সময় হৃদগত সমস্ত অবিদ্যা-গ্রন্থি ভিন্ন বা বিনষ্ট হইয়া যায়, সেই সময়ই সমস্ত কামনার সমুচ্ছেদবশতঃ মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল মনুষ্য অমৃতত্ব লাভ করে। বেদান্তশাস্ত্রের উপদেশ[ইহার অধিক আর উপদেশ নাই] ॥১২৪॥১৫৷৷
কদাপুনঃ কামানাং মূলতো বিনাশঃ? ইত্যুচ্যতে। যদা সর্ব্বে প্রতিদ্যন্তে ভেদমুপযান্তি বিনশ্যন্তি হৃদয়স্য বুদ্ধেরিহ জীবত এব গ্রন্থয়ো গ্রন্থিবদ্দঢ়বন্ধনরূপা অবিদ্যা প্রত্যয়া ইত্যর্থঃ। ‘অহমিদং শরীরং, মমেদং ধনং, সুখী দুঃখী চাহম্’ ইত্যেব-
মাদিলক্ষণাঃ তদ্বিপরীতাৎ ব্রহ্মাত্মপ্রত্যয়োপজননাৎ ‘ব্রহ্মৈবাহমস্যসংসারী’ ইতি। বিনষ্টেষু অবিদ্যাগ্রন্থিষু তন্নিমিত্তাঃ কামা মূলতো বিনশ্যন্তি। অথ মর্ত্যোহমৃতো ভবতি, এতাবদ্ধি—এতাবদেবৈতাবন্মাত্রং, নাধিকমস্তীত্যাশলা কর্ত্তব্যা। অনু- শাসনম্ অনুশিষ্টিঃ উপদেশঃ সর্ব্ববেদান্তানামিতি বাক্যশেষঃ ॥ ১২৪৷১৫ ॥
যখন এই জীবৎ-দেহেই হৃদয়গত গ্রন্থিসমূহ, অর্থাৎ ‘দৃঢ়তর গ্রন্থিবন্ধনের ন্যায় সমস্ত অবিদ্যা-বুদ্ধি(ভ্রান্তি জ্ঞান সমুদয়) সর্বতো- ভাবে ভিন্ন অর্থাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়—অর্থাৎ ‘আমি এই শরীর(স্থূল, কৃশ ইত্যাদি), আমার এই ধন, আমি সুখী ও দুঃখী, ইত্যাদি প্রকার অবিদ্যাত্মক প্রতীতি সমূহ যখন তদ্বিপরীত—‘আমি অসংসারী ব্রহ্ম- স্বরূপই, এইরূপ ব্রহ্মাত্ম-জ্ঞানোদয়ে বিনষ্ট হইয়া যায়। অবিদ্যা- গ্রন্থিসমূহ বিনষ্ট হইলে, তদধীন বা তম্মূলক কামনাসমূহও বিনষ্ট হইয়া যায়। তখন, সেই মর্ত্য ব্যক্তি অমৃত হন। এই পর্য্যন্তই— ইহা অপেক্ষা অধিক আছে বলিয়া আশঙ্কা করা উচিত নহে, অনুশাসন অর্থাৎ সমস্ত বেদান্ত-শাস্ত্রের উপদেশ[এতদপেক্ষা আর অধিক তত্ত্বোপদেশ নাই]। ‘সর্ববেদান্তানাং’ পদটি শ্রুতিতে না থাকিলেও উহা ঐ বাক্যের শেষাংশ; এই কারণে ভাষ্যকার ঐটুকু ব্যাখ্যায় সংযোজিত করিয়া দিয়াছেন ॥ ১২৪ ॥ ১৫ ॥
শত্রুঘ্নকঃ চ হৃদয়স্য নাড়া স্তাসাং মূর্দ্ধানমভিনিঃ টৈকা। তয়োর্ব্বিমায়ন্নমৃতত্বমেতি বিষঙ্ঙন্যা উৎক্রমণে ভবন্তি॥
এবং মোক্ষহেতুব্রহ্মবিদ্যামুক্তা জ্ঞানিনঃ চরমদেহাৎ নিষ্ক্রমণে শততমিত্যাদিনা। হৃদয়স্য(হৃদয়সম্বন্ধিনঃ) শতঞ্চ একা চ(প্রকোপনীতং) নাড্যঃ[সন্তি]; তাসাং[মধ্যে] একা(সুষুম্নাখ্যা নাড়ী) মূর্দ্ধানমভি(প্রতি)